প্রাচীন ভারতে গিল্ড ব্যবস্থা

প্রাচীন ভারতে গিল্ড ব্যবস্থা প্রসঙ্গে গিল্ডের সাংগঠনিক কাঠামো, গিল্ডের বৈশিষ্ট্য, গিল্ডের কার্যাবলী, গিল্ডের জনপ্রিয়তার কারণ ও ভারতে গিল্ডের পতনের কারণগুলি সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতে গিল্ড ব্যবস্থা

ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রাচীন ভারতের গিল্ড ব্যবস্থা
সভাপতিপ্রমুখ বা শ্রেষ্ঠিন
গিল্ড সংগঠনের প্রধানভাণ্ডাগারিক
কোষচারিত্রিক বিশুদ্ধতার প্রমান
লেখক্রিয়ালিখিত প্রতিশ্রুতি
প্রাচীন ভারতে গিল্ড ব্যবস্থা

ভূমিকা :- প্রাচীন ও আদি-মধ্য যুগে ভারত -এর বিপুল সংখ্যক বণিক, শিল্পী, কারিগর প্রমুখ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে বণিক, শিল্পী, কারিগর প্রমুখ নিজেদের পৃথক পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করত। এই সংগঠনগুলি ‘গিল্ড’ বা ‘সংঘ’ বা ‘শ্রেণি’ নামে পরিচিত ছিল।

প্রাচীন ভারতের গিল্ডের সাংগঠনিক কাঠামো

প্রাচীনযুগে ভারতে গিল্ডগুলি নিজেদের পেশাগত শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা ও বাণিজ্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোর প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেমন  –

(ক) সংবিধান

গিল্ডের কার্যাবলি পরিচালনার জন্য তাদের নিজস্ব সংবিধান ছিল যার নিয়মকানুনগুলি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। গিল্ডের সব সদস্যকেই এই সংবিধানের নিয়মকানুন ও আচরণবিধি মেনে চলতে হত। কোনো সদস্য গিল্ডের নিয়মকানুন অমান্য করলে গিল্ড তাকে বহিষ্কার করার মতো শাস্তি দিত, এমনকি তার সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করতে পারত।

(খ) সদস্যপদ

কোনো ব্যক্তিকে গিল্ডের সদস্য হওয়ার জন্য সদস্য পদপ্রার্থীকে ‘কোষ’ অর্থাৎ চারিত্রিক বিশুদ্ধতার প্রমাণ দিতে হত। গিল্ডের নিয়মাবলি মেনে চলার বিষয়ে তাকে ‘লেখক্রিয়া’ বা লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হত। নতুন সদস্যের পরিচিত কোনো ‘মধ্যস্থ’ ব্যক্তিকে নতুন সদস্যের নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে থাকতে হত।

(গ) সভাপতি ও পরিষদ

প্রতিটি গিল্ডের কাজকর্ম পরিচালনার জন্য বংশানুক্রমে নিযুক্ত একজন করে সভাপতি থাকতেন। তাঁকে ‘প্রমুখ’ বা ‘জ্যেষ্ঠক’ বা ‘শ্রেষ্ঠিন’ বলা হত। সভাপতির কাজকর্মে সাহায্য করার জন্য গিল্ডের প্রবীণ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি ছোটো পরিষদ থাকত।

(ঘ) গিল্ডের জোট

কোনো কোনো সময় একাধিক গিল্ড যুক্ত হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠন তৈরি করত, যার প্রধানকে ‘ভাণ্ডাগারিক’ বলা হত।

(ঙ) তহবিল

প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে গিল্ডের নিজস্ব ও স্থায়ী তহবিল গড়ে উঠেছিল। কোনো সদস্য অন্যায় করলে তার শাস্তিস্বরূপ তার কাছ থেকে জরিমানা আদায় করেও গিল্ডের আয় হত।

(চ) হিসাবরক্ষা

গিল্ডের আর্থিক লেনদেনের হিসাব রাখার জন্য একজন হিসাব অধীক্ষক থাকতেন। গিল্ডের অর্থ জমা রাখা এবং প্রয়োজনের সময় তা সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করতেন বিশ্বন্ত তিনজন মন্ত্রী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

(ছ) স্বাতন্ত্র্য

প্রতিটি গিল্ড নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে নিজেদের পৃথক পতাকা, প্রতীক, সিলমোহর ও সৈন্যবাহিনী রাখত। অন্য গিল্ডের সঙ্গে সংঘাতের সময় তারা এই সেনাদল ব্যবহার করত।

(জ) রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক

রাজতন্ত্রের সঙ্গে গিল্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গিল্ডের প্রধান রাজসভায় উপস্থিত থাকতেন এবং নানা বিষয়ে রাজাকে পরামর্শ দিতেন। রাজা প্রয়োজনে গিল্ডের সৈন্যবাহিনীর সাহায্যও নিতেন।

প্রাচীন ভারতে গিল্ডের বৈশিষ্ট্য

প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন বণিক ও বিভিন্ন পেশার কারিগর শিল্পীরা গিল্ড বা সংঘ গড়ে তুলেছিল। ‘নারদ-স্মৃতি’, ‘বৃহস্পতি-স্মৃতি’ ও অন্যান্য সূত্র থেকে গিল্ডের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল –

(১) নির্দিষ্ট পেশাগত ভিত্তি

বিভিন্ন পেশার সঙ্গে নিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের পৃথক পৃথক গিল্ড গড়ে তুলত। কামার, কুমোর, তাঁতি প্রভৃতি বিভিন্ন পেশার মানুষের পৃথক পৃথক সংঘ গড়ে উঠেছিল।

(২) কার্যকরী সংবিধান কার্যাবলি পরিচালনার জন্য প্রতিটি পেশায় গিল্ডের নিজস্ব সংবিধান ছিল। গিল্ডের সকল সদস্য এই সংবিধানের নিয়মকানুন ও আচরণবিধি মেনে চলত।

(৩) নিজস্বতা রক্ষা

নিজস্বতা বজায় রাখার জন্য প্রতিটি গিল্ডের পৃথক পতাকা, প্রতীক, সিলমোহর ও সৈন্যবাহিনী থাকত। এতে গিল্ডের সদস্যদের সংঘ-শক্তির প্রতি আস্থা বাড়ত।

(৪) সদস্যদের সহায়তা দান

গিল্ডগুলি সদস্যদের বিপদের সময় পাশে দাঁড়াত, তাদের পরামর্শ দিত, সদস্যের পারিবারিক বিবাদের মীমাংসা করত, মৃত সদস্যের পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিত ইত্যাদি।

(৫) অন্যান্য পদক্ষেপ

গিল্ডগুলি উৎপাদন ও বাণিজ্যের কাজ সচল রাখত, বিভিন্ন ব্যক্তির আমানত জমা রেখে ঋণ দিত, সরকারকে রাজস্ব প্রদান ও সামরিক সাহায্য করত ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতের গিল্ডের কার্যাবলি

নিজস্ব নিয়মকানুন অনুসারে গিল্ডের কার্যকলাপ পরিচালিত হত। গিল্ড বিভিন্ন ধরনের কাজ করত। যেমন –

(১) ব্যাংকের কাজ

গিল্ডগুলি বর্তমানকালের ব্যাংকের মতো স্থাবর সম্পত্তি ও নগদ অর্থ আমানত হিসেবে জমা রেখে আমানতকারীকে সুদ দিত। গিল্ড আবার জমা রাখা অর্থ সুদে অন্যকে ঋণ দিত।

(২) বাণিজ্যে অবাঞ্ছিত প্রবেশ রোধ

স্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্যে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ করে গিল্ডগুলি স্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্যকে রক্ষা করত।

(৩) আর্থিক সহায়তা

গিল্ডের অসহায় সদস্যকে, অকালমৃত সদস্যের পরিবারকে গিল্ড আর্থিক সহায়তা করত।

(৪) বিচারের কাজ

গিল্ডের বিচারালয়ে সদস্যদের যাবতীয় ব্যক্তিগত বিরোধ, অপরাধ ও পারিবারিক বিবাদ প্রভৃতির বিচার করে মীমাংসা করা হত।

(৫) গুণমান ও মূল্যমান নির্ধারণ

গিল্ডগুলি পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখতে এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করতে উদ্যোগ নিত।

(৬) রাজস্ব প্রদান

রাজকোশে নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করে গিল্ডগুলি রাজকীয় কাজে সহায়তা করত।

(৭) সামরিক সাহায্য

রাষ্ট্রের প্রয়োজনে গিল্ডগুলি রাজাকে সামরিক সাহায্য দিত।

প্রাচীন ভারতের গিল্ডের জনপ্রিয়তার কারণ

প্রাচীন ভারতে গিল্ডের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণগুলি হল –

(১) সুযোগসুবিধা প্রাপ্তি

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গিল্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজ নিজ শ্রেণির জন্য বিশেষ সুযোগসুবিধা লাভ করতে থাকে। সদস্যরা গিল্ড থেকে পারিবারিক ক্ষেত্রেও নানা সাহায্য পেত।

(২) পরিকাঠামোগত ব্যয় হ্রাস

গিল্ড বা সংঘের সদস্যরা কর্মক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ফলে কারিগর ও বণিকদের পরিকাঠামোগত বা প্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ অনেক কম হত।

(৩) আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি

কারিগর, শ্রমিক বা বণিকরা শিন্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে নিজ পেশার মানুষের একটি বৃহত্তর মিলনক্ষেত্রে যুক্ত থাকার আনন্দ লাভ করেছিল। ফলে ছোটো বড়ো সব কারিগর বা বণিকেরই আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

(৪) দাবি আদায়

গিল্ডের আয়তন ও কর্মপরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা তাদের দাবিদাওয়া আদায় করার একটি শক্তিশালী মঞ্চ পেয়েছিল।

প্রাচীন ভারতের গিল্ডের পতনের কারণ

প্রাচীন ভারতে গিল্ডগুলি একসময় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করলেও একসময় এগুলির পতন ঘটে। এই পতনের বিভিন্ন কারণগুলি হল –

(১) ব্যক্তিগত বাণিজ্য

গিল্ডের সামগ্রিক বাণিজ্যের সমৃদ্ধির বদলে সদস্যরা ব্যক্তিগত বাণিজ্যকে সমৃদ্ধ করতে মনোযোগী হলে গিল্ডের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সমৃদ্ধি হ্রাস পায়।

(২) রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ

গিল্ডের কাজকর্মে ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ গিল্ডগুলিকে দুর্বল করে দেয়।

(৩) জাতিভেদের প্রভাব

গিল্ডের কাজের ক্ষেত্রে জাতি বা বর্ণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু হলে নিম্নবর্ণের বহু মানুষ গিল্ড থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে থাকে।

(৪) ব্যক্তি মালিকানা

পূর্বে জমিতে রাজার অধিকার বেশি ছিল। পরে জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার প্রসার ঘটলে মানুষ ব্যক্তিগত কাজের দিকে বেশি নজর দেয় এবং গিল্ডের বাইরে স্বাধীন ও স্বচ্ছলভাবে জীবিকা নির্বাহের অধিকারী হয়।

(৫) কৃষির গুরুত্ব বৃদ্ধি

কৃষির অগ্রগতি এবং জমিতে কৃষকের মালিকানা বৃদ্ধির ফলে জমির কাজে ক্রমে বেশি সংখ্যায় কৃষক নিযুক্ত হতে থাকলে শিল্প-বাণিজ্য -এ শ্রমিকের সংখ্যা কমে যায়। ফলে ব্যাবসা ও গিল্ড উভয়ই দুর্বল হয়।

(৬) রোম-ভারত বাণিজ্যের অবসান

ইতিহাসবিদ ড. ডি. ডি. কোশাম্বী মনে করেন যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে ভারত-রোম বাণিজ্য বন্ধ হয়। ফলে গিল্ডগুলি ভেঙে পড়ে এবং এর সদস্যরা বর্ণভিত্তিক উৎপাদনের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে বা দূরের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

উপসংহার :- ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার গিল্ডগুলির প্রশংসা করে বলেছেন যে, “গুপ্তযুগে গিল্ডগুলি শক্তির কেন্দ্র এবং সংস্কৃতি ও অগ্রগতির একটি আধার হয়ে উঠেছিল। এই যুগের গিল্ডগুলি যুগপৎ সমাজের শক্তি ও অলংকার ছিল।”

(FAQ) প্রাচীন ভারতে গিল্ড ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রাচীন ভারতের গিল্ড গুলি অন্য কি নামে পরিচিত ছিল?

সংঘ বা শ্রেণি বা নিগম।

২. গিল্ডের সদস্য পদপ্রার্থীর চরিত্রিক বিশুদ্ধতার প্রমান দেওয়াকে কি বলা হত?

কোষ।

৩. গিল্ডের সভাপতিকে কি বলা হত?

প্রমুখ বা শ্রেষ্ঠিন।

৪. একাধিক গিল্ডের সংগঠনের প্রধানকে কি বলা হত?

ভাণ্ডাগারিক।

Leave a Comment