উপনিবেশিক সমাজে জাতি প্রশ্ন

উপনিবেশিক সমাজে জাতি প্রশ্ন প্রসঙ্গে শাসক ও শাসিতের জাতিগত পার্থক্য, উপনিবেশিক সমাজে জাতিগত প্রশ্ন, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব বিচার, অভিভাবকত্বের মানসিকতা, যোগ্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, শ্রেষ্ঠ জাতির প্রাধান্য, শ্বেতাঙ্গদের উন্নাসিকতা, জাতিগত ব্যবধান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা, বিকৃত জাতীয়তাবাদ ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে জানবো।

উপনিবেশিক সমাজে জাতি প্রশ্ন

ঐতিহাসিক ঘটনাঔপনিবেশিক সমাজে জাতি-প্রশ্ন
বিবর্তনবাদচার্লস ডারউইন
হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়াজেমস মিল
জার্মানরা খাঁটি আর্য জাতিহিটলার
অ্যাংলো স্যাক্সন জাতিহোমার লি
উপনিবেশিক সমাজে জাতি প্রশ্ন

ভূমিকা :- আধুনিক ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হল্যান্ড প্রভৃতি উন্নত জাতিগুলি এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অনুন্নত জাতির ওপর নিজেদের ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, আধুনিক আফ্রিকা মহাদেশের ২০টি দেশে ব্রিটেন, ১৮টি দেশে ফ্রান্স, ৫টি দেশে পোর্তুগাল, ৪টি দেশে স্পেন, ৩টি দেশে ইতালি এবং ২টি দেশে বেলজিয়াম ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল।

শাসক ও শাসিতের জাতিগত পার্থক্য

ইউরোপের উন্নত ও সুসভ্য জাতিগুলি অনুন্নত দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে শাসক ও শাসিতের জাতিগত পার্থক্য যথেষ্ট সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। উন্নত জাতিগুলি এই পার্থক্য নিজেদের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার, জাতীয় গৌরব গাথা রচনা, অন্য জাতিকে হীন বলে মনে করে তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা প্রভৃতির মাধ্যমে বারংবার প্রকাশ করত।

ঔপনিবেশিক সমাজে জাতিগত প্রশ্ন

আধুনিক ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের জনগণ সুস্পষ্ট দুটি জাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা – সাম্রাজ্যবাদী শাসক জাতি এবং উপনিবেশগুলিতে বসবাসকারী শাসিত জাতি। সাম্রাজ্যবাদী শাসক জাতি নিজেদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী ছিল।

ঔপনিবেশিক সমাজে জাতিগত প্রশ্নের বিভিন্ন দিক

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিশালী জাতিগুলি তাদের অধীনস্থ উপনিবেশের বাসিন্দাদের হীন জাতিভুক্ত বলে বিবেচনা করে তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। যেমন –

(ক) জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার

  • (১) ইউরোপের ঔপনিবেশিক জাতিগুলি উপনিবেশগুলিতে নিজেদের সীমাহীন জাতিগত গৌরবের কথা প্রচার করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনকালে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জেমস মিল মনে করতেন যে, ব্রিটিশ শাসনাধীনে অনুন্নত ভারতীয়দের মঙ্গল হচ্ছে। ভারতীয়দের স্বাধীনতা বা স্বশাসনদানের কোনো প্রশ্নই ওঠে না, কেন না, ভারতে ব্রিটিশ শাসন অনন্তকাল টিকে থাকবে।
  • (২) মিল তাঁর ‘হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে প্রাচ্যের সুবিস্তৃত ব্রিটিশ উপনিবেশের কোনো সভ্যতাকেই উচ্চমানের বলে মনে করেন নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ইতালি ও জার্মানিও নিজ নিজ জাতির সীমাহীন শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করার মাধ্যমে জাতিবিদ্বেষের কুৎসিত রূপ তুলে ধরে।
  • (৩) ভারতে বড়োলাট উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইন-সচিব লর্ড মেকলে ভারতে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থা অপেক্ষা সম্পূর্ণ নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করে জানান যে, “ইউরোপের ভালো কোনো গ্রন্থাগারের একটি তাক সমগ্র ভারত ও আরবের সাহিত্যের সমকক্ষ।”

(খ) অভিভাবকত্বের মানসিকতা

  • (১) মিশনারি না হয়েও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির কিছু মানুষ এশিয়া ও আফ্রিকার উপনিবেশগুলির বাসিন্দাদের স্বঘোষিত অভিভাবক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেন। তাঁরা উপনিবেশের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সংস্কৃতিবান করে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
  • (২) এক্ষেত্রে মিশরে লর্ড ক্রোমার, উত্তমাশা অন্তরীপে লর্ড মিলনার, নাইজেরিয়ায় লর্ড লুগার্ড, আফ্রিকায় কার্ল পিটার্স, মরক্কোয় মার্শাল লিয়াউতে প্রমুখ উপনিবেশের অনগ্রসর মানুষদের অগ্রসর করে তোলার উদ্দেশ্যে স্বঘোষিত দায়িত্ব পালন করার কথা বলা যায় । ডেভিড টমসনের মতে, “এসব লোকেদের উদ্যোগ ছাড়া আফ্রিকায় ব্যাপক ও সুনিয়ন্ত্রিত ইউরোপীয় কর্তৃত্ব সম্ভব হত না।”

(গ) যোগ্য জাতি শ্রেষ্ঠত্ব

  • (১) ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তাঁর ‘যোগ্যতমের উদবর্তন’ তত্ত্বে বলেছেন, প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে শুধু যোগ্যতম প্রাণীরাই বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।
  • (২) ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলি এই তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং সামাজিক ক্ষেত্রে ডারউইনের তত্ত্বকে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে ও নিজেদের স্বার্থপূরণকারী সেই নীতিকে তারা ‘যোগ্যতম জাতির শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা’র তত্ত্ব হিসেবে তুলে ধরে।
  • (৩) সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলি প্রচার করে যে, পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জীবনধারণের উপকরণে ঘাটতি দেখা দিলে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে যোগ্য বা শক্তিশালী জাতিই এই সংঘাতে জয়ী হয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকবে।

(ঘ) শ্রেষ্ঠ জাতির প্রাধান্য

  • (১) সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি নিজ নিজ জাতিকে শ্রেষ্ঠ এবং উপনিবেশে শাসিত জাতিগুলিকে নিকৃষ্ট বলে মনে করত। পাশাপাশি নিকৃষ্ট জাতির ওপর শ্রেষ্ঠ জাতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্মগত অধিকার আছে বলে রাষ্ট্রগুলি ঘোষণা করত। ঔপনিবেশিক শাসক জাতি মনে করত যে, তাদের শাসনাধীনে অনুন্নত উপনিবেশের জনগণের উন্নতি ঘটবে।
  • (২) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের জাতিগত গর্বের কথা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রচার করত যে, “ব্রিটিশ জাতির সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও অস্তমিত হয় না।” হিটলার জার্মান জাতিকে খাঁটি আর্য জাতি বলে ঘোষণা করেন এবং বলেন যে, অনার্য জাতিগুলির ওপর প্রকৃত আর্য জার্মান জাতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অধিকার বৈধ।

(ঙ) শ্বেতাঙ্গদের উন্নাসিকতা

  • (১) ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী জাতিগুলির বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, কৃষ্ণাঙ্গ জাতির চেয়ে শ্বেতাঙ্গ জাতির মানুষ অনেক বেশি উন্নত সভ্যতার অধিকারী। এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষ কখনও শ্বেতাঙ্গদের সমকক্ষ হতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদী নীতির মাধ্যমেও তাদের উন্নত সভ্যতার রূপটিই প্রকাশিত হয় বলে শ্বেতাঙ্গরা মনে করত।
  • (২) জনৈক ফরাসি লগ্নিকারক জুলে ফেরি বলেছিলেন যে, “উন্নত জাতির একপ্রকার অধিকার আছে, কারণ তাদের একটি কর্তব্য আছে। তাদের কর্তব্য হল পিছিয়ে পড়া জাতিকে সভ্য করে তোলা।”

(চ) জাতিগত ব্যবধান

  • (১) উপনিবেশগুলিতে ঔপনিবেশিক শাসক জাতি এবং উপনিবেশের শাসিত জাতির মধ্যে মর্যাদাগত ব্যবধান সহজেই চোখে পড়ে। উপনিবেশে বসবাসকারী স্থানীয় জনজাতিগুলি নানা ধরনের ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হলেও সেখানে আগত ঔপনিবেশিক জাতির মানুষজন বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা লাভ করে।
  • (২) ঔপনিবেশিক শক্তির আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের যাবতীয় বিশেষ সুযোগসুবিধা শাসকজাতি ভোগ করলেও উপনিবেশের শাসিত জাতি তা থেকে বঞ্চিত হয়। শাসিত জাতি উচ্চহারে কর প্রদান করে, শাসকদের অনুকূলে কায়িক শ্রম দান করে শাসক জাতির জীবনে বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিতে বাধ্য হয়।

(ছ) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা

  • (১) ঔপনিবেশিক শাসক জাতি সর্বদা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শ্রেষ্ঠতর এবং উপনিবেশে বসবাসকারী শাসিত জাতির সংস্কৃতিকে নিকৃষ্ট বলে মনে করত। ভারতে ব্রিটিশ আইন-সচিব লর্ড মেকলে প্রাচ্যের সভ্যতাকে সরাসরি দুর্নীতি, অপবিত্র ও নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করেন। লর্ড কর্নওয়ালিশও ভারতীয়দের দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করতেন।
  • (২) শাসক জাতি নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে তা উপনিবেশের শাসিত জনসমাজে চাপিয়ে দেয়। ব্রিটিশ সরকার ভারতের সুপ্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত নিম্নমানের বলে নিন্দা করে এদেশে নিজেদের ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে।

(জ) বিকৃত জাতীয়তাবাদ

  • (১) পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের ধারণাটি সম্পর্কযুক্ত। ঊনবিংশ শতকের শেষ এবং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে বিকৃত বা উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটে। এই ধরনের রাষ্ট্রের শাসকরা নিজেদের দেশ ও জাতিকে শ্রেষ্ঠতম বলে মনে করে এশিয়া ও আফ্রিকার অনগ্রসর জাতিগুলিকে পদানত করার উদ্যোগ নেয়।
  • (২) ইউরোপের এক শ্রেণির সাহিত্যিক ও সাংবাদিক এই ধরনের জাতীয়তাবাদের প্রচারক ও সমর্থকে পরিণত হয়। জার্মান ঐতিহাসিক হেনরিখ ফন ট্রিটস্কি, বার্নহার্ডি প্রমুখ প্রচার করেন যে, জার্মানির টিউটনিক জাতিই হল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। ইংরেজ লেখক হোমার লি অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেন।
  • (৩) বিকৃত জাতীয়তাবাদীদের অন্যতম কাজই হল শাসিত জাতিগুলির ওপর শোষণ, নির্যাতন ও দমনপীড়ন এবং তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো।

(ঝ) সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ

  • (১) ইউরোপের ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি নিজেদের লক্ষ্য ও স্বার্থকে জাতীয় লক্ষ্য ও স্বার্থের সমার্থক বলে প্রচার করে। এরূপ জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত। এরূপ পুঁজিপতিরা পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্ধ দেশপ্রেম ও সংকীর্ণ আত্মগৌরবের কথা প্রচার করে।
  • (২) ইউরোপে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি রাষ্ট্র গুলির সাধারণ মানুষ এরূপ সংকীর্ণ আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একদা সেইসব রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশিক শাসনের প্রসারকে সমর্থন করেছিল।

উপসংহার :- এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন উপনিবেশ গুলির কাছে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ ছিল একটি অভিশাপ। ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে উপনিবেশ গুলিতে মুক্তি আন্দোলন শুরু হয়।

(FAQ) উপনিবেশিক সমাজে জাতি প্রশ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া গ্রন্থের রচয়িতা কে?

জেমস মিল।

২. ভারতের বড়লা ট উইলিয়াম বেন্টিং এর আইন সচিব কে ছিলেন?

লর্ড মেকলে।

৩. যোগ্যতমের উদবর্তন তত্ত্বের প্রবক্তা কে?

চার্লস ডারউইন।

৪. জার্মান জাতিকে খাঁটি আর্য জাতি বলে ঘোষণা করেন কে?

হিটলার।

৫. প্রাচ্যের সভ্যতাকে সরাসরি ‘দুর্নীতি, অপবিত্র ও নির্বুদ্ধিতা’ বলে অভিহিত করেন কে?

লর্ড মেকলে।

Leave a Comment