টমাস ব্যাবিংটন মেকলে

টমাস ব্যাবিংটন মেকলে প্রসঙ্গে তার জন্ম, পিতৃপরিচয়, শিক্ষা, বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা, গ্রন্থ রচনা, ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে মেকলের দৃষ্টিভঙ্গি, মেকলের সন্তান, মেকলের ইতিহাস চেতনা সম্পর্কে ত্রিপাঠীর মন্তব্য, মেকলের ইতিহাস চেতনার সমালোচনা, ভারতীয়দের জাতীয় চরিত্র সম্পর্কে মেকলের অবমাননাকর মন্তব্য, মেকলের মৃত্যু ও তার সমাধি সম্পর্কে জানবো।

টমাস ব্যাবিংটন মেকলে

ঐতিহাসিক চরিত্রটমাস ব্যাবিংটন মেকলে
জন্ম২৪ অক্টোবর ১৮০০ খ্রি:
পরিচিতিঐতিহাসিক, দার্শনিক
রাজনৈতিক দলহুইগ দল
ভারতে অবস্থান১৮৩৪-৩৮ খ্রি:
মৃত্যু২৮ ডিসেম্বর ১৮৫৯ খ্রি:
টমাস ব্যাবিংটন মেকলে

ভূমিকা :- টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ছিলেন একজন খ্যাতনামা ব্রিটিশ পণ্ডিত, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক এবং হুইগ দলের রাজনৈতিক নেতা। একটি ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সন্তান মেকলে অল্প বয়সেই বিভিন্ন বিষয়ে অসীম প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন।

মেকলের জন্ম

মেকলে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর লিসেস্টারশায়ারের রথলি টেম্পল-এ জন্মগ্রহণ করেন।

পিতৃ পরিচয়

তিনি একজন স্কটিশ হাইল্যান্ডার জ্যাচারি ম্যাকাউলের ছেলে, যিনি একজন ঔপনিবেশিক গভর্নর ছিলেন।

মেকলের শিক্ষা

তিনি একটি বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর হার্টফোর্ডশায়ার, এবং পরবর্তীকালে, ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজে অধ্যয়ণ করেন।

বিভিন্ন ভাষায় মেকলের দক্ষতা

ইংরেজি, জার্মান, ডাচ, স্প্যানিশ, ফরাসি প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী মেকলে ‘প্যারাডাইস লস্ট’ অনায়াসে মুখস্থ বলতে পারতেন।

মেকলে রচিত গ্ৰন্থ

‘Lays of Ancient Rome’ এবং ‘The History of England from the Accession of James II’ তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য দুটি ইতিহাস গ্রন্থ।

ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে মেকলের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাধারণভাবে মেকলেকে উপযোগবাদী দার্শনিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। নীচে মেকলের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল

(ক) ব্রিটিশ জাতির শ্রেষ্ঠত্ব

  • (১) মেকলে তাঁর ইতিহাসচর্চায় বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন। যেমন – সভ্য জাতিসমূহের ইতিহাস এবং অসভ্য জাতিসমূহের ইতিহাস। তিনি ব্রিটিশ জাতিকে চূড়ান্ত সভ্য জাতি বলে মনে করতেন। পাশাপাশি তিনি ভারতীয় সভ্যতাকে চূড়ান্ত নিকৃষ্ট বলেও মনে করতেন।
  • (২) তাঁর মতে, উন্নত ব্রিটিশ সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিও উন্নত হতে পারে। হিতবাদী দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মেকলের মতানুযায়ী, নিকৃষ্ট ভারতীয় সভ্যতাকে উন্নত করা এদেশের ব্রিটিশ শাসনের এক মহান কর্তব্য।

(খ) ভারতে মেকলে অবস্থান

  • (১) লর্ড মেকলে ভারতের বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের শাসনকালে তাঁর আইন-সচিব হয়ে ভারতে আসেন এবং কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন-এর সভাপতি নিযুক্ত হন। তিনি ভারতে চার বছর (১৮৩৪-৩৮ খ্রি.) কাটান।
  • (২) এই সময়ে তিনি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য ধারণার প্রসারে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর তৈরি করা আইন সংক্রান্ত সুপারিশগুলি ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে তার প্রতিবেদন মেকলে মিনিট নামে পরিচিত।
  • (৩) ভারতে ব্রিটিশ শাসক লর্ড ক্লাইভ এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের বিষয়ে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন। আইন কমিশনের অন্যতম সদস্য হিসেবে মেকলে ভারতে অবস্থানকালের শেষ বছরে (১৮৩৮ খ্রি.) ভারতের ফৌজদারি আইনবিধি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

(গ) ভারতীয় শিক্ষার নিন্দা

মেকলে ভারতীয় সভ্যতা ও শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র নিন্দা করেন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের কাছে তাঁর বিখ্যাত প্রস্তাব বা ‘মিনিট’ পেশ করেন। এই প্রস্তাবে –

  • (১) মেকলে প্রাচ্যের সভ্যতাকে দুর্নীতিগ্রস্ত অপবিত্র ও বুদ্ধিহীন বলে অভিহিত করে সরাসরি পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন।
  • (২) তাঁর মতে, প্রাচ্য শিক্ষায় কোনো বৈজ্ঞানিক চেতনা নেই এবং তা পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে সব অংশেই নিকৃষ্ট।
  • (৩) তিনি দাবি করেন, “একটি ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি তাক ভারত বা আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমকক্ষ।”

(ঘ) ইংরেজি ভাষার প্রসারে গুরুত্ব দান

  • (১) ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বে শিক্ষাদানের মাধ্যম ছিল সংস্কৃত বা আরবি ভাষা। উগ্র পাশ্চাত্যবাদী মেকলে ভারতে পাশ্চাত্য রীতিতে শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন। মেকলে তৎকালীন বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে বোঝাতে সক্ষম হন যে, বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের পর ষষ্ঠ বর্ষ থেকে ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষা মাধ্যম হিসেবে চালু করা উচিত। এতে উচ্চশিক্ষার প্রসার সহজ হবে।
  • (২) মেকলের লক্ষ্য ছিল ভারতে সাংস্কৃতিক বিজয়। তিনি বলেন যে, পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে এদেশে এমন ভারতীয় জনগোষ্ঠী তৈরি হবে, যারা “রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায় হবে ইংরেজ।” তারাই পরে জনগণের মধ্যে নতুন জ্ঞান প্রচার করবে এবং ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভারতে নবজাগরণ ঘটাবে।

(ঙ) ক্রমনিম্ন পরিশ্রুত নীতির প্রবর্তন

মেকলে মনে করেন যে, প্রথম পর্যায়ে ভারতের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। জল যেভাবে ওপর থেকে নীচের দিকে প্রবাহিত হয় তেমনি পরবর্তীকালে এই উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সহায়তায় পাশ্চাত্য শিক্ষা ক্রমে ভারতের সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। মেকলের এই নীতি ক্রমনিম্ন পরিশ্রুত নীতি’ বা ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’ নামে পরিচিত।

মেকলের সন্তান

ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে মেকলের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মেকলে ভারতবাসীকে নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা ছেড়ে অন্ধভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিচর্চায় অনুপ্রাণিত করেছেন। তাই কোনো ভারতীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও যারা নিজেদের জীবনচর্যায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে, তাদের কখনো কখনো পরিহাস করে ‘মেকলের সন্তান’ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

মেকলের ইতিহাস চেতনা সম্পর্কে ত্রিপাঠীর মন্তব্য

ড. অমলেশ ত্রিপাঠী তাই যথার্থভাবে বলেছেন, “সমসাময়িককালের উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন লাভ করলেও মেকলের ঐতিহাসিক খ্যাতি আজ নিষ্প্রভ। … এক শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়নি, মেকলে স্মৃতির সপ্তম স্বর্গ হাতে নিন্দার পঙ্কশয্যায় নেমে এসেছেন।

মেকলের ইতিহাস চেতনার সমালোচনা

লর্ড মেকলের ইতিহাস চেতনা বিভিন্ন কারণে সমালোচিত হয়েছে। যেমন –

  • (১) লর্ড অ্যাক্টন বলেছেন, “ইতিহাসকে দাঁড়াতে হবে তথ্যের ওপর, ব্যক্তিগত মতামতের ওপর নয়।” এখানেই মেকলের প্রধান ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। তিনি ইতিহাস রচনায় তথ্যের চেয়ে ব্যক্তিগত মতামতকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
  • (২) মেকলের রচনা উন্নত সাহিত্য গুণসম্পন্ন হলেও তাতে উপস্থিত ঐতিহাসিক তথ্যাবলি সর্বদা নির্ভরযোগ্য নয়।
  • (৩) তাঁর রচনা ছিল অনেক সময় একপেশে এবং পক্ষপাতদুষ্ট। হুইগ দলের একনিষ্ঠ সমর্থক মেকলের রচনায় সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
  • (৪) ধ্রুপদি যুগ সম্পর্কে তাঁর যতটা জ্ঞান ছিল, ততটা জ্ঞান মধ্যযুগের ইতিহাস সম্পর্কে ছিল না।
  • (৫) ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে মেকলের জ্ঞান ছিল সীমিত।
  • (৬) মেকলে তাঁর রচনায় প্রতিপক্ষকে অনেক সময় অযৌক্তিক এবং নির্মমভাবে আক্রমণ করেছেন।

ভারতীয়দের জাতীয় চরিত্র সম্পর্কে মেকলের অবমাননাকর মন্তব্য

  • (১) আইন কমিশনের সভাপতি হিসেবে মেকলে ভারতের ফৌজদারি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখেন। দন্ডবিধির ওপর তাঁর রচিত প্রতিবেদন এক বিরাট কীর্তি। এই রচনায় তিনি তাঁর উদারনৈতিক চিন্তাধারা ও মহান বিচার শাস্ত্রীয় অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন।
  • (২) কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই আইন প্রণয়ন ও ফৌজদারি আইনের পাশ্চাত্যকরণ সম্পর্কিত সভার কার্যবিবরণীতে তিনি বাঙালি ও অন্যান্য ভারতীয়দের জাতীয় চরিত্র সম্পর্কে বহু অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যদিও তাঁর আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সে সব আদৌ সম্পর্কিত ছিল না।
  • (৩) তিনি বলেন যে, বাঙালিরা দৈহিক দিক থেকে ভঙ্গুর ও দুর্বল, নৈতিক দিক থেকে কাপুরুষ। তাঁর মতে, বাঙালিরা অভ্যাসগতভাবে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, যোগসাজশকারী ও জালিয়াত। তিনি বাঙালির এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, শতকের পর শতক সামন্তবাদী স্বৈরতন্ত্রের কবলে থাকার ফলে বাঙালির এ ধরনের চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটেছে

মেকলে রচিত গ্ৰন্থ

লর্ড মেকলের উল্লেখযোগ্য রচনা গুলি হল –

  • (১) Lays of Ancient Rome (1842)
  • (২) The History of England from the Accession of James II (1848)
  • (৩) Critical and Historical Essays(1843)
  • (৪) “Social and Industrial Capacities of the Negroes” (1873)
  • (৫) Lays of Ancient Rome: With Ivry, and The Armada. Longmans, Green, and Company (1881)
  • (৬) William Pitt, Earl of Chatham : Second Essay (Maynard, Merrill, & Company, 1892)
  • (৭) The Miscellaneous Writings and Speeches of Lord Macaulay (1860)
  • (৮) The Letters of Thomas Babington Macaulay (1881)

মেকলের মৃত্যু

তিনি ১৮৫৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৫৯ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর প্রধান কাজ, দ্য হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড ফ্রম অ্যাকসেসন অফ জেমস দ্য সেকেন্ড অসম্পূর্ণ রেখে যান।

মেকলের সমাধি

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারী তাকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে, পোয়েটস কর্নারে, অ্যাডিসনের মূর্তির কাছে সমাহিত করা হয়।

উপসংহার :- প্রকৃতপক্ষে এ এক পরিহাস যে, আজকের দক্ষিণ এশীয় পন্ডিত ব্যক্তিরা যত না ভারতীয় দন্ডবিধির উন্নয়নে তাঁর বিরাট অবদানের কথা স্মরণ করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি উল্লেখ করেন প্রাচ্যদেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর নেতিবাচক মনোভাবের। সে মনোভাবে ছিল না কোনো সমস্যার গভীরতর উপলব্ধি, ছিল না কোনো প্রজ্ঞাসুলভ পরিমিতিবোধ।

(FAQ) টমাস ব্যাবিংটন মেকলে সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. লর্ড মেকলের জন্ম কখন হয়?

২৪ অক্টোবর ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে।

২. লর্ড মেকলে কোন দেশের নাগরিক ছিলেন?

ইংল্যান্ড।

৩. চুঁইয়ে পড়া নীতির প্রবক্তা কে ছিলেন?

লর্ড মেকলে।

৪. মেকলের মৃত্যু কখন হয়?

২৮ ডিসেম্বর ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে।

৫. মেকলে রচিত দুটি গ্ৰন্থের নাম লেখ।

‘Lays of Ancient Rome’ এবং ‘The History of England from the Accession of James’

Leave a Comment