কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সময়কাল

কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সময়কাল প্রসঙ্গে ফ্লিট ও কানিংহামের অভিমত, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, মুদ্রার প্রমান, মার্শালের অভিমত, মার্শালের অভিমতের ত্রুটি, ডঃ মজুমদারের অভিমত, ফার্গুসনের মত, ফার্গুসনের মতের সমর্থনে যুক্তি ও ৭৮ খ্রিস্টাব্দের পক্ষে মত সম্পর্কে জানবো।

কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সময়কাল

বিষয় কণিষ্কের সময়কাল
সাম্রাজ্য কুষাণ সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা কুজুল কদফিসেস
শ্রেষ্ঠ রাজা কণিষ্ক
শেষ রাজা দ্বিতীয় বাসুদেব
কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সময়কাল

ভূমিকা :- কণিষ্কের সিংহাসনে বসার তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। যদিও কণিষ্কের লিপি ও মুদ্রা বেশ কিছু সংখ্যায় পাওয়া যায়, সেগুলির ব্যাখ্যা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকায় কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায়নি।

দুটি বিষয়

কণিষ্কের সিংহাসনে আরোহণ প্রসঙ্গে দুটি বিষয়ে বেশীর ভাগ পণ্ডিতেরা একমত – (১) কণিষ্ক তার সিংহাসনে বসার সময় একটি সম্বত বা অব্দ প্রবর্তন করেন, (২) কণিষ্ক বিম কদফিসেসের পরে রাজা হন।

ফ্লিট ও ক্যানিংহামের অভিমত

ডঃ ফ্লিট, ক্যানিংহাম প্রমুখ পণ্ডিতেরা মনে করেন যে, কণিষ্ক যে সম্বতের প্রবর্তন করেন তা ৫৮ খ্রি পূর্বে শুরু হয়েছিল। পরে এই সম্বতের নাম হয় বিক্রম সম্বত। এই মত অনুসারে হিসেব করলে কণিষ্ক, কদফিসেস গোষ্ঠীর আগে সিংহাসনে বসেন একথা স্বীকার করতে হয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

প্রত্নতাত্বিক প্রমাণ হতে দেখা যায় যে, কণিষ্ক ছিলেন বিম কদফিসেসের পরবর্তী। কণিষ্ক ভারতের ভেতর সারনাথ পর্যন্ত অধিকার করেন। যদি বিম কনফিসেস তাঁর পরে আসেন তাহলে কি করে তিনি শুধু গান্ধার অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেন? সুতরাং বিম কদফিসেস কণিষ্কের আগে আসেন বলা উচিত।

মুদ্রার প্রমান

কুজুল ও বিম কদফিসেসের মুদ্রায় শক রাজাদের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়। সুতরাং তাঁরা শক শাসনের অব্যবহিত পরে আসেন বলা যায়। কণিষ্কের মুদ্রায় রোমান প্রভাব দেখা যায়। তক্ষশিলায় খনন করে কণিক গোষ্ঠীর মুদ্রা মাটির ওপরের স্তরে এবং কদফিসেস গোষ্ঠীর মুদ্রা মাটির নীচের স্তরে পাওয়া গেছে। এর থেকে প্রমাণিত হয় কদফিসেসের পরে কণিষ্ক সিংহাসনে বসেন। কণিষ্কের মুদ্রায় সাসানীয় প্রভাবও দেখা যায়। এই সকল যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে ফ্লিটের মত এখন পরিত্যক্ত হয়েছে। বিক্রম সম্বতের ৫৮ খ্রিস্ট পূর্বের সঙ্গে কণিষ্কের কোনো সম্পর্ক ছিল না মনে করা হয়।

মার্শালের অভিমত

  • (১)  মার্শাল, স্মিথ প্রমুখের মতে কণিষ্ক ১২৫-১২৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সিংহাসনে বসেন। তারা কিছু চীনা সূত্র এবং তক্ষশীলায় খননের ফলে প্রাপ্ত প্রমাণ থেকে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন। চীনা সূত্রে বাসুদেব নামে রাজার নাম পেয়েছেন যিনি ২৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব করতেন। ২৩০ খ্রিস্টাব্দ = ৯৮ কণিষ্কাব্দ।
  • (২) যেহেতু বাসুদেবের আগে কণিষ্ক রাজত্ব করেন, সেহেতু ২৩০ – ৯৮ = ১৩২ খ্রিস্টাব্দকে কণিষ্কের সিংহাসনে বসার কাল ধরা হয়। কণিষ্ক ২৩ বছর রাজত্ব করেন। সুতরাং ১৩২ + ২৩ = ১৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কণিষ্ক রাজত্ব করেন বলে ধরা হয়। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তক্ষশীলায় খনন করে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে যা মার্শালের মতকে সমর্থন করে।

মার্শালের মতের ত্রুটি

  • (১) দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ১২৫-১২৮ খ্রিস্টাব্দ মতের বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি ডঃ রায়চৌধুরী দেখিয়েছেন। রুদ্রদামনের জুনাগড় লিপি থেকে জানা যায় তিনি নিম্ন সিন্ধু অঞ্চলে রাজত্ব করতেন।
  • (২) রুদ্রদামনের শাসনকাল হল ১৩০-১৫০ খ্রিস্টাব্দ। এদিকে কণিষ্কের সুই বিহার লিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি নিম্ন সিন্ধু অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। তাহলে একই সঙ্গে একই স্থানে দুই জন রাজা রাজত্ব করতে পারেন না।
  • (৩) রুদ্রদামন স্বাধীন নৃপতি ছিলেন এবং তাঁর কাল ১৩০-১৫০ খ্রিস্টাব্দ নিশ্চিত। এক্ষেত্রে কণিষ্ক অন্য সময় নিম্ন সিন্ধুতে রাজত্ব করতেন বলে ধরতে হয়। সুতরাং ১২৫-১২৮ খ্রিস্টাব্দ কণিষ্কের কাল হতে পারে না।
  • (৪) কণিষ্ক যদি ১২৫-১২৮ খ্রিস্টাব্দের হন তবে তিনি দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের। এই সময় কোনো রাজা কোনো সম্বত চালু করেননি। অথচ কণিষ্ক নিশ্চিতভাবে একটি সম্বত চালু করেন বলে জানা যায়। সুতরাং তাকে দ্বিতীয় খ্রীষ্টাব্দের লোক বলা যায় না।
  • (৫) চীনা গ্রন্থের তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। ষষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত গ্রন্থ সূত্রালঙ্কার থেকে চীনা গ্রন্থে এই সকল তথ্য গ্রহণ করা হয়। সূত্রালঙ্কারে কণিষ্কের সন-তারিখ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই। ডঃ সরকারের মতে, চীনা গ্রন্থে যে বাসুদেবের কথা বলা হয়েছে তিনি অন্য বাসুদেব এবং যে কণিষ্কের নাম করা হয়েছে তিনি আরা লিপিতে উল্লিখিত অন্য কণিষ্ক। সুতরাং মার্শালের মত গ্রহণীয় নয়।

ডঃ মজুমদারের অভিমত

  • (১) ডঃ আর সি মজুমদার কণিষ্কের কাল ২৪৮-৪৯ খ্রিস্টাব্দ বলে স্থির করেছেন। তিনি বলেন যে, কণিষ্ক যে সম্বত প্রচলন করেন তা ছিল ত্রৈকূটক-কলচুরি চেদি সম্বত।
  • (২) ডঃ মজুমদারের এই মতের বিরুদ্ধে বলা হয় যে, যদি কণিষ্কের কাল ২৪৮-৪৯ খ্রিস্টাব্দ ধরা হয়, তবে তাঁর বংশধর বাসুদেবের অব্দ হবে ৩৪৮ খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু ৩৪৮ খ্রিস্টাব্দে গুপ্তবংশ ক্ষমতায় এসে যায়। তখন কুষাণ বাসুদেবের রাজত্ব করার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
  • (৩) গুপ্তবংশের আগে মথুরায় নাগবংশের অধিকার ছিল একথা সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায়। নাগবংশের পর আসে গুপ্তবংশ। সুতরাং বাসুদেব কুষাণ কিছুতেই চতুর্থ খ্রিস্টাব্দ অথবা তৃতীয়  খ্রিস্টাব্দে আসতে পারেন না। ডঃ মজুমদারের মত এজন্য পরিত্যক্ত হয়েছে।

ফার্গুসনের মত

  • (১) পণ্ডিতেরা বিভিন্ন দিক বিচার করে ফার্গুসনের মতকেই সম্ভাব্য বলে গ্রহণ করেছেন। ফার্গুসনের মত হল এই যে, কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন এবং এই সনেই তাঁর সম্বত বা অব্দ চালু করেন। পরে এই সম্বতের নাম হয় শকাব্দ।
  • (২) ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে ভারততত্ত্ববিদদের সম্মেলনে কণিষ্কের কাল নিয়ে বিচার বিতর্কের পর স্থির হয় যে, কণিষ্ক প্রথম খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব করতেন ধরা উচিত এবং তিনি ৭৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সম্বত বা শকাব্দ প্রবর্তন করেন। ডঃ রায়চৌধুরী, ডঃ সরকার, ডঃ ওল্ডেনবার্গ প্রমুখ এই মতকে সমর্থন করেছেন।

ফার্গুসনের মতের সমর্থনে যুক্তি

এই মতের বিরুদ্ধে যুক্তি দেখান হয় যে, কণিষ্ক ছিলেন কুষাণ। তাঁর প্রবর্তিত অব্দের নাম কেন শকাব্দ হবে? এর উত্তরে বলা হয়েছে যে,

  • (১) কুষণরা দীর্ঘকাল শকদের সংস্পর্শে এসে শক আচার-পদ্ধতি বহু পরিমাণে আত্মসাৎ করেছিল।
  • (২) কুষাণ মুদ্রায় শক প্রভাব দেখা যায়।
  • (৩) র‍্যাপসনের মতে, কণিষ্কের অব্দটি পশ্চিম ভারতের শক-ক্ষত্রপরা দীর্ঘকাল ধরে একনাগাড়ে ব্যবহার করেন। কুষাণদের পতনের পরেও তারা এই অব্দটি চালান। শকদের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য এই সম্বতের নাম শকাব্দ হয়ে যায়। ৭৮ খ্রিস্টাব্দে এটি চালু হয়েছিল।

৭৮ খ্রিস্টাব্দের পক্ষে মত

  • (১) আপাতত ৭৮ খ্রিস্টাব্দকেই কণিষ্কের সিংহাসনে আরোহণের কাল বলে মনে করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে ভারততত্ত্ববিদদের দ্বিতীয় সভায় রুশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ গোবেল (D. Gobel) কুষাণ মুদ্রার সঙ্গে রোমান সম্রাটদের মুদ্রার তুলনা করে কণিষ্কের সিংহাসনে আরোহণ কাল নির্ণয়ের চেষ্টা করেন।
  • (২) তিনি কুষাণ মুদ্রায় রোমান প্রভাব ধরে কুষাণ সম্রাটদের কাল নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। তাতে বিম কদফিসেসের সমকালীন রোমান সম্রাট ট্রাজান ও হ্যাড্রিয়ানকে ধরা হয়। কণিষ্কের সমকালীন ধরা হয় হ্যাড্রিয়ান ও পিয়াসকে। এই তত্ত্ব মেনে নিলে কণিষ্ক প্রথম খ্রীষ্টাব্দে রাজত্ব করতেন বলে ধরে নিতে হয়।

উপসংহার :- ডঃ দানি কণিষ্কের মুদ্রার রেডিওকার্বন পরীক্ষা করে প্রথম অথবা দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দ সময়কাল ধরেছেন। তবে তিনি প্রথম খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ৭৮ খ্রিস্টাব্দের পক্ষেই বেশী মত দিয়েছেন। ডঃ বাসাম সকল যুক্তি আলোচনা করে বলেছেন, আপাতত ৭৮ খ্রিস্টাব্দকেই কণিষ্কের কালসীমা ধরা উচিত।

(FAQ) কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের সময়কাল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কুষাণ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে ছিলেন?

কণিষ্ক।

২. কণিষ্ক কখন সিংহাসনে আরোহণ করেন?

৭৮ খ্রিস্টাব্দে।

৩. কে কখন শকাব্দ প্রবর্তন করেন?

কুষাণ সম্রাট কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে।

৪. কণিষ্ক কোন ধর্ম গ্ৰহণ করেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

৫. কণিষ্কের সময় বৌদ্ধ ধর্মের কোন মত জনপ্রিয় হয়?

মহাযান।

৬. চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি কার রাজত্বকালে অনুষ্ঠিত হয়?

কুষাণ সম্রাট কণিষ্ক।

Leave a Reply

Translate »