কণিষ্কের রাজ্য বিস্তার

কণিষ্কের সাম্রাজ্য বিস্তার প্রসঙ্গে পূর্ব ভারত, পশ্চিম বাংলা, উড়িষ্যা, বিহার ও বাংলা, পশ্চিম ভারত, মধ্য ভারত, উত্তর ভারত, ভারতের ভিতরে রাজ্যসীমা, ভারতের বাইরে রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে জানবো।

কণিষ্কের রাজ্য বিস্তার

বিষয় কণিষ্কের রাজ্য বিস্তার
রাজা কণিষ্ক
পরিচিতি কুষাণ রাজা
শ্রেষ্ঠ রাজা কণিষ্ক
শেষ রাজা দ্বিতীয় বাসুদেব
কণিষ্কের রাজ্য বিস্তার

ভূমিকা :- কণিষ্ক বিম কদফিসেসের বিশাল সাম্রাজ্য পান। তিনি নিজের বাহুবলে এই সাম্রাজ্যের পরিধি বহুদূর বিস্তৃত করেছিলেন। তাঁর শিলালিপি, মুদ্রা ও চীনা ঐতিহাসিকদের বিবরণ থেকে তাঁর রাজ্যসীমা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

পূর্ব ভারত

পূর্ব ভারতে কণিষ্কের সাম্রাজ্য সারনাথ, বারাণসী, সাকেত বা অযোধ্যা ও মথুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিম কদফিসেস এই অঞ্চলের ওপর রাজত্ব করতেন। কণিষ্কও এই অঞ্চলের ওপর আধিপত্য স্থাপন করেন। সারনাথ, শ্রাবস্তী, মথুরা লিপি থেকে এই অঞ্চলে কণিষ্কের অধিকার প্রমাণিত হয়েছে। চীনা ঐতিহাসিকরাও বলেছেন যে, কণিষ্ক টিয়েন চো বা ভারতের প্রকৃত অঞ্চলে রাজত্ব করতেন।

পশ্চিম বাংলা ও উড়িষ্যা

সারনাথ বা বারাণসী ছাড়িয়ে আরও পূর্বে পাটলিপুত্র, পশ্চিম বাংলা এমন কি উড়িষ্যা পর্যন্ত কণিষ্কের রাজ্য বিস্তৃত ছিল বলে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন। এই পাটলিপুত্র থেকে তিনি বুদ্ধঘোষকে সঙ্গে নিয়ে যান। তাঁরা ক-জাঙ্গাল বা রাজমহল অঞ্চলে কণিষ্কের অধিকার ছিল বলে বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে প্রমাণ দেখান।

বিহার ও বাংলা

কুষাণ মুদ্রা তমলুক, বগুড়া, মুর্শিদাবাদ ও মালদায় পাওয়া গেছে। কিন্তু ডঃ সরকার প্রমুখ মনে করেন যে, শুধুমাত্র মুদ্রার প্রমাণের ওপর নির্ভর করে বিহার, বাংলা প্রভৃতি কণিষ্কের রাজ্যভুক্ত ছিল এরূপ সিদ্ধান্তে আসা যায় না।

পশ্চিম ভারত

পশ্চিম ভারতের অর্থাৎ মালব, সৌরাষ্ট্র প্রভৃতি অঞ্চলের শক-ক্ষত্রপরা কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের অধীনতা মেনে চলতেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। র‍্যাপসনের মতে, শক-ক্ষত্রপ নহপান প্রমুখ রাজা কুষাণদের প্রতি আনুগত্য দিয়েছিলেন। কিন্তু ডঃ এস চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ এই মতের বিরোধিতা করেন।

মধ্য ভারত

মধ্য ভারত অর্থাৎ সাঁচী প্রভৃতি অঞ্চল কণিষ্কের অধিকারে ছিল। কণিষ্কের উত্তরাধিকারী বশিষ্কের লিপি এখানে পাওয়া গেছে। মধ্য ভারতের হীরার খনি ছিল কুষাণ সাম্রাজ্যের সম্পদের অন্যতম উৎস।

উত্তর ভারত

কাশ্মীর কণিষ্কের রাজ্যভুক্ত ছিল বলে রাজতরঙ্গিনীতে কলহনের উক্তি পাওয়া যায়। পাঞ্জাব, সিন্ধু ও গঙ্গার দেশ তাঁর রাজ্যভুক্ত ছিল। পেশোয়ার, সুই বিহার খরোষ্ঠী লিপি থেকে একথা প্রমাণিত হয়।

ভারতের ভিতর রাজ্য সীমা

  • (১) ভারতের ভেতর কণিষ্কের রাজ্যসীমা পূর্বে বারাণসী বা সারনাথ, পশ্চিমে সিন্ধু উপত্যকা, দক্ষিণে সাঁচী ও উত্তরে কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, সারনাথ ও বারাণসীতে কণিষ্কের রাজ্য বিস্তার নির্দেশকারী যে লিপি ও মূর্তি পাওয়া যায় তা নির্ভরযোগ্য নয়।
  • (২) ভিক্ষু বালা ও বুদ্ধ মিত্র নামে দুই ব্যক্তি এই লিপি ও মূর্তি খোদাই করান। এই মূর্তিগুলি মথুরায় তৈরি করে বারাণসী ও সারনাথে স্থাপন করা হয়। তাঁদের মতে, এই অঞ্চলে তখন মিত্রবংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন।

মিত্রর বংশের রাজত্বের বিরোধিতা

উপরের মতের বিরুদ্ধে বলা হয় যে,

  • (১) যদি মিত্রবংশের হাতে এই অঞ্চলের শাসন থাকত, তাঁরা কখনও কণিষ্কের লিপি তাদের রাজ্যে স্থাপন করতে দিতেন না।
  • (২) লিপিগুলির তারিখ দেখে জানা যায় এগুলি বারাণসী ও সারনাথেই খোদাই হয়।
  • (৩) মিত্রবংশীয় রাজাদের ক্ষমতা তেমন ছিল না। সুতরাং পূর্ব অঞ্চল অর্থাৎ বারাণসী ও সারনাথ কণিষ্কের রাজ্যভুক্ত ছিল।

ভারতের বাইরে রাজ্য বিস্তার

ভারতের বাইরে কণিষ্কের রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে জানা যায় যে,

  • (১) বৌদ্ধ গ্রন্থের চীনা অনুবাদ থেকে জানা যায় যে, পার্থিয়ার রাজার সঙ্গে কণিষ্কের সঙ্ঘর্ষ হয়। এর ফলে অন্তত ভারতের বাইরে কিছুদিনের জন্যে তিনি পার্থিয়া অধিকার করেন।
  • (২) বিষ-কদফিসেসের আমল থেকে ব্যাকট্রিয়া কুষাণ অধিকারে ছিল। সেই অর্থে কণিষ্কও ব্যাকট্রিয়ার অধিপতি ছিলেন।
  • (৩) ডঃ স্মিথের মতে, এখনকার সোভিয়েত তুর্কীস্থানের কিছু অংশ যথা কাশগড়, খোটান, ইয়ারখন্দ কণিষ্ক জয় করেন। সম্ভবতঃ কণিষ্ক তাঁর রাজত্বের প্রথম দিকে এই স্থানগুলিতে আধিপত্য করতেন। পরবর্তী সময়ে চীনা সেনাপতি প্যান চাও এই স্থানগুলি অধিকার করেন বলে চীনা সূত্র থেকে জানা যায়।
  • (৪) পূর্ব তুর্কীস্থান বা আধুনিক চীনা তুর্কীস্থানের অধিকার নিয়ে কণিষ্কের সঙ্গে চীন সম্রাটের যুদ্ধ বাধে। চীনা বিবরণে বলা হয়েছে যে, কণিষ্ক জুং লিং গিরিবর্ষ পর্যন্ত এগিয়েছিলেন।
  • (৫) হিউয়েন সাঙের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, কণিষ্ক তাঁর রাজত্বের গোড়ার দিকে তুর্কীস্থানের ভেতর এতদূর এগিয়ে যান যে, হোয়াং হো বা পীত নদীর পশ্চিম দিকে চীনের করদ রাজ্যগুলি এক সময় কণিষ্কের বশ্যতা স্বীকার করেছিল।
  • (৬) কিন্তু চীন সম্রাট হো-তির নির্দেশে সেনাপতি প্যান চাও কণিষ্ককে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। কণিষ্ক সম্রাট হো-তিকে কর দিতে বাধ্য হন। চীনা কাহিনীর মধ্যে অতিশয়োক্তি আছে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন।
  • (৭) কণিষ্কের চীনা নীতি সম্পর্কে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায়নি। পণ্ডিতেরা মনে করেন যে, কণিষ্ক তার রাজত্বের গোড়ার দিকে তুর্কীস্থান অধিকার করলেও শেষ দিকে চীনের কাছে তাকে এই অঞ্চল ছাড়তে হয়।

মধ্য এশিয়া

মধ্য এশিয়ায় কণিষ্কের সাম্রাজ্যের সীমা নিম্নলিখিত অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত ছিল –

  • (১) তাঁর নিজস্ব কুষাণ রাজ্য ব্যাকট্রিয়া,
  • (২) বর্তমান সোভিয়েত তুর্কীস্থানের কিছু অংশ যেমন কাশগড়, খোটান ও ইয়ারখন্দ,
  • (৩) পামীর অঞ্চল ও চীনা তুর্কীস্থানের বা সিং-কিয়াং-এর কিছু অংশ।
  • (৪) সিস্থান বাদে আফগানিস্থান।

রাজ্য সীমা

একত্রে মিলিয়ে বলা যায় যে, অক্ষু নদীর উপত্যকা থেকে ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকা পর্যন্ত এই বিশাল অঞ্চল ছিল কণিষ্কের সাম্রাজ্যভুক্ত। বহু ভাষাভাষী, বহু জাতিগোষ্ঠীর লোক তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এজন্য কণিষ্ক তাঁর লিপি ও মুদ্রায় ব্যাকট্রিয় গ্রীক ভাষা ব্যবহার করতেন। কণিষ্ক তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যকে ক্ষত্রপদের দ্বারা শাসন করতেন।

উপসংহার :- কণিষ্কের সাম্রাজ্যের ভিত্তিতে একটি অর্থনৈতিক যোগসূত্র কাজ করেছিল। চীন থেকে রেশম রাস্তা ধরে চীনা রেশম ও মাল ব্যাকট্রিয়া হয়ে ভারতে চলে আসত। এই পথে সিন্ধু মোহনার বন্দর থেকে এই মাল রোমান সাম্রাজ্যে রপ্তানি হত। তাছাড়া ভারত হতে মাল মধ্য এশিয়ায় রপ্তানি হত।

(FAQ) কণিষ্কের সাম্রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কুষাণরা কোন জাতির শাখা?

ইউ-চি।

২. প্রথম স্বাধীন কুষাণ রাজা কাকে মনে করা হয়?

মিয়াওস।

৩. ভারতে কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

কুজুল কদফিসেস।

৪. কুষাণ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে?

কণিষ্ক।

৫. কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের রাজধানী কোথায় ছিল?

পুরুষপুর বা পেশোয়ার।

Leave a Reply

Translate »