উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি

উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ, নবজাগরণ বিষয়ে বিতর্ক, নবজাগরণ বাস্তব ঘটনা ও এই বিষয়ে যদুনাথ সরকার, সুশোভন সরকার, অম্লান দত্তের অভিমত, তথাকথিত নবজাগরণ ও এই বিষয়ে অশোক মিত্র, সুপ্রকাশ রায়, বিনয় ঘোষের অভিমত, ইতালিয় রেনেসাঁ-র সাথে বাংলার নবজাগরণের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য, নবজাগরণের স্রষ্টা, নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রকৃতি (Character of the 19th Century Renaissance)

সময়কালউনিশ শতক
প্রধান কেন্দ্রকলকাতা
নবজাগরণ বাস্তব ঘটনাযদুনাথ সরকার, সুশোভন সরকার, অম্লান দত্ত
তথাকথিত নবজাগরণঅশোক মিত্র
উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রকৃতি

ভূমিকা :- পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে এসে উনিশ শতকে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে এক যুক্তিবাদীও মানবতাবাদী আলোড়নের সূচনা হয়। তৎকালীন ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শনরাজনীতি—জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এর প্রভাব অনুভূত হয়। ইতালিয় নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে বাংলার এই জাগরণকে‘বঙ্গীয় নবজাগরণ’ বা ‘Bengal Renaissance’ বলে অভিহিত করেছেন।

বিতর্ক

উনিশ শতকের এই জাগরণ, তার স্বরূপ, প্রকৃতি, সীমাবদ্ধতা, গুরুত্ব—এমনকী এই জাগরণকে আদৌ ‘নবজাগরণ’ বা ‘রেনেসাঁ’ বলা যায় কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্কের অন্ত নেই।

(ক) ‘নবজাগরণ’ বাস্তব ঘটনা

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ যে বাস্তব ঘটনা সেই সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন।

(১) যদুনাথ সরকারের অভিমত

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর সম্পাদিত ‘History of Bengal‘ গ্রন্থে অতি স্পষ্ট ভাষায় এবং দ্বিধাহীনভাবে বাংলার এই জাগরণকে ‘নবজাগরণ’ বা ‘রেনেসাঁ’ বলেঅভিহিত করেছেন। তাঁর মতে “কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর ইউরোপে যে রেনেসাঁ দেখা দেয়,উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ছিল তদপেক্ষা ব্যাপক, গভীর এবং অধিকতর বৈপ্লবিক। এই নবজাগরণ ছিল প্রকৃতই একটি রেনেসাঁ।”

(২) সুশোভন সরকারের অভিমত

অধ্যাপক সুশোভন সরকার ‘অমিত সেন’ ছদ্মনামে তাঁর ‘Notes on Bengal Renaissance’ পুস্তিকায় বঙ্গীয় জাগরণের নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেও এই জাগরণকে ‘রেনেসাঁ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, “বাংলাদেশেই প্রথম ব্রিটিশ শাসন, বুর্জোয়া অর্থনীতি ও আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব অনুভূত হয়, এবং এর ফলে যে জাগরণ ঘটে, সাধারণভাবে তাকে বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলা হয়।

(৩) অম্লান দত্তের অভিমত

ডঃ অম্লান দত্ত নবজাগরণের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার গুরুত্ব এবং অসামান্যতাস্বীকার করেছেন।

(খ) তথাকথিত নবজাগরণ

নবজাগরণের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

(১) অশোক মিত্রের অভিমত

১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে জনগণনার সময় ‘সেন্সাস কমিশনার’ অশোক মিত্র তাঁর রিপোর্টে বাংলার এই জাগরণকে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ (‘so-called renaissance’) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দ্বারা লাভবান জমিদাররা প্রজা-শোষণের মাধ্যমে যে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিল তা কলকাতায় চালান করে তারা কলকাতায় এক ‘সাংস্কৃতিক জাগরণ” ঘটায়। এটাই ‘নবজাগরণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই জাগরণ শহর কলকাতার মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল—গ্রামীণ জনসাধারণকে তা স্পর্শ করে নি।

(২) সুপ্রকাশ রায়ের অভিমত

অশোক মিত্রকে অনুসরণ করে বিশিষ্ট মার্কসবাদী গবেষক সুপ্রকাশ রায় বলেন যে, জমিদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী অধ্যুষিত কলকাতা ও কয়েকটি শহরেই এই জাগরণ সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামাঞ্চলে যে সব জায়গায় এই আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছেছিল, তা ছিল মূলত হিন্দু-মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত অঞ্চল।

(৩) বিনয় ঘোষের অভিমত

বিশিষ্ট পণ্ডিত বিনয় ঘোষ একদা বঙ্গীয় নবজাগরণ সম্পর্কে এক উচ্ছ্বসিত — এমনকী অতিরঞ্জিত রূপ তুলে ধরতে অভ্যস্ত ছিলেন। জীবন-সায়াহ্নে তিনি মত পরিবর্তন করে বলেন যে, তাঁর পূর্ববর্তী সব সিদ্ধান্তই ভ্রান্ত। তাঁর মতে উনিশ শতকের নবজাগরণ হল একটি ঐতিহাসিক ছলনা বা প্রতারণা—’nothing but a historical hoax.’। তাঁর মতে বঙ্গীয় নবজাগরণ হল ‘একটি ‘অতিকথা’—’myth’।

(৪) অরবিন্দ পোদ্দারের অভিমত

অরবিন্দ পোদ্দার, ডঃ বরুণ দে, ডঃ অশোক সেন এবং ডঃ সুমিত সরকার-ও ঠিক অনুরূপ বক্তব্য রেখেছেন। অরবিন্দ পোদ্দার-এর মতে ঊনিশ শতকের জাগরণ ছিল ‘একটি বিকৃত ও নীরস নবজাগরণ’ (‘a distorted sapless renaissance’)।

(গ) ইতালিয় রেনেসাঁ-র সঙ্গে সাদৃশ্য

অধ্যাপক সুশোভন সরকার বঙ্গীয় নবজাগরণ ও ইতালিয় নবজাগরণের মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছেন। যেমন –

  • (১) ইতালিয় রেনেসাঁ যেমন মধ্যযুগীয় তন্দ্রা, কুসংস্কার ওঅন্ধ বিশ্বাস থেকে ইউরোপের মুক্তির পথ দেখায়, বঙ্গীয় নবজাগরণও তেমনই ভারতকে কুসংস্কার, জড়তা ও অন্ধ বিশ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করে।
  • (২) ইতালিয় নবজাগরণে প্রেরণার উৎস ছিল গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্য। অনুরূপভাবে প্রাচীন সংস্কৃত, মধ্যযুগীয় ফারসি এবং ইংরেজি সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গীয় নবজাগরণ গড়ে ওঠে।
  • (৩) ইতালিয় রেনেসাঁর স্বাধীন, যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধানী মানসিকতার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ডিরোজিও ও তাঁর অনুগামীদের কর্মধারায়।
  • (৪) ইতালিয় রেনেসাঁর মানবিকতার প্রতিফলন দেখা যায় রামমোহনবিদ্যাসাগর -এর মধ্যে।
  • (৫) ইতালিয় রেনেসাঁসের ফলে যেমন কথ্য ভাষায় সাহিত্য রচনার প্রসার ঘটে, তেমনি বঙ্গীয় নবজাগরণেও বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা ও বিজ্ঞানচর্চার ব্যাপক প্রয়াস দেখা দেয়।
  • (৬) এই সব যুক্তির মাধ্যমে উনিশ শতকে বাংলার জাগরণকে বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলে অভিহিত করা হয়।

বঙ্গীয় ও ইতালিয় রেনেসাঁর বৈসাদৃশ্য

বঙ্গীয় নবজাগরণকে ইতালিয় রেনেসাঁর সঙ্গে তুলনা করে তাকে ‘রেনেসাঁ’ বলে অভিহিত করার ব্যাপারে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী-র মতে বঙ্গীয় নবজাগরণের সঙ্গে ইতালিয় রেনেসাঁর তুলনা অর্থহীন।

  • (১) অধ্যাপক সুশোভনসরকার স্বীকার করেছেন যে, ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রচণ্ড গতিবেগ, বিরাট উদ্যম এবং বহুমুখী সৃজনশীলতা, যা ইউরোপের সমাজ, ধর্ম ও অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছিল, বঙ্গীয় নবজাগরণে তার একান্ত অভাব পরিলক্ষিত হয়।
  • (২) ডঃ ত্রিপাঠী বলেন যে, বাংলার নবজাগরণের প্রেক্ষাপট ও প্রকৃতির সঙ্গে ইতালির নবজাগরণের বিরাট পার্থক্য ছিল। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের বাণিজ্য বিপ্লব, নগর বিপ্লব প্রভৃতি আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ইতালিয় নবজাগরণের যে ব্যাপক সামাজিক ও আর্থিক ভিত্তি রচনা করেছিল, বাংলার নবজাগরণে তা অনুপস্থিত ছিল।
  • (৩) নবজাগরণের কেন্দ্র ফ্লোরেন্স-এর সঙ্গে কলকাতার তুলনা চলে না। ইতালিয় নবজাগরণ ঘটেছিল স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে। বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্র কলকাতা ছিল বিদেশি শাসনাধীন। তাই এখানে নবজাগরণের বিকাশ ঠিক স্বাভাবিক ছিল না।
  • (৪) ইতালির ফ্লোরেন্স নগরী শিল্পীদের যেভাবে বরণ করেছিল, কলকাতায় তা সম্ভব ছিল না। কলকাতা শিল্পের শহর নয়—বাণিজ্যের শহর, বন্দর শহর—তার কাজ উৎপাদন নয়, সওদাগরি।
  • (৫) অর্থ, সম্পদ ও বাণিজ্যের দিক থেকেও ফ্লোরেন্সের সঙ্গে কলকাতার তুলনা চলে না। কলকাতায় নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কৃষক-শোষণকারী কিছু জমিদার, ইংরেজ কোম্পানির সহযোগী কিছু বেনিয়ান, দেশীয় গোমস্তা, মুৎসুদ্দি ও কিছু চাকুরিজীবী। ফ্লোরেন্সের কসিমো বা লোরেঞ্জো মেদেচি-র মতো কোনও ধনী ব্যাঙ্ক ব্যবসায়ী সেখানে ছিল না।
  • (৬) ডঃ ত্রিপাঠী বলেন যে, কলকাতার এই সব পৃষ্ঠপোষকদের পক্ষে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, বত্তিচেল্লি বা দোনাতেল্লো-র শিল্প-প্রতিভা উপলব্ধি করার ক্ষমতা ছিল না—বরং তাঁদের উদ্যানে শোভা পেত ইতালি থেকে আনা তৃতীয় শ্রেণীর নগ্ন নারীমূর্তি।
  • (৭) ইতালিয় নবজাগরণের প্রেরণা এসেছিল গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্য থেকে। বঙ্গীয় নবজাগরণের ক্ষেত্রে গ্রিস বা রোম নয়—প্রেরণা আসে ইংল্যাণ্ড থেকে। শেক্সপিয়র, মিলটন, বায়রন, বেকন, লক, মিল প্রমুখের চিন্তাই বাংলার নবজাগরণকে সমৃদ্ধ করে।
  • (৮) কেবলমাত্র ইংল্যাণ্ড নয়— এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির বেশ কিছু অংশ। তাই বঙ্গীয় নবজাগরণে হুবহু ইউরোপীয় বা ইতালিয় অবয়ব অনুসন্ধান অবান্তর। ঋষি অরবিন্দ বলেন যে, ভারতের মাটিতে ইউরোপীয় ধাঁচের রেনেসাঁর জন্ম সম্ভব নয়।

নবজাগরণের স্রষ্টা কারা?

নবজাগরণের স্রষ্টা কারা? —তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

  • (১) এই ব্যাপারে স্বভাবতই সর্বপ্রথমে রামমোহন রায়ের নাম মনে পড়ে। মার্কিন গবেষক ডেভিড কফ বঙ্গীয় নবজাগরণের ব্যাপারে রামমোহন বা ডিরোজিও-কে কোনও কৃতিত্ব দিতে রাজি নন। তাঁর মতে, ভারতীয় নবজাগরণের পথিকৃৎ হলেন ব্রিটিশ প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ।
  • (২) ওয়ারেন হেস্টিংস-ই প্রথম বাংলায় নবজাগরণের আলো জ্বালেন। তিনি হলেন ‘ভারতের জনক’ এবং ‘প্রাচ্যের মুক্তিদাতা’।
  • (৩) লর্ড ওয়েলেসলি হলেন তাঁর সার্থক উত্তরাধিকারী এবং ওয়েলেসলি প্রতিষ্ঠিত ‘ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ’-কে কেন্দ্র করেই ভারতে নবজাগরণ ঘটেছিল।
  • (৪) মার্কিন ঐতিহাসিক ব্লুমফিল্ড বলেন যে, এই আন্দোলন হল নিজেদের ‘স্বার্থ সংরক্ষণের’ উদ্দেশ্যে ইংরেজ-সৃষ্ট তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর আন্দোলন। এই ‘ভদ্রলোকরা’ যতটা না ছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী, তার চেয়ে বেশি জন-বিরোধী — দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এঁদের কোনও সম্পর্ক ছিল না।
  • (৫) কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিক ডঃ অনিল শীল এঁদের ‘Elitist group’ বলে অভিহিত করেছেন। এই সব ঐতিহাসিকদের মতে উনিশ শতকের বাংলার জাগরণের নায়কেরা ছিলেন ‘দালাল বুদ্ধিজীবী’ এবং বাংলার রেনেসাঁ বলে যা পরিচিত তাকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালালবৃত্তি’ বলাই সংগত।
  • (৬) ডঃ সুমিত সরকার-এর মতে সমগ্র বাংলার জাগরণ ইংরেজের নকলনবিশ ছাড়া আর কিছু নয়। ডঃ বরুণ দে-র মতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় এই নবজাগরণ গড়ে উঠেছিলএবং বাংলার নবজাগরণের নায়করা হলেন ‘comprador intelligentsia.’। বলা বাহুল্য, এই মত গ্রহণযোগ্য নয়।
  • (৭) ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে এসে দেশবাসীর অন্তরে মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদের স্ফূরণ ঘটে এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবধারার সমন্বয়ের ফলেই নবজাগরণের সূচনা হয়।
  • (৮) ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন যে, পশ্চিম ও পূর্বের বীজের সংকর ভারতের মাটিতে পড়ে যে ফসল ফলিয়েছে, তাই হল নবজাগরণের ভিত্তি।

অভ্রান্ত তুলনা

আসলে অনেকে ইতালি ও বঙ্গীয় নবজাগরণের স্থানগত ও কালগত ব্যবধানে বিস্মৃত হয়ে দুই নবজাগরণের তুলনা করতে গিয়ে ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। নানা কারণে অতি সঙ্গতভাবেই ইতালিয় নবজাগরণের বিশাল গতিবেগ, প্রবল উদ্যম ও বহুমুখী সৃজনশীলতা বঙ্গীয় নবজাগরণে আশা করা যায় না।

ছোটো লোকদের রেনেসাঁ

বঙ্গীয় নবজাগরণের স্রষ্টারা ছিলেন সামন্ত জমিদার ও ইংরেজ-সৃষ্ট শিক্ষিত ‘ভদ্রলোক’। পৃথিবীর সব দেশের ইতিহাসেই তাই হয়— ‘ছোটলোকদের রেনেসাঁ’ পৃথিবীরকোনও দেশেই হয় নি—এমনকী ইতালিতেও নয়।

নবজাগরণের ভিত্তি

পাণ্ডিত্যপূর্ণ দর্শন-ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনও যুগেই ‘আম-জনতা’-র পরিচয় থাকে না। পৃথিবীর সব দেশেই প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় জাগরণ সংঘটিত হয়—ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।

ইতালিয় ও ভারতীয় রেনেসাঁ-র ভিত্তি

নবজাগরণের পশ্চাতে ছিল গ্রিক ও ল্যাটিন ঐতিহ্য। বঙ্গীয় নবজাগরণের পশ্চাতে ছিল প্রাচীন ভারতীয়ঐতিহ্য, সংস্কৃত ভাষা এবং ইংরেজি দর্শন।

পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন নয়

এই আন্দোলন কখনোই ‘পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন’ নয়। এই আন্দোলন ‘হিন্দু পুনরুত্থানবাদী’ আন্দোলনও নয়। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র বা বিবেকানন্দকে “হিন্দু পুনরুত্থানবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করাও অযৌক্তিক।

পাশ্চাত্য শিক্ষা ও প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়

আসলে ইংরেজি শিক্ষার সংস্পর্শে এসে পাশ্চাত্যের প্রগতিবাদী আদর্শ ও প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাধারা, ইংরেজি ভাবধারা ও সংস্কৃত ঐতিহ্যের সমন্বয়ে বঙ্গীয় নবজাগরণ গড়ে উঠেছিল।

সীমাবদ্ধতা

উনিশ শতকের নবজাগরণে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়।যেমন –

  • (১) এই আন্দোলন মূলত উচ্চবিত্ত ও উচ্চ শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর নেতৃত্ব দিয়েছিল ইংরেজের নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট শহরে বসবাসকারীনতুন জমিদার শ্রেণী।
  • (২) সাধারণ শ্রমিক-কৃষক বা গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে এদের কোনও সম্পর্ক ছিল। অধ্যাপক অনিল শীল এই আন্দোলনকে ‘এলিটিস্ট’ আন্দোলন বলে অভিহিত করেছেন।
  • (৩) এই আন্দোলন ছিল বহুলাংশে ইংরেজ-নির্ভর। ব্রিটিশ জাতির প্রতি নবজাগরণের নেতাদের গভীর শ্রদ্ধা ছিল, এবং তারা মনে করতেন যে, কেবলমাত্র ইংরেজ শাসনের মাধ্যমেই ভারতের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলসাধন হতে পারে।
  • (৪) এই নবজাগরণ মূলত হিন্দু সমাজ—বিশেষ করে উচ্চবর্ণের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলিম সমাজ বা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে এই নবজাগরণের কোনও সম্পর্ক ছিল না।

গুরুত্ব

নানা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই নবজাগরণের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। পরাধীন দেশে গড়ে ওঠা নবজাগরণে নানা ত্রুটি, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে—এতে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। এ সত্ত্বেও মানতে হবে যে নবজাগরণ ভারতের মাটিতে একটি সর্বব্যাপী বৌদ্ধিক জাগরণ এনে দেয়—এর ফলেইজন্ম নেয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, যা ভারতীয় ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে।

উপসংহার :- পরাধীন দেশে ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে বঙ্গীয় নবজাগরণ পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে নি—তবু এর গতিশীলতা, সৃজনশীলতা ও প্রাণশক্তিকে কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।

(FAQ) উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ বলতে কী বোঝায়?

উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ বলতে ব্রিটিশ রাজত্বের সময় অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের জোয়ার ও বহু কৃতি মনীষীর আবির্ভাবকে বোঝায়।

২. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ প্রথম কোথায় ঘটে?

ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে।

৩. কোন সময়ে বাংলায় নবজাগরণ ঘটে?

উনিশ শতকে।

৪. বাংলার নবজাগরণ ছিল কোন শহর কেন্দ্রীক?

কলকাতা।

৫. বাংলার নবজাগরণে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ভূমিকা পালন করেছে?

এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল (প্রতিষ্ঠিত, ১৭৮৪), শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন (১৮০০), ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০), হিন্দু কলেজ (১৮১৭), ক্যালকাটা স্কুল-বুক সোসাইটি (১৮১৭), কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ (১৮৩৫), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর (১৮৫৭) প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান।

Leave a Reply

Translate »