সেডানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সেডানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ জার্মানি, ভিয়েনা থেকে বার্লিন, সেডানের যুদ্ধের পর জার্মানি, সেডানের যুদ্ধের পর ফ্রান্স সেডানের যুদ্ধের পর অস্ট্রিয়া, সেডানের যুদ্ধের পর রাশিয়া, সেডানের যুদ্ধের পর ইতালি, সেডানের যুদ্ধের পর ইংল্যান্ড, সেডানের যুদ্ধের পর তুরস্ক এবং ইউরোপীয় শক্তি সাম্যের চারটি পর্যায় সম্পর্কে জানবো।

সেডানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

সময়কাল১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ
বিবাদমান পক্ষফ্রান্স ও প্রাশিয়া
পরিস্থিতিজার্মানির ঐক্য আন্দোলন
প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীবিসমার্ক
ফরাসি সম্রাটতৃতীয় নেপোলিয়ন
সেডানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

ভূমিকা:- ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ ইউরোপের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নানা কারণে এই সালটিকে ‘আধুনিক ইতিহাসের জলবিভাজিকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধে প্রাশিয়ার কাছে ফ্রান্স পরাজিত হয় এবং ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফোর্টের সন্ধি দ্বারা এই যুদ্ধের অবসান ঘটে।

ঐক্যবদ্ধ জার্মানি

সেডানের যুদ্ধের দ্বারা জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ঐক্যবদ্ধ জার্মানি অচিরেই ইউরোপের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। বিখ্যাত দার্শনিক টমাস কার্লাইল-এর ভাষায় জার্মানি ‘মহাদেশের রানি’-তে পরিণত হয়।

ভিয়েনা থেকে বার্লিন

  • (১) ঐতিহাসিক কেটেলবি বলেন যে, সেডানের যুদ্ধ বা ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয় যুদ্ধের ফলে বিসমার্ক জার্মানির প্রভুত্ব এবং জার্মানি ইউরোপের প্রভুত্ব লাভ করে। এতদিন পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনীতির ভারকেন্দ্র ছিল অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা।
  • (২) এই সময় ফ্রান্সও একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে স্যাডোয়ার যুদ্ধে অস্ট্রিয়া প্রাশিয়ার কাছে পরাজিত হয়। এর ফলে জার্মানি অস্ট্রিয়ার হস্তচ্যুত হয় এবং তার সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরে।
  • (৩) ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফোর্টের চুক্তি-র ফলে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির উত্থান ঘটে। অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্সের বদলে জার্মানিই ইউরোপীয় রাজনীতির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইউরোপীয় রাজনীতির ভারকেন্দ্র ভিয়েনা থেকে বার্লিনে স্থানান্তরিত হয়।

জার্মানি

সেডানের যুদ্ধের পর জার্মানির বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়। আর্থিক সমৃদ্ধি, সামরিক শক্তি, লোকবল, ভারী শিল্প এবং রেলপথের সাহায্যে জার্মনি ইউরোপে এক কলোসাস হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং অন্যান্য শক্তির ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
  • (২) ১৮৭১ থেকে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলার বিসমার্কই ছিলেন ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই সময় তাঁর অঙ্গুলি হেলনেই ইউরোপীয় রাজনীতি পরিচালিত হত।
  • (৩) ফ্রান্সকে পরাজিত করে জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন হয় এবং জার্মানি ফ্রান্সের শিল্পসমৃদ্ধ আলসাস-লোরেন অঞ্চল দখল করে। ফ্রান্স এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে তৎপর ছিল। এই কারণে এই কালপর্বে জার্মানির লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে নির্বান্ধব করে রাখা এবং এই উদ্দেশ্যে ফ্রান্স-বিরোধী জোট গঠন করা।

ফ্রান্স

সেডানের যুদ্ধের পর ফ্রান্সের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্স পরাজিত হয় এবং জার্মানির ঐক্য সাধিত হয়। ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন বন্দি হন। দ্বিতীয় ফরাসি সামাজ্যের পতন ঘটে এবং ফ্রান্সে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (২) প্রবীণ রাজনীতিক থিয়ার্স অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে শুরু হয় প্যারিস কমিউন-এর ঘটনা। সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ জনগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহ দমিত হয়।
  • (৩) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ফ্রান্স ইউরোপীয় রাজনীতিতে গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে থাকে এবং বিসমার্কের প্রভুত্বকালে ফ্রান্স নির্বান্ধবহয়ে পড়ে। কেবলমাত্র বিসমার্কের পতনের পরেই ফ্রান্স সেডানের যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি কাটিয়ে উঠে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।

অস্ট্রিয়া

সেডানের যুদ্ধের পর অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতালি ও জার্মানির ঐক্যের পর অস্ট্রিয়ার অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। এই ঐক্যের ফলে ইউরোপের প্রধান রাষ্ট্র অস্ট্রিয়া কেবলমাত্র বিশাল ভূখণ্ডই হারায় নি তার মর্যাদাও বহুল পরিমাণে খর্ব হয়।
  • (২) অধ্যাপক জেমস জোল বলেন যে, জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে জার্মানি ও ইতালির উত্থান সমগ্র ইউরোপের শক্তিসাম্যের উপর প্রভাব ফেলেছিল ঠিকই, তবে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় অস্ট্রিয়ার উপর।
  • (৩) ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অস্ট্রিয়া ছিল একটি দুর্বল রাষ্ট্র এবং তার প্রধান সমস্যা ছিল অস্তিত্বের সঙ্কট। জাতীয়তাবাদের ঝোড়ো হাওয়ার দিনে ক্রোট, সার্ব, রুমানিয়ান, চেক, ম্যাগিয়ার, জার্মান প্রভৃতি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে গঠিত অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠেছিল।
  • (৪) অস্ট্রিয়া উপলব্ধি করেছিল যে, ইতালি ও জার্মানি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাই সে পুর্বদিকে বলকান অঞ্চলে সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং প্রাচ্য সমস্যা জটিলতর রূপ ধারণ করে।

রাশিয়া

সেডানের যুদ্ধের পর রাশিয়ার বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) উনিশ শতকের মধ্যভাগে রাশিয়া ছিল একটি দুর্বল রাষ্ট্র। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের পর প্যারিসের সন্ধি দ্বারা তার উপর কিছু সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয় এবং পশ্চিম দিকে তার সম্প্রসারণ রুদ্ধ হয়।
  • (২) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধের পর রাশিয়া প্যারিসের সন্ধি-র সামুদ্রিক শর্তাবলী ভঙ্গ করতে থাকে। এর ফলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে তিক্ততা বৃদ্ধি পায়।

ইতালি

সেডানের যুদ্ধের পর ইতালির বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতালির ঐক্য সাধিত হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। ইতালি নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। বহু ইতালীয় ঐক্যবদ্ধ ইতালির বাইরে বসবাস করত। ট্রেনটিনো ও ইস্ট্রিয়া ছিল ঐক্যবদ্ধ ইতালির বাইরে। এছাড়া, ঐক্যবদ্ধ ইতালির সঙ্গে পোপের সম্পর্কও স্বাভাবিক ছিল না।
  • (২) এইসব দুর্বলতা সত্ত্বেও ইউরোপীয় রাজনীতিতে ইতালি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে তবে জার্মানি যেমন ইউরোপীয় রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, ইতালি তা ছিল না। ইতালি পরবর্তীকালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ত্রিশক্তি মৈত্রী সম্পাদন করেছিল।

ইংল্যান্ড

সেডানের যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল ইংল্যান্ড। শিল্প, নৌশক্তি ও উপনিবেশ বিস্তারে সে ছিল অপরাজেয়। তা সত্ত্বেও ইংল্যান্ড ইউরোপীয় রাজনীতিতে কোনও অংশগ্রহণ না করে বিচ্ছিন্নতার নীতি গ্রহণ করেছিল।
  • (২) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধ বা সেডানের যুদ্ধ অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। এই যুদ্ধের ফলে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির উত্থান ঘটে, যা ইংল্যান্ডের রাজনীতি ও বৈদেশিক নীতির উপর প্রভাব বিস্তার করে।
  • (৩) জার্মানির ত্রিশক্তি মৈত্রী জোট-এর বিরুদ্ধে যে ত্রিশক্তি আঁতাত গড়ে ওঠে, ইংল্যান্ড তার অন্যতম সদস্য ছিল। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ঐক্যসাধনের পর জার্মানি শিল্পে যথেষ্ট উন্নতি করে, যা ইংল্যান্ডের সম্মুখে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উপস্থিত হয়। ইংল্যান্ডের নৌশক্তি ও ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যও জার্মানির চ্যালেঞ্জ’-এর সম্মুখীন হয়।

তুরস্ক

সেডানের যুদ্ধের পর ইউরোপের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) উনিশ শতকে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য ছিল ইউরোপের দুর্বল ব্যক্তি। এর ফলে শুরু হয় ‘পূর্বাঞ্চলীয় সমস্যা’, যা ১৮৭০-১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রবল রূপ ধারণ করে। তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির স্বাধীনতা স্পৃহা বৃদ্ধি পায়।
  • (২) বলকান অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে সোচ্চার হয় এবং এইসব দ্বন্দ্বে পরস্পর-বিরোধী স্বার্থ নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলি যোগদান করলে সমস্যা জটিলতর রূপ ধারণ করে। এক কথায়, ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ তথা বিশ্ব নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়।

চারটি পর্যায়

১৮০০-১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ কালপর্বে শক্তিসাম্যের চারটি পর্যায় লক্ষ্য করা যায়। যথা –

  • (১) ১৮০০-১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পর্বের ইউরোপীয় শক্তিসাম্য নেপোলিয়নের অঙ্গুলি হেলনে বিনষ্ট হয়।
  • (২) ১৮১৫-১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়নের পতনের পর দ্বিতীয় পর্বের শক্তিসাম্য নিয়ন্ত্রণ করেন মেটারনিখ। এই উদ্দেশ্য নিয়েই ‘কনসার্ট অব ইউরোপ’ গঠিত হয়। ১৮৪৮ সালে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে ইউরোপীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
  • (৩) ১৮৪৮-১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় পর্বে ইউরোপে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিস্তার ঘটে। ইতালি ও জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়।
  • (৪) ১৮৭০-১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ পর্বে জার্মানির উত্থান ঘটে। তার প্রধান লক্ষ্য হয় শত্রু ফ্রান্সকে ইউরোপে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। এর ফলে ইউরোপের ছয়টি শক্তিশালী দেশ (জার্মানি, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও ইতালি) নিজ নিজ স্বার্থের তাগিদে মিত্র খুঁজতে থাকে।

উপসংহার:- ইউরোপে নতুন শক্তিসাম্যের উদ্ভব হয় এবং ইউরোপ দুটি রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুরু হয় পারস্পরিক বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সমরসজ্জা। ইউরোপ দ্রুত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়।

(FAQ) সেডানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কাদের মধ্যে সেডানের যুদ্ধ সংঘটিত হয়?

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও প্রাশিয়া।

২. কোন যুদ্ধের পর জার্মানি ও ইতালির ঐক্য সম্পন্ন হয়?

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধ।

৩. সেডানের যুদ্ধের সময় প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

বিসমার্ক।

৪. সেডানের যুদ্ধের সময় ফরাসি সম্রাট কে ছিলেন?

তৃতীয় নেপোলিয়ন।

Leave a Reply

Translate »