চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য জয়

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য জয় প্রসঙ্গে প্লুটার্কের বর্ণনা, জাস্টিনের বর্ণনা, বিতর্ক, রুশ গবেষকের বর্ণনা, নন্দবংশের উচ্ছেদ, পশ্চিম ভারত জয়, দাক্ষিণাত্য জয়, বঙ্গদেশ অধিকার ও সেলুকাসের অভিযান সম্পর্কে জানবো।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য জয়

মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
রাজ্য মগধ
রাজধানী পাটলিপুত্র
প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য
গ্ৰিক পর্যটক মেগাস্থিনিস
পূর্বসূরি ধননন্দ
উত্তরসূরি বিন্দুসার
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য জয়

ভূমিকা :- প্রাচীন ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। নন্দবংশের ধননন্দকে পরাজিত করে তিনি মগধে মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র।

প্লুটার্কের বর্ণনা

  • (১) গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুটার্কের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, আলেকজাণ্ডার যখন ৩২৬-২৫ খ্রি পূর্বে পাঞ্জাবে ছিলেন, সেই সময় চন্দ্রগুপ্ত (স্যান্ডাকোটাস) নামে এক যুবক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি আলেকজাণ্ডারকে নন্দ রাজা আগ্ৰামেস বা উগ্রসেনার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে অনুরোধ করেন।
  • (২) আলেকজান্ডার এই যুবকের ঔদ্ধত্যে বিরক্ত হয়ে তাঁর প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলে, তিনি দ্রুত পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। এই বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি যে, চন্দ্রগুপ্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গোড়ায় মগধ থেকে নন্দ বংশকে উচ্ছেদ করার জন্যে পণ করেন।

জাস্টিনের বর্ণনা

  • (১) জাস্টিনের মতে, আলেকজান্ডারের সাথে সাক্ষাতের পর চন্দ্রগুপ্ত বিন্ধ্য পর্বতের জঙ্গলে পালিয়ে যান এবং দস্যু দের নিয়ে তার সেনাদল গড়েন। ডা রায়চৌধুরী প্রমুখ পণ্ডিতেরা বলেন যে, জাষ্টিন যাদের ‘দস্যু’ বলেছেন তারা ছিল পাঞ্জাবের প্রজাতন্ত্রী রাজ্যের পেশাদারী ভাড়াটিয়া সেনা।
  • (২) এই সেনারা অস্ত্রের দ্বারা জীবিকা অর্জন করত বলে কৌটিল্য এদের ‘আয়ুধ জীবিন’ বলেছেন। বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে জানা যায় যে, এই সময় কৌটিল্য বা চাণক্য চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে যোগ দেন এবং তাকে নন্দ বংশ উচ্ছেদ করে সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য প্রেরণা ও পরামর্শ দেন।

বিতর্ক

  • (১) চন্দ্রগুপ্ত তার বাহিনী গঠন করার পর আগে কোন পরিকল্পনাটি সফল করেন এ বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। তিনি আগে মগধের সিংহাসন থেকে নন্দ রাজা ধননন্দ বা আগ্রামেসকে উচ্ছেদ করেন না আগে সিন্ধু ও পাঞ্জাব গ্রীক শাসন থেকে মুক্ত করেন, এ সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নন।
  • (২) ধ্রুপদী লেখক জাস্টিনের বিবরণই আমাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য সূত্র। কিন্তু জাস্টিনের বিবরণ অস্পষ্ট বলে মতভেদ দেখা দিয়েছে। ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী বলেন যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আগে নন্দ রাজাদের উচ্ছেদ করে তারপর উত্তর-পশ্চিম ভারতকে গ্রীক শাসন থেকে মুক্ত করার কাজে হাত দেন।
  • (৩) জাষ্টিন বলেছেন যে, “চন্দ্রগুপ্ত ভারতীয়দের কাছে বর্তমান সরকারকে উচ্ছেদ করতে এরা নতুন সার্বভৌম সরকারকে সমর্থন করতে আহ্বান জানান।” রায়চৌধুরী বলেন যে জাষ্টিন বর্তমান সরকার বলতে নন্দ বাজাদের কথাই বলেছেন এবং “নতুন সার্বভৌম সরকার” বলতে চন্দ্রগুপ্তের প্রতিষ্ঠিত সরকারের কথা বলেছেন। কাজেই চন্দ্রগুপ্ত আগে নদ বংশকে মগধের সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করে তারপর পাঞ্জাবকে গ্রীক শাসন মুক্ত করেন।
  • (৪) ড. টমাস ও ডঃ আর কে মুখার্জী এই মত সমর্থন করেন না। তারা বলেন যে, চন্দ্রগুপ্তের পক্ষে নন্দরাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাবার জন্য একটা ঘাঁটি তৈরির দরকার ছিল। গ্রীকদের হাত থেকে পাঞ্জাবকে মুক্ত করে তিনি দেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেন। নাহলে দুইবার নন্দ রাজার হাতে পরাস্ত হয়ে চন্দ্রগুপ্ত কোথায় আশ্রয় নেন?
  • (৫) রায়চৌধুরী এ সম্পর্কে মত খণ্ডন করে বলেছেন যে, জাষ্টিনের যে কথাটির ওপর নির্ভর করে ডঃ টমাস প্রমুখ উপরের অভিমত দিয়েছেন তা অস্পষ্ট। মুদ্রারাক্ষস নাটকেও আগে নন্দ রাজার উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে।
  • (৬) জাস্টিনের বক্তব্যের সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের মিল এ কথাই প্রমাণিত করে যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আগে ধননন্দকে উচ্ছেদ করেন এবং তারপর গ্রীকদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের কাজে হাত দেন।

রুশ গবেষকের বর্ণনা

অধুনা রুশ গবেষক বনগার্ড লেভিন এ সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন যে নন্দদের হাত থেকে মগধ জয়ের জন্য চন্দ্রগুপ্তের প্রচেষ্টা আমরা কয়েকটি পর্যায়ে দেখতে পারি, যথা –

  • (১) মহাবংশ টীকা প্রভৃতি বৌদ্ধ ও অন্যান্য জৈনগ্রন্থের মতে চন্দ্রগুপ্ত পাঞ্জাব জয়ের আগে প্রথমবার মগধ আক্রমণ করে পরাস্ত হন।
  • (২) এরপর তিনি পাঞ্জাবে আলেকজাণ্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি জোট দ্বারা নন্দ রাজ্য আক্রমণের প্রস্তাব দেন। আলেকজাণ্ডার এই প্রস্তাব নাকচ করেন একথা প্লুটার্ক বলেছেন। ভারতীয় উপাদান হতে জানা যায় যে চন্দ্রগুপ্ত রাজা পুরুর সঙ্গে জোট বাঁধার চেষ্টা করেন।
  • (৩) ইতিমধ্যে আলেকজান্ডার ভারত ছেড়ে যান এবং পাঞ্জাবে গ্রীকশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বীর সেনাপতি ইউডেমাস রাজা পুরুকে হত্যা করে ভারত ছেড়ে চলে যান। এই গণ্ডগোলের সুযোগে চন্দ্রগুপ্ত পাঞ্জাবকে শ্রীকশাসন থেকে মুক্ত করেন।
  • (৪) জাস্টিন বলেছেন যে, “আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর ভারত (পাঞ্জাব) দাসত্বের জোয়াল ছুড়ে ফেলে দেয় এবং আলেকজাণ্ডারের শাসনকর্তা ক্ষত্রপদের নিহত করে। এই মুক্তি যুদ্ধের নায়ক ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত। বনগার্ড লেভিনের মতে এই বিজয় ছিল চন্দ্রগুপ্তের মগধলাভের দ্বিতীয় পর্যায়।
  • (৫) তিনি যদি আগে পাঞ্জাব জয় না করতেন তবে উত্তর পশ্চিমের উপজাতিগুলির সাহায্য তিনি পেতেন না। কারণ এই যুদ্ধ প্রিয় উপজাতিগুলি নন্দরাজাদের প্রজা ছিল না। পাঞ্জাব অঞ্চল জয় করার পরেই তিনি এই উপজাতিদের সাহায্য লাভ করেন এবং তার সাহায্যে মগধ জয় করেন।
  • (৬) জাষ্টিন যখন “বর্তমান সরকার” কথাটি বলেন তখন তিনি পাঞ্জাবে প্রতিষ্ঠিত চন্দ্রগুপ্তের সরকারের কথাই বলেছেন। “ভারতীয়দের তার সরকারকে সাহায্য করতে” বলার অর্থ গ্রীকদের বিরুদ্ধে মুক্তি যুদ্ধে তিনি ভারতীয়দের সাহায্য চান।
  • (৭) চন্দ্রগুপ্ত সিন্ধু ও পূর্ব পাঞ্জাব দখল করেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ৩২১ খ্রিস্ট পূর্বে আলেকজাণ্ডারের সেনাপতিদের মধ্যে যখন রাজ্য ভাগ হয় তাতে সিন্ধুর উল্লেখ নেই। অর্থাৎ সিন্ধুদেশ গ্রিকদের হাতছাড়া হয়। তারপর ৩১৭ খ্রিস্ট পূর্ব নাগাদ চন্দ্রগুপ্ত পূর্ব পাঞ্জাব জয় করেন।
  • (৮) প্লিনি বলেছেন যে সিন্ধুনদ ছিল চন্দ্রগুপ্ত ও সেলুকাসের রাজ্যের মধ্যবর্তী সীমানা। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় চন্দ্রগুপ্ত পূর্বপাঞ্জাব ও সিন্ধু জয় করেন।
  • (৯) এই দ্বিতীয় পর্যায়ের যুদ্ধ সমাপ্ত করার পর তিনি তৃতীয় পর্যায়ে মগধের নন্দ রাজ্য আক্রমণ করেন। মিলিন্দ পনহো গ্রন্থে এই মগধ যুদ্ধের বিবরণ পাওয়া যায়।

নন্দবংশের উচ্ছেদ

  • (১) নন্দ রাজার বিরুদ্ধে চন্দ্রগুপ্ত অভিযান চালালে তিনি জনসমর্থন পান। কারণ, ধননন্দ বা আগ্রামেস যদিও বহু ক্ষমতাশালী ছিলেন, তিনি প্রজাদের ওপর চড়া হারে কর চাপাতেন বলে লোকে তাকে পছন্দ করত না। তাছাড়া তিনি শূদ্র বংশজাত ছিলেন বলে লোকের কাছে হেয় ছিলেন।
  • (২) উত্তর-পশ্চিম ভারতে গ্রীক আগ্রাসন প্রতিরোধের জন্য কোন কার্যকর ব্যবস্থা না করায় ধননন্দের জনপ্রিয়তা ও মর্যাদা নষ্ট হয়। সুতরাং চন্দ্রগুপ্ত এই অবস্থার সুযোগ নেন। ইতিমধ্যে তিনি পাঞ্জাব জয় করে নিজের শক্তি বাড়ান। তিনি নন্দ সেনাপতি ভদ্দশালকে পরাস্ত করে পাটলিপুত্র অধিকার করেন।
  • (৩) জাষ্টিন অবশ্য ধননন্দের বিরুদ্ধে চন্দ্রগুপ্তের জয়ের কৃতিত্ব কৌটিল্য বা চাণক্যকে দিয়েছেন। হয়ত চাণক্য কূটনীতির দ্বারা নন্দ রাজাদের ক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলেন। যাই হোক, এই জয়ের ফলে চন্দ্রগুপ্ত নন্দ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে সুবিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য পান।
  • (৪) এই সাম্রাজ্য পাঞ্জাব সীমান্ত থেকে দক্ষিণে গোদাবরী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা চন্দ্রগুপ্তের দখলে চলে আসে।

পশ্চিম ভারত জয়

  • (১) চন্দ্রগুপ্ত কেবলমাত্র নন্দ সাম্রাজ্য, পাঞ্জাব ও সিন্ধু জয় করে সন্তুষ্ট থাকেননি। প্লুটার্কের মতে, ছয় লক্ষ সেনা নিয়ে চন্দ্রগুপ্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করে ফেলেন। কিন্তু ঠিক কোন কোন অঞ্চল চন্দ্রগুপ্ত জয় করেন প্লুটার্ক সে কথা বলেননি।
  • (২) রুদ্রদমনের জুনাগড় শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, সৌরাষ্ট্র বা গুজরাট চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যভুক্ত ছিল। এখানে তার শাসনকর্তা পুষ্যগুপ্ত জলসেচের জন্য সুদর্শন হ্রদ খোদাই করেন। অবন্তী বা মালব জয় না করলে মৌর্য সম্রাটের পক্ষে সৌরাষ্ট্রে ভৌগোলিক দিক থেকে ঢোকা কঠিন ছিল। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় চন্দ্রগুপ্ত অবন্তী বা মালব ও কোঙ্কন বা মহারাষ্ট্রের কিছু অংশ জয় করেন।

দাক্ষিণাত্য জয়

  • (১) দাক্ষিণাত্যে চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যসীমা কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। স্মিথ মনে করেন যে, দক্ষিণ ভারত বিজয় চন্দ্রগুপ্তের পুত্র বিন্দুসারের আমলে ঘটেছিল। বিন্দুসার ১৬টি রাজ্য জয় করে মগধের সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু অনেক পণ্ডিত এই মত অগ্রাহ্য করেন এই কারণে যে, ইতিহাসে বিজেতারূপে বিন্দুসারের কোনো স্বীকৃতি ও প্রমাণ দেখা যায়নি।
  • (২) ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে, নন্দ রাজাদের দক্ষিণ সীমান্ত গোদাবরী তীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্ভবতঃ চন্দ্রগুপ্ত এই রাজ্য লাভ করেন। চন্দ্রগুপ্ত এই রাজাসীমা আরও বহুদুর দক্ষিণে বাড়ান। কারণ অশোকের শিলালিপিগুলি তামিলনাড়ুর তিনেভেলী জেলায় এবং মহীশূরের চিতলদ্রুগ ও এরাগুড়িতে পাওয়া গেছে।
  • (৩) বিন্দুসার বা অশোক কেউই এই অঞ্চল জয় করেননি। সুতরাং একথা স্বীকার্য যে, অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তামিলনাড়ু ও মহীশূর পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। জৈন ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দাক্ষিণাত্যের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের নাম জড়িত দেখা যায়।
  • (৪) খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের তামিল কবি মামুলনার বলেছেন যে, “ভম্বা মোরিয়” গণ বিন্ধ্য পর্বত পার হয়ে দক্ষিণে ঢুকে পড়েছিল। তামিল ভাষায় “ভম্বা” কথাটির অর্থ হল “ভুঁই ফোড়”। এই অভিধা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সম্পর্কে প্রয়োগ করা হয় বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।

বঙ্গদেশ অধিকার

চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের মধ্যে বাংলা বা বঙ্গদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা যায়। কারণ নন্দ রাজাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রাশী বা প্রাচী এবং গঙ্গারিডাই বা গঙ্গাহৃদি। প্রাচীনকালে বাংলার “ব” দ্বীপ অঞ্চলের নাম ছিল গঙ্গাহৃদি। চন্দ্রগুপ্ত এই দেশ লাভ করেন। মহাস্থানগড়ে ব্রাহ্মি শিলালিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে পণ্ডিতেরা স্বীকার করেছেন।

সেলুকাসের অভিযান

  • (১) চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বের শেষ দিকে তার বিরুদ্ধে আলেকজাণ্ডারের সেনাপতি সেলুকাস নিকাটরের আক্রমণ ঘটে। সেলুকাস আলেকজাণ্ডারের রাজ্যের অংশ সিরিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত পান। সুতরাং ভারতে তিনি হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্যে অভিযান চালান।
  • (২) গ্রীক ঐতিহাসিকরা সেলুকাসের আক্রমণের (৩০৫ খ্রিস্ট পূর্ব) কথা বললেও, যুদ্ধের বিস্তৃত বিবরণ দেননি। তবে সন্ধির শর্ত দেখে পণ্ডিতেরা ধারণা করেন যে, এই যুদ্ধে সেলুকাস পরাজিত হন। স্ট্র্যাবো নামে গ্রীক লেখকের মতে, সেলুকাস সন্ধির দ্বারা চন্দ্রগুপ্তকে কাবুল, কান্দাহার, হিরাট ও বেলুচিস্থান ছেড়ে দেন। বিনিময়ে তিনি ৫০০ যুদ্ধের হাতি পান।
  • (৩) সম্ভবত চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাস কন্যাকে বিবাহ করেন। সেলুকাস পাটলিপুত্রে মেগাস্থিনিস নামে এক দূত পাঠান। উপরোক্ত স্থানগুলি পাওয়ার ফলে চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যসীমা হিন্দুকুশ পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। স্ট্র্যাবো সন্ধির যে শর্ত উল্লেখ করেছেন তার ব্যাখ্যা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।
  • (৪) ভিনসেন্ট স্মিথ স্ট্র্যাবোর বক্তব্য ও প্লিনির বক্তব্য মেনে নিয়ে তার Early History of India গ্রন্থে বলেছেন যে, কাবুল, কান্দাহার, হিরাট ও বেলুচিস্থান সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তকে ছেড়ে দেন। কিন্তু টার্ন নামে পণ্ডিত বলেন যে সবটা নয়, চন্দ্রগুপ্ত আংশিকভাবে কিছুটা স্থান পান।
  • (৫) কাবুল, কান্দাহার, বেলুচিস্থানের কিছু অংশ কেবলমাত্র চন্দ্রগুপ্ত পান। কারণ, স্ট্র্যাবো “আংশিকভাবে হস্তান্তরিত” কথাটি বলেছেন। অশোকের পঞ্চম ও ত্রয়োদশ শিলালিপিতে ‘যোন’ বা যবন প্রজাদের কথা বলা হয়েছে। এই শিলালিপি হিন্দুকুশের কাছে জালালাবাদ পাওয়া গেছে।
  • (৬) অশোকের দ্বিভাষিক শিলালিপি খরোষ্ঠী ও গ্রীক এখন কান্দাহারে পাওয়ার ফলে সন্দেহের নিরসন হয়েছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে কাবুল, কান্দাহার ও বেলুচিস্থানের একাংশ চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসের কাছে পান। সুতরাং চন্দ্রগুপ্ত যে প্রকৃতপক্ষে তার রাজ্যসীমা পাঞ্জাব ছাড়িয়ে গান্ধার পার হয়ে হিন্দুকুশ পর্যন্ত বিস্তার করেন তা প্রমাণিত হয়েছে।
  • (৭) এই সন্ধি দ্বারা সেলুকাস ও চন্দ্রগুপ্তের মধ্যে একটি বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয় বলে স্ট্র্যাবো বলেছেন। ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মতে চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাস কন্যাকে বিবাহ করেন। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

দেহত্যাগ

উপরোক্ত বিজয় সমাপ্ত করে এবং সমগ্র সাম্রাজ্যে এক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করার পর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য দেহত্যাগ করেন। জৈন সূত্র থেকে জানা যায় যে, তার সাম্রাজ্যে পর পর কয়েক বছর অনাবৃষ্টির কারনে দুর্ভিক্ষ হলে, চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসন ত্যাগ করে প্রায়োপবেশনে দেহত্যাগ করেন। মহীশূরের শ্রাবণবেলগোলা নামক স্থানে তিনি দেহ ত্যাগ করেন। জৈন সূত্রের মত অনুযায়ী চন্দ্রগুপ্ত জৈনধর্ম গ্রহণ করে জৈন রীতিতে দেহত্যাগ করেন।

উপসংহার :- মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে দেখা যায় যে, চন্দ্রগুপ্ত তাঁর প্রাসাদে ও শিবিরে প্রচণ্ড আড়ম্বর ও ভোগবিলাসে থাকতেন। তাকে নারী দেহরক্ষী ঘিরে থাকত। শিকারে গেলে তারা তার সঙ্গে যেত। তার প্রাসাদ ও রাজসভা ছিল আড়ম্বরপূর্ণ। তাঁর মন্ত্রী ছিলেন ব্রাহ্মণ কুল-তিলক চাণক্য। সুতরাং তার জীবন-যাত্রায় কোথাও জৈনধর্মের ত্যাগ ও কৃচ্ছসাধনের ছায়ামাত্র নেই। হয়ত শেষ জীবনে তার বৈরাগ্য সাধনা ও জৈনধর্মে অনুরাগ এসেছিল।

(FAQ) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্য জয় সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।

২. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

কৌটিল্য বা চাণক্য।

৩. অর্থশাস্ত্র কার লেখা?

কৌটিল্য বা চাণক্য।

৪. কোন গ্ৰিক পর্যটক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় এসেছিলেন?

মেগাস্থিনিস।

Leave a Reply

Translate »