ভাইফোঁটা

হিন্দুদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ভাইফোঁটা প্রসঙ্গে উদযাপনের দিন, ভাইদুজ, ভাইটিকা, যমদ্বিতীয়া, শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক, ভাইফোঁটার ছড়া, ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান, রীতি, দিক সম্পর্কে রীতি, পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা, পশ্চিম ভারতে ভাইফোঁটা ও মহারাষ্ট্রে ভাইফোঁটা সম্পর্কে জানবো।

হিন্দুদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ভাইফোঁটা

ধরণধর্মীয় উৎসব
পালনকারীহিন্দু সম্প্রদায়
দিনকার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথি
সম্বন্ধদীপাবলি উৎসব
হিন্দুদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ভাইফোঁটা

ভূমিকা :- হিন্দুদের একটি বিশেষ উৎসব হল ভাইফোঁটা। এই উৎসবের পোষাকি নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া অনুষ্ঠান। কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে (কালীপূজার দুই দিন পরে) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

ভাইফোঁটা উদযাপনের দিন

বাঙালি হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, এই উৎসব কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় দিনে উদযাপিত হয়। মাঝে মধ্যে এটি শুক্লপক্ষের প্রথম দিনেও উদযাপিত হয়ে থাকে।

ভাইদুজ

পশ্চিম ভারতে এই উৎসব ভাইদুজ নামেও পরিচিত। সেখানে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পাঁচ-দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের শেষদিন।মহারাষ্ট্র, গোয়া ও কর্ণাটকে ভাইফোঁটাকে বলে ভাইবিজ।

ভাইটিকা

নেপালে ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে এই উৎসব পরিচিত ভাইটিকা নামে। সেখানে বিজয়াদশমীর পর এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব।

যমদ্বিতীয়া

এই উৎসবের আরও একটি নাম যমদ্বিতীয়া। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী ধর্ম ও মৃত্যুর দেবতা যম তাঁর বোন যমুনা বা যমির ঘরে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যান। কার্তিক মাসের দ্বিতীয় তিথিতে শুভ ক্ষণে দাদার কপালে তিলক লাগিয়ে তাঁর আরতি করে ঘরে আমন্ত্রণ জানান যমুনা। যত্ন করে তাঁকে খাওয়ান। বোনের রন্ধন কুশলতায় এবং আতিথেয়তায় অত্যন্ত খুশি হয়ে যম তাঁকে আশীর্বাদ করেন, এই শুভ দিনে যাঁরা বোনের হাত থেকে ফোঁটা নেবে তাঁরা নরক যাত্রা থেকে মুক্তি পাবেন।

শ্রীকৃষ্ণের সাথে ভাইফোঁটার সম্পর্ক

মহাভারতের বর্ণনায় নরকাসুর নামে এক দানবকে বধ করার পর দ্বারকায় ফেরেন কৃষ্ণ। দাদার আগমনে সুভদ্রা বিশেষ পূজা করেছিলেন। কৃষ্ণের কপালে পূজার তিলক লাগিয়ে তাঁকে বরণ করেন সুভদ্রা। সে দিনও ছিল কার্তিক মাসের দ্বিতীয় তিথি। সেই থেকে এই উৎসব সারা দেশে পালন করা শুরু হয়।

ভাইফোঁটার ছড়া

ভাইফোঁটার দিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে ছড়া কেটে বলে,

“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।

যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা॥

যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে যম হলচিরজীবী।

আমার হাতে ফোঁটা খেয়ে আমার ভাই হোক দীর্ঘজীবী॥”

ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান

  • (১) শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়াতে ভাইকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায় বোন। ভাইকে আসনে বসিয়ে শুরু হয় ফোঁটা দেওযার অনুষ্ঠান।
  • (২) কাঁসা বা পিতলের থালায় ধান-দূর্বা, বাড়িতে আমপাতায় পাড়া কাজল, চন্দন সাজিয়ে রাখা হয় ভাইয়ের সামনে। সঙ্গে থাকে ঘিয়ের প্রদীপ ও শঙ্খ। আর মুখ মিষ্টি করানোর জন্য থাকে ভাইয়ের পছন্দের সমস্ত মিষ্টিও।
  • (৩) এর পর বোনেরা বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে কাজল নিয়ে এঁকে দেয় ভাইয়ের ভ্রু-যুগল। এবার ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেওয়ার সময় বোনেরা ছড়া কেটে তিনবার ফোঁটা দেয়।
  • (৪) চন্দনের ফোঁটা দেওয়ার পর শঙ্খ ধ্বনির মাঝে ধান-দূর্বা দিয়ে ভাইকে আশীর্বাদ করে বোন। এবার মিষ্টিমুখ করার পালা। তার পর ভাই-বোনের মধ্যে উপহার আদান-প্রদান করা হয়।

ভাইফোঁটার রীতি

বোন চন্দন কাঠ জল দিয়ে ঘষে ( কেউ কেউ দইও মিশ্রিত করেন চন্দন কাঠের সাথে), নিজের অনামিকা আঙ্গুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে ছড়া বা মন্ত্রটি পড়তে পড়তে তিনবার ফোঁটা দেয়।

দিক সম্পর্কে রীতি

ফোঁটা নেওয়ার সময় দিকেরও সম্পর্ক রয়েছে। শাস্ত্র অনুযায়ী সব সময় পূর্ব দিকে মুখ করে ফোঁটা নেওয়া শুভ। তবে সমস্যা থাকলে উত্তর দিক বা উত্তর-পূর্ব দিকে মুখ করে ফোঁটা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ দিকে মুখ করে ভাইফোঁটা নেওয়া অত্যন্ত অশুভ বলে বিবেচিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা

আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়।

পশ্চিম ভারতে ভাইফোঁটা

পশ্চিম ভারতের ভাইবিজ একটি বর্ণময় অনুষ্ঠান। সেখানে এই উপলক্ষে পারিবারিক সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়।

মহারাষ্ট্রে ভাইফোঁটা

মহারাষ্ট্রে মেয়েদের ভাইবিজ পালন অবশ্যকর্তব্য। এমনকি, যেসব মেয়েদের ভাই নেই, তাদেরও চন্দ্র দেবতাকে ভাই মনে করে ভাইবিজ পালন করতে হয়। এই রাজ্যে বাসুন্দি পুরী বা শ্রীখণ্ড পুরী নামে একটি বিশেষ খাবার ভাইবিজ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করার রেওয়াজ আছে।

উপসংহার :- ভাইবোনের অটুট বন্ধন, আনন্দ ও খুনসুটির এক উৎসব ভাইফোঁটা। ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনার উদ্দেশ্যে বোনেরা এই রীতি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।

(FAQ) ভাইফোঁটা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন দিন ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা হয়?

কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে।

২. দীপাবলি উৎসবের শেষ দিনটি কি পালন করা হয়?

ভাইফোঁটা।

৩. কোন দিকে মুখ করে বসে ভাইফোঁটা নেওয়া শুভ বলে মনে করা হয়?

পূর্বদিকে।

৪. ভাইফোঁটা আর কি কি নামে পরিচিত?

ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, ভাইদুজ, ভাইবিজ, ভাইটিকা।

Leave a Reply

Translate »