নেপোলিয়নের পতনের কারণ

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের পতনের কারণ হিসেবে সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ফ্রান্সে স্বৈরতন্ত্র, সাম্রাজ্যের স্ব-বিরোধিতা, সাম্রাজ্যের দুর্বল ভিত্তি, মহাদেশীয় ব্যবস্থা, ধর্মীয় অসন্তোষ, স্পেনীয় ক্ষত, নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান, ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাব, মিত্র শক্তির জোট গঠন, সামরিক দুর্বলতা ও নেপোলিয়নের পতনে ইংল্যান্ডের ভূমিকা সম্পর্কে জানবো।

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের পতনের কারণ

ইউরোপের মুক্তিদাতানেপোলিয়ন বোনাপার্ট
জন্ম১৫ আগস্ট, ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ
পিতামাতাকার্লো বোনাপার্ট, লেটিজিয়া
ফরাসি জাতির সম্রাট১৮০৪ খ্রিস্টাব্দ
পতন১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু১৮২১ খ্রিস্টাব্দ
সম্রাট নেপোলিয়নের পতনের কারণ

ভূমিকা:- এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং গোলন্দাজ বাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগদান করেও কেবলমাত্র নিজ প্রতিভাবলে নেপোলিয়ন একদিন ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন।

ইউরোপের ভাগ্যবিধাতা

১৭৯৯ থেকে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্তকালপর্বে তিনিই ছিলেন ইউরোপের ভাগ্যবিধাতা এবং তাঁর জীবন কাহিনিই ছিল ফ্রান্স ও ইউরোপের ইতিহাস।

নির্বাসন

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়াটার্লুর যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে তাঁর ভাগ্যরবি অস্তমিত হয়, তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন।

পতনের শুরু

বস্তুতপক্ষে, ওয়াটার্লুর যুদ্ধের বহু পূর্বেই তাঁর পতনের সূচনা হয়। ডেভিড টমসন-এর মতে, অ্যামিয়েন্সের সন্ধি (১৮০২ খ্রিঃ) ভঙ্গের পর থেকেই তার পতন শুরু হয়। অপরদিকে, গ্রান্ট ও টেম্পারলি-র মতে, ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে টিলসিটের সন্ধির পর তাঁর পতন শুরু হয়।

পতনের কারণ

১৮০২ বা ১৮০৭ যখনই হোক না কেন—তাঁর শাসননীতিও সাম্রাজ্যের গঠনের মধ্যেই তাঁর পতনের বীজ নিহিত ছিল। তাঁর পতনের মূলে নানা কারণ বিদ্যমান ছিল।যেমন –

(ক) সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা

  • (১) সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রত্যয় তাঁর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ। অল্পবয়সে একের পর এক সাফল্য অর্জন করার ফলে তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা গগনচুম্বী হয়ে ওঠে। নিজ শক্তি ও প্রতিভা সম্পর্কেও তিনি সীমাহীন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং অচিরেই এই আত্মবিশ্বাস উন্মত্ততায় পরিণত হয়।
  • (২) তিনি ভুলে যান যে, মানুষের শক্তির একটি সীমা আছে। তিনি মনে করতেন যে, ‘অসম্ভব কথাটি একমাত্র মূর্খদের অভিধানে লেখা থাকে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আত্মবিশ্বাসের ফলস্বরূপ তিনি সাধারণ বাস্তববোধ হারিয়ে মরীচিকার পিছনে ছুটতে থাকেন।
  • (৩) তিনি নিজ জেদ ও অহঙ্কারবশত এমন সব ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, যাতে তাঁর পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য বা শার্লাম্যানের অনুকরণে তিনি সমগ্র ইউরোপকে এক শাসন ও আইনের বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি ভুলে যান যে উনিশ শতকের সূচনায় এই ধরনের সাম্রাজ্য স্থাপনের উদ্যোগ অবান্তর ও হাস্যকর।
  • (৪) তাঁর স্পেন ও রাশিয়া আক্রমণ ছিল বিরাট ভ্রান্তি । লিপজিগের যুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তিবর্গ তাঁকে যে সন্ধির প্রস্তাব দেয়, তা প্রত্যাখান করাও ছিল তাঁর চরম নির্বুদ্ধিতা। এই প্রস্তাব গ্রহণ করলে তাঁকে কেবল হল্যান্ড ও বেলজিয়াম ছাড়তে হত।
  • (৫) সীমাহীন আত্মবিশ্বাসের অধিকারী নেপোলিয়ন এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে নিজ পতনকে অনিবার্য করে তোলেন। মার্শাল ফচ (Foch) বলেন যে, নেপোলিয়ন ভুলে যান যে মানুষ কখনও ঈশ্বর হতে পারে না। তিনি এ কথাও ভুলে যান যে, যুদ্ধ অপেক্ষা শান্তিই হল মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য।

(খ) ফ্রান্সে স্বৈরতন্ত্র

একদা মুক্তির দূত হিসেবে বন্দিত হলেও কালক্রমে ফ্রান্স ও ফ্রান্সের বাইরে নেপোলিয়নের শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

  • (১) তিনি বিপ্লব-বিধ্বস্ত অশান্ত ফ্রান্সে শাস্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিপ্লবের সুফলগুলিকেও দেশবাসীর ঘরে পৌঁছে দেন।
  • (২) তাঁর যুদ্ধজয় ফরাসিদের গৌরবান্বিত করে, কালক্রমে তারা নেপোলিয়নের প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। বাক্-স্বাধীনতা খর্ব করে, বিচারে দেশবাসীকে কারাগারে পাঠিয়ে, সাম্রাজ্যের সর্বত্র গুপ্তচর নিয়োগ করে তিনি দেশে -এক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
  • (৩) ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেন, “নেপোলিয়নের স্বৈরশাসনে ফ্রান্স ক্রমে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ফলে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু হয় এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকেরাই ছিলেন এই চক্রান্তের নায়ক।
  • (৪) এছাড়া বৈদেশি যুদ্ধ, লোকক্ষয়, অর্থনৈতিক দুর্দশা, গ্রামাঞ্চলের চরম বিশৃঙ্খলা ফরাসিদের চরমভাবে ক্ষুধ করে তোলে। মানুষ প্রবলভাবে নেপোলিয়ন-বিরোধী হয়ে ওঠে। তাদের দাবি ছিল শান্তি।
  • (৫) সমগ্র ইউরোপে যখন নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত গণ-জাগরণ শুরু হয়েছে, ফরাসিরা তখন ছিল রণক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। মিত্রবাহিনী যখন প্যারিসের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখনও তারা ছিল অবসাদগ্রস্ত। তারা যে কোনও মূল্যে শান্তি স্থাপনের জন্য আকুল হয়ে ওঠে। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়নের পতনে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

(গ) সাম্রাজ্যের স্ব-বিরোধিতা

ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেন, “নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের আত্মবিনাশী স্ব-বিরোধিতা এবং স্বতঃসিদ্ধ দুর্বলতার জন্যই এই সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য ছিল।” যেমন –

  • (১) নেপোলিয়ন ছিলেন বিপ্লবের অগ্নিময় তরবারি। বিপ্লবী আদর্শেরধারক হিসেবে তিনি ইউরোপের দেশগুলি জয় করেন এবং সংস্কারের মাধ্যমে বিজিত দেশগুলিতে বিপ্লবী ভাবধারার প্রসার ঘটান।
  • (২) বিজিত রাজ্যের অধিবাসীরা তাঁর কাছে অনেক কিছু আশা করেছিল। অচিরেই কিন্তু তাঁর বিপ্লবী ভাবমূর্তি ম্লান হয়ে যায়। মানুষ বুঝতে পারে যে, তিনি ফ্রান্সের স্বার্থে ইউরোপকে ব্যবহার করছেন। তিনি নিজেও স্বীকার করেন যে, “ফ্রান্সের স্বার্থই আমার কাছে সর্বাগ্রগণ্য।”
  • (৩) বিজিত রাজ্যে তিনি যে শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তা পুরোনো রাজবংশগুলির স্বৈরাচার অপেক্ষাও ভয়ঙ্কর ছিল। নানাপ্রকার স্বৈরাচারী আইন ও বিধি-ব্যবস্থার প্রবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত কর আরোপ, বাধ্যতামূলক সেনা সংগ্রহ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং বলপূর্বক মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা আরোপ প্রভৃতি কারণে ওইসব রাজ্যে তিনি ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন।
  • (৪) জাতীয়তাবাদী আদর্শের কথা প্রচার করেও তিনি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার উপর আঘাত হানেন। ইতালি, জার্মানি, স্পেন, হল্যান্ড, নেপলস্, ওয়েস্টফেলিয়া প্রভৃতি রাজ্যে তিনি নিজ রাজবংশ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। ইতালিতে সৎপুত্র ইউজেন, হল্যান্ডে ভ্রাতা লুই, নেপলস্-এ ভগ্নিপতি মুরাট, স্পেনে ভ্রাতা যোসেফ এবং জার্মানিতে ভ্রাতা জেরোম-কে তিনি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন।
  • (৫) এইসব রাজ্যে রাজতন্ত্র ‘ভুঁইফোড় সামরিক স্বৈরতন্ত্রে’ পরিণত হয়। স্বাভাবিকভাবেই জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ মানুষের পক্ষে তা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ঐতিহাসিক রবার্ট এরগ্যাং বলেন, “নেপোলিয়ন যে জাতীয়তাবাদী শক্তির জাগরণ ঘটান, তা তাঁর বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের সেনাদল অপেক্ষা বহুগুণ শক্তিশালী ছিল।”

(ঘ) সাম্রাজ্যের দুর্বল ভিত্তি

  • (১) তাঁর সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল। জনগণের আনুগত্য নয়—সামরিক শক্তির জোরেই তিনি একদা সিংহাসন দখল করেছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে, সামরিক শক্তির জোরেই তিনি সেই বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখবেন।
  • (২) ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি যে, তাঁর ধারণা সঠিক নয়। ফ্রান্সের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পেলে তাঁর সাম্রাজ্য হয়তো টিকে থাকত, কিন্তু ১৮১০ খ্রিস্টাব্দের পর তিনি সামরিক সাফল্য এবং ফরাসি জাতির আনুগত্য দুটি থেকেই বঞ্চিত হন।

(ঙ) মহাদেশীয় ব্যবস্থা

মহাদেশীয় অবরোধ তাঁর পতনের অন্যতম কারণ। নৌ-যুদ্ধে ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করা সম্ভব নয় বুঝে তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এক অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেন। এই যুদ্ধ জয় করতে গিয়ে তিনি নিত্যনতুন সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন। এই যুদ্ধের ফলেই তিনি পোপ, স্পেন ও রাশিয়ার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন, পরবর্তীকালে যার ফল হয় খুবই মারাত্মক।

(চ) ধর্মীয় অসন্তোষ

১৮০১ খ্রিস্টাব্দে পোপ সপ্তম পায়াস ও নেপোলিয়নের মধ্যে যে ‘কনকর্ডাট বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তার দ্বারা ক্যাথলিক ধর্ম ফ্রান্সের স্বীকৃত ধর্মে পরিণত হয়। এতে পোপ ও ক্যাথলিকরা খুশি হলেও প্রোটেস্টান্টরা কিন্তু ক্ষুব্ধ হয়। ইতিমধ্যে পোপ মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকৃত হলে নেপোলিয়ন তাঁর রাজ্য দখল করেন এবং পোপকে বন্দি করেন (১৮০৯ খ্রিঃ)। এর ফলে সমগ্র ক্যাথলিক জগতে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

(ছ) স্পেনীয় ক্ষত

  • (১) নেপোলিয়ন অন্যায়ভাবে স্পেন দখল করে নিজ ভ্রাতা যোসেফকে স্পেনের সিংহাসনেবসালে স্পেনবাসীর আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধে তীব্র আঘাত লাগে। পর্তুগালের সঙ্গে মিলিত হয়ে স্পেনবাসী নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।
  • (২) ছয় বৎসরব্যাপী (১৮০৮-১৮১৪ খ্রিঃ) এই উপদ্বীপের যুদ্ধে নেপোলিয়ন পরাজিত হলে তাঁর মর্যাদা বিনষ্ট হয়, তাঁর বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয় এবং তাঁর পরাজয়ে সারা ইউরোপে প্রবল উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। 
  • (৩) তিনি নিজেই বলেছেন, “স্পেনীয় ক্ষতই আমার সর্বনাশ করেছে।” ঐতিহাসিক গ্রান্ট ও টেম্পারলি বলেন যে, তাঁর স্পেনীয় নীতি ছিল এক বিশাল ভ্রান্তি।

(জ) মস্কো বা রাশিয়া অভিযান

  • (১) তাঁর মস্কো অভিযানের শোচনীয় ব্যর্থতা তাঁর পতনকে অনিবার্য করে তোলে। দুরত্বও প্রাকৃতিক অসুবিধাকে উপেক্ষা করে মস্কো অভিযান চালিয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেন।
  • (২) পশ্চিমে চিরশত্রু ইংল্যান্ডকে পরাজিত না করে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এর ফলে তাকে পূর্ব ও পশ্চিম দু’দিকে দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়।
  • (৩) পরাজিত না হয়েও পরাজয়ের গ্লানি ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতিতে তাঁর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। তাঁর অপরাজেয় ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ ধ্বংস হয়। এর ফলে সমগ্র ইউরোপে নব-উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। তাঁর স্বৈরাচারী শাসনে নিপীড়িত মানুষ জোটবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

(ঝ) ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাব

ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা ছিল নেপোলিয়নের রাজনৈতিক জীবনের একটি মারাত্মক ভুল। লাইপজিগের যুদ্ধে পরাজয়ের পর বিজয়ী শক্তিবর্গ নেপোলিয়নের নিকট ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাব পেস করেন। এই প্রস্তাব নেপোলিয়নের পক্ষে যথেষ্ট সম্মানজনক ছিল। তাঁকে শুধু বেলজিয়াম ও হল্যান্ডের উপর অধিকার ত্যাগ করতে বলা হয়। কিন্তু এই সম্মানজনক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নেপোলিয়ন চরম অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

(ঞ) মিত্রশক্তির জোট গঠন

ইতিপূর্বের যুদ্ধগুলিতে নেপোলিয়নের জয়লাভের প্রধান কারণ ছিল নেপোলিয়ন বিরোধী শক্তিগুলি পরস্পর ঐক্যবদ্ধ না থাকা। কিন্তু চতুর্থ শক্তিজোট গঠিত হওয়ার পর তাদের মিলিত শক্তির সামনে নেপোলিয়নের ফরাসি বাহিনী অত্যন্ত দুর্বল ছিল। এই চতুর্থ শক্তিজোট শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

(ট) সামরিক দুর্বলতা

  • (১) সামরিক জীবনের সূচনা-পর্বে নেপোলিয়ন যে সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করতেন তা ছিল বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ফরাসি সেনাদল। কালক্রমে সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি পেলে তিনি বিজিত দেশগুলি থেকে সেনা সংগ্রহ করতে থাকেন।
  • (২) পোল, ডেন, জার্মান, ডাচ, ইতালীয় প্রভৃতি বিভিন্ন জাতির লোক নিয়ে তিনি বিশাল সেনাদল গঠন করেন। এর ফলে তাঁর সেনাদলের জাতীয় চরিত্র বিনষ্ট হয়।তারা ছিল নিছক ভাড়াটে সৈনিক-বিপ্লবী আদর্শের জন্য কোনও আত্মত্যাগের প্রেরণা তাদের মধ্যে ছিল না।
  • (৩) এছাড়া, ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে তাঁর সেনাদল রণক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনাদের অনেকেরই মৃত্যু হয়। অনভিজ্ঞরা তাদের স্থান দখল করলে সেনাদল দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • (৪) রণকৌশলের ক্ষেত্রে নেপোলিয়ন নানা উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডিউক অব ওয়েলিংটন ও ব্লুকার তাঁর রণকৌশল শিখে তাঁর বিরুদ্ধেই তা প্রয়োগ করেন।

(ঠ) ইংল্যান্ডের ভূমিকা

  • (১) নেপোলিয়নের পতনে ইংল্যান্ডের ভূমিকা ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ড ধারাবাহিক ভাবে নেপোলিয়নের বিরোধিতা চালিয়ে যায়। ইংল্যান্ডের উদ্যম ও আর্থিক সহায়তায় ইউরোপে বারংবার নেপোলিয়ন-বিরোধী শক্তিজোট গড়ে ওঠে।
  • (২) সমগ্র ইউরোপকে সংঘবদ্ধ করার ব্যাপারে ইংল্যান্ডের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডের অদ্বিতীয় নৌ-বাহিনীর জন্যই মহাদেশীয় ব্যবস্থা ব্যর্থ হয় এবং উপদ্বীপের যুদ্ধে স্পেন ও পর্তুগাল জয়যুক্ত হয়। ওয়াটার্লুর যুদ্ধেও তিনি ইংরেজ সেনাপতি ডিউক অব ওয়েলিংটনের কাছে পরাজিত হন।

উপসংহার:- ফরাসি বিপ্লব প্রসূত রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযােগে নেপােলিয়ন ফ্রান্সের সম্রাট হন। কিন্তু মাত্র এক দশকের মধ্যেই তার পতন ঘটে। উত্তরােত্তর ক্ষমতার পশ্চাদ্ধাবনই নেপােলিয়নের পতনকে অনিবার্য করে তােলে।

(FAQ) নেপোলিয়নের পতনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইউরোপের মুক্তিদাতা কাকে বলা হয়?

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।

২. নেপোলিয়ন কখন ফরাসি জাতির সম্রাট উপাধি ধারণ করেন?

১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে।

৩. নেপোলিয়নকে কোথায় নির্বাসন দেওয়া হয়?

এলবা দ্বীপে।

৪. কোন যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে নেপোলিয়নের পতন ঘটে?

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়াটার্লুর যুদ্ধে।

৫. কখন কোথায় নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়?

১৮২১ খ্রিস্টাব্দে, সেন্ট হেলেনা দ্বীপে।

Leave a Reply

Translate »