নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ

নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে চতুর্থ শক্তিজোট গঠন, জার্মানির জাগরণ, নেপোলিয়নের শেষ জয়, চতুর্থ শক্তিজোটের সেনানায়ক, চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত ফ্রান্স, লিপজিগের যুদ্ধ, ফ্রান্সের অধীনতা মুক্ত, জাতিসমূহের যুদ্ধ, ফ্রাঙ্কফোর্ট প্রস্তাব, মিত্রবাহিনীর পরাজয়, মিত্রপক্ষের শান্তি প্রস্তাব, শৌমন্টের সন্ধি, সন্ধির শর্ত, নেপোলিয়নের পরাজয়, ফন্টেন ব্ল্যু সন্ধি, নির্বাসন, নির্বাসনে যাওয়ার পূর্বে উক্তি, প্যারিসের প্রথম সন্ধি ও তার শর্ত সম্পর্কে জানবো।

নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ

ড্রেসডেনের যুদ্ধ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ
লিপজিগের যুদ্ধঅক্টোবর, ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ
ফন্টেনব্ল্যু সন্ধি৬ এপ্রিল, ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ
এলবা দ্বীপপোলিয়নের নির্বাসন
নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ

ভূমিকা :- নেপোলিয়নের মস্কো অভিযানের শোচনীয় ব্যর্থতা সমগ্র ইউরোপে এক নব-উন্মাদনাসৃষ্টি করে। নেপোলিয়ন অজেয় নন এই ধারণা প্রমাণিত হতেই ইউরোপীয় শক্তিবর্গ তাঁর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হতে শুরু করে।

চতুর্থ শক্তিজোট গঠন

রাশিয়া, প্রাশিয়া ও ইংল্যান্ড চতুর্থ শক্তিজোট গড়ে তোলে। পরে তুরস্ক, সুইডেন ও অস্ট্রিয়া এতে যোগ দেয়। চতুর্থ শক্তিজোট অঙ্গীকার করে যে, নেপোলিয়নের পতন না হওয়া পর্যন্ত তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে।

জার্মানির জাগরণ

  • (১) ইতিমধ্যে নেপোলিয়নের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে সমগ্র জার্মানিতে জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ শুরু হয়।এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয় জার্মান রাজ্য প্রাশিয়া। নেপোলিয়নের হাতে পরাজয়ের পর প্রাশিয়াতে জাতীয় পুনর্গঠন শুরু হয়।
  • (২) হার্ডেনবার্গ, স্টেইন, শার্নহস্ট, হুমবোল্ড প্রমুখ দেশপ্রেমিকের উদ্যোগে প্রাশিয়ায় নানাবিধ সংস্কার প্রবর্তিত হয় এবং প্রাশিয়া একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
  • (৩) জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ মুক্তিকামী জনগণ নেপোলিয়নকে বাধা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়। প্রাশিয়ার এই ভাবধারা সমগ্র জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ে।

নেপোলিয়নের শেষ জয়

নেপোলিয়ন ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ড্রেসডেনের যুদ্ধে অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করেন। এটিই তাঁর শেষ উল্লেখযোগ্য জয়। এই জয় ছিল ক্ষণস্থায়ী।

চতুর্থ জোটের সেনানায়ক

চতুর্থ শক্তিজোট নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করে। এই জোটের সেনানায়কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উইটগেনস্টাইন, ইয়র্ক, বুলো, ব্লুকার প্রমুখ।

চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত ফ্রান্স

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সূচনায় প্রাশিয়া ও রাশিয়ার যুগ্ম সেনাবাহিনী ব্লুকারের নেতৃত্বে সাইলেশিয়া থেকে ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হয়। উত্তর দিক থেকে সুইডেনের সেনাদল ফ্রান্স অভিমুখে যাত্রা করে। দক্ষিণ দিক থেকে অস্ট্রিয়া বাহিনী ফ্রান্সকে আক্রমণ করে। এইভাবে ফ্রান্স চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত হয়।

লিপজিগ-এর যুদ্ধ

মিত্রশক্তি নেপোলিয়নকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে। জার্মানির লিপজিগ-এ তিনদিন একটানা যুদ্ধের পর ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন। লিপজিগের যুদ্ধে তাঁর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাঁর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, জার্মানি নেপোলিয়নের শাসনমুক্ত হয়।

ফ্রান্সের অধীনতা মুক্ত

ওয়েস্টফেলিয়া, মেক্লেনবার্গ, কনফেডারেশন অব রাইন ফরাসি সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। অস্ট্রিয়া হৃতরাজ্য ফিরে পায়। হল্যান্ড স্বাধীন হয়ে যায়।ডেনমার্ক মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে।

জাতিসমূহের যুদ্ধ

লিপজিগের যুদ্ধ ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’ নামেও পরিচিত।কারণ, এই যুদ্ধে ইউরোপের তেরোটি জাতি নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

ফ্রাঙ্কফোর্ট প্রস্তাব

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ই নভেম্বর বিজয়ী মিত্রশক্তি ফ্রাঙ্কফোর্ট প্রস্তাব দ্বারা নেপোলিয়নকে সম্মানজনক শর্তেসন্ধির প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবঅনুযায়ী, (১) নেপোলিয়নকে ফ্রান্সেররাজা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে, (২) ফ্রান্স তাঁর প্রাকৃতিক সীমা বজায় রাখতে পারবে, অর্থাৎ জার্মানির দিকে রাইন, ইতালির দিকে আল্পস এবং স্পেনের দিকে পিরেনিজ—এই হবে তার সীমারেখা।

মিত্রবাহিনীর পরাজয়

নেপোলিয়ন ফ্রাঙ্কফোর্ট প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে আবার মিত্রপক্ষের অভিযান শুরু হয়। নেপোলিয়ন পরপর ছয়টি যুদ্ধে মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করে তাঁর অসাধারণ রণদক্ষতার প্রমাণ দেন।

মিত্রপক্ষের শান্তি প্রস্তাব

মিত্রপক্ষ শাতিলঁ সম্মেলনে মিলিত হয়ে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে পুনরায় নেপোলিয়নের কাছে শান্তি প্রস্তাব দেয়। বলা হয় যে, তাঁকে বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের রাজ্যসীমা মেনে নিতে হবে। নেপোলিয়ন এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন।

শৌমন্ট-এর সন্ধি

এই সময় মিত্রবাহিনীতে প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল। অথচ নেপোলিয়নের পরাজয়ের জন্য প্রয়োজন তাদের ঐক্য। এই অবস্থায় ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া শৌমন্ট-এর সন্ধি (Treaty of Chaumont) স্বাক্ষর করে।

শৌমন্ট-এর সন্ধির শর্ত

এই সন্ধি অনুসারে স্থির হয় যে,

  • (১) নেপোলিয়নের পতন না হওয়া পর্যন্ত অন্তত ২০ বছর এই চুক্তি স্থায়ী হবে।
  • (২) চুক্তিবদ্ধ কোনও রাষ্ট্র নেপোলিয়নের সঙ্গে পৃথকভাবে কোনও চুক্তি করবে না।
  • (৩) ফ্রান্সকে তার প্রাকৃতিক সীমানার মধ্যে বেঁধে রাখা হবে এবং এই উদ্দেশ্যে চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রগুলি প্রত্যেকে দেড় লক্ষ করে সেনা প্রস্তুত রাখবে।

নেপোলিয়নের পরাজয়

এরপর মিত্রবাহিনী পাঁচটি পথ ধরে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়। এই আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা আর নেপোলিয়নের ছিল না। সেনাপতিরা রণক্লান্ত, অনুচরেরা একে একে তাঁকে ত্যাগ করছে, জনসাধারণ উদাসীন। এই অবস্থায় ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে শত্রুসেনা প্যারিস দখল করে।১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ২রা এপ্রিল সিনেট ও আইন সভা তাঁর পদত্যাগ দাবি করে।

ফন্টেন ব্ল্যু সন্ধি

নির্বান্ধব ও পরাজিত সম্রাট নেপোলিয়ন ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ই এপ্রিল মিত্রশক্তি জোটের সঙ্গে ফন্টেন ব্ল্যু সন্ধি (Treaty of Fontainebleau) স্বাক্ষর করে ফ্রান্সের সিংহাসন ত্যাগ করেন।

নির্বাসন

ফ্রান্স ও ইতালির মাঝে ভূমধ্যসাগরের উত্তরে এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়।তাকে বার্ষিক পেনসন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

নির্বাসনে যাওয়ার পূর্বে উক্তি

এলবা দ্বীপেনির্বাসনে যাওয়ার ঠিক আগে তিনি বলেছিলেন যে, “আমি সিংহাসন ত্যাগ করলাম, কিন্তু আমি কিছুই ছেড়ে গেলাম না” (“I abdicate, I yield nothing.”)।

প্যারিসের প্রথম সন্ধি

১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে মিত্রপক্ষ ও ফরাসি প্রতিনিধিদের মধ্যে প্যারিসের প্রথম সন্ধি (First Treaty of Paris) স্বাক্ষরিত হয়।এর শর্তাবলী এমন কিছু কঠোর ছিল না।

সন্ধির শর্ত

এই সন্ধির শর্ত সাপেক্ষে

  • (১) ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন ষোড়শ লুই-এর ভ্রাতা বুরবোঁ বংশীয় অষ্টাদশ লুই।
  • (২) ফ্রান্সকে বিপ্লব-পূর্ব সীমারেখায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।
  • (৩) ইতালি, জার্মানি, হল্যান্ড ও বেলজিয়ামের যে স্থানগুলি ফ্রান্স দখল করেছিল, তা ফিরিয়ে দেয়।
  • (৪) ব্রিটেন মাল্টা, টোবাগো ও সেন্ট লুসিয়া নিজের দখলে রেখে অন্যান্য উপনিবেশগুলি ফ্রান্সকে ফেরত দেয়।
  • (৫) অরেঞ্জ রাজবংশের অধীনে বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে যোগ করা হয়।

উপসংহার :- এলবা দ্বীপের নির্বাসন থেকে ফিরে এসে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে পুনরায় একশো দিন স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করেন, যা ইতিহাসে একশো দিনের রাজত্ব নামে পরিচিত।

(FAQ) নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. নেপোলিয়নের শেষ উল্লেখযোগ্য জয় কোনটি?

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ড্রেসডেনের যুদ্ধে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জয়লাভ।

২. লিপজিগের যুদ্ধ কখন হয়?

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে।

৩. জাতিসমূহের যুদ্ধ কাকে বলে?

ইউরোপের তেরোটি জাতি নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে একযোগে লিপজিগের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।তাই লিপজিগের যুদ্ধকে জাতিসমূহের যুদ্ধ বলা হয়।

৪. ফন্টেন ব্ল্যু সন্ধি কবে কাদের মধ্যে হয়?

৬ এপ্রিল, ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ নেপোলিয়ন ও মিত্রশক্তি জোটের মধ্যে।

৫. নেপোলিয়নকে কোথায় নির্বাসন দেওয়া হয়?

এলবা দ্বীপে।

Leave a Reply

Translate »