জোটনিরপেক্ষ নীতি

জোটনিরপেক্ষ নীতি প্রসঙ্গে জোটনিরপেক্ষ দেশ, জোটনিরপেক্ষ নীতির সংজ্ঞা, জোটনিরপেক্ষ নীতির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, জোটনিরপেক্ষতার নীতিসমূহ ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্পর্কে জানবো।

জোটনিরপেক্ষ নীতি

ঐতিহাসিক ঘটনাজোটনিরপেক্ষ নীতি
উদ্ভাবকজওহরলাল নেহেরু
জোট নিরপেক্ষ দেশভারত, মিশর, ঘানা প্রভৃতি
নেতৃত্বজওহরলাল নেহেরু, নাসের
পঞ্চশীল নীতি১৯৫৪ খ্রি
বান্দুং সম্মেলন১৯৫৫ খ্রি
জোটনিরপেক্ষ নীতি

ভূমিকা :- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে বিশ্বরাজনীতিতে দ্বিমেরুকরণ ঘটে। একদিকে থাকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ধনতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক জোট এবং অন্যদিকে থাকে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক জোট। এই দুটি জোটের মধ্যে ক্রমাগত শক্তির লড়াই এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের মতাদর্শের প্রসার ঘটানোর প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। এর ফলে উভয় জোটের মধ্যে ঠান্ডা লড়াইয়ের সুত্রপাত ঘটে।

জোটনিরপেক্ষ দেশ

এই সময় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ উক্ত কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখে। এই দেশগুলি ‘জোটনিরপেক্ষ দেশ’ বা ‘নির্জোট দেশ’ নামে পরিচিত।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী দেশ

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশ ছিল, ভারত, মিশর, যুগোশ্লোভিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ঘানা, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন ভারতের জওহরলাল নেহরু, মিশরের গামাল আবদেল নাসের, যুগোশ্লোভিয়ার মার্শাল টিটো, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, ঘানার নকুমা প্রমুখ।

জোটনিরপেক্ষ নীতি

জোটনিরপেক্ষ নীতি বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন অভিমত দিয়েছেন। যেমন –

(১) সাধারণ সংজ্ঞা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের কোনো কোনো রাষ্ট্র ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কোনো জোটেই যোগ না দিয়ে উভয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নিজেদের বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করত। প্রথম দুটি জোটের বাইরে অবস্থানকারী দেশগুলির এই নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত।

(২) বার্টনের অভিমত

জে. ডব্লিউ. বার্টন বলেছেন, জোটনিরপেক্ষ ধারণার মাধ্যমে সেইসব দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বোঝায়, যারা সাম্যবাদী বা পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী জোটের প্রভাব থেকে দূরে থেকে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও পরিচালনা করে।

(৩) কঠোর নিরপেক্ষ নয়

জোটনিরপেক্ষতা বলতে কঠোর নিরপেক্ষতাকে বোঝায় না। জোটনিরপেক্ষ দেশও অনিরপেক্ষ হতে পারে বা আন্তর্জাতিক বিরোধের ক্ষেত্রে কোনো দেশের পক্ষ অবলম্বন করতে পারে বা সমালোচনা করতে পারে।

(৪) ইতিবাচক নিরপেক্ষতা

জওহরলাল নেহরু বলেছেন যে, জোটনিরপেক্ষতা নীতি নেতিবাচক নয়, এটি হল ইতিবাচক নীতি। তাঁর মতে, জোটনিরপেক্ষতা নিছক নিরপেক্ষতার নামান্তর নয় বরং সক্রিয়ভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে নিজেদের স্বাধীন বিচারশক্তি দিয়ে বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং সম্ভব হলে তাকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা।

(৫) গতিশীল নিরপেক্ষতা

জোটনিরপেক্ষতা বলতে গতিশীল নিরপেক্ষতা বোঝায়। জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি আন্তর্জাতিক বিরোধে না জড়িয়েও বিশ্বরাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং বিরোধের মীমাংসায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরোধ সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। ভারত-সহ বিভিন্ন জোটনিরপেক্ষ দেশ ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগে আপস বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিভিন্ন বিরোধের মীমাংসায় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি জাতিপুঞ্জের অভ্যন্তরে উপনিবেশিকতাবাদ, বর্ণবৈষম্য, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, কঙ্গো সংকট প্রভৃতি ঘটনায় আমেরিকার নীতির বিরোধিতা করেছে।

জোটনিরপেক্ষ নীতির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাবলি জোটনিরপেক্ষ নীতির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। এবিষয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সদ্যস্বাধীন বিভিন্ন রাষ্ট্র বিশেষ অগ্ৰণী ভূমিকা নিয়েছিল। যেমন –

(১) জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগ

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে জোটনিরপেক্ষ নীতির জনক বা উদ্ভাবক বলে মনে করা হয়। তিনি ভারতের স্বাধীনতা লাভের কিছুদিন পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর ঘোষণা করেন যে, ভারত সকল জোট ও সামরিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বাইরে থাকবে এবং সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করবে। স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় গণপরিষদেও তিনি এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।

(২) পঞ্চশীল নীতি

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘পঞ্চশীল’ নামে যে পাঁচটি নীতি গৃহীত হয় তা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়।

(৩) টিটোর ভূমিকা

যুগোশ্লোভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মার্শাল টিটো রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক জোট থেকে বেরিয়ে এসে জোটনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যুগোশ্লাভিয়া সফরে যান এবং ডিসেম্বর মাসে টিটো ভারত সফরে আসেন। তারা উভয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়ে জোটনিরপেক্ষ নীতির প্রতি আস্থা জানান।

(৪) কলম্বো সম্মেলন

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান সম্মিলিত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। এখানে এশিয়া ও আফ্রিকার জাতিগুলির স্বার্থের সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি এবং তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

(৫) দিল্লি সম্মেলন

এশিয়ার ১৪টি রাষ্ট্র ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে মিলিত হয়। এখানে তারা আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীতি, ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবৈষম্য প্রভৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, নিজেদের মধ্যে ঐক্য শক্তিশালী করা প্রভৃতির প্রতিশ্রুতি দেয়।

(৬) বান্দুং সম্মেলন

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের (১৮-২৬ এপ্রিল) বান্দুং সম্মেলনকে জোটনিরপেক্ষ নীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। এই সম্মেলনে এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি দেশ যোগদান করে। সম্মেলনে বর্ণবৈষম্যের অবসান, ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি, পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা ও ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ প্রভৃতি বিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

(৭) কায়রো সম্মেলন

জোটনিরপেক্ষ দেশগুলিকে নিয়ে একটি প্রস্তাবিত সম্মেলনের বিষয়ে আলোচনার জন্য এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ২১টি দেশ ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে (৫-১২ ডিসেম্বর) মিশরের রাজধানী কায়রোতে মিলিত হয়। এখানে স্থির হয় যে, প্রস্তাবিত সম্মেলনে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কায়রো সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে যুগোশ্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলির প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে জোটনিরপেক্ষ নীতির পটভূমি বা ভিত্তি গড়ে ওঠে।

জোটনিরপেক্ষতার নীতিসমূহ

জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি নির্দিষ্ট কিছু নীতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের কর্মসূচি পরিচালনা করে। এই দেশগুলি তাদের বিভিন্ন সম্মেলনে বিভিন্ন জোটনিরপেক্ষ নীতিগুলির উল্লেখ করেছে। জোটনিরপেক্ষতার প্রধান নীতিগুলি হল –

  • (১) জোটনিরপেক্ষ দেশগুলির মার্কিন নেতৃত্বাধীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন – উভয় সামরিক জোট থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখা।
  • (২) ঠান্ডা লড়াইয়ের বিরোধিতা করে বিশ্বে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখায় গুরুত্ব দেওয়া।
  • (৩) প্রতিটি দেশের অখণ্ডতা রক্ষা ও সার্বভৌমিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থান গ্রহণ।
  • (৪) যে-কোনো রকম আক্রমণ বা আগ্রাসনের বিরোধিতা করা। নিজ দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মিশ্র ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • (৬) রাষ্ট্রসংঘের নীতি ও আদর্শ মেনে এই সংগঠনের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন

বিভিন্ন জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে এবং জোটনিরপেক্ষ নীতি ও আদর্শের ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। এই ঘটনা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (Non-alignment Movement বা NAM) নামে পরিচিত। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং সম্মেলন থেকে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় বলে অনেকে মনে করেন। ক্রমে এই আন্দোলনের আরও প্রসার ঘটে।

উপসংহার :- বিভিন্ন জোটনিরপেক্ষ দেশগুলি জোটনিরপেক্ষ নীতি ও আদর্শের প্রসারে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই দেশগুলির অধিকাংশই আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ধনতান্ত্রিক জোট এবং সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক জোটের মধ্যে সংঘটিত ঠাণ্ডা লড়াই থেকে সমদূরত্ব বজায় রেখে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করে।

(FAQ) জোটনিরপেক্ষ নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জোট নিরপেক্ষ দেশ বা নির্জোর দেশ কাদের বলা হয়?

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ আমেরিকা বা রাশিয়া কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখে। এই দেশগুলি ‘জোটনিরপেক্ষ দেশ’ বা ‘নির্জোট দেশ’ নামে পরিচিত।

২. কয়েকটি জোট নিরপেক্ষ দেশের নাম লেখ।

ভারত, মিশর, যুগোশ্লাভিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ঘানা, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি।

৩. জোট নিরপেক্ষ নীতির জনক বা উদ্ভাবক কাকে বলা হয়?

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।

৪. জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের কয়েকজন নেতার নাম লেখ?

ভারতের জওহরলাল নেহরু, মিশরের গামাল আবদেল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, ঘানার নক্রুমা, যুগোশ্লাভিয়ার মার্শাল টিটো প্রমুখ।

Leave a Comment