সাতবাহন যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা

সাতবাহন যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা প্রসঙ্গে কৃষির অগ্ৰগতি, সামন্ত প্রথা, শিল্প, বাণিজ্য ও উপনিবেশ, বাণিজ্য কেন্দ্র, বহির্বাণিজ্য, পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, নিগম প্রথা, ধনতন্ত্রবাদ ও নিগম প্রথার বিস্তার সম্পর্কে জানবো।

সাতবাহন যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা

বিষয় সাতবাহন যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা
সাম্রাজ্য সাতবাহন সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা সিমুক
শ্রেষ্ঠ রাজা গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী
শেষ রাজা যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী
সাতবাহন যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা

ভূমিকা :- সাতবাহন যুগের সভ্যতা ও সংস্কৃতির পশ্চাতে এক দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তার এই চারটি প্রকরণের মাধ্যমে সাতবাহন অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছিল।

কৃষির অগ্ৰগতি

সাতবাহন যুগে দাক্ষিণাত্যে গভীর চাষ অর্থাৎ লাঙ্গলের দ্বারা আবাদ ব্যাপকভাবে চালু হয়। চাষের জন্য জলসেচের ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পুলুমায়ির রাজত্বকালে জনৈক গৃহপতি একটি জলাধার তৈরি করেন বলে জানা যায়।

সামন্ত প্রথা

কৃষির বিস্তারের ফলে সামন্ত প্রথার উদ্ভব অনিবার্য হয়ে পড়ে। মহারথী, মহাভোজ, মহাসেনাপতিরা ছিল সামস্তশ্রেণীর লোক। সামস্তশ্রেণীর লোকেরা শাসনকার্যে অংশ নিত এবং সেনাদল পরিচালনা কর।

শিল্প

  • (১) সাতবাহন যুগে কৃষি জনসাধারণের একমাত্র জীবিকা ছিল না। এই যুগে শিল্পের অসাধারণ বিস্তার হয়েছিল। চামড়া, কাপড়, কাঠ, লোহা, পাথর ও অন্যান্য সৌখীন শিল্পের বিরাট প্রসার ঘটেছিল। নগর জীবনের প্রসার ও নাগরিক জীবনের সমৃদ্ধি ও বিলাস এই শিল্পের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
  • (২) এর ফলে শ্রেষ্ঠী, গিল্ড বা নিগমের প্রধান শ্রেষ্ঠী প্রমুখের প্রাধান্য সমাজে বেড়ে যায়। বাৎসায়ণের কামশাস্ত্রে নগর ও শিল্প অর্থনীতির ছায়া ভালভাবে দেখা যায়। শিল্পী কারিগরদের গিল্ড বা সঙ্ঘ থাকত।

বাণিজ্য ও উপনিবেশ

  • (১) শিল্প বিস্তারের পাশাপাশি বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তার ঘটে। বাণিজ্য এক শ্রেণীর লোকের প্রধান জীবিকা বলে গণিত হয়। বণিকরা সমাজে বিশেষ প্রাধান্য পায়। শিল্পী, কারিগরদের আর্থিক অবস্থা এত ভাল ছিল যে, অনেক সময় তারা স্তূপ বা বিহার নির্মাণ করে তা উৎসর্গ করে।
  • (২) এর ফলে সামন্তশ্রেণী সমাজে তাদের একাধিপত‌্য হারায়। কারণ, সাতবাহন সমাজে বহু নগর গড়ে ওঠে। নগরবাসী ও বণিকরা তাদের স্বচ্ছলতার দরুন সামন্তশ্রেণীর গুরুত্বকে খর্ব করে দেয়। বাৎসায়ণের রচনায় তার প্রতিফলন দেখা যায়। মধ্যযুগের ইওরোপে নগর বিপ্লবের ফলে যে রকম নগরবাসীদের প্রাধান্য বেড়েছিল। অনেকটা সেই রকম ঘটনা সাতবাহন যুগে ঘটে।

বাণিজ্য কেন্দ্র

  • (১) সাতবাহন যুগে অন্তর্বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে মালবের উজ্জয়িনী, অন্ধ্রের ধান্যকটক, পশ্চিম অঞ্চলের প্রতিষ্ঠান, নাসিক বা গোবর্ধন, মহীশূরের বা কন্নড়ের বনবাসি, টগর প্রভৃতি প্রসিদ্ধ ছিল। এছাড়া ছিল নতুন শহর বেনাকটক প্রভৃতি।
  • (২) এই শহরগুলি বিভিন্ন রাস্তা দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দাক্ষিণাত্যে আগে যে বিরাট অনাবাদী অরণ্য অঞ্চল ছিল শক-সাতবাহন যুগে তার পরিবর্তে গ্রাম ও শহর গড়ে ওঠে এবং অন্তর্বাণিজ্য খুবই বৃদ্ধি পায়।

বহির্বাণিজ্য ও উপনিবেশ বিস্তার

সাতবাহন যুগে বহির্বাণিজ্যের ও উপনিবেশ বিস্তারের পশ্চাতে কয়েকটি কারণ ছিল। যেমন –

  • প্রথমত, সাতবাহন সাম্রাজ্যের শান্তি ও সংহতির ফলে এই বাণিজ্যের আগ্রহ দেখা দেয়।
  • দ্বিতীয়ত, দাক্ষিণাত্যের পূর্বভাগে কৃষ্ণা-গোদাবরী উপত্যকায় সাতবাহন শক্তির বিস্তারের ফলে এই বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।
  • তৃতীয়ত, আর্য সংস্কৃতির প্রচার এবং উপনিবেশ স্থাপনের আগ্রহ বাণিজ্যের অন্যতম কারণ ছিল।
  • চতুর্থত, যাবতীয় বিলাস দ্রব্য যথা মশলা, চন্দন কাঠ, কর্পূর প্রভৃতি এত প্রচুর উৎপাদন হত যে তা রোমে রপ্তানি করে রোম থেকে সোনা আমদানীর আগ্রহ দেখা দেয়।

বহির্বাণিজ্য ও বাণিজ্যকেন্দ্র

  • (১) সাতবাহন যুগের প্রধান বাণিজ্য চলত উপকূলের বন্দর থেকে। পশ্চিম উপকূলের প্রধান বন্দর ছিল ভৃগুকচ্ছ বা ভারুচ বা ব্রোচ। খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে সাতবাহন যুগে এই বন্দর থেকে সাতবাহন দূত রোমান সম্রাট আগাষ্টাসের সভায় গিয়েছিল বলে জানা যায়।
  • (২) শক সাতবাহন বাণিজ্য ভারুচ বন্দর থেকে সমুদ্র পথে আরব সমুদ্র, লোহিত সাগর হয়ে, আলেকজান্দ্রিয়া তথা রোম সাম্রাজ্যের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র পর্যন্ত চলত। মৌসুমী বায়ুর গতিপথ ৪৫ অব্দে হিপপলাস নামে এক গ্রীক নাবিক আবিষ্কার করেন।
  • (৩) মৌসুমী বায়ুতে পাল খাটিয়ে রোমান জাহাজগুলি গভীর সমুদ্র দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে ভারুচ ও সোপর্ক বন্দরে চলে আসত। আলেকজাণ্ডারের ভারত আক্রমণের পর পারস্যের বিরাট সোনা ও রূপার সম্পদ গ্রীক জগতে ছড়িয়ে পড়লে ভারতের সঙ্গে গ্রীক বাণিজ্য বাড়ে।
  • (৪) ক্রমে গ্রীসের পর রোমানরাও এই বাণিজ্যে আগ্রহী হয় প্লিনি বলেছেন যে, রোমের স্বর্ণমুদ্রার বেশীর ভাগ ভারতে চলে আসতে থাকে। নাসিক, কার্লে, কানহেরির লিপিতে এই বাণিজ্যের সংবাদ পাওয়া যায়। কোলাপুর ও পণ্ডিচেরীতে রোমের বাণিজ্যদ্রব্যের নিদর্শনও পাওয়া যায়।
  • (৫) সুপর্ক বা সোপারা এবং কল্যাণ বন্দর ছিল মহারাষ্ট্রের বন্দর। এই বন্দরগুলি অর্ন্তবন্দর নাসিক, পৈঠান প্রভৃতির সঙ্গে রাস্তা দ্বারা সংযুক্ত ছিল। এর দক্ষিণে মালাবার উপকূলে লিমরিক (Lymrika) ছিল অপর বন্দর।
  • (৬) মৌসুমী বায়ুর গতিপথ আবিষ্কৃত হলে এই বায়ুর গতিতে পাল খাটিয়ে জাহাজগুলি সহজে আরব সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পশ্চিম উপকূলের বন্দরে আসত। রান্নার মশলা, চন্দন কাঠ, হাতির দাঁত, রেশম, সরু চাল, সুগন্ধি মশলা, কর্পূর প্রভৃতি রোমান সাম্রাজ্যে রপ্তানি হত আর তার বিনিময়ে আসত সোনা।
  • (৭) সোপারা ও কল্যাণ থেকে দেশের ভেতর যে বাণিজ্য পথ প্রসারিত ছিল তার ধারেই তৈরি হয়েছিল বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও গুহাগুলি। এর অনেকগুলি বণিকদের বা ব্যক্তিগত দাক্ষিণ্যে তৈরি হয়েছিল। এই বিহারগুলি সম্ভবত বাণিজ্যে উৎসাহ দিত, অনেক সময় অর্থ বিনিয়োগ করত।

পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য

  • (১) পূর্ব উপকূলেও বাণিজ্য বন্দর ছিল যা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য চলত ও উপনিবেশ বিস্তার করা হত। বাংলার তাম্রলিপ্ত থেকে করমণ্ডল উপকূল ধরে বিভিন্ন বন্দর স্থাপিত হয়েছিল। পেরিপ্লাসের ভ্রমণ কাহিনী ও টলেমীর ভূগোলে এর বর্ণনা পাওয়া যায়।
  • (২) কাবেরীপত্তনম থেকে তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের লোকেরা এই বাণিজ্যে অংশ নিত। রোমান সাম্রাজ্যে মশলা সরবরাহের জন্য পূর্ব উপকূলের বণিকরা সুমাত্রা ও জাভার মশলা আমদানী করত। তাছাড়া আর্য বা হিন্দু সংস্কৃতির বিস্তারের জন্যও পূর্ব উপকূল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উপনিবেশ স্থাপিত হয়।
  • (৩) সাতবাহন সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য ও উপনিবেশের বিস্তার ঘটে। টলেমির রচনা থেকে জানা যায় যে, খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকে দাক্ষিণাত্যে ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য চলত। জাভা, মালয়, ইন্দোচীন প্রভৃতি অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের পূর্ব উপকূলের বাণিজ্যের কথা টলেমি বলেছেন।

নিগম প্রথা

  • (১) সাতবাহন যুগে বাণিজ্যের ও শিল্পের প্রসারের ফলে গিল্ড বা সঙ্ঘ বা নিগমগুলির প্রভাব বাড়ে। নগর জীবনের প্রসার ও স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এবং ব্যাপক রপ্তানি বাণিজ্য বাড়লে বিশেষ বিশেষ শিল্পদ্রব্যের কারিগর ও ব্যবসায়ীরা তাদের আলাদা নিগম বা সঙ্ঘ গঠনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে।
  • (২) ফলে মৃৎশিল্প, চর্মশিল্প, ধাতুশিল্প প্রভৃতির আলাদা নিগম বা সঙ্ঘ গঠিত হয়। নিগমগুলি স্থানীয় বাজারের একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত এবং স্থানীয় সরকারী দপ্তরের অনুমোদন নিত।
  • (৩) নিগম গঠনের ফলে নিগমের সদস্য শিল্পী-কারিগর বা নবাগত শিল্পী-কারিগরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাত থেকে রক্ষা পেত। কারণ নতুন কোনো কারিগর নিগমের সদস্য না হলে স্থানীয় বাজারে ঢুকতে পারত না।
  • (৪) নিগম থেকে জিনিসের যে দাম ঠিক করা হত, তাই স্থির থাকত। দাম নিয়ে কেউ প্রতিযোগিতা করতে পারত না। নিগম থেকে মালের মান ঠিক করে দেওয়া থাকত। নিম্নমানের জিনিস বেশী দামে বিক্রয় করা যেত না।
  • (৫) নিগমের সদস্য হিসেবে কারিগরদের নিগমের প্রথা ও আইন মেনে চলতে হত। না হলে নিগম থেকে শাস্তি দেওয়া হত। কোনো সদস্য রোগে পড়লে বা তার মৃত্যু হলে নিগম তার দেখাশোনা করত।

ধনতন্ত্রবাদ

  • (১) গিল্ড বা নিগম প্রথার ফলে ধনতন্ত্রবাদের উদ্ভব হয়েছিল। কারণ, বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নিগমগুলির উৎপাদন বাড়ান হয়। এজন্য ক্রীতদাস বা ভাড়াটে শ্রমিক নিয়োগ করা হত। সাধারণ কারিগর সদস্যরা যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন করতে পারত না বলেই বাড়তি উৎপাদনের জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়।
  • (২) এই ভাড়াটে শ্রমিক বা ক্রীতদাসদের যৎসামান্য দক্ষিণা দেওয়া হত। শার্দুলপুত্র নামে এক নিগম প্রধানের ৫০০ মৃৎশিল্পের কারখানা ছিল। এতে বহু ক্রীতদাস শ্রমিক কাজ করত। গঙ্গার পথে নৌকার দ্বারা দূর-দূরান্তরে শার্দুলপুত্রের মাল চালান যেত। এভাবে একচেটিয়া বাণিজ্যের মুনাফা নিগম প্রধান বা শ্রেষ্ঠীরা পেত।

নিগম প্রথার বিস্তার

  • (১) নিগম বা সঙ্ঘগুলি অনেক সময় আধুনিক ব্যাঙ্কের কাজ করত। এরা বণিকদের সুদ নিয়ে মূলধন যোগাত। নাসিকের গুহা লিপি থেকে জানা যায় যে, নাসিকের নিগম বহু লোকের টাকা সুদের বিনিময়ে গচ্ছিত রাখত।
  • (২) ক্ষত্রপ নহপানের জামাতা ঋষভদত্ত গোবর্ধনের নিগমে মাসিক টাকা পিছু এক পত্রিকা সুদে টাকা গচ্ছিত রাখেন। সাতবাহনবাসীরাও এভাবে টাকা জমা রাখতেন। নিগমগুলি এই সঞ্চিত অর্থ বণিকদের চড়া সুদে ঋণ দিত।
  • (৩) বণিকদের বিভিন্ন ব্যবসার ঝুঁকি অনুসারে সুদের হারের তারতম্য হত। সাধারণ সুদ ছিল শতকরা ১২%। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য ২০%-৩০% সুদ আদায় করা হত।

উপসংহার:- বৌদ্ধ বিহারগুলিও অনেক সময় নিগমে অর্থ খাটাত অথবা বাণিজ্যের জন্য উৎসাহ দিত। নাগার্জুনীকোণ্ড ও কাঞ্চির বিহারগুলি সামুদ্রিক বাণিজ্যে উৎসাহ দেয় এবং মূলধন লগ্নী করে বলে জানা যায়।

(FAQ) সাতবাহন যুগের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সাতবাহন যুগের দুটি বন্দরের নাম লেখ।

ভৃগুকচ্ছ, কল্যাণ, সুপারা, তাম্রলিপ্ত।

২. পুরাণে সাতবাহনদের কি বলা হয়েছে?

অন্ধ্র।

৩. সাতবাহন রাজ্য কে প্রতিষ্ঠা করেন?

হিমুকে।

৪. সাতবাহন রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে?

গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী।

৫. সাতবাহন রাজ্যের শেষ রাজা কে?

যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী।

Leave a Reply

Translate »