ভিয়েতনাম সংকট

ভিয়েতনাম সংকট প্রসঙ্গে হো-চি-মিনের প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সূচনা ও প্রথম পর্যায়, দিয়েন বিয়েন-ফু-র ঘটনা, জেনেভা সম্মেলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়, দিয়েম সরকারের পতন, ভিয়েতনামে মার্কিন উগ্রতা ও ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনাম সম্পর্কে জানবো।

ভিয়েতনাম সংকট

ঐতিহাসিক ঘটনাভিয়েতনাম সংকট
ভিয়েতনাম বিভাজন১৭ ডিগ্ৰি অক্ষরেখা
ভিয়েতমিনহো চি মিন
জেনেভা সম্মেলন১৯৫৪ খ্রি
ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনাম১৯৭৬ খ্রি
প্রথম রাষ্ট্রপতিফাম ভান দং
ভিয়েতনাম সংকট

ভূমিকা :- ভিয়েতনাম বা ইন্দোচিন ফ্রান্স ও জাপানের মতো শক্তিগুলির সাম্রাজ্যবাদের শিকার হয়েছিল। ভিয়েতনামে বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে কৃষক ও শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয়তাবাদী মুক্তিসংগ্রাম শুরু করে। এই সংগ্রামের নেতা ছিলেন সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত নগুয়েন আই কুয়োক যিনি হো-চি-মিন নামে সমধিক পরিচিত।

হো-চি-মিনের প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

হো-চি-মিন ছিলেন ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের পথপ্রদর্শক ও প্রাণপুরুষ। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) সংগঠন স্থাপন

হো-চি-মিন ভিয়েতনামে আধিপত্য বিস্তারকারী বৈদেশিক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সংগঠন স্থাপন করেন। এগুলি হল –

(১) ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি

তিনি ভিয়েতনামের কৃষক ও শ্রমিকদের নিয়ে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেন। এটি পরবর্তীকালে ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি নামে পরিচিত হয়।

(২) ভিয়েতমিন

হো-চি-মিন ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে লিগ ফর দি ইন্ডিপেন্ডেন্স ইন ভিয়েতনাম বা সংক্ষেপে ভিয়েতমিন গঠন করেন। কমিউনিস্ট ও জাতীয়তাবাদী উভয় মতাদর্শের মানুষই এতে ছিল।

(৩) গুপ্ত সংগঠন

তিনি নগুয়েন গিয়াপ-এর সহায়তায় একটি গুপ্ত সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর সদস্যরা গেরিলা যুদ্ধে দক্ষ ছিল।

(খ) অগ্রগতি

ইন্দোচিনে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের অবসান ও জাপানের আবির্ভাবের সুযোগে আন্নাম-এর সম্রাট বাও দাই এবং কম্বোজ ও লাওসের রাজারা নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। এই সুযোগে ভিয়েতমিন নেতা হো-চি-মিন টংকিং-এর সাতটি প্রদেশে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন।

(গ) প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

জাপানের আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে ২৯ আগস্ট, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি হ্যানয় নামক স্থানটিও দখল করেন। হো-চি-মিন তাঁর অধিকৃত স্থানে ২ সেপ্টেম্বর ‘ভিয়েতনাম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সূচনা ও প্রথম পর্যায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে জাপানের আত্মসমর্পণকালে মিত্রশক্তি জুলাই, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত পটসডাম সম্মেলনে ইন্দোচিনে দ্বিখণ্ডিত শাসন চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) দ্বিখণ্ডিত ইন্দোচিন

পটসডাম সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, জাপান ইন্দোচিন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এখানকার ১৭ ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখার উত্তরাংশে কুয়োমিনতাং চিন এবং দক্ষিণাংশে ব্রিটেন দায়িত্ব গ্রহণ করবে। –

  • (১) কুয়োমিনতাং চিন হো-চি-মিনের হাতে উত্তর ইন্দোচিনের ক্ষমতা তুলে দেয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভিয়েতনামের স্বাধীনতা লাভ।
  • (২) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইন্দোচিনে ফ্রান্সের কর্তৃত্ব ছিল। তাই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেখানে ফ্রান্স কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হলে ব্রিটেন দক্ষিণ ইন্দোচিন থেকে সরে যায় এবং সেখানে ফ্রান্সের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু শুধু দক্ষিণ ইন্দোচিন নয়, সমগ্র ইন্দোচিনে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল ফ্রান্সের লক্ষ্য।

(খ) ফ্রান্সের বোমাবর্ষণ

হো-চি-মিন-এর নেতৃত্বাধীন ভিয়েতমিন ও ফ্রান্সের মধ্যে বহু আলাপ আলোচনার পর উভয়ের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির দ্বারা ফ্রান্স ভিয়েতনামকে ইন্দোচিন ফেডারেশন ও ফরাসি ইউনিয়নের অংশরূপে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু চুক্তির পরও ফ্রান্স ইন্দোচিনে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। ফ্রান্স ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে হাইফং-এ বোমা বর্ষণ করলে ৬ হাজার অসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়।

(গ) ফ্রান্সের ব্যর্থতাফ্রান্সের বোমাবর্ষণের প্রতিবাদে ভিয়েতমিনরা ফরাসি অধিকৃত টংকিং-এ আক্রমণ চালায়। এভাবে ইন্দোচিন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, যা দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চলে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে ফ্রান্স ইন্দোচিনের কিছু শহরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হলেও গ্রামগুলিতে ভিয়েতমিনদের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। ফলে নিজেদের ব্যর্থতা উপলব্ধি করে ফ্রান্স কূটনীতির আশ্রয় গ্রহণ করে।

(ঘ) ঠান্ডা লড়াইয়ের সূত্রপাত

কুটনীতির সহায়তায় ফ্রান্স সম্রাট বাও দাই-এর নেতৃত্বে ইন্দোচিনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ‘স্বাধীন সরকার’ প্রতিষ্ঠা করে। এই সরকার ছিল একান্তই ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীল। ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা, ইংল্যান্ড সহ অন্যান্য কয়েকটি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। ইতিমধ্যে চিনের মাও-সে-তুঙ-এর সরকার হো-চি- মিন প্রতিষ্ঠিত ভিয়েতনাম সরকারকে স্বীকৃত দিয়েছিল। এভাবে ইন্দোচিন ঠান্ডা লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। হো-চি-মিন-কে চিন ও রাশিয়া এবং ফ্রান্সকে আমেরিকা সাহায্য করতে থাকে।

(ঙ) মার্কিন ভূমিকা

ইন্দোচিনে হো-চি-মিনের নেতৃত্বে সাম্যবাদী সংগ্রামকে আমেরিকা সুনজরে দেখে নি। এজন্য প্রথমে আমেরিকা যুদ্ধে অংশ না নিলেও ফ্রান্সকে মদত ও সহায়তা দান করতে থাকে। মার্কিন সহায়তার পরিমাণ ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ছিল ১৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে দাঁড়ায়, ১,০০০ মিলিয়ন ডলার। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েতনামে ফরাসি অর্থব্যয়ের ৮০ শতাংশই বহন করেছিল আমেরিকা।

দিয়েন বিয়েন-ফু-র ঘটনা

ভিয়েতনামের দিয়েন বিয়েন-ফু নামক স্থানের ঘটনা ছিল নিম্নরূপ –

(১) ফ্রান্সের ক্রমিক পরাজয়

ভিয়েতমিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে ক্রমাগত পরাজয় বরণ করতে থাকে। হ্যানয় ও হাইফং-এর গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে ফ্রান্সের হাতছাড়া হয়।

(২) নেভারে প্ল্যান

ভিয়েতমিনদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ফরাসি সেনাপতি নেভারে এক নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন যা ‘নেভারে প্ল্যান’ নামে খ্যাত। এই পরিকল্পনা অনুসারে তিনি টংকিং এর দিয়েন-বিয়েন-ফু নামক স্থানে একটি অস্ত্রভাণ্ডার ও দুর্ভেদ্য ঘাঁটি তৈরি করেন।

(৩) ফ্রান্সের আত্মসমর্পণ

ভিয়েতমিন সেনাপতি জেনারেল নগুয়েন গিয়াপ সঠিক সময়ে আক্রমণ চালিয়ে এই ঘাঁটি ছিন্নভিন্ন করে দেন। ৫৭ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর ৭ মে, ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসিরা গিয়াপের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। এভাবে ভিয়েতমিনদের নেতৃত্বে ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের জয় ঘোষিত হয়।

(৪) ফ্রান্সের ক্ষয়ক্ষতি

৮ বছরব্যাপী এই যুদ্ধের জন্য ফ্রান্সকে প্রচুর মূল্য দিতে হয়। এই যুদ্ধে মোট ৯২ হাজার ফরাসি সেনা নিহত হয় এবং প্রায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার সেনা আহত হয়। দিয়েন-বিয়েন-ফু-তে প্রায় ১৫ হাজার ফরাসি সেনা অবরুদ্ধ হয়।

(৫) আমেরিকার উদ্যোগ

ফ্রান্সের পরাজয় সত্ত্বেও আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি ছিল না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফস্টার ডালেস মনে করতেন, কমিউনিস্টদের হাত থেকে মুক্ত পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

জেনেভা সম্মেলন

দিয়েন-বিয়েন-ফু-র যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজয়ের পর ভিয়েতনামে ফ্রান্স আর যুদ্ধ চালাতে রাজি ছিল না। ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী পিয়ের মেন্ডেস ফ্রাঁস শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে ইন্দোচিন সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই সমস্যা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ফরাসি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরের দিন ৮ মে, ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে জেনেভা সম্মেলন বসে। এই সম্মেলনের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) জেনেভা চুক্তি স্বাক্ষর

এই সম্মেলনে যোগদানকারী আমেরিকা, ব্রিটেন, চিন, ফ্রান্স, ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার পরারাষ্ট্রমন্ত্রীরা ২০ জুলাই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন করে।

(খ) জেনেভা চুক্তির শর্তাবলি

জেনেভা চুক্তিতে বলা হয় যে –

  • (১) ভিয়েতনামকে ১৭ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর দুই ভাগে বিভক্ত করা হবে। অক্ষরেখার উত্তরাঞ্চলে ভিয়েতমিন এবং দক্ষিণাঞ্চলে ফরাসি নিয়ন্ত্রিত না দিন দিয়েম-এর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
  • (২) ভিয়েতনামের এই বিভাজন সম্পূর্ণ অস্থায়ী। শান্তিপূর্ণ উপায়ে ভিয়েতনামের সংযুক্তি জাতিপুঞ্জের দ্বারা গঠিত একটি তদারকি কমিশনের নেতৃত্বে দু-বছর পর জুলাই, ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
  • (৩) ভিয়েতনামের নির্বাচন তদারকির উদ্দেশ্যে ভারতের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের অপর দুই সদস্য ছিল পোল্যান্ড ও কানাডা।
  • (৪) এই চুক্তিতে আরও বলা হয় যে, উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে সকল বিদেশি সেনা অপসারণ করা হবে।
  • (৫) লাওস ও কম্বোডিয়া থেকে ফরাসি ও ভিয়েতমিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে। এই দুই দেশে পূর্বতন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

(গ) জেনেভা চুক্তির গুরুত্ব

জেনেভা সম্মেলন ও চুক্তির প্রধান গুরুত্বগুলি ছিল –

  • (১) জেনেভা সম্মেলনের মাধ্যমে পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলি শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছোন। রক্তক্ষয়ী হিংস্রতার দিনে জেনেভা সম্মেলনের এই শান্তিপূর্ণ প্রয়াস খুবই প্রশংসার যোগ্য।
  • (২) জেনেভা চুক্তির দ্বারা ভিয়েতনামে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটে এবং লাওস ও কম্বোডিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে জেনেভা চুক্তির দ্বারা ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতি হলেও এই চুক্তি ভিয়েতনামের সমস্যার সমাধান করতে পারে নি। বলা যায় যে, জেনেভা চুক্তির দ্বারা ভিয়েতনাম সমস্যার একটি অধ্যায় শেষ হয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কারণ, আমেরিকা বুঝেছিল যে, ভিয়েতনামে নির্বাচন হলে কমিউনিস্ট নেতা হো-চি-মিন নিশ্চিতভাবে জয়লাভ করবে এবং এই অঞ্চলে সাম্যবাদের প্রসার ঘটবে। তাই আমেরিকা জেনেভা চুক্তির দ্বারা জাতিপুঞ্জের তদারকি কমিশনের নেতৃত্বে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েতনামে নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়। এর দ্বারা আমেরিকা ইন্দোচিনে কমিউনিস্ট নেতা হো-চি-মিনের প্রভাব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্যবাদের প্রসার রোধের চেষ্টা করে। এই উপলক্ষ্যে আমেরিকা কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এগুলি হল –

(১) মার্কিন অনুগত সরকার

আমেরিকা তার অনুগ্রহপুষ্ট ন দিন দিয়েম-কে দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করে। দিয়েম ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে জানান যে, দক্ষিণ ভিয়েতনাম জেনেভা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী না হওয়ায় সেই চুক্তি পালনের বিষয়ে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর ফলে জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী ভিয়েতনামে নির্বাচন করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

(২) মার্কিন সাহায্য

আমেরিকা দিয়েম সরকারকে প্রচুর আর্থিক ও সামরিক সাহায্য দিতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে সেখানে বার্ষিক অর্থসাহায্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এই সময় সেখানে ৬৮৫ জন মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।

(৩) সামরিক চুক্তি

সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্যবাদের অগ্রগতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আমেরিকা এই অঞ্চলে একটি যৌথ সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। জেনেভা চুক্তির দেড় মাসের মধ্যেই আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, থাইল্যান্ড, ফিলিপিনস ও পাকিস্তানকে নিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফিলিপিনসের রাজধানী ম্যানিলায় এক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ম্যানিলা চুক্তি নামে পরিচিত। এ ছাড়া উক্ত দেশগুলিকে নিয়ে মার্কিন নেতৃত্বে ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা’ বা ‘সিয়াটো’ গড়ে ওঠে।

দিয়েম সরকারের পতন

উত্তর ভিয়েতনামে হো-চি-মিন বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ এবং জনগণের মধ্যে জমি বণ্টন করে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার দালাল দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার ছিল অপদার্থ। তাই এই সরকারের বিরুদ্ধে শীঘ্রই তীব্র আন্দোলন শুরু হলে সেখানকার পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) দিয়েম সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

দক্ষিণের দিয়েম সরকার ছিল স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ। দক্ষিণ ভিয়েতনামে এই সরকারের শাসনে মানুষের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। এজন্য সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের যথেষ্ট ক্ষোভ ছিল। এরই মধ্যে দিয়েম সরকার ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনের বিরোধিতা করলে সমগ্র ইন্দোচিনে প্রবল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কমিউনিস্ট, অকমিউনিস্ট, এমনকি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও এই সরকারের বিরোধিতা করতে থাকে।

(২) সংঘর্ষ

দিয়েম সরকারের বিরুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গড়ে ওঠে। উত্তর ভিয়েতনাম এই ফ্রন্টের সদস্যদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। দিয়েম সরকারের সঙ্গে এই ফ্রন্টের সংঘর্ষ শুরু হয়। দিয়েম এই ফ্রন্টকে ‘ভিয়েত কং’ বা ভিয়েতনামি কমিউনিস্ট আখ্যা দেন।

(৩) মার্কিন উদ্যোগ

আমেরিকা ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে দক্ষিণ ভিয়েতনামের ঘটনায় আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ে। এখানে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টার সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েত কং-দের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমানবাহিনীর যৌথ আক্রমণ শুরু হয়।

(৪) দিয়েম সরকারের পতন

ভিয়েত কং-দের ওপর আক্রমণ শুরু হলে দিয়েম সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল গণ আন্দোলন শুরু হয়। এই সময় এক সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে নভেম্বর, ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে দিয়েম সরকারের পতন ঘটে। সামরিক শাসকরা দেশের চূড়ান্ত ক্ষমতা দখল করে। জেনারেল নগুয়েন ভ্যান থিউ ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন।

ভিয়েতনামে মার্কিন উগ্রতা

১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভিয়েতনামে প্রত্যক্ষ মার্কিন হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) মার্কিন সামরিক শক্তি

ভিয়েতনামে মার্কিন স্থলবাহিনীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েতনামে মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৮৪ হাজার। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লক্ষ ৪২ হাজার।

(২) নির্মম আক্রমণ

ক্রমে ভিয়েত কং-দের ওপর মার্কিন আক্রমণ তীব্রতর হয়। মার্কিন সেনারা বিষাক্ত গ্যাস ও বিস্ফোরকের দ্বারা গাছপালা ধ্বংস ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে থাকে। ভিয়েত কং ও উত্তর ভিয়েতনামের সেনাবাহিনী ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি একযোগে দক্ষিণ ভিয়েতনামের ৪৪টি প্রাদেশিক রাজধানী শহরে আক্রমণ চালায়।

(৩) মাই লাই ঘটনা

মার্কিন সেনা সবচেয়ে নির্মম ঘটনাটি ঘটায় ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মাই লাই গ্রামে। সেনারা সেখানে শিশু ও বৃদ্ধ সহ ৪০০ থেকে ৪৫০ জনকে হত্যা করে। এই ঘটনা ‘মাই লাই ঘটনা’ নামে পরিচিত।

(৪) মুক্তিযুদ্ধ

বহুদিন ধরে অকথ্য নির্যাতন সত্ত্বেও ভিয়েতনামের সংগ্রাম আমেরিকা দমন করতে পারে নি। আসলে ভিয়েতনামের এই যুদ্ধ ছিল সেখানকার জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব উ থান্ট বলেছেন যে, ভিয়েতনামের যুদ্ধ কমিউনিস্ট আগ্রাসীদের যুদ্ধ নয়। এটি একটি বিদেশি শক্তি, বিশেষত আমেরিকানদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ।

(৫) মার্কিন-বিরোধী প্রতিবাদ

ভিয়েতনামে মার্কিন হস্তক্ষেপ ও আক্রোশ চরমে পৌঁছালে আমেরিকার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দেশের অভ্যন্তরেও মার্কিন রাষ্ট্রপতি লিন্ডন জনসনের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা যথেষ্ট অস্বস্তিতে পড়ে।

(৬) শান্তি স্থাপন

জনসনের পরবর্তী মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন উপলব্ধি করেন, ভিয়েতনামে মার্কিন জঙ্গিনীতি আর চলবে না। সত্তরের দশকের শুরু থেকে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের অবসান ঘটতে থাকে। ভিয়েতনাম ও আমেরিকার মধ্যে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন সেনা ও বিমানবাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রায় সমগ্র অঞ্চল ভিয়েত কং-দের দখলে আসে।

উপসংহার :- ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে দক্ষিণ ভিয়েতনামের জেনারেল ভ্যান মিন সায়্যানে মুক্তিবাহিনী বা ভিয়েত কং-দের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম রাষ্ট্রপতি হন ফাম ভান দং।

(FAQ) ভিয়েতনাম সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক কে ছিলেন?

হো চি মিন

কে কখন ভিয়েতমিন গঠন করেন?

হো চি মিন ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে

কে কখন ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেন?

হো চি মিন ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে

কত ডিগ্রী অক্ষরেখা বরাবর ভিয়েতনাম বিভাজিত হয়?

১৭ ডিগ্রী

জেনেভা সম্মেলন কখন অনুষ্ঠিত হয়?

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে

ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনাম গঠিত হয় কখন?

১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে

ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?

ফাম ভান দং

Leave a Comment