গুপ্ত যুগের সভ্যতা

গুপ্ত যুগের সভ্যতা প্রসঙ্গে উচ্চ শ্রেণির মর্যাদা, লোক সংস্কৃতির অভাব, নাটকের পক্ষে অভিমত, সংস্কৃত ভাষার পক্ষে মত, ধর্মচিন্তা, সাহিত্য, শিল্প ও বিজ্ঞানচর্চা সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত যুগের সভ্যতা

বিষয় গুপ্ত যুগের সভ্যতা
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
শ্রেষ্ঠ রাজা সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
গুপ্ত যুগের সভ্যতা

ভূমিকা :- গুপ্ত যুগের সভ্যতার অসাধারণ অগ্রগতি লক্ষ্য করে বার্ণেট (Barnett) এই যুগকে প্রাচীন গ্রীসের পেরিক্লীয় যুগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনেকেই গুপ্ত যুগের সভ্যতার অভূতপূর্ব অগ্রগতির জন্য একে ধ্রুপদী যুগ (Classical Age) বলে অভিহিত করেছেন। স্মিথ ইংলন্ডের এলিজাবেথীয় যুগের সঙ্গে গুপ্ত যুগের তুলনা করেছেন।

উচ্চ শ্রেণির মর্যাদা

গুপ্ত যুগ ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ। সমাজে ও রাষ্ট্রে সকল ক্ষমতা এবং মর্যাদা ছিল উচ্চশ্রেণী, বিশেষত ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শ্রেণীর হাতে। তারাই ছিল সমাজের প্রভু। সমাজের নিম্নশ্রেণী যে সম্পদ কৃষিক্ষেত্রে, শিল্পে, বাণিজ্যে উৎপাদন করত তার সিংহভাগ তারাই ভোগ করত।

লোকোসংস্কৃতির অভাব

  • (১) উচ্চ শ্রেণীর বিনোদনের জন্যই গুপ্ত সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছিল। তাই লোকের মুখের ভাষা প্রাকৃতকে ছেড়ে কাব্যময়, অলঙ্কার-বহুল সংস্কৃতে সাহিত্য রচনা আরম্ভ হয়। এই সাহিত্যের রসাস্বাদন একমাত্র উচ্চশ্রেণীর বিদগ্ধ লোকেরাই করতেন।
  • (২) গুপ্ত যুগের উৎকৃষ্ট সংস্কৃত নাটকগুলির সবই মিলনান্তক। যেহেতু রাজদরবারে ও অভিজাতদের মনোরঞ্জনের জন্যই এই সকল নাটক লিখিত হয় সেজন্য এগুলি উচ্চশ্রেণীর রুচির উপযোগী করে লেখা হয়েছিল। বিয়োগান্ত নাটক বা সাধারণ লোকের জীবন, তাদের দুঃখ-বেদনা নিয়ে কোনো নাটক লেখা হয়নি। গুপ্ত যুগের শিল্প-ভাস্কর্যও ছিল উচ্চশ্রেণীর রুচির দিকে লক্ষ্য রেখে রচিত।

নাটকের পক্ষে অভিমত

  • (১) কোনো কোনো ঐতিহাসিক উপরের মতের বিরোধিতা করে বলেছেন যে, গুপ্ত যুগের সংস্কৃত নাটকগুলির গঠনভঙ্গি এমন ছিল যে তা ছিল একাধারে মিলনান্তক ও বিয়োগান্তক। গ্রীক নাটকের মত আলাদা ভাগে বিয়োগান্ত নাটক লেখার প্রবণতা গুপ্ত যুগের কবিদের ছিল না।
  • (২) একই নাটকের অঙ্গে মিলন, বিরহ, বিয়োগ গ্রথিত করা হত এবং এটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ মানুষের জীবনে এরূপই ঘটে। অভিজ্ঞান শকুন্তলম, বিক্রোমোর্বশীম প্রভৃতি নাটকে ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্ত নাটকের রস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

সংস্কৃত ভাষার স্বপক্ষে যুক্তি

গুপ্ত যুগেই সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য চর্চার প্রথম সূত্রপাত হয় নি। মৌর্যযুগে প্রাকৃত ভাষার প্রাধান্য সংস্কৃত কিছুটা পিছিয়ে পড়ে যায়। কিন্তু শুঙ্গ-কুষাণ যুগ হতে সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য চর্চা প্রাধান্য পায়। গুপ্ত যুগে সেই ধারা অব্যাহত ছিল। প্রাকৃত ভাষার চর্চা গুপ্ত যুগে একেবারে লোপ পায় নি। তবে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সংস্কৃত ভাষার চর্চাই প্রাধান্য পায়।

ধর্মচিন্তা

  • (১) গুপ্ত যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থান হলেও, বৈদিক দেব-দেবীরা গুপ্ত যুগে তাদের আগের মর্যাদা হারান। বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণের স্থলে লৌকিক দেবতা দুর্গা, শিব, কালী, কার্তিকেয় প্রাধান্য পান। এই নতুন দেবতাদের ঐশ্বরিক মহিমা প্রতিষ্ঠা করতে পুরাণকে পুনরায় লিখতে হয়।
  • (২) একথা স্বীকার্য যে, এই লৌকিক দেব-দেবীদের অনেকেই ছিলেন অনার্যনের দেবতা। গুপ্ত যুগে তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়। তবে পুরাণে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের বিশদ ব্যাখ্যা ও স্বীকৃতি দেখা যায়নি। বিষ্ণু বা কৃষ্ণের তথা বৈষ্ণব ধর্মের দার্শনিক ব্যাখ্যা ভগবদগীতায় পাওয়া যায়।

পৌরাণিক হিন্দু ধর্মের বিকাশ

গুপ্তযুগে যে লৌকিক বা পৌরাণিক হিন্দুধর্মের বিকাশ ঘটে তার কতকগুলি বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন –

  • (১) দেবদেবীর মূর্তিপুজো গুপ্ত যুগে প্রাধান্য পায়। নিরাকারের স্থলে সাকারের উপাসনা জনপ্রিয় হয়।
  • (২) লৌকিক দেবতাদের জনপ্রিয়তার কথা আগেই বলা হয়েছে।
  • (৩) যজ্ঞ ও আহুতির পরিবর্তে পুজো এবং ভক্তিবাদ গুপ্তযুগে প্রাধান্য পায়।
  • (৪) দেবতারা সপরিবারে পূজিত হতে থাকেন; যথা শিবের সঙ্গে পার্বতী, নারায়ণের সঙ্গে লক্ষ্মী। অনেক সময় শুধুমাত্র দেবীরাও পূজিতা হন; যেমন দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী।
  • (৫) বৈদিক দেবতাদের মধ্যে ব্রহ্মা কোনো কোনো অঞ্চলে উত্তর পশ্চিম ভারতে পুজিত হতেন। তবে সূর্য তার নিজ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকেন। ভবিষ্য পুরাণ, বরাহ পুরাণ প্রভৃতিতে সূর্য পুজোর কথা ও সূর্যের মহিমার কথা বলা হয়েছে। পশ্চিম ভারতের নানা স্থানে, দক্ষিণে সূর্যমন্দিরের কথা জানা যায়।
  • (৬) অনেকে মনে করেন যে, শক-পার্থিয় প্রভাবের ফলে সূর্যপুজোর প্রচলন বাড়ে। ভূমরের শিবমূর্তি কণিষ্কের মূর্তির মত চোগা-চাপকান, মাথায় শিরস্ত্রাণ ও পায় পাদুকা পরিহিত। এটি বৈদেশিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য দক্ষিণী সূর্যমূর্তিগুলি ভারতীয় রীতিতে নগ্ন গাত্র, নগ্ন পদ।
  • (৭) গুপ্ত যুগে শক্তিপুজোর প্রাধান্য দেখা যায়। গুপ্তযুগের প্রধান দেবতা শিব ও বিষ্ণুর পরেই শক্তিরূপিনী দুর্গার স্থান। তাকে দুভাবে কল্পনা করা হয়। ভয়ঙ্করী, ভীমা, রুদ্রাণী-রূপে তিনি হলেন চামুণ্ডা, কালী, করালী, ভৈরবী, আর শান্ত মাতৃরূপে উমা, দুর্গা, পার্বতী, ভবানী, চণ্ডিকা।
  • (৮) ক্রমে শক্তিরূপিনী দুর্গা শিবের সঙ্গে যুক্ত হন এবং গণেশ ও কার্তিকেয় তাদের সন্তান হিসেবে দেব পরিবারে যুক্ত হন। মার্কণ্ডেয় পুরাণের বর্ণনায় শক্তিরূপিনী দুর্গার হাতে মহিষাসুর ও অন্যান্য অসুর নিহত হন।

বৌদ্ধ ধর্ম

  • (১) গুপ্ত যুগে লৌকিক বা পৌরাণিক ধর্ম ছাড়া বৌদ্ধ ধর্ম বিদ্যমান ছিল। ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে জানা যায় যে গান্ধার, মথুরা প্রভৃতি স্থানে তিনি বহু বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাক্ষাৎ পান। গৃহস্থরা স্তূপ বা চৈত্য প্রতিষ্ঠা করে পুজো করত। যদিও ফা-হিয়েন হীনযানী বৌদ্ধদের কথা বলেছেন, তবে মথুরা ও সারনাথের ভাস্কর্য দেখে অনুমান করা যায় যে, গুপ্ত যুগে মহাযানী বৌদ্ধরা প্রাধান্য লাভ করে।
  • (২) নালন্দা বিহার ছিল বৌদ্ধধর্মতত্ত্ব প্রচারের প্রধান কেন্দ্র। গুপ্ত সম্রাটরা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বুধগুপ্ত, তথাগত গুপ্ত সম্ভবত বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী ছিলেন। তবে হূণ আক্রমণে বৌদ্ধ বিহারগুলির বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। হিউয়েন সাঙ যখন সপ্তম খ্রিস্টাব্দে ভারতে আসেন তখন বৌদ্ধধর্মের পতনশীল অবস্থা দেখা দেয়।

জৈন ধর্ম

  • (১) তুলনামূলকভাবে গুপ্তযুগে জৈনধর্মের বিশেষ প্রসার ঘটে। তবে গুপ্ত-পূর্ব যুগে জৈনদের মধ্যে বহু সম্প্রদায়ের উদ্ভব হওয়ায় জৈনদের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়। উত্তর ভারতে বিশেষত মগধে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমলেও দক্ষিণ ভারতে এই ধর্মের বিশেষ বিস্তার ঘটে।
  • (২) উত্তরে গুপ্ত সম্রাটদের আনুকুল্য জৈনধর্ম না পেলেও দক্ষিণের রাজাদের সাহায্য এই ধর্ম পায়। মহীশুরের গঙ্গ রাজবংশের নাম এই প্রসঙ্গে করা যায়। তামিল ভাষাভাষী অঞ্চলে জৈনধর্মের প্রভাব ছিল। জৈন পণ্ডিত সর্বনন্দিন কাঞ্চীতে তার লোক বিভাগ গ্রন্থ রচনা করেন।

সাহিত্য ও শিল্প

গুপ্তযুগের সাহিত্য, শিল্প উচ্চ শ্রেণীর রুচির উপযোগী ছিল। সংস্কৃত ভাষা ছিল এই সাহিত্যের বাহন। গুপ্তযুগের তথা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকার ছিলেন মহাকবি কালিদাস।

বিজ্ঞান

বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিদ্যার ক্ষেত্রে গুপ্তযুগের মনীষা পিছিয়ে ছিল না। বরাহমিহির, আর্যভট্ট, বাগভট্ট প্রমুখ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন।

উপসংহার :- কোনো কোনো ঐতিহাসিক গুপ্ত যুগ সম্পর্কে এই মুগ্ধতা বা কাব্যময় প্রশংসার এখন সমালোচনা করেন। রোমিলা থাপার প্রমুখ গবেষিকাদের মতে, গুপ্ত যুগের সভ্যতার স্বকীয়তা ও শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েও বলা যায় যে, এটা ছিল দরবারী সভ্যতা (Court culture)।

(FAQ) গুপ্ত যুগের সভ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত যুগকে পেরিক্লীয় যুগের সাথে তুলনা করেন কে?

ঐতিহাসিক বার্ণেট।

২. গুপ্ত যুগের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে?

সমুদ্রগুপ্ত।

৩. গুপ্ত যুগের শ্রেষ্ঠ কবি কে ছিলেন?

কালিদাস।

৪. গুপ্ত যুগের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী কে ছিলেন?

আর্যভট্ট।

Leave a Reply

Translate »