আর্যভট্ট -প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ

আর্যভট্ট বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ সম্পর্কে আলোচনা করা হল । এই প্রসঙ্গে আর্যভট্ট -এর জন্ম, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, রচনা, আর্যভট্টের গণিতচর্চা, জ্যোতির্বিদ্যায় আর্যভট্টের অবদান, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের প্রকৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হল ।

Table of Contents

আর্যভট্ট বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ

মহান কয়েকজন ভারতীয়দের মধ্যে আর্যভট্ট ছিলেন একজন, যাঁকে তাঁর অবদানের জন্য সারা পৃথিবী চিরকাল স্মরণ করবে। আর্যভট্ট গণিত আর মহাকাশ নিয়ে গভীর চর্চা করেছিলেন।

আর্যভট্ট -প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ

ভূমিকা :- প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত গণিতবিদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আর্যভট্ট। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের আঙিনায় তাঁর বিভিন্ন কাজ আজও বিজ্ঞানীদের বিস্ময় ও অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহের নাম তাঁর নাম অনুসারেই রাখা হয় ” আর্যভট্ট “।

জ্যোতির্বিদ আর্যভট্টের জন্ম

ভারতে গুপ্ত যুগের শাসন ৪৭৬ খ্রীস্টাব্দে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট জন্ম গ্রহণ করেন। সেই সময় গুপ্ত সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন বুদ্বগুপ্ত (৪৭৬-৪৯৫ খ্রীঃ) আজ আমরা তাঁর সব কথা জানতে পারিনা। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে বহু তথ্য। তবে যেটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তা বিশ্লেষণ করে কেউ কেউ বলছেন তাঁর জন্মস্থান হল প্রাচীন অশ্মকা। প্রাচীন বৌদ্ধ এবং হিন্দু রীতি অনুসারে এই জায়গাটিকে বর্তমানের মহারাষ্ট্র বলেই মনে করা হয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন তিনি কুসুমপুরাতে জন্মগ্রহণ করেন। আজকের দিনে এই স্থানটি হল পাটনা।

আর্যভট্টের শিক্ষাজীবন

কিছু তথ্য থেকে জানা যায় যে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কুসুমপুরে গিয়েছিলেন। তিনি যে জীবনের বেশিরভাগ সময় কুসুমপুরেই অতিবাহিত করেন তা অনেকেই স্বীকার করেছেন। কুসুমপুরের আর্যভ নামে তিনি খ্যাত ছিলেন।নালন্দা মহাবিহারে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন।

আর্যভট্টের কর্মজীবন

জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট তাঁর কাজের অধিকাংশই করেছিলেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় -এ। শিক্ষাশেষে আর্যভট্ট নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন। অনেকেই বলেছেন যে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আর্যভট্টের বিখ্যাত রচনা

গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আর্যভট্ট তাঁর জ্ঞান মূলত দু’টি গ্রন্থে সংকলিত করেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ‘আর্যভট্টীয় ’একটি, যার উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। অন্য আর একটি হল ‘আর্য-সিদ্ধান্ত’। এই গ্ৰন্থের কোনও পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত এবং প্রথম ভাস্করের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও আর্যভট্টের তৃতীয় একটি রচনা সম্পর্কে খোঁজ পাওয়া যায়, তবে এটি তার আসল আকারে বিদ্যমান নয় বলেই মনে করা হয়।

গণিত শাস্ত্রে আর্যভট্টের অবদান

প্রাচীন ভারতীয় গণিত চর্চার ইতিহাসে আর্যভট্টের হাত ধরেই ক্লাসিকাল যুগ বা স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। আর্যভট্টের গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ মূলত দুটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে প্রথম গ্রন্থটি হল ‘ আর্যভট্টীয় ’। এই গ্রন্থটি পাওয়া গেলেও তাঁর অন্য গ্ৰন্থ ‘আর্য-সিদ্ধান্ত’ -এর কোনো পাণ্ডলিপি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত এবং প্রথম ভাস্করের কাজের ক্ষেত্রে এই গ্ৰন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়।

আর্যভট্ট রচিত গ্রন্থের পরিচয়

আর্যভট্ট রচিত আর্যভট্টীয় গ্রন্থের পরিচয়

জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট মাত্র ২৩ বছর বয়সে আর্যভট্টীয় গ্রন্থটি সংকলন করেন। এই গ্রন্থটি চারটি পাদ বা অধ্যায়ে বিভক্ত। –‌ গীতিকাপাদ, গণিতপাদ, কালক্রিয়াপাদ ও গোলপাদ। গ্রন্থটি ১১৮ টি স্তোত্রে রচিত হয়েছে।

(ক) গীতিকাপাদ

এই অধ্যায়ে ১৩ টি শ্লোক আছে। এখানে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত কিছু সংজ্ঞা ও সারণি উল্লেখ করা হয়েছে। বৃত্তীয় একক (আধুনিক যুগের রাশি, ডিগ্রি, মিনিটের মতো), যোজন, নৃ, হস্ত, আঙ্গুল প্রভৃতি দৈর্ঘ্যের এককের সংজ্ঞাও এই অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাছাড়া এই অধ্যায়ে পৃথিবীর ঘুর্ণন ও অন্যান্য গ্ৰহের আবর্তন, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্যের ব্যাস ইত্যাদি বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়টিকে অনেকেই দশগীতিকা বলে থাকেন।

(খ) গণিতপাদ

গণিত পাদে আছে জ্যামিতিক চিত্র ও তার ধর্ম, পাটীগণিত, বীজগণিত, সমতল ত্রিকোণমিতি, দ্বিঘাত সমীকরণ, সহ সমীকরণ, প্রথম n সংখ্যক স্বাভাবিক সংখ্যার ঘাতবিশিষ্ট পদ সমূহের বর্গ ও ঘনের সমষ্টি এবং একটি সাইন অণুপাতের সারণি। তাছাড়া সে সময়কার জনপ্রিয় জ্যোতিষচর্চার প্রয়োজনীয় ৩৩টি গাণিতিক প্রক্রিয়ার বর্ণনাও আছে এই অধ্যায়ে। গণিতপাদে আর্যভট্ট পাই-এর মান তথা বৃত্তের পরিধির সঙ্গে এর ব্যাসের মান ৩.১৪১৬ হিসাবে চিহ্নিত করেন। এই অধ্যায়ে ৩৩ টি শ্লোক আছে।

(গ) কালক্রিয়াপাদ

কালক্রিয়াপাদ অধ্যায়ে বিভিন্ন একক, যেমন বছর, মাস, দিন প্রভৃতির উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে ২৫ টি শ্লোক স্থান পেয়েছে।

(ঘ) গোলপাদ

এই অংশে সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্ৰহের গতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া গোলীয় ত্রিকোণমিতির বিভিন্ন সূত্রও এই অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে। এই অধ্যায়ে ৫০ টি শ্লোক আছে।

আর্যভট্ট রচিত আর্য-সিদ্ধান্ত গ্রন্থের পরিচয়

জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনার উপর একটি কাজ হল আর্য-সিদ্ধান্ত। এই গ্ৰন্থটির কোনো পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না। আর্যভট্টের সমসাময়িক বরাহমিহির ও গণিতজ্ঞ ভাস্করের লেখার মাধ্যমে এই গ্ৰন্থটি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পেয়ে থাকি। মনে করা হয় যে এই রচনাটি পুরানো সূর্যসিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এই বইয়ে বেশ কিছু যন্ত্রের বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলি জোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রয়োগে ব্যবহার করা হয়। যেমন – শঙ্কু যন্ত্র, ছায়া যন্ত্র, কোণ পরিমাপ যন্ত্র, জল ঘড়ি, একটি নলাকার লাঠি, বৃত্তাকার যন্ত্র ইত্যাদি।

দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি এবং শূন্য আবিষ্কার

আর্যভট্টের কাজে দশমিক সংখ্যা পদ্ধতির পূর্ণ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। পদবাচ্যের আকারে গ্রন্থ রচনা করায় সংখ্যা উপস্থাপনের জন্য একটি নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন তিনি। সেখানে সংখ্যাকে শব্দের আকারে উপস্থাপন করা হত।

তিনি ব্যঞ্জনবর্ণগুলোকে ব্যবহার করতেন বিভিন্ন অঙ্ক হিসেবে আর স্বরবর্ণগুলোর সাহায্যে বুঝিয়ে দিতেন বিভিন্ন অঙ্কের নির্দিষ্ট অবস্থান। সে দিক থেকে তার ব্যবহৃত দশমিক সংখ্যা ব্যবস্থা বর্তমানের দশমিক সংখ্যা ব্যবস্থার মত নয়। কিন্তু পদ্ধতিগত বিবেচনায় আজকের দশমিক সংখ্যার সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আর্যভট্টের দশমিক সংখ্যা পদ্ধতিতে শূন্য ছিল কিনা সে বিষয়ে দ্বন্দ্ব্ব আছে। তাঁর কাজে শূন্যের সমতুল্য একটি ধারণা ছিল, যাকে বলা হয়েছে ‘খ’ (শূণ্য বোঝাতে)। এই  ‘খ’ -এর ধারণাটি কোনো অঙ্ক হিসেবে ছিল নাকি শূন্যস্থান জ্ঞাপক চিহ্ন হিসেবে ছিল তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

প্রচলিত বিভিন্ন গ্ৰন্থে এটিকে শূন্যস্থান জ্ঞাপক চিহ্ন হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য বিখ্যাত গণিতবিদ Georges Ifrah দাবি করেছেন যে, আর্যভট্ট পরোক্ষভাবে সেটিকে একটি দশমিক অঙ্ক হিসেবেই ব্যবহার করতেন।

দশমিক পদ্ধতিকে ব্যবহার করে তিনিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন। আর এর মাঝে ছিল সংখ্যার বর্গমূল ও ঘনমূল নির্ণয়। দশমিক সংখ্যা ব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গরূপে স্থাপিত করার জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি জরুরি। স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় এই সংখ্যার উপস্থাপন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সভ্যতায় ব্যবহার করা হলেও স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় গাণিতিক প্রক্রিয়াগুলোর ব্যবহার সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। অর্থাৎ এর পদ্ধতিগত উপযোগিতা সম্পূর্ণরূপে অণুধাবিত হয়নি।

সেই সময়ে সবচেয়ে জরুরি ছিল দশমিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পদ্ধতিগত সাধারণীকরণ নিশ্চিত করা, যা সর্বপ্রথম করেন আর্যভট্ট। তাই তাঁকেই পূর্ণাঙ্গ দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি প্রবর্তনের কৃতিত্বের দাবিদার বলাই যায়। ৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে আর্যভট্টের একটি কাজে দশমিক সংখ্যা ব্যবস্থার বিবৃতিতে ‘স্থানম স্থানম দশ গুণম’ – এই বাক্যাংশটি পাওয়া যায়। এর অর্থ স্থান থেকে স্থানে দশ গুণ করে পরিবর্তিত হয়। এখান থেকে স্পষ্টতই বর্তমান দশমিক সংখ্যা পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি ধরা পড়ে।

ত্রিকোণমিতিতে আর্যভট্টের অবদান

আর্যভট্টের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক অবদান হল আধুনিক ত্রিকোণমিতির সূচনা করা। ত্রিকোণমিতির ক্ষেত্রে আর্যভট্ট সাইন, ভারসাইন (Versine = ১ – Cosine), বিপরীত সাইনের ব্যবহার করেন। সাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুগ্ম ও অর্ধ কোণের সূত্রগুলো তিনি জানতেন বলেই ধারণা করা হয়। আর্যভট্ট ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ত্রিকোণমিতিক সম্পর্কগুলোর একটি হল sin (n+১)x কে sin x এবং sin (n-১)x -এর সাহায্যে প্রকাশ করা।

আর্যভট্ট একটি সাইন টেবিল তৈরি করেছিলেন, যেখানে ৩ ডিগ্রি ৪৫ মিনিট পার্থক্যে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত সাইন এবং ভারসাইনের মান উল্লেখিত ছিল। তার ব্যবহার করা এই সূত্রটি দিয়ে খুব সহজেই এই সাইন টেবিলটি পুনরায় তৈরি করে ফেলা সম্ভব। এই সূত্রটি হল –

sin (n +1) x – sin x = sin x – sin (n – 1) x – (1/225)sin x

ত্রিকোণমিতির সূত্র

এই সাইন টেবিলটি সম্পর্কে বলে রাখা যেতে পারে আর্যভট্ট তার সাইন টেবিলে সরাসরি sinθ -এর বদলে Rsinθ ব্যবহার করেছেন। এখানে তিনি R দ্বারা একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের ব্যাসার্ধ বুঝিয়েছেন। আর্যভট্ট এই ব্যাসার্ধের মান ব্যবহার করেছিলেন ৩৪৩৮ । আসলে আর্যভট্ট এক মিনিট পরিমাণ কোণের জন্য একক ব্যাসার্ধের বৃত্তে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্যকে এক একক হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। একটি বৃত্তের সম্পূর্ণ পরিধি তার কেন্দ্রে (৩৬০ × ৬০) = ২১৬০০ মিনিট কোণ তৈরি করে। সেই দিক থেকে বৃত্তের পরিধি হল ২১৬০০ একক এবং ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধ হবে ২১৬০০/২π। তাই আর্যভট্টের হিসেবে পাওয়া π = ৩.১৪১৬ ব্যবহার করলে ব্যাসার্ধের মান হয় প্রায় ৩৪৩৮ ।

বীজগণিতে আর্যভট্টের অবদান

আর্যভট্ট একাধিক অজানা রাশি সংবলিত সমীকরণ সমাধান করার একটি সাধারণ পদ্ধতি তৈরি করেন। এর নাম ছিল “কুত্তক”। প্রথম ভাস্করের কাজের ক্ষেত্রে কুত্তক পদ্ধতির ব্যাখ্যা দেবার সময় একটি উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি হল – “এমন সংখ্যা নির্ণয় কর যাকে ৮ দিয়ে ভাগ করলে ৫, ৯ দিয়ে ভাগ করলে ৪ এবং ৭ দিয়ে ভাগ করলে ১ অবশিষ্ট থাকে।” এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে কুত্তক পদ্ধতিটিই আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি আর্যভট্টের কাজেই প্রথম n সংখ্যক স্বাভাবিক সংখ্যার ঘাতবিশিষ্ট পদ সমূহের বর্গ ও ঘনের সমষ্টির সূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

পাইয়ের মান আবিষ্কার

আর্যভট্ট তাঁর ‘আর্যভট্টীয়’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে লিখেছেন – “চার এর সাথে একশ যোগ করে তাকে আট দিয়ে গুণ করে তার সাথে বাষট্টি হাজার যোগ করা হলে বিশ হাজার একক ব্যাসের বৃত্তের পরিধি পাওয়া যায়”। সেই হিসেবে আর্যভট্ট পাই এর মান নির্ণয় করেছিলেন (৪+১০০)×৮+৬২০০০)/২০০০০ = ৬২৮৩২/২০০০০ = ৩.১৪১৬। পাই – এর এই মান তার সময় পর্যন্ত যেকোনো গণিতবিদের বের করা মানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সঠিক।

জ্যোতির্বিদ্যায় আর্যভট্টের অবদান

আর্যভট্টীয় বইটির গোলপাদ অংশে আর্যভট্ট উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে পৃথিবী নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘোরে। তিনি পৃথিবীর আক্ষিক গতির হিসাবও করেছিলেন। তার হিসাবে পৃথিবীর পরিধি ছিল ৩৯,৯৬৮ কিলোমিটার। এই মান সেই সময় পর্যন্ত বের করা যেকোনো পরিমাপের চেয়ে শুদ্ধতর (ভুল মাত্র ০.২%)। তার ভাষ্যে সৌর জগতে গ্রহগুলোর কক্ষপথের আকৃতি ছিল উপবৃত্তাকার।

তিনি সৌরজগতের পৃথিবীকেন্দ্রিক নাকি সূর্যকেন্দ্রিক মডেল ব্যবহার করেছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ডাচ গণিতবিদ B.L. van der Waerden এবং গণিতের অধ্যাপক Hugh Ansfrid Thurston -এর লেখায় আর্যভট্টের জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত হিসাব নিকাশের পদ্ধতিকে সরাসরি সূর্যকেন্দ্রিক বলে দাবি করা হয়েছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Noel Mark Swerdlow অবশ্য বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে আর্যভট্টের ধারণায় সৌরজগৎ পৃথিবীকেন্দ্রিকই ছিল। অন্যদিকে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক Dennis Duke এর মতে, আর্যভট্টের কাজের পদ্ধতি সূর্যকেন্দ্রিক ছিল, তবে আর্যভট্ট নিজে তা লক্ষ করেননি কিংবা তিনি জানতেন না।

সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের প্রকৃত ব্যাখ্যাদানে আর্যভট্ট

আর্যভট্ট সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের সঠিক কারণ উল্লেখ করেন এবং তার সময়ও নির্ধারণ করেন।

আর্যভট্ট সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের হিন্দু পৌরাণিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রকৃত কারণগুলো ব্যাখ্যা করে গেছেন।

সেই সঙ্গে তিনি সূর্য গ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল নির্ণয়ের পদ্ধতিও বের করেছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি আর্যভট্ট বলেছিলেন যে চাঁদের আলো আসলে সূর্যের আলোর প্রতিফলনেরই ফলাফল।

আর্যভট্ট হলেন গুপ্তযুগের নিউটন

পৃথিবীর আকর্ষণের ফলেই বস্তু মাটিতে এসে পড়ে – এই কথা আর্যভট্ট প্রথম বলেছিলেন। তাই তাঁকে গুপ্তযুগের নিউটন বলা হয়।

একনজরে আর্যভট্ট সম্পর্কে তথ্য

  • (ক) আর্যভট্টের লেখা আর্যভট্টিয় এখনও হিন্দু ক্যালেন্ডারে ব্যবহৃত হয়।
  • (খ) গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর অতুলনীয় অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রথম উপগ্রহের নামকরণ করা হয় তাঁরই নামে ‘আর্যভট্ট’।
  • (গ) আর্যভট্ট দশমিক পদ্ধতি তৈরি করেন।
  • (ঘ) ২৩ বছর বয়সে, আর্যভট্ট ‘আর্যভটিয়া গ্রন্থ’ রচনা করেন।
  • যার সাফল্য ও উপযোগিতা দেখে তৎকালীন রাজা বুদ্ধগুপ্ত তাকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেন।
  • (ঙ) আর্যভট্ট বিহারের তেরেগানা অঞ্চলের সূর্য মন্দিরে একটি পর্যবেক্ষণ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
  • (চ) পণ্ডিতদের মতে, আরবি রচনা ‘আল-নাতফ’ এবং ‘আল-নানফ’ আর্যভট্টের রচনাগুলির অনুবাদ।
  • (ছ) আর্যভট্ট কখনই সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ব্রাহ্মী লিপি ব্যবহার করেননি,
  • ব্রাহ্মী লিপি বৈদিক যুগ থেকে সাংস্কৃতিক রীতি অনুসারে অনুসরণ করা হয়েছিল।
  • তিনি সবসময় শুধু বর্ণমালাই ব্যবহার করতেন।

আর্যভট্টের পরলোক গমন

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা আর্যভট্ট সম্পর্কে অনেক তথ্য ই জানতে পারি না। যেটুকু তথ্য পেয়ে থাকি তাতেই তাঁর কর্মধারা সম্পর্কে আমাদের অবাক করে।

এই খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

আর্যভট্ট ভারতীয় গণিত শাস্ত্রের এক অবিস্মরণীয় নাম

উপসংহার :- আর্যভট্ট ভারতীয় গণিত শাস্ত্রের এক অবিস্মরণীয় নাম ইতিহাসের এই মহান ভারতীয়কে সম্মান জানাতে ভারতের প্রথম উপগ্রহের নাম রাখা হয় আর্যভট্ট ।

বিহার সরকার তাঁকে সম্মান জানাবার উদ্দেশ্যে পাটনায় তাঁর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী করেন – ‘The Aryabhata Knowledge University’ (AKU)।

এই মহান ব্যক্তির অনেক লেখা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। হয়তো তা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তা না হলে আমরা হয়তো আরো অনেক রহস্য জানতে পারতাম।

আর্যভট্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য (FAQ) ?

১. আর্যভট্ট রচিত গ্রন্থের নাম কী ?

আর্যভট্টীয় ।

২. গুপ্তযুগের নিউটন কাকে বলা হয় ?

আর্যভট্টকে ।

৩. আর্য ভট্ট কে ছিলেন?

প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ ও জ্যোর্তিবিদ্

Leave a Reply

Translate »