জিয়াউদ্দিন বরনীর রাষ্ট্রনীতি

জিয়াউদ্দিন বরনীর রাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তার পরিচয়, ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থের বিষয়বস্তু, সুলতানের ধর্মীয় কর্তব্য, রাজকীয় মর্যাদা, সুলতানের বংশ কৌলিন্য, ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় আইন, রাজতন্ত্র, ঐশ্বরিক তত্ত্ব ও মন্ত্রণাসভার গঠন সম্পর্কে জানবো।

জিয়াউদ্দিন বরনীর রাষ্ট্রনীতি

ঐতিহাসিক ঘটনাজিয়াউদ্দিন বরনির রাষ্ট্রচিন্তা
গ্ৰন্থফতোয়া ই জাহান্দারি
জিলুল্লাহঈশ্বরের ছায়া
নবিহজরত মহম্মদ
আসরাফউচ্চবর্ণ
আজলাফনিম্নবর্ণ
সমাজের দর্পনইতিহাস
জিয়াউদ্দিন বরনীর রাষ্ট্রনীতি

ভূমিকা :- সুলতানি যুগের ঐতিহাসিকদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রনীতিবিদ ছিলেন জিয়াউদ্দিন বরনি (১২৮৫- ১৩৫৭ খ্রি.)। বরনি তাঁর ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে সুলতানি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনীতি ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বরনির পরিচয়

সুলতানি যুগের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ছিলেন জিয়াউদ্দিন বরনি।

(১) প্রথম জীবন

বরনি এমন এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন যে পরিবারের সঙ্গে রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ফলে বরনি অভিজাত রাজকীয় পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর রচনায় স্বাভাবিকভাবেই অভিজাতশ্রেণির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে।

(২) সুলতানদের সঙ্গে সম্পর্ক

তিনি দিল্লির সুলতান মহম্মদ-বিন-তুঘলকের (১৩২৫-১৩৫১ খ্রি.) সভাসদ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে ফিরোজ তুঘলকের আমলে (১৩৫১-১৩৮৮ খ্রি.) তিনি সুলতানের কুনজরে পড়ে খুব অসহায় অবস্থায় জীবনের শেষ দিনগুলি কাটান।

(৩) গ্ৰন্থ রচনা

বরনি রচিত তারিখ-ই-ফিরোজশাহি, ফতোয়া-ই-জাহান্দারি, সিরাৎ-ই-ফিরোজশাহি প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে সুলতানি আমলের রাজনৈতিক ঘটনা ও শাসননীতির বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় ৷

ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থের বিষয়বস্তু

জিয়াউদ্দিন বরনি দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের আমল থেকে শুরু করে ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলের প্রথম ৬ বছর পর্যন্ত আটজন সুলতানের রাজত্বকাল সম্পর্কে তাঁর তারিখ-ই-ফিরোজশাহি গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। বরনি-রচিত তারিখ-ই-ফিরোজশাহি গ্রন্থের সহায়ক হিসেবে তাঁরই রচিত ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থটিকে ধরা হয়। ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর কৃতিত্বের প্রশংসা করে ইতিহাসবিদ সামসুল হক বলেছেন যে, “মধ্যযুগের ঐতিহাসিকদের মধ্যে বরনি শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারেন।”

(ক) সমকালীন তথ্য

এই গ্ৰন্থ থেকে সমকালীন বিভিন্ন ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

(১) নির্ভরযোগ্য তথ্য

বরনি দীর্ঘ ১৭ বছর মহম্মদ-বিন-তুঘলকের (১৩২৫-১৩৫১ খ্রি.) রাজদরবারে সভাসদ হিসেবে নিযুক্ত থাকায় সেই সময়ের সরকারি নথিপত্র প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ পান। ফলে তাঁর উল্লিখিত তথ্যাবলি অন্য ইতিহাসবিদদের রচনার তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয়।

(২) শাসনীতির ব্যাখ্যা

ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে বরনি সুলতানি যুগের ইসলাম ও রাজতন্ত্রের সম্পর্ক, রাজার কর্তব্য, সুলতানদের শাসননীতি প্রভৃতি বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে সমকালীন সুলতানি শাসনের বহু যথার্থ তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

(খ) শাসনতান্ত্রিক আলোচনা

ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে আলোচিত শাসনতান্ত্রিক বিষয়ের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) রাজতন্ত্র ও ইসলামের সম্পর্ক

বরনি তাঁর ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে ইসলাম ও রাজতন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। রাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কীরূপ হওয়া উচিত, রাজার কী কী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা উচিত, দিল্লির সুলতানদের শাসননীতি কোন পথে পরিচালিত হওয়া উচিত প্রভৃতি বিষয় তিনি এই গ্রন্থে বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন।

(২) শাসন প্রকৃতি

সুলতানি শাসনের প্রকৃতি বা স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়েও বরনি আভাস দিয়েছেন। তিনি দাস বংশ থেকে শুরু করে তুঘলক বংশ পর্যন্ত সময়ের সুলতানদের শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলি বিভিন্ন সুলতানের কাজের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।

(গ) ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

  • (১) ব্যক্তিগত জীবনে জিয়াউদ্দিন বরনি ছিলেন একজন গোঁড়া মুসলমান। তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি সুলতানি শাসকদের রাজকার্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের ধর্মীয় ধ্যানধারণা প্রয়োগ করেছেন। তিনি ইতিহাস গ্রন্থ এবং ‘হাদিস’-কে সমপর্যায়ভুক্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
  • (২) তাঁর মতে, রাজনীতি ও ধর্ম হল দুই সহোদর ভাই। তাই সুলতানের উচিত ইসলামীয় ঐতিহ্য ও রীতিনীতি অনুসারে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা এবং এই বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ লোকের পরামর্শ নেওয়া। ইসলামীয় ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুলতানের হাতে সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকা উচিত বলে তিনি মনে করতেন।

‘ফতোয়া-ই-জাহান্দারি’ গ্রন্থে উল্লিখিত রাষ্ট্রনীতি

ইতিহাসের বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ ও ইতিহাস দর্শন-চিন্তায় জিয়াউদ্দিন বরনি ছিলেন সুলতানি যুগের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক। অধ্যাপক ইরফান হাবিবের মতে, বরনি ইতিহাসকে শুধু ঘটনার বিবরণের মধ্যে আবদ্ধ রাখেন নি। তিনি ইতিহাসকে সমাজের দর্পণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লেখা ফতোয়া-ই-জাহান্দারি হল সুলতানি যুগের রাষ্ট্রনীতি ও শাসননীতি বিষয়ক সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা অ্যারিস্টলের মতবাদ, সমকালীন সুলতানদের শাসননীতি, ইসলামের আদর্শ এবং তাঁর নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে তিনি সুলতানি আমলের রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যেমন –

(ক) সুলতানের ধর্মীয় কর্তব্য

বরনির মতে, সুলতানি আমলে ভারতীয় মুসলিমরা অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের মৌলিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ ও ভাবধারা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বরনি রাষ্ট্রশক্তির প্রয়োগ অর্থাৎ সুলতানের হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ইসলামের আদর্শ সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুলতানের হাতে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকা উচিত বলেও বরনি উল্লেখ করেছেন।

(খ) রাজকীয় মর্যাদা

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) সর্বাত্মক ক্ষমতা লাভের উপায়

বরনির মতে রাজার সীমাহীন মর্যাদা, আড়ম্বর ও গৌরব প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা সর্বাত্মক হতে পারে। রাজার সামনে সভাসদদের নতজানু হওয়া, রাজার হস্ত ও পদ চুম্বন প্রভৃতি প্রথা দরবারে রাজাকে চালু রাখতে হবে। রাজা সর্বদা তাঁর বিপুল ক্ষমতা ও জাঁকজমকপূর্ণ মর্যাদার প্রকাশ করলে অধস্তনদের অন্তর থেকে স্বাভাবিকভাবেই রাজার প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটবে।

(২) মুঘিসুদ্দিনের সঙ্গে কথোপকথন

এই প্রসঙ্গে বরনি তাঁর তারিখ-ই-ফিরোজশাহি গ্রন্থে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি (১২৯৬-১৩১৬ খ্রি.) ও বেয়ানার কাজি মুঘিসুদ্দিনের মধ্যে একটি কথোপকথনের উল্লেখ করেছেন। এই কথোপকথনে একদা কাজি মুঘিসুদিন সুলতান আলাউদ্দিন খলজিকে জানান যে, সুলতানের কাজকর্ম শরিয়তের বিধান মেনে সম্পন্ন হচ্ছে না। এই প্রসঙ্গে আলাউদ্দিন কাজি মুঘিসুদ্দিনকে বলেন যে, “কোনটি শরিয়তের বিধানসম্মত বা বিধানসম্মত নয় তা আমি জানি না। রাষ্ট্রের পক্ষে যা কল্যাণকর বা আপৎকালে যা জরুরি বলে আমি মনে করি, আমি তা-ই করি। সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচারের দিন আমার কী হবে সে কথা আমি চিন্তা করি না।”

(গ) সুলতানের বংশকৌলীন্য

সর্বোচ্চ ক্ষমতার ব্যবহারকারী হিসেবে সম্রাটের বংশকৌলিন্য থাকা আবশ্যক বলে বরনি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

(১) মানুষের শ্রদ্ধা লাভ

উচ্চ ও পরাক্রমশালী রাজবংশের বংশধর হিসেবে সম্রাট সম্পর্কে প্রজাদের মনে উচ্চ ধারণা তৈরি হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই তিনি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য লাভ করেন।

(২) নিম্নবর্গের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি

বরনি মুসলিম রাষ্ট্রে নিম্নবর্ণের মানুষকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। তিনি নিম্নবর্ণের মানুষকে শিক্ষাদানও সমর্থন করেন নি। মহম্মদ বিন তুঘলক কর্তৃক উচ্চপদে নাজবা, মানকা, শেখ প্রভৃতি নিম্নবর্ণের মানুষের নিয়োগকে বরনি সমর্থন করেন নি। তিনি ‘আসরাফ’ নামে উচ্চবর্ণের এবং ‘আজলাফ’ নামে নিম্নবর্ণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। এ ছাড়া তিনি ‘আজরাল’ নামে এক নিম্নশ্রেণির মুসলিমের উল্লেখ করেছেন।

(ঘ) ন্যায়বিচার

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা

বরনি বলেছেন যে, শাসকের প্রধান কর্তব্য হল বিচারব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা রাজার শাসননীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ন্যায়বিচার বলতে তিনি সত্তা, ন্যায় ও ধর্মের প্রতিষ্ঠাকে বুঝিয়েছেন।

(২) সমান অধিকার

তাঁর মতে, ঈশ্বরের রাজ্যে সকলেই সমান অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই অধিকার থেকে কেউ যাতে বঞ্চিত না হয় তা রাজাকে দেখতে হবে।

(৩) জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা

রাজা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে জনগণের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করবেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে যাবতীয় বাধাকে প্রতিহত করবেন। প্রয়োজনে এই বিষয়ে রাজাকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে তিনি মনে করতেন।

(ঙ) রাষ্ট্রীয় আইন

বরনির উল্লেখযোগ্য অবদান হল রাষ্ট্রীয় আইনের ধারণা। তিনি তাঁর গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যেমন –

(১) শরিয়তের বিধান

তাঁর মতে, একজন শাসকের প্রধান উদ্দেশ্যই হল ইসলামি আইন অর্থাৎ শরিয়তের বিধান মেনে রাষ্ট্রের সফল পরিচালনা।

(২) জাওয়াবিত

তবে গোঁড়া মুসলিম বরনি স্বীকার করেছেন যে, ভারতের মতো রাষ্ট্রব্যবস্থায় শরিয়তি আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। কারণ, শরিয়তের বিধান এবং ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই এখানে ‘জাওয়াবিত’ নামে রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। তা ছাড়া যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরিয়তের বিধানকেও তিনি যুগোপযোগী করে তোলার কথা বলেন।

(চ) রাজতন্ত্র

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) চরম রাজতন্ত্র

বরনি তাঁর ফতোয়া-ই-জাহান্দারি গ্রন্থে চরম রাজতন্ত্রকে সমর্থন করেছেন। তিনি রাজতন্ত্রকে একটি বংশানুক্রমিক প্রতিষ্ঠান বলে উল্লেখ করেছেন এবং রাজাকে সব ধরনের বন্ধন থেকে মুক্ত চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী বলে ঘোষণা করেছেন। এজন্য তিনি শাসককে ‘জিলুল্লাহ’ বা ‘ঈশ্বরের ছায়া’ বলে অভিহিত করেছেন।

(২) পারসিক রাজতন্ত্রের অনুকরণ

তিনি ভারতের সুলতানি রাজতন্ত্রকে পারস্যের সাসানীয় রাজতন্ত্রের অনুকরণে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, পারস্যের সম্রাট ইসলামের আদর্শ ভাবধারা রক্ষা করে চলেছে। পারস্যের রাজতন্ত্রের জাঁকজমক, বিলাস-বৈভব ও মর্যাদা সমগ্র ইসলামি জগতে শ্রদ্ধা লাভ করেছে। তাই পারস্যের রাজতন্ত্রকে দিল্লির সুলতানি-সহ যে-কোনো রাজতন্ত্রেরই অনুকরণ করা উচিত।

(জ) ঐশ্বরিক তত্ত্ব

  • (১) বরনি শাসকের ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্বকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, ঈশ্বর হলেন চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী এবং তাঁর রাজ্য হল আদর্শ রাজ্য। ঈশ্বর ইহজগতে কারও শাস্তিবিধান করেন, আবার কাউকে রাজ্য দিয়ে রাজা হিসেবে মনোনীত করেন। ইহজগতের রাজা ও রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের অধীন।
  • (২) তিনি ইহজগতের রাজ্যকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন – নবি বা পয়গম্বরের রাজ্য, পয়গম্বরের অনুসারী রাজ্য এবং নবি ও পয়গম্বরের আদর্শ থেকে বিচ্যুত স্বৈরাচারী রাজতান্ত্রিক রাজ্য। বরনির মতে, প্রথম ধরনের অর্থাৎ নবি হজরত মহম্মদ ও পরবর্তী চারজন খলিফার শাসন রাজতন্ত্র ছিল না, ছিল ঈশ্বর কর্তৃক সুনির্দিষ্ট বিশেষ ধরনের শাসন।
  • (৩) দ্বিতীয় ধরনের রাষ্ট্রও ঈশ্বরের ছত্রছায়ায় লালিত। পরবর্তীকালে আদম থেকে শুরু করে ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমল পর্যন্ত শাসন হল তৃতীয় ধরনের শাসন যেখানে চূড়ান্ত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। বরনি বলেছেন যে, তৃতীয় শ্রেণির এই রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের উচিত প্রথম দুই শ্রেণির শাসকদের অনুসরণ করা।

(ঝ) মন্ত্রণাসভার সিদ্ধান্তগ্রহণ

বরনি চরম রাজতন্ত্রের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি উল্লেখ করে তা সংশোধনের পথেরও সন্ধান দিয়েছেন।

(১) মন্ত্রণাসভা গঠন

তিনি বলেছেন যে, রাজাকে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ পারিষদদের নিয়ে একটি মন্ত্রণাসভা গঠন করতে হবে। এই সভার সদস্যরা হবেন রাজার প্রতি অনুগত, অভিজ্ঞ ও একই পদমর্যাদাভুক্ত।

(২) মন্ত্রণাসভার সঙ্গে পরামর্শ

রাজা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সেই সভার পরামর্শদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারাও নির্ভয়ে এবং দ্বিধাহীনভাবে তাদের মতামত রাজাকে জানাবেন। রাজা যেমন কোনো বিষয় তাদের কাছে গোপন করবেন না, তেমনি তাদের মতামতও বাইরে প্রকাশ করবেন না। পরামর্শদাতাদের মতামত জানার পর রাজা নিজের মতামত জানাবেন, আগে নয়। মন্ত্রণাসভার সবাই কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছোলে রাজা সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

উপসংহার :- জিয়াউদ্দিন বরনি ছিলেন একজন গোঁড়া মুসলমান। নিজ ধর্মীয় চিন্তায় আচ্ছন্ন থেকে তিনি সুলতানদের কাজের ভালোমন্দ বিচার করেছেন। এজন্য ইতিহাসবিদ হেনরি ইলিয়ট বরনিকে মধ্যযুগের একজন ‘পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাসবিদ’ বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য বরনি তাঁর গ্রন্থে যে আদর্শ রাষ্ট্রনীতির কথা প্রকাশ করেছেন তা সুলতানি যুগের শাসকদের শাসননীতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি। যেমন, আলাউদ্দিন খলজির মতো সুলতান কাজির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই বোধ করেন নি, অন্যদিকে মহম্মদ-বিন-তুঘলক হিন্দু ঐতিহ্যে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন।

(FAQ) জিয়াউদ্দিন বরনীর রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ফতোয়া ই জাহান্দারি গ্ৰন্থের রচয়িতা কে?

জিয়াউদ্দিন বরনির।

২. সুলতানি যুগের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক কে ছিলেন?

জিয়াউদ্দিন বরনি।

৩. জিয়াউদ্দিন বরনির কোন গ্ৰন্থ থেকে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানা যায়?

ফতোয়া ই জাহান্দারি।

৪. জিলুল্লাহ কথার অর্থ কি?

ঈশ্বরের ছায়া।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment