রোমের ক্রীতদাসদের জীবন

রোমের ক্রীতদাসদের জীবন প্রসঙ্গে শারীরিক নির্যাতন, প্রভুর সম্পত্তি, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার শাস্তি, অমানবিকতা, গ্লাডিয়েটরের লড়াই ও সতুরনালিয়া উৎসব সম্পর্কে জানবো।

রোমের ক্রীতদাসদের জীবন

ঐতিহাসিক ঘটনারোমের ক্রীতদাসদের জীবন
কাজপরিশ্রম সাধ্য
শাস্তিউত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা
পলাতক ক্রীতদাসম্যানুমিসিও
যোদ্ধা ক্রীতদাসগ্ল্যাডিয়েটার
প্রভূ-দাস সহমর্মিতাসতুরনালিয়া উৎসব
রোমের ক্রীতদাসদের জীবন

ভূমিকা :- রোমের ক্রীতদাসদের প্রতি তাদের প্রভুদের আচরণ ও ব্যবহার মোটেই সুখকর ছিল না। প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের সঙ্গে অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করত।

ক্রীতদাসের দুর্দশাগ্রস্ত জীবন

ক্রীতদাসদের কোনো ধরনের আইনি অধিকার না থাকায় তারা প্রভুর অমানবিক আচরণ ও নির্যাতনের কোনো প্রতিকার পেত না। প্রভুর বিভিন্ন ধরনের অমানবিক আচরণ, নির্যাতন, লাঞ্ছনা প্রভৃতির ফলে ক্রীতদাসদের জীবন ছিল সীমাহীন দুঃখদুর্দশায় পূর্ণ।

ক্রীতদাসদের শারীরিক নির্যাতন

  • (১) ক্রীতদাসরা মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও দৈহিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ পরাধীন ছিল। ক্রীতদাসরা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজকর্ম করলেও পরিশ্রমের প্রাপ্য না পেয়ে তারা দুর্বিষহ জীবন কাটাতে বাধ্য হত। প্রভুরা তাদের অধীনস্থ ক্রীতদাসদের ওপর অশেষ নির্যাতন করত।
  • (২) ক্রীতদাসের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও প্রভুর দাসে পরিণত হত এবং একই ধরনের নির্যাতন ভোগ করতে বাধ্য হত। প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের দিয়ে বেশি কাজ করাত। আবার কেউ যাতে পালিয়ে যাবার চেষ্টা না করে সেজন্য ক্রীতদাসদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাত।
  • (৩) সর্বদা নির্যাতনের ফলে ক্রীতদাসের সারা দেহে ঘা ও কালচে দাগ হয়ে থাকত। প্লেটো রচিত একটি নাটকের একটি দৃশ্যে আছে যে, বোলিও নামে এক প্রভু তীব্র চিৎকার করতে করতে তার ক্রীতদাসকে চাবুক দিয়ে পেটাচ্ছে।

(খ) প্রভুর সম্পত্তি

রোমান ক্রীতদাসরা তাদের প্রভুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে বিবেচিত হত। প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসদের বিক্রি করতে, ভাড়া খাটাতে বা হস্তান্তর করতে পারত। যুদ্ধবন্দি ক্রীতদাসদের অত্যন্ত অবমাননাকর অবস্থায় রাখা হত। তাদের বন্দি করে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হত। একটি কার্ডে বিক্রয়যোগ্য ক্রীতদাসটির গুণাবলি উল্লেখ করে তা তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হত। ফলে কেনার আগে ক্রেতা উক্ত ক্রীতদাসটিকে সম্পূর্ণ দেখেশুনে নিতে পারতেন। প্রভু ইচ্ছা করলে তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে হত্যাও করতে পারত। এজন্য প্রভুর কোনো শাস্তি হত না ৷

(গ) পালানোর চেষ্টার শাস্তি

  • (১) ক্রীতদাসরা অমানুষিক পরিশ্রম ও প্রভুর নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সুযোগ পেলে পালানোর চেষ্টা করত। পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসকে ‘ম্যানুমিসিও’ (Manumissio) বলা হত। পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসকে ধরা পড়লে তাকে সীমাহীন নির্যাতন ভোগ করতে হত।
  • (২) ধরা পড়ার পর ‘Fugitivus বা পালানোর প্রতীক হিসেবে ক্রীতদাসের কপালে ‘F’ লিখে দেওয়া হত। পালিয়ে গিয়ে ক্রীতদাসটি নিজেকে চুরি করেছে বলে আইনের চোখে সে দুষ্কৃতী বলে গণ্য হত। দেশের সমস্ত ধরনের আইনের আশ্রয় থেকে সে বঞ্চিত হত।
  • (৩) ক্রীতদাসের পালানোর চেষ্টা রুখতে প্রভু বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করত। এরূপ চেষ্টা করলে ক্রীতদাসটিকে চাবুক দিয়ে পেটানো হত বা উত্তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা দেওয়া হত। ক্রীতদাসরা যাতে কখনও পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য বহু ক্রীতদাসের গলায় ধাতব গলা-বন্ধনী, হাতে-পায়ে শেকল বেঁধে রাখা হত।

(ঘ) অমানবিকতা

প্রভুরা তাদের অধীনস্থ ক্রীতদাসদের প্রতি নানা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করত। একদা একটি কাপ ভাঙার শাস্তি হিসেবে প্রভু ভেডিয়াস পোলিও তার অধীনস্থ ক্রীতদাসটিকে মাছের খাদ্য হিসেবে জীবন্ত অবস্থায় জলাশয়ে ছুঁড়ে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। কোনো কোনো প্রভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসীদের বারবণিতার পেশায় নিযুক্ত করত বা পতিতালয়ে বিক্রি করে দিত। এভাবে প্রভুরা যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করে প্রভূত অর্থসম্পদের মালিক হয়ে উঠত।

(ঙ) গ্ল্যাডিয়েটারের লড়াই

সাধারণ নাগরিকদের অবসর বিনোদনের অংশ হিসেবে রোমে গ্ল্যাডিয়েটারের লড়াই নামে এক ধরনের নিষ্ঠুর খেলা প্রচলিত ছিল। এই খেলায় কোনো ক্রীতদাসকে খোলা মাঠে বাঘ, সিংহ বা অন্যান্য হিংস্র ও ক্ষুধার্ত পশুর সঙ্গে অসম লড়াইয়ে অংশ নিতে হত। এই যোদ্ধা ক্রীতদাসরা গ্ল্যাডিয়েটার নামে পরিচিত ছিল। গ্ল্যাডিয়েটাররা হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণ হারাত। দর্শকরা তা দেখে খুবই আনন্দ পেত।

(চ) প্রভুর সুব্যবহার

  • (১) অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভু তার দাসদের প্রতি ভালো আচরণও করত। কোনো কোনো প্ৰভু তার অধীনস্থ ক্রীতদাসকে বিভিন্ন সুযোগসুবিধা দিয়ে যথেষ্ট সুখস্বাচ্ছন্দ্যে রাখত। কোনো কোনো ক্রীতদাস তার প্রভুর কাছ থেকে এমন সদয় এবং ভালো ব্যবহার পেত যা অনেকে কল্পনা করতে পারত না।
  • (২) ইতিহাসবিদ নার্দো বলেছেন যে, “কোনো কোনো প্রভু নিজের সন্তানের মতোই তাদের দাসদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন।” ইতিহাসবিদ এল. পি. উইলকিনসন বলেছেন যে, “কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রীতদাসরা রোমের দরিদ্র সাধারণ মানুষের চেয়েও ভালো খাওয়াপরা পেত।”

(ছ) ‘সতুরনালিয়া’ উৎসব

কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভু ও তার অধীনস্থ ক্রীতদাসের মধ্যে সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটত ‘সতুরনালিয়া’ নামে একটি উৎসবের মাধ্যমে। এই উৎসবে প্রভুটি ক্রীতদাসের ভূমিকা গ্রহণ করে ক্রীতদাসদের পালনীয় কাজগুলি সম্পাদন করত। আবার ক্রীতদাসও তার প্রভুর ভূমিকা গ্রহণ করে প্রভুর মতো আচরণ করত। নার্দো বলেছেন যে, “এই উৎসবের মাধ্যমে প্রভুরা ক্রীতদাসদের জন্য সহমর্মিতা দেখাত। এখানে প্রভু ও তার অধীনস্থ দাসরা একত্রে শান্তিপূর্ণ সময় অতিবাহিত করত।”

উপসংহার :- বাজারে গৃহপালিত পশু ক্রয়বিক্রয়ের মতো রোমে ক্রীতদাসদের ক্রয়বিক্রয়ের জন্যও দাস বাজার গড়ে উঠেছিল। পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ডেলোস ছিল একটি বড়ো ক্রীতদাস বাজার

(FAQ) রোমের ক্রীতদাসদের জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন উৎসবে প্রভূ ও ক্রীতদাসদের মধ্যে সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটত?

সতুরনালিয়া।

২. রোমের যোদ্ধা ক্রীতদাসরা কি নামে পরিচিত ছিল?

গ্লাডিয়েটার।

৩. রোমের পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসদের কি বলা হত?

ম্যানুমিসিও।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment