মৌর্য যুগের বাণিজ্য

মৌর্য যুগের বাণিজ্য প্রসঙ্গে স্থলপথে অন্তর্বাণিজ্য, গ্ৰিক ব্যবসায়ীদের আগমণ, জলপথে অন্তর্বাণিজ্য, বৈদেশিক বাণিজ্য, আমদানি ও রপ্তানি দ্রব্য, সরকারের নিয়ন্ত্রণ, নগর গঠন, গিল্ড প্রথা ও ধনতন্ত্রী শ্রেণি সম্পর্কে জানবো।

মৌর্য যুগের বাণিজ্য

বিষয় মৌর্য যুগের বাণিজ্য
আমদানি সোনা, যুদ্ধের ঘোড়া, নীলকান্ত মণি
রপ্তানি মশলা, সুগন্ধি দ্রব্য, সূতি কাপড়
বন্দর সোপারা, কল্যাণ, তাম্রলিপ্ত
যোগাযোগ গ্ৰিক, মিশর
মৌর্য যুগের বাণিজ্য

ভূমিকা :- মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে ভারতের বিশাল অঞ্চলের রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপিত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরাট প্রসার ঘটেছিল। ফলে হাতে তৈরি জিনিষের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। মৌর্যযুগে স্থলপথে এবং নদী ও সমুদ্র পথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে এবং বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চলত।

স্থলপথে অন্তর্বাণিজ্য

  • (১) দেশের ভিতর বেশ কয়েকটি সড়ক ছিল। এই পথ দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে স্থল বাণিজ্য চলত। শ্রাবস্তি থেকে মহারাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত, শ্রাবস্তি থেকে বিহারের রাজগৃহ এবং পাটলিপুত্র থেকে তাম্রলিপ্ত, পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশীলা পর্যন্ত রাজপথ ছিল।
  • (২) মেগাস্থিনিস উত্তর, উত্তর পশ্চিম ভারতের প্রধান রাজপথ বা সড়কের কথা বলেছেন। এই সড়ক পাটলিপুত্র থেকে উত্তর ও পশ্চিমের তক্ষশিলা হয়ে ব্যাকট্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই পথ পূর্বদিকে পাটলিপুত্র থেকে সমুদ্র উপকূল সম্ভবত তাম্রলিপ্ত পর্যান্ত বিস্তৃত ছিল।
  • (৩) মেগাস্থিনিসের মতে এই পথ ১০ হাজার স্টেডিয়া দীর্ঘ ছিল। এই রাজপথ ধরে মাল চলাচল করত। অশোক রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে, কূপ খুঁড়ে ও সরাইখানা স্থাপন করে যোগাযোগ ও বাণিজ্যকে আরও শ্রীময়ী করেন। অশোক তার রাজুকদের নির্দেশ দেন যে তারা যেন রাস্তার দূরত্ব মেপে দূরত্ব নির্দেশক চিহ্ন স্থাপন করে।

গ্ৰিক ব্যবসায়ীদের আগমণ

  • (১) মৌর্য যুগে দক্ষিণের খনিতে প্রচুর সোনা ও লোহা পাওয়া যেত। এই খনিজ পদার্থের লোভে ব্যবসায়ীরা দক্ষিণে ঢুকে পড়ে। এমন কি গ্রীক বৌদ্ধ ব্যবসায়ীরাও পিছিয়ে থাকেনি।
  • (২) কার্লে গুহার কাছে ধান্যকটক গ্রামে এই ধরনের গ্রীক বণিকদের একটি বসতি ছিল বলে কোশাম্বি মনে করেন। কার্লে গুহার গায়ে খোদাই করা সিংহীর শরীর ও মানবীর মাথা যুক্ত মূর্তি এই গ্রীক ভাস্কর্যের চিহ্ন বহন করছে।

নদীপথে অন্তর্বাণিজ্য

স্থল পথ ছাড়া নদীপথে মৌর্যযুগে অন্তর্বাণিজ্য চলত। গঙ্গা ও যমুনা নদীর পথেই প্রধানত এই বাণিজ্য চলত। চম্পা, পাটলিপুত্র, বারানসী, কোশাম্বি প্রভৃতি নদীতীরস্থ নগরগুলির মধ্যে নদীপথে মাল চলাচল করত।

বৈদেশিক বাণিজ্য

মৌর্য যুগে ভারতের বন্দরগুলি থেকে ভারতের বাইরে বাণিজ্য চলত। বৈদেশিক বাণিজ্যের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) স্থলপথে বৈদেশিক বাণিজ্য

উত্তর-পশ্চিমে তক্ষশিলা ছিল এক স্থল বাণিজ্যের কেন্দ্র। হিমালয়ের পথ ধরে মধ্য এশিয়া ও ব্যাকট্রিয়া হতে সার্থবাহ বা উট ও খচ্চরের পিঠে মাল চাপিয়ে বণিকরা তক্ষশিলায় এসে মাল বিনিময় করত। তক্ষশিলা হতে এই ভারতীয় পণ্য ব্যাকট্রিয়া হয়ে কাম্পিয়ান ও ককেশাস দিয়ে ইউরোপে চলে যেত। এই পথে কাবুল, কান্দাহার, পারস্য হয়ে পশ্চিম এশিয়ায় মাল পৌঁছে যেত।

(২) উপকূলীয় বন্দর

ভারতের উপকূলের বন্দরের মধ্যে গুজরাটের ভৃগুকচ্ছ, মহারাষ্ট্রের সোপারা, কল্যাণ, বাংলার তাম্রলিপ্ত প্রসিদ্ধ ছিল। পাটলিপুত্র এক গুরুত্বপূর্ণ নদী স্থল বন্দরে পরিণত হয়। বিহার থেকে প্রচুর তামা বাংলার তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে ব্রহ্ম, সুবর্ণভূমি বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি করা হত।

(৩) পাশ্চাত্য সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রসার

আলেকজাণ্ডারের নৌ সেনাপতি নিয়ারকাস সিন্ধুনদের উপকূলে নৌ অভিযান দ্বারা ভারতের বন্দরের সঙ্গে পাশ্চাত্য দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের পথ প্রস্তুত করেন।

(৪) সিংহল ও মিশরের সাথে যোগাযোগ

অশোকের শিলালিপিতে সিংহল, মিশর ও এশিয়া মাইনরের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানা যায়। মিশরের গ্রীক সম্রাট তাঁর রাজ্যে ভারতীয় গৃহপালিত পশু ও ক্রীতদাসী আনা হত বলেছেন। স্ট্রাবোর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে খ্রিস্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতকে মিশর থেকে একদল বণিক ভারতে আসে। তারা ভারত থেকে দামী পাথর ও সুগন্ধি দ্রব্য মিশরে নিয়ে যায়।

আমদানি দ্রব্য

মৌর্য যুগে বিভিন্ন দেশ থেকে ভারত যুদ্ধের ঘোড়া, সোনা, কাচ, নীলকান্ত মণি আমদানি করত।

রপ্তানি দ্রব্য

ভারত থেকে রপ্তানি হত মশলা, সুগন্ধি দ্রব্য, দামী পাথর, হাতির দাঁতের জিনিষ, সুতি কাপড়, রেশম, চাউল, মেহগনি কাঠ, রঞ্জন দ্রব্য এবং হাতে তৈরি শিল্প দ্রব্য, তামা, লাক্ষা, বন্য জন্তুর চামড়া, লোহার লাঙ্গলের ফলা ও বিলাস সামগ্রী।

সরকারের নিয়ন্ত্রণ

  • (১) মৌর্য যুগে অন্তর্বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য সকল প্রকার বাণিজ্যে সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। উপকূলের বাণিজ্যে আরও বেশী নিয়ন্ত্রণ ছিল। মেগাস্থিনিস যাদের এস্টোনোমই (Astonomoi) বলেছেন, সেই কর্মচারীরা জিনিষপত্রের সঠিক দাম, ওজন ও মাপের উপর প্রথর লক্ষ্য রাখত।
  • (২) অর্থশাস্ত্রের মতে, বাণিজ্যাধক্ষ জলপথ ও স্থলপথে কত মাল আমদানি হল ও তার মূল্যের বিষয়ে খাতাপত্র রাখতেন। শুল্ক কর্মচারীরা বিক্রিত মাল থেকে নিয়মিত শুল্ক আদায় করত। জনপদের ভিতর মাল কিনলে তা অন্য জনপদে বিক্রি করতে হত। একই স্থানে কেনা-বেচা চলত না।
  • (৩) বিভিন্ন করের দাবী মিটিয়ে ব্যবসায়িদের বিশেষ লাভ থাকত না। মৌর্য যুগে সরকার বণিকদের ওপর উদার ছিল না। বহু বাধা-নিষেধের বেড়াজালে তাদের বেঁধে রাখা হত। অর্থশাস্ত্রে বণিকদের সম্মানজনক স্থান দেওয়া হয়নি।
  • (৪) বাণিজ্যের সুবিধার জন্যে সুবর্ণ, কার্ষার্পণ প্রভৃতি প্রতীক-যুক্ত মুদ্রা ব্যবহার করা হত। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে দারিক বা দ্রাক্ষমা নামে পারসিক বা গ্রিক মুদ্রা ব্যবহার করা হত।

নগর গঠন

  • (১) সাম্রাজ্যের ভেতর শান্তি ও সংহতি থাকায় এবং বাণিজ্যবৃদ্ধি পাওয়ায় মৌর্যযুগে নগরের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। রাজধানী পাটলিপুত্র ছাড়া উত্তর ভারতে শ্রাবস্তী, চম্পা, রাজগৃহ, কোশাম্বি, কুশীনগর, বারাণসী প্রভৃতি নগর ছিল।
  • (২) মধ্য ও পশ্চিম ভারতে উজ্জয়িনী ছিল এক প্রাচীন নগরী। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে খননকার্যের ফলে উজ্জয়িনীতে অষ্টম খ্রিস্ট পূর্বের সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। উত্তরপশ্চিম ভারতে তক্ষশিলা ছিল বিখ্যাত স্থল বন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্র ও সংস্কৃতি গর্বিত নগরী।
  • (৩) বাংলার তাম্রলিপ্ত ছিল তখন বন্দরনগরী। হিউয়েন সাঙ এখানে অশোকের তৈরি স্তূপ দেখেছিলেন। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ ভারতের নগরায়ন তখন পিছিয়ে ছিল বলে মনে হয়।

গিল্ড প্রথা

  • (১) ঐতিহাসিক ফিক (Fick) বলেছেন যে, মৌর্য যুগে বড় বড় নগরের বণিক ও কারিগররা সঙ্ঘ বা গিল্ড বা নিগম গঠন করত। মৌর্য যুগের আগেও গিল্ড বা সঙ্ঘ প্রথা ছিল। জাতকে সঙ্ঘ প্রথার উল্লেখ দেখা যায়। জেখক বা জেষ্ঠ বা জেথক নামে ধনী ব্যবসায়ী সঙ্ঘের সভাপতি হতেন।
  • (২) অর্থশাস্ত্রে গিল্ড বা সঙ্ঘের উল্লেখ দেখা যায়। সাধারণত কারিগর, শ্রমিক ও পরে ব্যবসায়ী শ্রেণী নিজ নিজ শ্রেণীর স্বার্থরক্ষা করতে গিল্ড বা সঙ্ঘ স্থাপন করে। কারিগর শ্রেণী তাদের নিগম বা সঙ্ঘ গড়ে স্থানীয় শিল্পে তাদের একচেটিয়া অধিকার স্থাপন করত।
  • (৩) বিভিন্ন শিল্পের কারিগররা আলাদা সঙ্ঘ গড়ত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিগমের সাহায্যে স্থানীয় শিল্পের উৎপাদনে তাদের একচেটিয়া অধিকার স্থাপন করা। বহিরাগত কোনো কারিগর হঠাৎ স্থানীয় শিল্পে ঢুকতে পারত না।
  • (৪) নিগমগুলিকে কঠোর নিয়মে পরিচালনা করা হত। ধনী কারিগররাই সঙ্ঘগুলিকে চালাত। এর ফলে এক ধরণের পুঁজিবাদ দেখা দিয়েছিল। মৌর্য যুগে বণিকদের সঙ্ঘ বা নিগম ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই নিগমগুলিকে ধনী বণিক বা শ্রেষ্ঠীরাই নিয়ন্ত্রণ করত। এই নিগম রাষ্ট্র দ্বারা স্বীকৃত হত।
  • (৫) বাইরের কোনো ব্যবসায়ী হঠাৎ এসে নিগমের সদস্য না হয়ে বাণিজ্য করতে পারত না। অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় যে, একজন হিসাব রক্ষক গিল্ড বা সঙ্ঘের আয়-ব্যয়ের হিসেব রাখত। সঙ্ঘের সদস্যদের নিয়মিত চাঁদা দিতে হত। সঙ্ঘের নিজস্ব তহবিল ছিল।
  • (৬) অর্থশাস্ত্রে ‘শ্রেণীবল’ বলে একটি কথার ব্যবহার দেখা যায়। গিল্ডের বা সঙ্ঘের সেনাবাহিনীকে শ্রেণীবল বলা হত বলে ভাণ্ডারকর মনে করেন। সঙ্ঘ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বা সনদ পেত। সঙ্ঘের নিয়ম সদস্যদের মেনে চলতে হত। সদস্যদের বিবাদ-বিসম্বাদ সঙ্ঘ মিটিয়ে দিত।

ধনতন্ত্রী শ্রেণি

মৌর্য যুগে কৃষির ও বাণিজ্যের উন্নতির ফলে একটি ধনতন্ত্রী শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। কৃষির দ্বারা যারা সমাজে অর্থ, জমি ও প্রতিপত্তি ভোগ করত তাদের বলা হত গহপতি। আর বাণিজ্যের দ্বারা যারা সম্পদশালী হয় তাদের বলা হত শ্রেষ্ঠী। এরা এক ধরনের পুঁজিপতি শ্রেণী ছিল। যদিও সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল, নাসিক ও অন্যান্য শিলালিপি থেকে দেখা যায় যে, শতকরা ১৫% সুদে এই মহাজনশ্রেণী টাকা ধার দিত। বণিকদের কাছে অনেক সময় ৬০% সুদ মহাজনরা আদায় করত। নিগম তাদের সঞ্চিত অর্থ সুদে খাটাত। এভাবে ধনতন্ত্রবাদের পত্তন হয়।

উপসংহার :- সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি ছাড়াও  সামুদ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার মৌর্য যুগের বৈষয়িক সমৃদ্ধির  অন্যতম কারণ।

(FAQ) মৌর্য যুগের বাণিজ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্যযুগে কোন কোন পথে বাণিজ্য চলত?

স্থলপথ ও জলপথে।

২. মৌর্যযুগের দুটি বন্দরের নাম লেখ?

কল্যাণ, সোপারা, ভৃগুকচ্ছ।

৩. মৌর্যযুগে বাংলায় অবস্থিত বন্দর কোনটি?

তাম্রলিপ্ত।

Leave a Reply

Translate »