দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ফরাসিদের অভাব, বাণিজ্যে অবহেলা, নৌশক্তির অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, ফরাসিদের উৎসাহ উদ্দীপনার অভাব, দুই কোম্পানির চারিত্রিক পার্থক্য, সাম্রাজ্য স্থাপনে ফরাসি সরকারের অনীহা, সেনাপতিদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও অন্তর্দ্বন্দ্ব, সেনাপতি দুপ্লের অপসারণ ও সেনাপতি বুসি-র অপসারণ সম্পর্কে জানবো।

দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ

ইংরেজ সেনাপতিআয়ার কূট, লরেন্স, সন্ডার্স, ফোর্ড
ফরাসি সেনাপতিকাউন্ট লালি, দুপ্লে, বুসি
বন্দিবাসের যুদ্ধ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ
প্যারিসের সন্ধি১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দ
দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ

ভূমিকা :- ভারতে বাণিজ্যিক প্রাধান্য লাভের দ্বন্দ্বে ইংরেজ ও ফরাসিরা পরস্পর বিরোধী দুই বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ ভারতে রাজনৈতিক প্রাধান্য লাভের জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফরাসিরা চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত হয়।

ব্যর্থতার কারণ

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বে ফরাসিদের ব্যর্থতার পশ্চাতে নানা কারণ ছিল। যেমন –

(ক) ফরাসিদের অভাব

বাণিজ্যিক দিক থেকে ইংরেজ কোম্পানি ফরাসিদের অপেক্ষা অনেক বেশি সমৃদ্ধশালী ছিল। কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধের পূর্বেই বাংলার ওপর ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর ফলে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধে তারা বাংলার অমিত সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পায়। কিন্তু ফরাসিদের অর্থাভাব ছিল প্রবল। কোম্পানির অর্থাভাবে দুপ্লে ব্যক্তিগত অর্থব্যয়ে বাধ্য হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল অকিঞ্চিৎকর।

(খ) বাণিজ্যে অবহেলা

  • (১) ইংরেজরা ভারতীয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে কখনোই এই কথা ভোলে নি যে, তারা বণিক। এমনকী যুদ্ধের সময়েও তারা বাণিজ্যকে উপেক্ষা করে নি। বাণিজ্যে সুযোগ সুবিধা লাভের জন্যই তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ।
  • (২) বাংলার অমিত সম্পদ হাতে আসার পর তারা প্রকৃত অর্থে অপরাজেয় হয়ে পড়ে। এই কারণে বলা হয়ে থাকে যে, “পলাশির যুদ্ধই প্রকৃতপক্ষে ভারতে ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারিত করে দেয়।”
  • (৩) অন্যদিকে বাণিজ্যে ব্যর্থ হয়েই ফরাসিরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং সামরিক আদর্শ গ্রহণ করে। এটি একটি মারাত্মক ভুল, এবং এর ফলে তাদের সর্বদাই প্রবল আর্থিক কৃচ্ছ্রতার মুখোমুখি হতে হয়—যার ফলাফল ছিল মারাত্মক।

(গ) নৌশক্তির অভাব

  • (১) ভারতবর্ষে ইওরোপীয়দের পক্ষে সাম্রাজ্য স্থাপনের প্রধান শর্ত ছিল শক্তিশালী নৌবহর। ফরাসিদের কোনও শক্তিশালী নৌবহর ছিল না এবং দুপ্নে তার কোনও প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেন নি।
  • (২) অপরপক্ষে, ইংরেজদের নৌবাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল এবং তারাই ভারতের সমুদ্র উপকূল নিয়ন্ত্রণ করত। ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন যে, যারা নৌপথ এবং গাঙ্গেয় উপত্যকার সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব করে তাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব ছিল না।
  • (৩) স্মিথ আরও বলেন যে, বাংলা যাদের দখলে এবং জলপথে যাদের প্রাধান্য, পণ্ডিচেরিকে ঘাঁটি বানিয়ে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভারত-সাম্রাজ্য জয় আলেকজাণ্ডার বা নেপোলিয়নের পক্ষেও সম্ভব হত না।

(ঘ) যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব

  • (১) ভারতের অভ্যন্তরে মাদ্রাজ, বোম্বাই ও কলকাতা ইংরেজদের শক্তিশালী কেন্দ্রস্থল ছিল—যেখান থেকে যুদ্ধের সরঞ্জাম, সৈন্য ও রসদ জোগাড় করা তাদের পক্ষে শ্রমসাধ্য ছিল না।
  • (২) কিন্তু ফরাসিদের নিকটতম শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল সুদূর মরিশাস। সেখান থেকে সৈন্য ও মালপত্র আমদানি করা সর্বদা সহজসাধ্য ছিল না।
  • (৩) যুদ্ধে মাদ্রাজের পতন হলে ইংরেজরা অনায়াসে কলকাতা বা বোম্বাই থেকে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে পারত, কিন্তু ফরাসিদের একমাত্র অবলম্বন ছিল পণ্ডিচেরি। পণ্ডিচেরি পতনের অর্থ ছিল ভারতে ফরাসিদের সকল সম্ভাবনার অবসান এবং বাস্তবেও ঠিক তাই হয়েছিল।

(ঙ) ফরাসিদের উৎসাহ উদ্দীপনার অভাব

অষ্টাদশ শতকে ইংল্যাণ্ডে শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হওয়ায় ইংল্যাণ্ডের কারখানা গুলির জন্য কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য বিক্রয়ের জন্য বাজারের প্রয়োজন ছিল। এই কারণে ইংরেজ বণিকদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দেয়। ফরাসি বণিকদের মধ্যে এই ধরনের কোনও উদ্দীপনার কারণ ছিল না।

(চ) দুই কোম্পানির চারিত্রিক পার্থক্য

  • (১) ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল জনগণের প্রতিষ্ঠান। এর পশ্চাতে প্রবল জনসমর্থন ছিল এবং এর সঙ্গে দেশবাসীর স্বার্থও জড়িত ছিল। জাতীয় স্বার্থের তাগিদেই ব্রিটিশ সরকার কোম্পানির কার্যকলাপের ওপর দৃষ্টি রাখতেন।
  • (২) অপরপক্ষে, ফরাসি কোম্পানি ছিল রাষ্ট্রের মালিকানাধীন। তাই সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে ফরাসি কোম্পানিকে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত। এর ফলে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগের অভাব দেখা দেয়।
  • (৩) ইংরেজ কোম্পানি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে তারা নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারত—এ জন্য তাদের সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার কোনও প্রয়োজন ছিল না।
  • (৪) স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র-কবলিত ফরাসি কোম্পানির পশ্চাতে কোনও জনসমর্থন ছিল না এবং প্রবল অর্থকৃচ্ছ্রতার দিনে ফরাসি সরকারের পক্ষেও কোম্পানিকে কোনও প্রকার অর্থ সাহায্য করা সম্ভব ছিল না।

(ছ) সাম্রাজ্য স্থাপনে ফরাসি সরকারের অনীহা

  • (১) সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের কালে ইউরোপ ও আমেরিকায় ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব চলছিল। ফ্রান্সের রাজা, মন্ত্রী ও অভিজাতবর্গ ইউরোপেই তাঁদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী ছিলেন— উপনিবেশ রক্ষা বা নতুন উপনিবেশপ্রতিষ্ঠায় তাঁদের বিশেষ কোনও আগ্রহ ছিল না।
  • (২) ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে দুপ্নের ব্যক্তিগত বিষয় ছিল। এইকারণে ফরাসি কোম্পানি স্বদেশ থেকে বিশেষ কোনও সাহায্য পায় নি এবং তৎকালীন পরিস্থিতিতে ফরাসি সরকারের পক্ষে ভারতে কোনও সাহায্য পাঠানো সম্ভবও ছিল না।

(জ) সেনাপতিদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও অন্তর্দ্বন্দ্ব

  • (১) ফরাসি সেনাপতিদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তাদের পতনের জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল। ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট লালি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন সুদক্ষ সমরকুশলী সেনানায়ক ছিলেন।কিন্তু তাঁর মেজাজ ছিল অতি রুক্ষ এবং বিপদের সময় কখনোই তার ওপর নির্ভর করা যেত না।
  • (২) পণ্ডিচেরির কাউন্সিলের সঙ্গে তাঁর ক্রমাগত বিবাদের ফলে ফরাসিদের দক্ষতা বহুল পরিমাণে হ্রাস পায়। চরম বিপদের দিনেও তাঁরা দ্বন্দ্ব পরিহার করতে পারেন নি।
  • (৩) দুপ্লে ছিলেন দাম্ভিক ও উগ্র প্রকৃতির মানুষ— কূটনীতিতে দক্ষ হলেও যুদ্ধবিদ্যা সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা তাকে ভয় করতেন— ভালোবাসতেন না।
  • (৪) ফলে তাদের কাছ থেকে তিনি সর্বপ্রকারের সহযোগিতা পান নি। অপরপক্ষে, ইংরেজ সেনাপতি সান্ডার্স, আয়ার কূট, ফোর্ড, লরেন্স প্রমুখের দক্ষতা ও যোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। ক্লাইভ একাধারে ছিলেন দক্ষ সেনাপতি ও কূটনীতিবিদ।

(ঝ) দেশীয় রাজন্যবর্গের ওপর ফরাসিদের নির্ভরতা

দেশীয় রাজন্যবর্গের অনিশ্চিত সাহায্যের ওপর নির্ভর করে ফরাসিরা মারাত্মক ভুল করে। হায়দার আলি প্রথমে সেনা দিয়ে ফরাসিদের সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু পরে তাঁর নিজ রাজ্যে গোলযোগ শুরু হলে তিনি ফরাসি শিবির থেকে তাঁর সেনাবাহিনী সরিয়ে আনতে বাধ্য হন। অপরপক্ষে, ইংরেজরা কখনোই দেশীয় কোনও শক্তির ওপর নির্ভর করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় নি।

(ঞ) দুপ্লের ত্রুটি

  • (১) দুপ্লে ও বিভিন্ন ফরাসি নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন ভুল-ত্রুটি ভারতে ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারণে যথেষ্ট সাহায্য করে। কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় দুপ্লের কয়েকটি ভ্রান্তি ফরাসিদের পক্ষে মারাত্মক হয়ে ওঠে।
  • (২) মহম্মদ আলি ত্রিচিনোপলি দুর্গে আশ্রয় নিলে দুপ্নে তাঁকে আক্রমণ করতে অযথা দেরি করেন। এর ফলে ইংরেজরা তাঁর সাহায্যে আসার জন্য যথেষ্ট সময় পায় অথচ মহম্মদ আলিকে সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করলে তাঁর পতন অনিবার্য ছিল।
  • (৩) আবার, তিনি যখন চাঁদা সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিচিনোপলি আক্রমণ করেন, তখন বুসিকে কর্ণাটকের রাজধানী আর্কটে পাঠানো উচিত ছিল, কিন্তু তা হয় নি। এর ফলে ক্লাইভের পক্ষে আর্কট দখল করা অতি সহজ হয়। এতে যুদ্ধের গতিই একরকম পরিবর্তিত হয়ে যায়।

(ট) দুপ্লের অপসারণ

দুপ্লেই প্রথম ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেন। ফরাসিদের সংকটের এক চরম মুহূর্তে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি কর্তৃপক্ষ দুপ্লেকে পদচ্যুত করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন এবং তাঁর নীতি পরিবর্তন করে ভিন্ন নীতি গ্রহণের চেষ্টা করা হয়। বলা বাহুল্য, দুপ্নের অপসারণ ও ভিন্ন নীতি গ্রহণ ছিল একটি মারাত্মক ভুল।

(ঠ) বুসি-র  অপসারণ

পরবর্তীকালে লালির নির্দেশেহায়দ্রাবাদ থেকে বুসি-র অপসারণও অনুরূপভাবে মারাত্মক হয়ে ওঠে। বুসি ছিলেন ফরাসি সেনানায়কের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর অপসারণে দাক্ষিণাত্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা পূর্ণ করার মতো অপর কেউ দাক্ষিণাত্যে ছিলেন না।

উপসংহার :- ফরাসিদের ব্যর্থতার পর দক্ষিণ ভারতে ইংরেজরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ভারতের উপকূলভাগে তারা একচ্ছত্র হয়ে ওঠে এবং এর ফলে আগামী দিনে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অপ্রতিহত গতির সূচনা হয়।

(FAQ) দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বে নিযুক্ত দুজন ফরাসি সেনাপতির নাম লেখ।

কাউন্ট লালি, যোশেফ দুপ্লে।

২. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বে নিযুক্ত দুজন ইংরেজ সেনাপতির নাম লেখ।

আয়ার কূট, লরেন্স।

৩. কোন যুদ্ধে ফরাসিরা ইংরেজদের কাছে চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত হয়?

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বন্দিবাসের যুদ্ধে।

Leave a Reply

Translate »