দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ, সেন্ট থোমের যুদ্ধ, আই-লা-স্যাপেলের সন্ধি, কর্নাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ, অম্বুরের যুদ্ধ, কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ, বন্দীবাসের যুদ্ধ, প্যারিসের সন্ধি, ও ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্বের গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাদাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব
কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ১৭৪৬-৪৮ খ্রি
সেন্ট থোমের যুদ্ধ১৭৪৬ খ্রি
কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ১৭৪৯-৫৪ খ্রি
অম্বুরের যুদ্ধ১৭৪৯ খ্রি
কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ১৭৫৬-৬৩ খ্রি
বন্দীবাসের যুদ্ধ১৭৬০ খ্রি
দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব

ভূমিকা :- ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পোর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা সর্বপ্রথম জলপথে ভারতে আসে। এরপর থেকে পোর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি, দিনেমার প্রভৃতি বিভিন্ন ইউরোপীয় জাতি ভারতে বাণিজ্য করতে আসে। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ইংরেজ ও ফরাসিরা।

দক্ষিণ ভারতে ইংরেজ ও ফরাসিদের বাণিজ্যকুঠি

ইংরেজরা দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ ও সেন্ট ফোর্ট ডেভিড-এ এবং ফরাসিরা পন্ডিচেরিতে সুসজ্জিত বাণিজ্যকুঠি গড়ে তোলে।

কর্ণাটকের তিনটি যুদ্ধ

ভারতে বাণিজ্যে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইংরেজ ও ফরাসিরা দাক্ষিণাত্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধগুলি সাধারণভাবে কর্ণাটের যুদ্ধ বা কর্ণাটকের যুদ্ধ নামে পরিচিত। ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে দক্ষিণাত্যে প্রধান তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যথা –

  • (ক) কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ,
  • (খ) কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং
  • (গ) কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ।

(ক) কর্ণাটকের প্রথম যুদ্ধ (১৭৪৬-৪৮ খ্রি.)

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরবর্তীকালে দাক্ষিণাত্যের হায়দ্রাবাদ ও কর্ণাটক রাজ্য স্বাধীন হয়ে পড়ে। এরপর দাক্ষিণাত্যের রাজনীতির বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) কর্ণাটকে আনোয়ারউদ্দিন

কৰ্ণাটক আইনত হায়দ্রাবাদের অধীন হলেও কর্ণাটকের নবাব দোস্ত আলি কার্যত স্বাধীনভাবেই শাসন চালাতে থাকেন। দোস্ত আলির মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা চাঁদা সাহেব সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার থাকলেও হায়দ্রাবাদের নিজামের মনোনীত ব্যক্তি আনোয়ারউদ্দিন কর্ণাটকের সিংহাসনে বসেন।

(২) যুদ্ধের কারণ

১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হলে এই যুদ্ধের পরস্পর-বিরোধী পক্ষ ইংরেজ ও ফরাসিরা ভারতেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি কমডোর বার্নেট কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ দখল করে নিলে ভারতে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। পন্ডিচেরির ফরাসি শাসনকর্তা ডুপ্লে কর্ণাটক রাজ্যের ইংরেজদের বাণিজ্যকেন্দ্র মাদ্রাজ দখল করে নেন।

(৩) সেন্ট থোমের যুদ্ধ

বিপন্ন ইংরেজরা কর্ণাটকের নবাব আনোয়ারউদ্দিনের সহায়তা প্রার্থনা করলে তিনি ১০,০০০ সৈন্য দিয়ে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। কিন্তু ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিরাট বাহিনী মাইলাপুর বা সেন্ট থোমের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর মাত্র ৯৩০ জন সৈন্যের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

(৪) আই-লা-স্যাপেলের সন্ধি

১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে আই-লা-স্যাপেলের সন্ধির দ্বারা ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের অবসান ঘটলে ভারতেও ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধের অবসান ঘটে। সন্ধির শর্তানুসারে ফরাসিরা ইংরেজদের মাদ্রাজ ফিরিয়ে দেয়।

(খ) কর্ণাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১৭৪৯-৫৪ খ্রি.)

প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধে দাক্ষিণাত্যে ক্ষুদ্র ফরাসি বাহিনীর কাছে কর্ণাটকের নবাব আনোয়ারউদ্দিনের বিশাল বাহিনী পরাজিত হয়। এতে উৎসাহিত হয়ে ফরাসিরা সামরিক শক্তির সহায়তায় এদেশে একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকে। –

(১) সিংহাসন নিয়ে বিবাদ

১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে হায়দ্রাবাদের নবাব নিজাম-উল- মূলকের মৃত্যু হলে সিংহাসন নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র নাসির জঙ্গ ও দৌহিত্র মুজাফফর জঙ্গ-এর মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। অন্যদিকে কর্ণাটকের সিংহাসন নিয়ে আনোয়ারউদ্দিন ও চাদা সাহেবের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়।

(২) ফরাসিদের ভূমিকা

এই বিবাদের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে পন্ডিচেরির ফরাসি শাসক ডুপ্নে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিবৃদ্ধির চেষ্টা করেন। ডুপ্লে হায়দ্রাবাদের সিংহাসনে মুজাফ্ফর জঙ্গ-কে এবং কর্ণাটকের সিংহাসনে চাঁদা সাহেবকে সমর্থন করেন।

(৩) অম্বুরের যুদ্ধ

এরপর মুজাফ্ফর জঙ্গ, চাঁদা সাহেব ও ফরাসি বাহিনী একত্রে আনোয়ারউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে ভেলোরের কাছে অম্বুরের যুদ্ধে আনোয়ারউদ্দিন নিহত হন এবং তাঁর পুত্র মহম্মদ আলি ত্রিচিনোপল্লিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। চাঁদা সাহেব কর্ণাটকের সিংহাসনে বসেন। ফলে কর্ণাটকে ফরাসি শক্তির প্রভাব অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

(৪) ফরাসিদের চূড়ান্ত প্রাধান্য

ফরাসিদের শক্তিবৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে ইংরেজরা নাসির জঙ্গ ও মহম্মদ আলির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়। ইতিমধ্যে নাসির জঙ্গ আততায়ীদের হাতে নিহত (১৭৫০ খ্রি.) হলে মুজাফ্ফর জঙ্গ হায়দ্রাবাদের সিংহাসনে বসেন। শীঘ্রই মুজাফফর জঙ্গও নিহত (১৭৫১ খ্রি.) হলে ফরাসিরা নিজাম-উল-মূলকের তৃতীয় পুত্র সলাবৎ জঙ্গ-কে সিংহাসনে বসায়। হায়দ্রাবাদে একটি ফরাসি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

(৫) ইংরেজদের সাফল্য

মহম্মদ আলি ত্রিচিনোপল্লিতে অবস্থানকালে ফরাসিরা সেখানে অভিযান চালায়। এদিকে মাদ্রাজের ইংরেজরা মহম্মদ আলির পক্ষ নেয়। নতুন ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ দ্রুত অভিযান চালিয়ে কর্ণাটকের রাজধানী আর্কট দখল করে নেন। ফরাসিরা আর্কট দখলের উদ্দেশ্যে ত্রিচিনোপল্লি থেকে সরে এলে ইংরেজরা ত্রিচিনোপল্লিও দখল করে নেয়। ইংরেজরা ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে চাঁদা সাহেবকে হত্যা করে মহম্মদ আলিকে কর্ণাটকের সিংহাসনে বসায় এবং সেখানে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে ডুপ্লে পদচ্যুত হয়ে ফ্রান্সে ফিরে যান।

(৬) শান্তি স্থাপন

১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে এক সন্ধি স্বাক্ষরের মাধ্যমে শান্তি স্থাপিত হয়। সন্ধির শর্তানুসারে উভয় পক্ষ একে অন্যের অধিকৃত স্থানগুলি ফেরত দেয় এবং সিদ্ধান্ত হয় যে, ভবিষ্যতে দেশীয় শাসকদের বিবাদে কোনো পক্ষই হস্তক্ষেপ করবে না।

(গ) কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধ (১৭৫৬-৬৩ খ্রি.)

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-৬৩ খ্রি.) শুরু হয়। এরপর দাক্ষিণাত্যের রাজনীতির বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) যুদ্ধের সূত্রপাত

সপ্তবর্ষের যুদ্ধের সূত্র ধরে ভারতে ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতেই ইংরেজরা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ফরাসি ঘাঁটি চন্দননগর দখল করে নেয়।

(২) বন্দীবাসের যুদ্ধ

ইংরেজ সেনাপতি স্যার আয়ার কূট ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বন্দীবাসের যুদ্ধে ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট লালিকে পরাজিত করেন। ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি ঘাঁটি পন্ডিচেরি ইংরেজদের দখলে চলে যায়। জিঞ্জি এবং মাহেও ইংরেজরা দখল করে। ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে ফরাসি শক্তির অবসান ঘটে।

(৩) প্যারিসের সন্ধি

১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের সন্ধির ফলে ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটলে ভারতেও ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়। সন্ধির শর্তানুসারে ফরাসিরা তাদের হারানো স্থানগুলি ফিরে পায়।

ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের গুরুত্ব

১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের সন্ধির দ্বারা কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধের অবসান ঘটলে প্রায় দুই দশক ধরে চলা ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটে। দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্ব ছিল। এই গুরুত্বগুলি হল –

(১) ফরাসিদের শক্তি সংকোচন

যুদ্ধে পরাজয়ের পর ফরাসিরা তাদের পন্ডিচেরি, চন্দননগর ও অন্যান্য স্থানগুলি ফিরে পায় ঠিকই, তবে সিদ্ধান্ত হয় যে, ফরাসিরা এসব স্থানে দুর্গ নির্মাণ বা সেনা মোতায়েন করতে পারবে না। তারা এই স্থানগুলি কেবল বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহার করতে পারবে। এর ফলে ফরাসিদের শক্তি খুবই হ্রাস পায় এবং ভারতে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভেঙে যায়।

(২) দেশীয় শাসকদের দুর্বলতা

ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধে দেশীয় শাসকদের সামরিক দুর্বলতা সকলের সামনে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। ইংরেজরা বুঝতে পারে যে, দেশীয় শাসকদের সামরিক দুর্বলতা এবং পারস্পরিক বিরোধের ফলে ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্যের প্রসার ঘটাতে খুবই সহায়তা করবে।

(৩) বিদেশী শক্তির সাহায্য গ্রহণ

ইউরোপীয় বণিক জাতিগুলির সামরিক দক্ষতা ভারতীয় শাসকদের মুগ্ধ করে। তাঁরা নিজেদের পারস্পরিক বিবাদেও বিদেশী শক্তির সহায়তা নিতে শুরু করে। ফলে ইংরেজদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা সহজতর হয়।

(৪) ইংরেজদের চূড়ান্ত আধিপত্য

কর্ণাটকের যুদ্ধে চূড়ান্ত জয়লাভের ফলে দক্ষিণ ভারতে ইংরেজরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে তারা বাংলাতেও নিজেদের হাতের লোককে সিংহাসনে বসায়। ফলে আগামী দিনে ভারত-ব্যাপী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রসারের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের সাফল্য ও ফরাসিদের ব্যর্থতার কারণ

দীর্ঘ দুই দশক-ব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতার শেষে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের কাছে ফরাসি শক্তি চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। ইংরেজদের এই সাফল্য ও ফরাসিদের ব্যর্থতার বিভিন্ন কারণ ছিল। এই কারণগুলি হল –

(১) বাংলায় আধিপত্য

ইংরেজ কোম্পানি বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এখানকার বিপুল সম্পদ ও একচেটিয়া বাণিজ্যের মালিক হয়ে যায়। বাংলার বিপুল সম্পদ হাতে আসায় তারা একপ্রকার অপরাজেয় হয়ে ওঠে। এজন্য বলা হয় যে, “পলাশির যুদ্ধই প্রকৃতপক্ষে ভারতে ফরাসিদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।”

(২) ইংরেজদের আর্থিক সমৃদ্ধি

ভারতের বাণিজ্যে ফরাসিদের চেয়ে ইংরেজ কোম্পানি অনেক বেশি প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধের আগেই ইংরেজরা বাংলায় রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। ফলে বাংলার বিপুল অর্থ-সম্পদ তারা দাক্ষিণাত্যে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ পায়। অপরদিকে, প্রবল অর্থ সংকটের কারণে ফরাসিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হয়।

(৩) বাণিজ্যকে গুরুত্বদান

ইংরেজরা ভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেও তারা বাণিজ্যকে কখনও উপেক্ষা করে নি। অপরদিকে, ফরাসিরা বাণিজ্যে ব্যর্থ হয়ে ভারতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। এটি ফরাসিদের একটি মারাত্মক ভুল ছিল।

(৪) নৌবহর

ভারতে ইউরোপীয়দের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিশালী নৌবহরের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। ইংরেজদের শক্তিশালী নৌবহর ছিল এবং এর দ্বারা তারা ভারতের উপকূলভাগ নিয়ন্ত্রণ করত। অপরদিকে, ভারতে ফরাসিদের শক্তিশালী নৌবহর ছিল না। ফলে ফরাসিরা যুদ্ধে পিছিয়ে পড়ে।

(৫) বাজার দখলের তাগিদ

অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হলে সেখানকার কলকারখানার প্রয়োজনে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য বাজার দখলের উদ্দেশ্যে ভারতের ব্রিটিশ বণিকদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ দেখা যায়। কিন্তু ফরাসিদের মধ্যে এরুপ উৎসাহ ছিল না।

(৬) জাতীয় স্বার্থ

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল জনগণের প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে দেশবাসীর জাতীয় স্বার্থ জড়িত ছিল। তাই এর পশ্চাতে প্রবল জনসমর্থন ছিল। ফলে এই কোম্পানি খুবই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। অপরদিকে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ফরাসি কোম্পানির প্রতি সেদেশের জনগণের কোনো সমর্থন ছিল না।

(৭) মাতৃভূমি থেকে সহায়তা

ভারতের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইংরেজরা তাদের মাতৃভূমি ইংল্যান্ড থেকে যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছিল। কিন্তু ফরাসিরা এদেশে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য মাতৃভূমি ফ্রান্স থেকে বিশেষ সহায়তা পায় নি। কারণ, ইউরোপে সপ্তবর্ষের যুদ্ধের সময় ইউরোপে তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় ফ্রান্স বেশি আগ্রহী ছিল। উপনিবেশ রক্ষার আন্তরিক তাগিদ তাদের ছিল না।

(৮) সেনাপতিদের যোগ্যতা

ফরাসি সেনাপতিদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও অন্তর্দ্বন্দ্ব এদেশে তাদের পরাজয়ের জন্য যথেষ্ট দায়ি ছিল। ফরাসি সেনাপতি লালি-র তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও উন্নত সামরিক দক্ষতা থাকলেও তাঁর মেজাজ ছিল অত্যন্ত রুক্ষ। ডুপ্লে কূটনীতিতে দক্ষ হলেও সামরিক বিষয়ে তিনি ছিলেন অজ্ঞ। দাম্ভিক ও উগ্র ডুপ্লে-কে তাঁর সহকর্মীরা ভয় করতেন – ভালোবাসতেন না। অপরদিকে, ইংরেজ সেনাপতি সান্ডার্স, আয়ার কূট, ফোর্ড, লরেন্স প্রমুখের যোগ্যতা ও সামরিক দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত।

(৯) ফরাসিদের ভুল সিদ্ধান্ত

ফরাসি কর্তৃপক্ষের কয়েকটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত ভারতে ইংরেজদের সাফল্য লাভকে অনিবার্য করে তোলে। ডুপ্লের অপসারণ, তাঁর নীতির পরিবর্তন করে নতুন নীতি গ্রহণ, হায়দ্রাবাদ থেকে সেনাপতি বুসী-র অপসারণ প্রভৃতি পদক্ষেপগুলি ভারতে ইংরেজদের সুবিধা করে দিয়েছিল।

উপসংহার :- তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ শেষে প্যারিসের সন্ধি দ্বারা ফরাসিরা তাদের হৃত স্থান গুলি ফিরে পেলেও প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয় যে, তারা এই স্থানগুলি কেবল বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহার করবে। এভাবে ভারতে ইংরেজদের আধিপত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং ফরাসিদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

(FAQ) দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শেষ পর্যন্ত কারা জয় লাভ করে?

ইংল্যান্ড।

২. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজন ইংরেজ সেনাপতির নাম লেখ।

সান্ডার্স, আয়ার কূট, ফোর্ড, লরেন্স।

৩. দাক্ষিণাত্যে ইঙ্গ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজন ফরাসি সেনাপতির নাম লেখ।

ডুপ্লে, কাউন্ট লালি।

৪. বন্দীবাসের যুদ্ধ কখন হয়?

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে।

৫. অম্বুরের যুদ্ধ কখন হয়?

১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে।

৬. মাইলাপুর বা সেন্ট থোমের যুদ্ধ কখন হয়?

১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment