ভারতে রেলযাত্রার সূচনা

ভারতে রেলযাত্রার সূচনা প্রসঙ্গে ভারতে সর্বপ্রথম রেলপথ প্রতিষ্ঠা, দ্বিতীয় রেলপথ প্রতিষ্ঠা, রেলপথের প্রসার, রেলপথ স্থাপনে লর্ড ডালহৌসির প্রধান উদ্দেশ্য, রেলপথ স্থাপনে ইংরেজদের উদ্দেশ্য, রেলপথের সম্প্রসারণ, রেলপথ নির্মাণের নঞর্থক ও সদর্থক প্রভাব সম্পর্কে জানবো।

ভারতে রেলযাত্রার সূচনা

ঐতিহাসিক ঘটনাভারতে রেলযাত্রার সূচনা
সময়কাল১৮৫৩ খ্রি
প্রথম রেলপথ স্থাপনবোম্বাই থেকে থানে
রেলপথের জনকলর্ড ডালহৌসি
রেলবোর্ড১৯০৫ খ্রি
অ্যাকওয়ার্থ কমিটি১৯১৯ খ্রি
ভারতে রেলযাত্রার সূচনা

ভূমিকা :- ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতে রেলপথের প্রতিষ্ঠা এদেশের অর্থনীতিকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছিল। ভারতে ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে রেলপথ স্থাপনের প্রস্তাব উঠতে থাকে।

ভারতে সর্বপ্রথম রেলপথ প্রতিষ্ঠা

শেষপর্যন্ত বড়োলাট লর্ড ডালহৌসির (১৮৪৮-৫৬ খ্রি.) আমলে ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেল কোম্পানি’ ভারতে সর্বপ্রথম রেলপথের প্রতিষ্ঠা করে। ডালহৌসিকে ভারতীয় রেলপথের জনক বলা হয়। তাঁর আমলে ১৬ এপ্রিল ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত ২১ মাইল পথে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

ভারতে দ্বিতীয় রেলপথ প্রতিষ্ঠা

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব ভারতের হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ২৪ মাইল পথে ভারতের দ্বিতীয় রেলপথ চালু হয়। ডালহৌসির আমলে ভারতে প্রায় ২০০ মাইল রেলপথ নির্মিত হয়।

ভারতে রেলপথের প্রসার

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পর ভারতে রেলপথের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় রেলপথের জাতীয়করণ করা হয় এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম নেটওয়ার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

ভারতে রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হার্ড -এর মন্তব্য

অধ্যাপক জে. এম. হার্ড ‘কেম্ব্রিজ ইকনমিক অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে বলেন যে, রেলপথ স্থাপনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান এখনও সম্ভব না হলেও, এর পিছনে যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যই ছিল, সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই।

রেলপথ স্থাপনে লর্ড ডালহৌসির প্রধান উদ্দেশ্য

ভারতে রেলপথ স্থাপনের পিছনে লর্ড ডালহৌসির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এদেশে সুদক্ষ ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ইংরেজ সেনাবাহিনীকে দ্রুত ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া, ভারতে ব্রিটিশ পুঁজি ও শিল্পোদ্যোগ বৃদ্ধি করা, কাঁচামাল ও উৎপাদিত শিল্পদ্রব্য দ্রুত ও সহজে পরিবহণ করা প্রভৃতি প্রয়োজনে তিনি ভারতে রেলপথ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

রেলপথ স্থাপনের উদ্দেশ্য

ভারতীয়দের কল্যাণসাধনের উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, সম্পূর্ণভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ইংরেজরা ভারতে রেলপথ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ভারতে রেলপথ স্থাপনের পিছনে ইংরেজদের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী ও শোষণমূলক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। মূলত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যেই ভারতে রেলপথের প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেমন –

(ক) কাঁচামাল রপ্তানি সহজ করা

ইংল্যান্ডের কারখানাগুলিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে সেখানে কাঁচামালের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ভারত থেকে উৎপাদিত কাঁচামাল ইংল্যান্ডের কারখানাগুলিতে পাঠানো হয়। ভারতের অভ্যন্তর থেকে কাঁচামাল দ্রুত বন্দরে পৌঁছোনোর উদ্দেশ্যে রেল যোগাযোগের প্রয়োজন হয়। ড. সব্যসাচী ভট্টাচার্য বলেছেন, “এইসব লাভে লোভই ছিল আসল কথা, এ দেশের অর্থনীতির আধুনিকীকরণ মোটেই নয়।”

(খ) বিলাতি পণ্যের আমদানি সহজ করা

ভারতে রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের ফলে সেখানকার কারখানাগুলিতে প্রচুর পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হতে থাকে। এসব সামগ্রী ভারতের অভ্যন্তরে দূরদূরান্তের বাজারগুলিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন অনুভূত হয়।

(গ) পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা

শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটিশ শিল্পপতিদের হাতে বিপুল পরিমাণ পুঁজি সঞ্চিত হয়। এই পুঁজি তারা ভারতের লাভজনক, নিরাপদ ও সুবিধাজনক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী ছিল। পুঁজিপতিদের কাছে ভারতে রেলপথ নির্মাণ অন্যতম লাভজনক ও নিরাপদ ক্ষেত্র বলে মনে হয়। তারা উপলব্ধি করে যে, ভারতে রেলব্যবস্থা চালু হলে রেল লাইন, ইঞ্জিন, মালগাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে তারা প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে পারবে।

(ঘ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

বিশাল ভারতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজে দ্রুত সংবাদ আদানপ্রদান ও যোগাযোগ রক্ষা, বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ, দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী প্রেরণ, সেনাবাহিনীর কাছে দ্রুত খাদ্য ও রসদ পৌঁছে দেওয়া প্রভৃতি উদ্দেশ্যে ভারতে রেলপথ স্থাপনকে ব্রিটিশ সরকার অপরিহার্য বলে মনে করে। ব্রিটিশ সরকার আরও মনে করে যে, ভারতে রেলপথের প্রসার ঘটলে বহু ইংরেজের কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটবে।

(ঙ) সামরিক উদ্দেশ্য

  • (১) লর্ড ডালহৌসি ভারতে সামরিক প্রয়োজনে রেলপথের প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। অবশ্য তাঁর আগে লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে সামরিক প্রয়োজনে ভারতে রেলপথ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এরপর ডালহৌসি ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রতিবেদনে একই কথা বলেন।
  • (২) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের পর ইংরেজ সরকার সামরিক প্রয়োজনে ভারতে রেলপথ নির্মাণের গুরুত্ব ভালোরকম উপলব্ধি। করে। তাই দেখা যায়, বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল না – এমন বহু স্থানেও শুধু সামরিক প্রয়োজনে রেলপথ স্থাপিত হয়।

(চ) দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করা

ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে দুর্ভিক্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা। দুর্ভিক্ষকবলিত এলাকায় দ্রুত খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছোনোর উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার রেল যোগাযোগের প্রয়োজন উপলব্ধি করে।

ভারতে রেলপথের সম্প্রসারণ

১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রেলপথের সম্প্রসারণ ঘটে। এই সময়কালে ভারতে রেলপথের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে চারটি পৃথক পর্যায় লক্ষ্য করা যায়। যথা –

  • (ক) গ্যারান্টি ব্যবস্থা,
  • (খ) সরকারি উদ্যোগ,
  • (গ) পুনরায় গ্যারান্টি ব্যবস্থা,
  • (ঘ) পুনরায় সরকারি উদ্যোগ।

এই পর্যায়গুলি সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল –

(ক) গ্যারান্টি ব্যবস্থা

প্রথমে কয়েকটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে ভারতে রেলপথ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কোম্পানিগুলি মনে করেছিল যে, ভারতে রেলব্যবস্থা লাভজনক হবে না। এজন্য তারা একাজে বিশেষ উৎসাহ দেখায় নি। –

(১) গ্যারান্টি ব্যবস্থা সম্বন্ধীয় ধারণা

রেলপথ নির্মাণে কোম্পানিগুলিকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোম্পানিগুলিকে সরকার কয়েকটি বিষয়ে ‘গ্যারান্টি’ বা প্রতিশ্রুতি দেয়। এই ব্যবস্থা ‘গ্যারান্টি ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় বলা হয় যে,

  • (i) সরকার কোম্পানিগুলিকে রেলপথ নির্মাণের জন্য বিনামূল্যে জমি দেবে।
  • (ii) কোম্পানিগুলির বিনিয়োগ করা মূলধনের ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দেবে।
  • (iii) সুদ পরিশোধের পর লভ্যাংশ সরকার ও কোম্পানির মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হবে।
  • (iv) ২৫ বা ৫০ বছর পর সরকার ইচ্ছা করলে রেলপথগুলি ক্রয় করতে পারবে।
(২) গ্যারান্টি ব্যবস্থার প্রয়োগ

গ্যারান্টি ব্যবস্থা অনুসারে, ১৮৪৯-১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে রেলপথ নির্মিত হয়। এর মাধ্যমে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ৪,২৫৫ মাইল রেলপথ নির্মিত হয়।

(৩) দুর্নীতি

লাভের গ্যারান্টি থাকায় কোম্পানিগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করতে থাকে এবং তাদের বার্ষিক হিসেবে প্রচুর ঘাটতি দেখায়। প্রতি মাইল রেলপথ নির্মাণের খরচ পড়ে ১৬ হাজার পাউন্ড। ভারতের রাজস্ব থেকে এই ঘাটতি মেটানো হত। এর ফলে এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

(খ) সরকারি উদ্যোগ

  • (১) গ্যারান্টি ব্যবস্থায় নানা সমস্যা দেখা দিলে সরকার এই ব্যবস্থা বাতিল করে রেলপথ নির্মাণের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়। সরকারি উদ্যোগে ১৮৬৯ থেকে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশ কিছু রেলপথ নির্মিত হয়। সরকারি উদ্যোগে রেলপথ নির্মাণের ফলে কোম্পানিগুলির মুনাফা লাভের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
  • (২) তারা সরকারি মালিকানায় রেলপথ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য পার্লামেন্টের ওপর চাপ দিতে থাকে। এ ছাড়া, ঠিক এই সময় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ও ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধের ফলে ভারত সরকারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে রেলপথ নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়।

(গ) পুনরায় গ্যারান্টি ব্যবস্থা

সরকারি পরিচালনায় রেলপথ নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে রেলপথ নির্মাণে পুনরায় গ্যারান্টি ব্যবস্থা চালু হয়। –

(১) নতুন গ্যারান্টি ব্যবস্থার নীতি

কিন্তু রেলপথ নির্মাণ পরিকল্পনার দায়িত্ব থাকে সরকারের হাতে। কোম্পানিগুলিকে শুধু রেলপথ নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পূর্ববর্তী গ্যারান্টি ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন গারান্টি ব্যবস্থার সামান্য পার্থক্য ছিল। এই সময় পাঁচ শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে তিন শতাংশ সুদের গ্যারান্টি দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থাতেও কোম্পানিগুলি একদিকে যেমন প্রচুর মুনাফা লুটতে থাকে, অপরদিকে তেমনি রেল ব্যবস্থার যথেষ্ট সম্প্রসারণ ঘটে।

(২) রেল বোর্ড গঠন

ভারতীয় রেল ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে রেল বোর্ড গঠিত হয়। এর ফলে রেলের আয় বৃদ্ধি পায় ও রেল ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়। যাইহোক, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে প্রায় ২৮ হাজার মাইল রেলপথ নির্মিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে রেলের উন্নয়ন কিছুটা ব্যাহত হয়।

(৩) অ্যাকওয়ার্থ কমিটি

রেলপথের সম্প্রসারণ ও রেল প্রশাসন সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে স্যার উইলিয়াম অ্যাকওয়ার্থ-এর সভাপতিত্বে অ্যাকওয়ার্থ কমিটি’ নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি নিযুক্ত হয়। এই কমিটি রেলপথের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রতি পাঁচ বছরে ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ, দেশের সাধারণ বাজেট থেকে রেল বাজেটের পৃথকীকরণ এবং রেলপথের ওপর বেসরকারি নিয়ন্ত্রণের অবসান ও সরকারি নিয়ন্ত্রণে রেলপথ নির্মাণের সুপারিশ করে। বলা বাহুল্য, ব্রিটিশ সরকার তখন এই প্রস্তাব গ্রহণ করে নি।

(ঘ) পুনরায় সরকারি উদ্যোগ

  • (১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ভারতীয় নেতৃবৃন্দ রেল ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, কারণ এতে ভারতীয় অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছিল। এ ছাড়া, ভারতীয় যাত্রীদের প্রতি দুর্ব্যাবহার, ভারতীয় পণ্যের ওপর বাড়তি মাশুল প্রভৃতি সম্পর্কেও ভারতীয়রা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন।
  • (২) এই অবস্থায় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে সরকার কয়েকটি রেল কোম্পানির দায়িত্ব নিজ হাতে গ্রহণ করে, রেল বোর্ড পুনর্গঠিত হয় এবং রেলের বাজেট দেশের সাধারণ বাজেট থেকে পৃথক করা হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই কার্যকর ছিল।

ভারতীয় অর্থনীতিতে রেলপথ নির্মাণের প্রভাব

ড. বিপান চন্দ্র বলেছেন যে, “ভারতে রেলপথের প্রবর্তন ভারতীয় জনজীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। ভারতের ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে রেলপথ নির্মাণের গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই প্রভাব সদর্থক ও নঞর্থক উভয় ধরনেরই ছিল। যেমন –

(ক) সদর্থক প্রভাব

ভারতে রেলপথ নির্মাণের বিভিন্ন সদর্থক প্রভাব ছিল। যেমন –

(১) প্রশাসনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা

ভারতে রেলপথের বিস্তারের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রশাসনিক ঐক্য গড়ে ওঠে এবং এদেশে ব্রিটিশ শাসনের ভিত আরও শক্ত হয়।

(২) পরিবহণ বৃদ্ধি

পূর্বে ভারতে পশুচালিত শকট, নৌকা প্রভৃতি ছিল দেশের প্রধান পরিবহণ মাধ্যম। এই ব্যবস্থা ছিল ব্যয়বহুল, বিপজ্জনক ও সময়সাপেক্ষ। রেল ব্যবস্থার প্রসারের ফলে ভারতে মানুষ ও পণ্য উভয় পরিবহণের কাজে রেল যোগাযোগের ব্যবহার ব্যাপক বাড়ে। দেশের দূরদূরান্তে অতি দ্রুত চলাচলের সুবিধা হওয়ায় দুর্ভিক্ষ ও খরার সময় খাদ্য পাঠানো সহজ হয়।

(৩) আন্তর্জাতিক বাজার

পূর্বে আঞ্চলিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভারতে কৃষি-উৎপাদন চলত। কিন্তু রেলপথের প্রসারের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের প্রবেশ ঘটে। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি মূল্য পাওয়া যায়, এমন সব কৃষিপণ্যেরই উৎপাদন বাড়তে থাকে।

(৪) অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধি

পূর্বে পরিবহণ ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পণ্যমূল্যে যথেষ্ট পার্থক্য হত। রেলপথের মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারগুলির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং এক অঞ্চলের পণ্য অন্য অঞ্চলে সহজেই সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ফলে মূল্যস্তরে আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।

(৫) রপ্তানি বৃদ্ধি

রেলের মাধ্যমে স্বল্পব্যয়ে মালপত্র পরিবহণ করা সম্ভব হত। তাই গম, চাল, চা, পাট, চামড়া, তৈলবীজ, তুলো প্রভৃতি কাঁচামাল রেলের মাধ্যমে সহজে বন্দরে নিয়ে যাওয়া যেত। বন্দরগুলি থেকে ভারতে পণ্যসামগ্রী সহজে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। ১৮৬২ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত থেকে রপ্তানি বাণিজ্য প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পায়।

(৬) আমদানি বৃদ্ধি

রেলের সহায়তায় রপ্তানি বাণিজ্যের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভারতে বিদেশি পণ্যের আমদানির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। ইংল্যান্ডের কারখানায় উৎপাদিত শিল্পপণ্য, কাপড়, সুতো, মূলধনী সামগ্রী প্রভৃতি ভারতের বন্দরগুলি থেকে রেল যোগাযোগের মাধ্যমে সহজেই দেশের বিভিন্ন বাজারে চলে আসে। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে আমদানির পরিমাণ ৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিক থর্নটন তাই বলেন যে, “রেলপথ দিয়েই ভারতের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যায়। অপরদিকে, বিলাতি পণ্যে বাজার ছেয়ে যায়।”

(৭) শিল্প স্থাপন

কার্ল মার্কস বলেছিলেন যে, “রেলপথ ভারতে আধুনিক শিল্পায়নের প্রকৃত অগ্রদূত হবে।” বাস্তবক্ষেত্রে রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতে শিল্পের বিকাশের পটভূমি তৈরি হয়। রেল ব্যবস্থা স্বল্পব্যয়ে কাঁচামালের জোগান দিয়ে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছে দিয়ে লোহা, ইস্পাত, কয়লা প্রভৃতি আধুনিক শিল্পের বিকাশে সাহায্য করে। রেলের সুবিধার ফলে ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা ভারতে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়।

(৮) কর্মসংস্থান

ভারতে রেলপথের প্রসার শুরু হলে রেলপথ নির্মাণ, রেলকারখানা প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। দেশের ভূমিহীন কৃষকরা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে রেলের কাজে নিযুক্ত হয়। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় রেলে নিযুক্ত মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৭৩ হাজার।

(৯) জাতীয় ঐক্য

রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। ভাষা, ধর্ম ও গোষ্ঠীগত বিভেদের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে রেল ব্যবস্থা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও মতামত আদানপ্রদানের কাজে সুবিধা করে দেয়। এভাবে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পায়।

(খ) রেলপথ নির্মাণের নঞর্থক প্রভাব

দাদাভাই নওরোজি. জি. ডি. যোশি, ডি. ই. ওয়াচা, জি. এস. আয়ার, রমেশচন্দ্র দত্ত, বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা ভারতে রেল ব্যবস্থাকে সুনজরে দেখেন নি। তাঁদের মতে, ভারতে রেলপথের প্রসারের বিভিন্ন সদর্থক প্রভাব সত্ত্বেও এর বেশ কিছু নঞৰ্থক প্রভাবও ছিল। যেমন –

(১) সম্পদের বহির্গমন

রেলপথ নির্মাণের জন্য বার্ষিক ৫ শতাংশ হার সুদে গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মূলধন বিনিয়োগ করা হয়। এর ফলে সুদ ও মুনাফা হিসেবে প্রচুর পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর ইংল্যান্ডে চলে যেতে থাকে।

(২) বর্ণবৈষম্যের বিভিন্ন প্রকাশ

রেলে ভারতীয়দের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হত। মালপত্র পরিবহণে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে ভারতীয়দের বেশি ভাড়া দিতে হত এবং শ্বেতাঙ্গ যাত্রীরা ভারতীয় যাত্রীদের লাঞ্ছনা করত।

(৩) এদেশে ভারীশিল্পের প্রসার না ঘটা

রেলের ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিগুলি ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আমদানি করে এদেশে রেলপথ নির্মিত হয়। ফলে ভারতে রেলপথ নির্মিত হলেও এদেশে ভারীশিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটেনি।

(৫) কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্য

রেলপথের প্রসারের ফলে সরকারি উচ্চপদে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সব পদে শ্বেতাঙ্গদেরই নিযুক্ত করা হত। রেলের উচ্চপদগুলিতে মাত্র ১০ শতাংশ ভারতীয় নিযুক্ত ছিল।

(৬) দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব

রেল যোগাযোগের দ্বারা দুর্ভিক্ষকবলিত অঞ্চলে খাদ্য পাঠানো সহজতর হলেও পরোক্ষভাবে এই রেল ব্যবস্থাই আবার দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির জন্য দায়ী ছিল। কারণ, রেলের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য দেশের অন্যত্র, এমনকি বন্দরগুলিতে খুব দ্রুত পৌঁছানো যেত। এর ফলে বিদেশে নির্বিচারে রপ্তানির ফলে উৎপাদক অঞ্চলে খাদ্যের ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

(৭) জলপথ ও সেচের ক্ষতি

দেশের বিস্তীর্ণ অংশে রেলপথ এবং নদীনালার ওপর রেলের সেতু নির্মিত হলে নদীনালায় পলি সঞ্চিত হয়ে জলস্রোত কমে আসে এবং নদীর পরিবহণযোগ্যতা হ্রাস পায়। ফলে জনপথে পরিবহণ এবং কৃষিজমিতে সেচের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

(৮) দেশীয় শিল্প-বাণিজ্যের সর্বনাশ

রেলের মাধ্যমে ভারতের দূরদুরান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিলাতি পণ্যসামগ্রী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশীয় পণাগুলি অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয় এবং দেশীয় শিল্প বাণিজ্য মার যায়।

(৯) শাসনের ফাঁস কঠিন হওয়া

সারা ভারত জুড়ে রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতবাসীর ওপর ব্রিটিশ শাসকদের বজ্রমুষ্টি আরও শক্ত হয়। দেশের কোনো প্রান্তে কোনো বিদ্রোহ বা বিরোধিতার সামান্য সম্ভাবনা দেখা দিলে রেলপথের মাধ্যমে খুব শীঘ্র সেখানে পৌঁছে গিয়ে সরকারি বাহিনী তা দমন করতে সক্ষম হয়।

ভারতে রেলপথ বিস্তার সম্পর্কে বুকাননের মন্তব্য

জনৈক মার্কিন ঐতিহাসিক বুকানন বলেছেন, “স্বনির্ভরতার যে ধর্ম ভারতের গ্রামগুলিকে এতদিন রক্ষা করে এসেছিল, ইস্পাতের রেল সেই ধর্ম ভেদ করে গ্রামজীবনের রক্ত শোষণ শুরু করে দেয়।”

উপসংহার :- ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থেই ভারতে রেলপথের প্রতিষ্ঠা করে। ভারতে রেলপথের প্রসারের অনেক নেতিবাচক প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। তবে সার্বিক বিচারে রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতীয়রা উপকৃতই হয়। ভারতের কৃষি ও শিল্পের বিকাশ রেলের মাধ্যমেই সম্ভব হয়। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর এই রেলের মাধ্যমেই শিল্পায়নের পথে অগ্রসর হয়।

(FAQ) ভারতে রেলযাত্রার সূচনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতে প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয় কখন?

১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে।

২. ভারতের কোথায় প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়?

বোম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত।

৩. ভারতে রেলপথ প্রতিষ্ঠার সূচনাকালে গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?

লর্ড ডালহৌসি।

৪. ভারতের রেলপথের জনক কাকে বলা হয়?

লর্ড ডালহৌসি।

Leave a Comment