গোপালকৃষ্ণ গোখলে

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্ৰামী গোপালকৃষ্ণ গোখলে -র জন্ম, পিতামাতা, বাল্যকাল, শিক্ষা, কর্মজীবন, জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য, মধ্যপন্থী নেতা, আয়ারল্যান্ড সফর, কংগ্রেসের যুগ্ম সচিব, গোখলে ও তিলকের মিল গোখলে ও তিলকের মতপার্থক্য, জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি, সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠা, নরমপন্থী ও চরমপন্থী, কংগ্রেসে ভাঙ্গন, সমাজ সংস্কারক, লন্ডনে আমন্ত্রণ, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, বাঙালি জাতি সম্পর্কে মন্তব্য, গান্ধীজীর রাজনৈতিক গুরু, মহম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক গুরু, স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভাব ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

গোপালকৃষ্ণ গোখলে

জন্ম৯ মে, ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ
পরিচিতিভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী
প্রতিষ্ঠাতাসারভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি
রাজনৈতিক শিষ্যমহাত্মা গান্ধী ও মহম্মদ আলি জিন্না
মৃত্যু১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ
গোপালকৃষ্ণ গোখলে

ভূমিকা:- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আদিযুগের এক স্বনামধন্য রাজনৈতিক নেতা এবং এক বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ছিলেন গোপালকৃষ্ণ গোখলে।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের জন্ম

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ গোপালকৃষ্ণ গোখলে ১৮৬৬ সালের ৯ মে তৎকালীন বোম্বাই প্রেসিডেন্সির (অধুনা মহারাষ্ট্র রাজ্য) রত্নগিরি জেলারকোটালুকে জন্মগ্ৰহণ করেন।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের পিতামাতা

গোখলের পিতা ছিলেন কৃষ্ণারাও গোখলে এবং মাতা ছিলেন সত্যভামা বাই।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের বাল্যকাল

উচ্চবর্ণীয় চিৎপবন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও, গোখলের পরিবার ছিল অপেক্ষাকৃত দরিদ্র। তবুও তার পরিবার বাল্যকালে গোখলেকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন যাতে ভবিষ্যতে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে করণিক বা ছোটোখাটো পদের চাকরি লাভ করতে পারেন।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের শিক্ষা

  • (১) বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত ভারতীয়দের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন গোখলে। ১৮৮৪ সালে এলফিনস্টোন কলেজ থেকে তিনি স্নাতক হন। গোখলের শিক্ষা তার পরবর্তী কর্মজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।
  • (২) ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পাশ্চাত্য রাজনৈতিক ধ্যানধারণার সঙ্গে অবহিত হয়েছিলেন। এই সময় জন স্টুয়ার্ট মিল ও এডমন্ড বার্কের চিন্তাভাবনা তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে।
  • (৩) ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের নানা দিকের কঠোর সমালোচনা করলেও, কলেজ জীবনের শিক্ষা থেকে পাওয়া ইংরেজদের রাজনৈতিক তত্ত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ আমৃত্যু বজায় ছিল।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের কর্মজীবন

  • (১) গোপালকৃষ্ণ গোখলের কর্ম জীবন শুরু হয়১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ফার্গুসন কলেজের অধ্যাপক হিসেবে। পরবর্তীকালে তিনি প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মক্ষেত্রেপ্রবেশ করেন।
  • (২) বোম্বে হাইকোর্ট -এর বিচারপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন‌।জনসেবায় আত্মনিয়োগ করার জন্য ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেছিলেন

জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য

১৮৮৯ সালে গোখলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করেন। তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক মহাদেব গোবিন্দ রানাডে। তিনি দাদাভাই নওরোজি ও ফিরোজ শাহ মেহতাকেও অনুসরণ করতেন।

আইন সভায় ভারতীয় সদস্য বৃদ্ধির পক্ষে মত

বাল গঙ্গাধর তিলক, দাদাভাই নওরোজি, বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপৎ রায়, অ্যানি বেসান্ত প্রমুখ সমসাময়িক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ভারতীয়দের হাতে অধিকতর শাসনক্ষমতা দেওয়া ও আইনসভায় ভারতীয় প্রতিনিধিদের সংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

মধ্যপন্থী নেতা

রাজনৈতিক আদর্শের বিচারে তিনি ছিলেন মধ্যপন্থী নেতা। তিনি মনে করতেন, আবেদন-নিবেদন নীতিতে চললে ভারতীয় অধিকারগুলি আদায়ের ক্ষেত্রে ইংরেজদের সম্ভ্রম পাওয়া সহজ হবে।

আয়ারল্যান্ড সফর

গোপালকৃষ্ণ গোখলে আয়ারল্যান্ড সফর করেন এবং তারই উদ্যোগে আইরিশ জাতীয়তাবাদী নেতা আলফ্রেড ওয়েব ১৮৯৪ সালের জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

কংগ্রেসের যুগ্মসচিব

১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে গোখলে তিলকের সঙ্গে কংগ্রেসের যুগ্মসচিব নিযুক্ত হন।

গোখলে ও তিলকের মিল

  • (১) অনেক দিক থেকেই গোখলে ও তিলকের প্রাথমিক জীবন সংক্রান্ত নানা মিল ছিল। তারা দুজনেই ছিলেন চিৎপাবন ব্রাহ্মণ (যদিও তিলক ছিলেন ধনী)।
  • (২) দুজনেই এলফিনস্টোন কলেজে পড়াশোনা করেন, দুজনেই ছিলেন গণিতের অধ্যাপক এবং দুজনেই ছিলেন ডেকান এডুকেশন সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

গোখলে ও তিলকের মতপার্থক্য

কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর ভারতীয়দের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের উপায় সংক্রান্ত প্রশ্নে উভয়ের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকট হয়ে পড়ে।

জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি

১৯০৫ সালে গোখলে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি তার এই নবলব্ধ ক্ষমতা তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী তিলকের ক্ষমতা খর্ব করার কাজে ব্যবহার করেন।

সারভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠা

  • (১) ১৯০৫ সালে গোখলে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। এইরূপ রাজনৈতিক উচ্চতায় আসীন হওয়ার পর তিনি স্থাপন করেন সারভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি।
  • (২) সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে বলবতী ছিল তার হৃদয়ের গভীরতম ইচ্ছা – ভারতে শিক্ষার প্রসার।
  • (৩) গোখলে বিশ্বাস করতেন, নতুন প্রজন্ম দেশ ও দশের প্রতি তাদের সাধারণ ও জাতীয় কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত না হওয়া পর্যন্ত ভারতে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসা সম্ভবপর নয়।
  • (৪) আবার তিনি সেই যুগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসকেও এই শিক্ষার বিস্তারের জন্য যথোপযুক্ত মনে করতেন না। সংস্থার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার বিস্তার।
  • (৫) শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তারা ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার, বিদ্যালয় ও কারখানার শ্রমিকদের জন্য নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেন।গোখলের মৃত্যুর পর এই সংস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও, আজও এর অস্তিত্ব রয়েছে।

নরমপন্থী ও চরমপন্থী

গোখলে নরমপন্থী এবং তিলক চরমপন্থী গোষ্ঠীর নেতৃত্বদান করতে থাকেন। এই চরমপন্থীদেরই পরবর্তীকালে বলা হত উগ্র জাতীয়তাবাদী।

কংগ্রেসের ভাঙন

তিলক গণআন্দোলন ও প্রত্যক্ষ বিপ্লবের মাধ্যমে ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের ডাক দেন। অন্যদিকে গোখলে সংস্কারপন্থীই থেকে যান। কংগ্রেস দলও এই বিবাদের জেরে দুটি শাখায় ভেঙে গিয়ে এক দশকের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে। তবে ১৯১৫ সালে গোখলের মৃত্যুর পর দুই শাখা আবার পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিল।

সমাজ সংস্কারক

  • (১) গোখলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম যুগের একজন বিশিষ্ট নেতা হলেও প্রাথমিকভাবে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের থেকে সমাজ সংস্কারে অধিক গুরুত্ব আরোপ করতেন।
  • (২) তিনি মনে করতেন এই ধরনের সংস্কার বর্তমান ব্রিটিশ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমেই সম্ভব। এই জাতীয় চিন্তাভাবনার ফলে তিলকের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতৃবর্গের সঙ্গে তার শত্রুতা বৃদ্ধি পায়।
  • (৩) তবে এই ধরনের বিরোধিতায় নিরুৎসাহিত না হয়ে সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে তার সমগ্র রাজনৈতিক কর্মজীবনেই তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতার পরিবেশে প্রত্যক্ষভাবে সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন।

পরম প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি

১৮৯৯ সালে গোখলে বোম্বাই প্রাদেশিক আইনসভায় নির্বাচিত হন। এরপর ১৯০২ সালে নির্বাচিত হন ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে। সেখানে এক পরম প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরূপে তার পরিচিত হয়।

গোখলের সম্ভ্রম বৃদ্ধি

বার্ষিক বাজেট বিতর্কগুলিতে তিনি তার প্রতিভার সাক্ষর রেখে যান। ব্রিটিশদের মধ্যে গোখলের প্রতি সম্ভ্রম বৃদ্ধি পায়।

লণ্ডনে আমন্ত্রণ

ভারত সচিব লর্ড জন মর্লের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তিনি লন্ডনে নিমন্ত্রিতও হন। ১৯০৯ সালে প্রবর্তিত মর্লে-মিন্টো সংস্কার -এর খসড়াও এই সফরকালেই রচিত হয়েছিল।

আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি

১৯০৪ সালে নববর্ষ সম্মান তালিকায় গোখলে একজন সিআইই (কমপ্যানিয়ন অফ দি অর্ডার অফ দি ইন্ডিয়ান এমপায়ার) নিযুক্ত হন। এটি ছিল সাম্রাজ্যের প্রতি তার আনুগত্যের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

বাঙালি জাতি সম্পর্কে মন্তব্য

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালি জাতি সম্পর্কে তার বিখ্যাত উক্তি, বাঙালি আজ যা ভাবে, ভারত ভাবে আগামীকাল (What Bengal thinks today, India thinks tomorrow.)।

গান্ধীজির রাজনৈতিক গুরু

মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন গোখলে। ১৯১২ সালে গান্ধীজির আমন্ত্রণে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেন। এই সময় তরুণ ব্যারিস্টার গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরকারের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি গোখলের সারভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটির সদস্যপদ গ্রহণ করেননি।

জিন্নার রাজনৈতিক গুরু

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ আলি জিন্নারও আদর্শস্থানীয় ব্যক্তি তথা রাজনৈতিক গুরু ছিলেন গোখলে। ১৯১২ সালে জিন্না “মুসলিম গোখলে” হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভাব

  • (১) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গোখলে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ স্তর পর্যন্ত সম্পর্ক স্থাপন করে গোখলে কেবলমাত্র ভারতের তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিতই করে তোলেননি, তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সরকারি কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
  • (২) রাজনীতির আধ্যাত্মিকীকরণ, সমাজ সংস্কার ও বিশ্বজনীন শিক্ষায় দৃঢ় বিশ্বাসের দ্বারা অনুপ্রেরিত হয়েছিলেন তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মহাত্মা গান্ধী।
  • (৩) ১৯৫০ সালের ভারতীয় সংবিধান -এ যে ওয়েস্ট মিনিস্টার ধাঁচের সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, তা ছিল গোখলেরই চিন্তার ফসল।

গোপালকৃষ্ণ গোখলের মৃত্যু

অতিরিক্ত পরিশ্রমে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। ১৯১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হয়।

উপসংহার:- লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে গোপালকৃষ্ণ গোখলে দুটি মূল আদর্শে বিশ্বাস করতেন – সহিংসতা বর্জন ও সরকারি সংস্থার মধ্য থেকে সংস্কার সাধন।

(FAQ) গোপালকৃষ্ণ গোখলে সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক গুরু কে ছিলেন?

গোপালকৃষ্ণ গোখলে।

২. গোপালকৃষ্ণ গোখলে কোন হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন?

বোম্বে হাইকোর্ট।

৩. সারভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি কে, কি উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন?

গোপালকৃষ্ণ গোখলে, শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে।

৪. “What Bengal thinks today, India thinks tomorrow.” – কে বলেছেন?

গোপালকৃষ্ণ গোখলে।

Leave a Reply

Translate »