ভিয়েনা সম্মেলনের মূল্যায়ণ

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা শহরে অনুষ্ঠিত ভিয়েনা সম্মেলনের মূল্যায়ণ প্রসঙ্গে বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে পাঁচটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য, সম্মেলন বলা ঠিক নয়, স্বার্থ রক্ষায় পরিচালিত, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা, হ্যাজেনের মন্তব্য, ব্লুকারের মন্তব্য, রক্ষণশীল নেতৃত্ব, নেতৃবৃন্দের স্বার্থসিদ্ধি, স্থায়ীত্বের অভাব, ইতালি ও জার্মানির পরিস্থিতি, ন্যায্য অধিকার নীতি লঙ্ঘিত, সপক্ষে যুক্তি হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বিকাশের সূত্রপাত, স্থায়ীত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ, উদারতা, গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ফ্রান্স, পরবর্তীকালের ইউরোপ গঠন, ভবিষ্যত সম্ভবনা ও আন্তর্জাতিক সূচনা সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ভিয়েনা সম্মেলনের মূল্যায়ণ

সময়কালনভেম্বর ১৮১৪ – নভেম্বর ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ
স্থানভিয়েনা
সভাপতিপ্রিন্স মেটারনিখ
উদ্দেশ্যনেপোলিয়ন পরবর্তী ইউরোপের পুনর্গঠন
মূল নীতিন্যায্য অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও শক্তিসাম্য নীতি
ভিয়েনা সম্মেলনের মূল্যায়ণ

ভূমিকা :- আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হলেও ভিয়েনা সম্মেলনের কার্যাবলী কিন্তু কখনোই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এর পক্ষে ও বিপক্ষে ঐতিহাসিকরা নানা মত ব্যক্ত করেছেন।

(ক) বিপক্ষে যুক্তি

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ভিয়েনা সম্মেলনের নানা ভাবে সমালোচনা করা হয়।এই সম্মেলনের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে বিভিন্ন যুক্তি গুলি হল –

(১) পাঁচটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য

ভিয়েনা সম্মেলন নামেমাত্রই ইউরোপীয় রাষ্ট্রবর্গের সম্মেলন ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিলেও অস্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রাশিয়া ও ফ্রান্স—এই পাঁচটি রাষ্ট্রই ছিল সব। সম্মেলনের নিজেদের গোপন বৈঠকে তারা সব কিছু ঠিক করে রাখত। এই সম্মেলন ছিল তাদের সেই পূর্ব-নির্ধারিত সিদ্ধান্তগুলিকে আইনানুগভাবে গ্রহণের অনুষ্ঠান মাত্র।

(২) সম্মেলন বলা ঠিক নয়

ঐতিহাসিক রাইকার-এর মতে, ভিয়েনা সম্মেলন কখনোই কোনও সম্মেলন ছিল না। পাঁচটি বৃহৎ শক্তির বিদেশমন্ত্রীরাই ছিলেন সম্মেলন।

(৩) স্বার্থ রক্ষায় পরিচালিত

সম্মেলনের লক্ষ্য হিসাবে উদ্যোক্তারা ‘ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে ইউরোপের পুনর্গঠন, ‘ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস’, ‘ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ’ প্রভৃতি বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথা বললেও তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরাজিত দেশগুলির রাজ্যাংশ গ্রাস এবং নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করা।

(৪) প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা

ফলাফলের বিচারে অনেকেই এই সম্মেলনকে ‘একান্ত স্বার্থরক্ষার সম্মেলন প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক ডেভিড টমসন-এর মতে, এই সম্মেলন ছিল ‘আত্মস্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে দর কষাকষি ও সমঝোতার প্রতিফলন’।

(৫) হ্যাজেনের মন্তব্য

ঐতিহাসিক হ্যাজেন বলেন যে, ভিয়েনায় সমবেত রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের সম্পত্তির মতোই তাঁদের ইচ্ছামতো ইউরোপের পুনর্গঠন করেন।

(৬) ব্লুকারের মন্তব্য

প্রাশিয়ার নেপোলিয়ন-বিজেতা সেনাপতি ব্লুকার এই সম্মেলনকে ‘গবাদি পশুর মেলা’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

(৭) রক্ষণশীল নেতৃত্ব

ভিয়েনা সম্মেলনের নেতারা ছিলেন রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল। অষ্টাদশ শতকের ঘুণধরা মানসিকতা নিয়ে তাঁরা ইউরোপ পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। বিপ্লবের তরঙ্গে ভেসে আসা গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ উপলব্ধি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

(৮) নেতৃবৃন্দের স্বার্থসিদ্ধি

পুরোনো যুগ, মানসিকতা ও মতাদর্শের প্রতিনিধি এইসব নেতৃবৃন্দের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজ নিজ দেশের স্বার্থসিদ্ধি।

(৯) ডেভিড টমসনের মন্তব্য

অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, অষ্টাদশ শতকের মানসিকতায় গড়া ভিয়েনা সন্ধি ঊনিশ শতকের দ্রুতগামী ঐতিহাসিক জগতে বাতিল হয়ে যায়।

(১০) স্থায়িত্বের অভাব

ভিয়েনা বন্দোবস্তের অস্থায়িত্বই হল এর সবচেয়ে বড়ো ত্রুটি। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃমণ্ডলী পুরাতনতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হন, কিন্তু তাঁদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউরোপে তীব্র আন্দোলন গড়েওঠে। এই আন্দোলনের ফলেই ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত ও সংশোধিত হতে শুরু করে।

(১১) হেজ-এর মন্তব্য

অধ্যাপক হেজ (Hayes)-এর মতে, এইসব রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের খুব অল্পই ছিল চিরস্থায়ী এবং বেশির ভাগই ছিল ক্ষণস্থায়ী। বেলজিয়াম ও হল্যান্ডের সংযোজন মাত্র পনেরো বছর স্থায়ী হয়।১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের পর বেলজিয়াম হল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

(১২) ইতালি ও জার্মানির পরিস্থিতি

ইতালি ও জার্মান-ব্যবস্থাও মাত্র পঞ্চান্ন বছরের মতো স্থায়ী হয় ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতালি ও জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ে ও সুইডেন পৃথক হয়ে পড়ে।১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ফিনল্যান্ড রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। 

(১৩) ন্যায্য অধিকার নীতি লঙ্ঘিত

সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ ন্যায্য অধিকার নীতির উপর গুরুত্বের কথা ঘোষণা করলেও সর্বদা তা বাস্তবায়িত হয় নি। শক্তিসাম্য নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় ন্যায্য অধিকারের আদর্শ বারংবার লঙ্ঘিত হয়েছে। ফ্রান্স, রোম, সিসিলি প্রভৃতি দেশের ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকারের নীতি প্রযুক্ত হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই নীতি প্রয়োগ করা হয় নি।

(১৪) বৈধ অধিকার উপেক্ষা

নেপোলিয়ন ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ পতন ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু ভিয়েনাতে তার পুনরুত্থাপন ঘটানো হয় নি। জেনোয়া ও ভেনিসের প্রজাতান্ত্রিক সরকারের পুনর্বাসন হয় নি, পোল্যান্ডের পূর্বাবস্থা ফিরে আসে নি—সেখানে রাশিয়ার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পোল্যান্ড ছাড়া পশ্চিম জার্মানি, স্যাক্সনি, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ড বা বেলজিয়ামের ক্ষেত্রে বৈধ অধিকার নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করা হয় নি।

(১৫) প্রজা ও জনসাধারণ উপেক্ষিত

আসলে ভিয়েনায় সমবেত কূটনীতিকরা বৈধ অধিকার বলতে কেবলমাত্র রাজতন্ত্রের বৈধ অধিকারের কথাই ভেবেছেন—প্রজা, প্রজাতন্ত্র বা জনসাধারণের নয়।

(১৬) প্রজাতন্ত্র অস্বীকৃত

রাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে নৈবাধিকার নীতি পালিত হলেও প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রে তা অস্বীকৃত হয়েছে। এই ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মেটারনিখ বলেন যে, “এই যুগে প্রজাতান্ত্রিক শাসন অচল হয়ে গেছে।”

(১৭) ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে হ্যাজেনের মন্তব্য

অধ্যাপক হ্যাজেন বলেন যে, ন্যায্য অধিকার নীতিটি ছিল বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গের ‘আলঙ্কারিক বাগাড়ম্বর’ মাত্র। একচক্ষু হরিণের মতো তারা কেবল রাজতন্ত্রের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় তৎপর ছিল—প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নয়।

(১৮) যুগধর্ম উপেক্ষিত

সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ যুগধর্ম অর্থাৎ ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত গণতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শকে উপেক্ষা করে ইতিহাসের বাতিল হয়ে যাওয়া আদর্শগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এই জন্যই তাঁরা ইতালি, জার্মানি, স্পেন, পোল্যান্ড ও ইউরোপের অন্যান্য স্থানে প্রস্ফুটিত জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছিলেন।

 (১৯) অভিজাতদের সম্মেলন

অধ্যাপক হ্যাজেন বলেন যে, “ভিয়েনা কংগ্রেস ছিল অভিজাতদের সম্মেলন। তাঁদের কাছে ফরাসি বিপ্লব-ঘোষিত জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র দুর্বোধ্য ও ঘৃণ্য ছিল।” তাই এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ভিয়েনা সম্মেলন ছিল প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

(খ) সপক্ষে যুক্তি

নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও ভিয়েনা সম্মেলনকে একেবারে অর্থহীন বা প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দেওয়া যুক্তিসম্মত হবে না। এই সম্মেলনের ইতিবাচক দিকগুলো হল –

(১) শান্তি প্রতিষ্ঠা

বিপ্লব ও যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইউরোপের মানুষ শান্তির জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড নিকলসন বলেন যে, ভিয়েনা বন্দোবস্ত দীর্ঘদিন ইউরোপকে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। অধ্যাপক ডেভিড টমসন-এর মতে, ভিয়েনা সম্মেলন মোটামুটিভাবে চল্লিশ বছরের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

(২) বিকাশের সূত্রপাত

ভিয়েনা সম্মেলনইউরোপে দীর্ঘ সময় ধরে যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলতার ফলেই ইউরোপে সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকে।

(৩) রাজনীতিক মাত্র

পৃথিবীতে কোনও শান্তিচুক্তিই চিরস্থায়ী নয়। ঐতিহাসিক হারনশ-এর মতে, ভিয়েনার নেতৃবর্গ কেউই ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা মহাপুরুষ ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন রাজনীতিক মাত্র। সুতরাং, তাঁরা যে আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী শান্তিচুক্তি স্থাপনে সক্ষম হবেন, এমন আশা করা অন্যায়।

(৪) গোপন চুক্তি উপেক্ষা করা অসম্ভব

নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় বিভিন্ন শক্তিবর্গ নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন গোপন চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যভাগের বন্দোবস্ত করেছিল। ভিয়েনা চুক্তি সম্পাদনকালে এই গোপন চুক্তিগুলিকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

(৫) স্থায়িত্ব

নেতৃমণ্ডলীর পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করার কোনও উপায় ছিল না। তা সত্ত্বেও এই চুক্তির স্থায়িত্ব সম্পর্কে কোনও সংশয় নেই। বারট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russel) বলেন যে, স্থায়িত্বের বিচারে ভিয়েনা ব্যবস্থা ১৯১৯-এর ভার্সাই ব্যবস্থা অপেক্ষা কৃতিত্বপূর্ণ। ইতিপূর্বে ইউরোপের রাষ্ট্রবর্গের মিলিত কোনও সিদ্ধান্তই ভিয়েনার মতো দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।

(৬) গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ

বলা হয় যে, ভিয়েনার নেতৃবর্গ গণতন্ত্র, উদারনৈতিকতা ও জাতীয়তাবাদকে উপেক্ষা করেছেন। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন-এর মতে, এই অভিযোগ যথার্থ নয়, কারণ “১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে খুব কম লোকই গণতন্ত্র ও উদারতন্ত্রের তাৎপর্য বুঝেছিল। সুতরাং সন্ধি-নির্মাতাদের উপর দোষারোপ করা নিষ্ফল।”

(৭) ক্রোসির মন্তব্য

ঐতিহাসিক ক্রোসি-র মতে, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে উদারনীতিছিল একটি “অর্ধজাগ্রত প্রবণতা” এবং ‘সংখ্যালঘিষ্ঠের ধর্ম।

(৮) সীম্যানের মন্তব্য

ঐতিহাসিক সীম্যান বলেন যে, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদের আদর্শ গ্রহণ করা অসম্ভব ও অনভিপ্রেত ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি বেলজিয়াম ও জার্মানির কথা বলেছেন। যেমন –

  • (i) তাঁর মতে ১৮১৫এমনকী ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দেও স্বাধীন বেলজিয়ামের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত না করলে তা ফ্রান্সের আক্রমণের শিকার হত।
  • (ii) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির ঐক্যের কোনও সম্ভাবনা ছিল না, এবং কেউ তা চায়ও নি। ইতালিকে অস্ট্রিয়ার অধীনে না আনলে ফ্রান্স সেখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হত।

(৯) ক্রেইগের মন্তব্য

অধ্যাপক গর্ডন ক্রেইগ বলেন যে, ভিয়েনার নেতৃমণ্ডলী তখন যদি ইউরোপে ফরাসি বিপ্লব-প্রসূত ভাবধারা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতেন, তাহলে ইউরোপে অশান্তি দেখা দিত, বিভিন্ন রাজন্যবর্গ তা মানতেন না এবং এর ফলে ইউরোপে শান্তি প্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত হত।

(১০) উদারতা

ভিয়েনা চুক্তির উদারতা অতি প্রশংসনীয়। এই চুক্তি ইউট্রেক্টের সন্ধি (১৭১৩ খ্রিঃ) বা ভার্সাই সন্ধি (১৯১৯ খ্রিঃ) অপেক্ষা অনেক উদার ছিল। এর মধ্যে নতুন কোনও যুদ্ধ বা অশান্তির বীজ নিহিত ছিল না। ভিয়েনা চুক্তিতে ফ্রান্সের প্রতি কঠোর প্রতিশোধমূলক কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নি। পরাজিত ফ্রান্সের সঙ্গে যে প্যারিসের দ্বিতীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়, তার নমনীয়তায় দার্শনিক রাসেল বিস্মিত হয়েছিলেন।

(১১) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ফ্রান্স

এই সন্ধি ভার্সাই সন্ধির (১৯১৯ খ্রিঃ) মতো জার্মানির উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া (‘Dictated Peace’) হয় নি — ভিয়েনা সন্ধির শর্ত আলোচনায় ফ্রান্স ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অধ্যাপক হব এই চুক্তিকে ‘বাস্তবোচিত ও যুক্তিসম্মত’ বলে অভিহিত করেছেন।

(১২) গ্ৰান্ট ও টেম্পারলির মন্তব্য

ঐতিহাসিক গ্রান্ট ও টেম্পারলি বলেন যে, ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ পুরাতনতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ব্রতী হলেও এবং নতুন মতাদর্শগুলিকে অগ্রাহ্য করলেও পুরাতনতন্ত্রের উৎকৃষ্ট দিকগুলিই তাঁরা তুলে ধরেছিলেন। এটি ছিল প্রকৃতই একটি শান্তির উদ্যোগ।

(১৩) পরবর্তীকালের ইউরোপ গঠন

কেটেলবি বলেন যে, এই ভিয়েনা বন্দোবস্তের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ইউরোপ গড়ে ওঠে।

(১৪) ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এই সন্ধির মধ্যে ভবিষ্যতের কয়েকটি সম্ভাবনার বীজ নিহিত ছিল। যেমন –

  • (i) ইতালিতে পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে জেনোয়াকে যুক্ত করায় পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া ইতালির অন্যতম শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয় এবং এই রাজ্যের নেতৃত্বে ইতালির মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়।
  • (ii) রাইন অঞ্চল প্রাশিয়ার অধীনে আসায় প্রাশিয়া শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আগামীদিনে প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্য আন্দোলন শুরু হয়।
  • (iii) ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার ভূখণ্ড লাভের ফলে তুরস্কের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং প্রাচ্য সমস্যার পুনরুত্থাপন ঘটে। এর ফলে গ্রিস স্বাধীনতা লাভ করে এবং সার্বিয়ায় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

(১৫) আন্তর্জাতিকতার সূচনা

জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করলেও ভিয়েনা সম্মেলন আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে ‘লিগ অফ নেশনস্’ এবং ‘ইউ. এন. ও’-র ভিত্তি এখানেই রচিত হয়।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন-এর মতে, নানা ত্রুটি সত্ত্বেও “ভিয়েনা ব্যবস্থা ছিল মোটামুটি একটি যুক্তিসঙ্গত ও রাষ্ট্রনীতিজ্ঞমূলক সন্ধি।”

(FAQ) ভিয়েনা সম্মেলনের মূল্যায়ণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কোথায় ভিয়েনা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়?

নভেম্বর ১৮১৪ – নভেম্বর ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা শহরে।

২. ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি কে ছিলেন?

প্রিন্স মেটারনিখ।

৩. ভিয়েনা সম্মেলনের নীতি গুলি কি ছিল?

ন্যায্য অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও শক্তিসাম্য নীতি।

৪. ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য কি ছিল?

নেপোলিয়ন পরবর্তী ইউরোপের পুনর্গঠন।

Leave a Reply

Translate »