সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে মধ্যযুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সামন্ততন্ত্র, সামন্ততান্ত্রিক যুগ, সামন্ততন্ত্রের অর্থ ও সংজ্ঞা, সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্থানীয় ভূস্বামীদের প্রাধান্য, শোষিত কৃষক ও ভূমিদাস, জমির গুরুত্ব, ম্যানর ব্যবস্থা, যোদ্ধা শ্রেণি, বেগার প্রথা ও অনুন্নত অবস্থা সম্পর্কে জানবো।

সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

ঐতিহাসিক ঘটনাসামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য
ফিউডালিজমইংরেজি শব্দ
ফিওডালিসলাতিন শব্দ
ফিওডালিতেফরাসি শব্দ
দরিদ্র কৃষকভ্যাসাল
বীর যোদ্ধানাইট
সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

ভূমিকা :- প্রাচীন ও মধ্য যুগের ইউরোপ-সহ ভারতের অর্থনীতিতে কখনো-কখনো বিশেষ ধরনের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল যেখানে কেন্দ্রীয় শক্তির অধীনে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ ঘটেছিল। এই কাঠামো সামন্ততন্ত্র নামে পরিচিত।

মধ্যযুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সামন্ততন্ত্র

প্রকৃত অর্থে, যে বৈশিষ্ট্যগুলি ইতিহাসের কোনো সময়কালকে মধ্যযুগ হিসেবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে সেগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল সামন্ততন্ত্র বা সামন্তপ্রথা।

সামন্ততান্ত্রিক যুগ

ইউরোপের ইতিহাসে সামন্ততন্ত্র এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যে অনেক সময় মধ্যযুগকেই সামন্ততান্ত্রিক যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

সামন্ততন্ত্রের অর্থ

ইংরেজি ‘ফিউডালিজম’ কথাটির বাংলা প্রতিশব্দ হল ‘সামন্ততন্ত্র’ বা ‘সামন্তপ্রথা’। ‘ফিউডালিজম’ কথাটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘ফিওডালিস’ এবং ফরাসি শব্দ ‘ফিওডালিতে’ থেকে।

সামন্ততন্ত্রের সংজ্ঞা

নির্দিষ্ট কোনো একটি সংজ্ঞার দ্বারা সামন্ততন্ত্রকে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন  –

  • (১) সাধারণভাবে সামন্ততন্ত্র বলতে কোনো সরকারি ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পরিবর্তে স্থানীয় ভূস্বামীদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত হয়ে থাকে।
  • (২) বোলাভিয়ের-এর মতে, সামন্ততন্ত্র হল সার্বভৌম অধিকারের বিভাজন যেখানে প্রশাসনকে খণ্ডিত ও বিকেন্দ্রীভূত করে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
  • (৩) কার্ল মার্কসের মতে, স্বাধীনতাহীন শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা বৃহৎ ভূসম্পত্তিতে কৃষি ও হস্তশিল্পজাত পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করার ব্যবস্থাই হল সামন্তব্যবস্থা। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যেই সামন্ততন্ত্রের উত্থান ঘটেছিল বলে কোনো কোনো পণ্ডিত অভিমত পোষণ করে থাকেন। প্রাচীন যুগে ইউরোপ-সহ ভারতে অর্থনীতির কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচ লক্ষ করা গেলেও মূলত মধ্যযুগেই সামন্ততন্ত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল।

সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য

ধ্রুপদি যুগে পশ্চিম ইউরোপে যে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটে তাতে বিভিন্ন দেশের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোগত কিছু নিজস্বতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশে সামন্ততন্ত্রের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন –

(ক) স্থানীয় ভূস্বামীদের প্রাধান্য

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের সর্বত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য স্থানীয় সামন্তপ্রভু বা ভূস্বামীদের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হত। আঞ্চলিক এই সামন্তপ্রভুরা নিজেদের স্থানীয় এলাকায় চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। আঞ্চলিক সামন্তপ্রভুরা কেন্দ্রীয় শাসক অর্থাৎ রাজাকে যুদ্ধের সময় সেনা সরবরাহ করে সহায়তা করতেন। ফলে দেশের কেন্দ্রীয় শক্তি কখনোই যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারত না। কেন্দ্রীয় শক্তিকে বিভিন্ন বিষয়ে আঞ্চলিক সামন্তপ্রভুর ওপর নির্ভর করতে হত।

(খ) শোষিত কৃষক ও ভূমিদাস

  • (১) সামন্তপ্রভুদের দ্বারা তাদের অধীনস্থ কৃষক শ্রেণি বা ভ্যাসাল এবং ভূমিদাসদের শোষণ করার বিষয়টি সামন্ততন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বলে মার্ক ব্লখ মনে করেন। কৃষকরা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে তাদের ঊর্ধ্বতন প্রভুর কাছ থেকে কৃষিজমি লাভ করত এবং এর বিনিময়ে কৃষকের উদ্‌বৃত্ত উৎপাদন প্রভু ভোগ করত।
  • (২) কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর ও বেগার শ্রম শোষণ করে প্রভু তাদের নিঃস্ব করে দিত। ভূমিদাসদের ওপর শোষণের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। নিঃস্ব ভূমিদাসরা প্রভুর জমিতে কাজ করে কায়ক্লেশে দিন কাটাত। সর্বোপরি তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের সামন্ততান্ত্রিক করের বোঝা চেপে বসেছিল।

(গ) জমির গুরুত্ব

সামন্তপ্রথায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জমি। অধীনস্থ জমির পরিমাণের দ্বারা কোনো সামন্তপ্রভুর আভিজাত্য ও মর্যাদা বিচার করা হত। যে প্রভুর যত বেশি জমি থাকত সেই প্রভু তত বেশি ভ্যাসাল ও ভূমিদাস নিয়োগ করতে পারত এবং উর্ধ্বতন লর্ডকে তত বেশি রসদ জোগান দিতে পারত। নর্মান সামরিক যোদ্ধারা তাদের প্রভু বা লর্ডদের দান করা ঘোড়া, অলংকার ও অস্ত্রশস্ত্রের পরিবর্তে প্রভুর কাছে জমি প্রার্থনা করেছিল। এর থেকে সামন্তব্যবস্থায় জমির গুরুত্বের বিষয়টি কল্পনা করা যায়।

(ঘ) ম্যানর ব্যবস্থা

কার্ল মার্কস সামন্ততন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ম্যানর ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। সামন্তপ্রভুর অধীনস্থ কৃষিভিত্তিক গ্রামগুলি ছিল সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। এই গ্রামগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত ম্যানর ব্যবস্থা। ম্যানর এলাকায় প্রভু ম্যানর হাউস প্রতিষ্ঠা করে সেখানে অবস্থান করতেন এবং সেখান থেকে নিজের এলাকায় কৃষকদের উৎপাদনের কাজে নিযুক্ত রাখতেন। এভাবে ম্যানর হাউস থেকে প্রভু তাঁর অধীনস্থ কৃষক ও ভূমিদাসদের অর্থ ও শ্রম শোষণ করতেন।

(ঙ) যোদ্ধা শ্রেণি

  • (১) সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি সুসংবদ্ধ যোদ্ধা শ্রেণির গঠন ও যোদ্ধাদের স্বার্থ-সংরক্ষণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সামন্ততন্ত্রে বীর যোদ্ধাদের বলা হত ‘নাইট’। সামন্তব্যবস্থায় স্থানীয় ভূস্বামীরা সামরিক নেতায় পরিণত হন এবং তাঁদের নেতৃত্বে সমাজে সশস্ত্র কৃষক শ্রেণির উত্থান ঘটে।
  • (২) বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করা ছাড়া অভ্যন্তরীণ সংকটের মোকাবিলা করাও এই যোদ্ধা শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। সামন্ততান্ত্রিক যুগে স্থানীয় ভূস্বামীদের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা গ্রহণ করেই রাজা বা সম্রাট অভিজাত-বিরোধী বিক্ষোভ দমন করতেন।

(চ) বেগারপ্রথা

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন সামন্তপ্রভু তাঁর কৃষিজমি ও খামারে বিনা পারিশ্রমিকে তাঁর অধীনস্থ কৃষকদের শ্রমদানে বা বেগার খাটতে বাধ্য করতেন। দুর্যোগের সময় কৃষককে তার নিজের জমির ফসল রক্ষা করার পরিবর্তে প্রভুর জমির ফসল রক্ষা করতে বাধ্যতামূলকভাবে বেগার শ্রম দিতে হত।

(ছ) অনুন্নত ব্যবস্থা

সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষিপ্রযুক্তি, শ্রমবিভাজন নীতি প্রভৃতি সবই নিম্নমানের ছিল বলে ইতিহাসবিদ মরিস ডব উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই অনুন্নত ব্যবস্থার কারণে কৃষিজমির আয়তন ও কৃষকের বিপুল সংখ্যার অনুপাতে কৃষি উৎপাদন যথেষ্ট কম হত। অবশ্য এই স্বল্প উৎপাদনই তৎকালীন মানুষের চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল। কারণ, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদন হত প্রধানত গ্রামীণ সমাজের ভোগের প্রয়োজনেই।

উপসংহার :- সামন্ত প্রভুর বিভিন্ন ধরনের শোষণে জর্জরিত হয় কৃষকরা প্রকৃতপক্ষে ভূমিদাসে পরিণত হয়েছিল। দরিদ্র কৃষকের উপর প্রভু এবং চার্চ বিভিন্ন ধরনের কর চাপিয়ে তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতো।

(FAQ) সামন্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইংরেজি কোন শব্দ থেকে বাংলা সামন্ততন্ত্র কথাটি এসেছে?

ফিউডালিজম।

২. কোন লাতিন শব্দ থেকে ফিউডালিজম কথাটি এসেছে?

‘ফিওডালিস’।

৩. কোন ফরাসি শব্দ থেকে ফিউডালিজম কথাটি এসেছে?

‘ফিওডালিতে’।

৪. সামন্ত প্রভুর অধীনস্থ অগণিত দরিদ্র কৃষক কি নামে পরিচিত ছিল?

ভ্যাসাল।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment