অশোকের সাম্রাজ্য

অশোকের সাম্রাজ্য সীমা প্রসঙ্গে কলিঙ্গ জয়, শিলালিপির প্রাপ্তিস্থান, উত্তর-পশ্চিম সীমানা, পশ্চিম ভারত, দাক্ষিণাত্য, সীমান্ত উপজাতিসমূহ, প্রতিবেশী রাজ্য, বাংলা, কাশ্মীর ও স্থাপত্য নিদর্শন থেকে প্রমান সম্পর্কে জানবো।

অশোকের সাম্রাজ্য

বিষয় অশোকের সাম্রাজ্য
রাজা অশোক
যুদ্ধজয় কলিঙ্গ যুদ্ধ
রাজতরঙ্গিনী কলহন
বন্দর তাম্রলিপ্ত
অশোকের সাম্রাজ্য

ভূমিকা :- অশোকের শিলা ও স্তম্ভলিপি গুলির প্রতিষ্ঠার স্থান ও শিলালিপির দেওয়া তথ্য থেকে এবং অশোকের স্থাপত্য নিদর্শন থেকে অশোকের আমলে মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমা কতদূর বিস্তৃত হয়েছিল তা জানতে পারা যায়।

কলিঙ্গ জয়

অশোক তাঁর জীবনকালে কেবলমাত্র কলিঙ্গ দেশ জয় করেন। সুতরাং ধরে নেওয়া যায় যে, অধিকাংশ স্থান চন্দ্রগুপ্ত এবং বিন্দুসার জয় করেন।

হালসের মন্তব্য

হালস (Hultzsch) নামে এক পণ্ডিত মন্তব্য করেছেন যে, “অশোকের সাম্রাজ্য সীমা তাঁর শিলালিপিগুলির অবস্থান থেকে বোঝা যায়। কারণ এগুলি তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তে স্থাপিত হয়েছিল।”

শিলালিপি গুলির প্রাপ্তিস্থান

প্রথমে অশোকের শিলালিপিগুলির প্রাপ্তিস্থানের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। তার আলোকে তাঁর সাম্রাজ্যসীমা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা করা সম্ভব।

  • (১) মৌর্য সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমায় কলিঙ্গের অধুনা উড়িষ্যার ধৌলিতে এবং অন্ধ্রের গঞ্জামের জৌগড় গ্রামে অশোকের চতুর্দশ শিলালিপি পাওয়া যায়। এটিই হল মৌর্য সাম্রাজ্যের পূর্বতম সীমা। এর পরেইবঙ্গোপসাগর।
  • (২) উত্তর-পূর্বে লুম্বিনী বা রুম্মিনদেই ও নিগ্লীভ স্তম্ভলিপি গুলির প্রাপ্তিস্থান নেপালের তরাই অঞ্চলে অশোকের রাজ্যের উত্তর-পূর্ব সীমা নির্দেশ করছে।
  • (৩) দেরাদুন জেলার কালসী গ্রামে অশোকের চতুর্দশ শিলালিপির একপ্রস্থ পাওয়া গেছে। এই প্রাপ্তিস্থানকে হিমালয় অঞ্চলে তাঁর রাজ্যসীমার চিহ্ন বলে মনে করা যায়।
  • (৪) বর্তমান পাকিস্তানের হাজারা জেলার মানসেরা গ্রামে এবং পেশোয়ার জেলার শাহবাজগড়ি গ্রামে দুপ্রস্ত চতুর্দশ শিলালিপি পাওয়া গেছে। এই দুই স্থানকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের নির্দেশক মনে করা যায়।

উত্তর-পশ্চিম সীমানা

  • (১) মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছাড়িয়ে হিন্দুকুশ পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে গ্রীক সূত্র থেকে জানা যায়। সেলুকাসের কাছ থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই সকল স্থানগুলি পান।
  • (২) এই কথার সমর্থন মিলছে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকারের আবিষ্কারের ফলে। আফগানিস্থানের জালালাবাদে এবং গান্ধারের তক্ষশীলায় অ্যারামাইক লিপিতে লেখা অশোকের শিলালেখ পাওয়া গেছে।
  • (৩) এই অঞ্চলে অশোকের গ্রীক ও খরোষ্ঠী দ্বিভাষিক লিপিও পাওয়া গেছে। এ থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কাবুল, কান্দাহার, হিরাট ও বালুচিস্থান সেলুকাসের কাছ থেকে দখল করেন। মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমানা হিন্দুকুশ ছুঁয়ে গিয়েছিল।

পশ্চিম ভারত

মৌর্য সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমানার ক্ষেত্রে কাথিয়াবাড়ের জুনাগড়ে অশোকের শিলালিপি পাওয়া গেছে। মহারাষ্ট্রের থানা জেলায় সোপারা বা সুপর্কে অশোকের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, পশ্চিমে আরব সমুদ্র পর্যন্ত মৌর্য সাম্রাজ্য প্রসারিত ছিল।

দাক্ষিণাত্য

দক্ষিণে অন্ধ্র প্রদেশের কুরনুল জেলার এরাগুড়িতে অশোকের একপ্রস্থ চতুর্দশ লিপি পাওয়া গেছে। এছাড়া মহীশূরের চিতলদ্রুগ জেলায় অশোকের তিন প্রস্থ অপ্রধান শিলালিপি পাওয়া গেছে। এই দুটি প্রাপ্তিস্থান থেকে প্রমাণিত হয় যে, অন্ধ্রের কুরনুল ও মহীশূরের চিতলদ্রুগ জেলা পর্যন্ত নিশ্চয়ই অশোকের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।

ভৌগোলিক অবস্থান থেকে ধারণা

অশোকের শিলালিপিগুলি নিশ্চয়ই সাম্রাজ্যের তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ শাসনকেন্দ্রে বা বাণিজ্য কেন্দ্রে স্থাপিত হয়েছিল। এই লিপিগুলির ভৌগোলিক অবস্থান প্রমাণ করে যে, অশোকের সাম্রাজ্য হিন্দুকুশ পর্বত থেকে দক্ষিণে অন্ধ্র ও মহীশূর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে আরব সাগর থেকে পূর্বে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

সীমান্ত উপজাতিসমূহ

অশোকের শিলালিপিগুলিতে যে তথ্য উৎকীর্ণ আছে তা থেকে তাঁর রাজ্যসীমা সম্পর্কে আরও সঠিক ও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। এই প্রমাণকে আমরা আভ্যন্তরীণ প্রমাণ বলব। যেমন –

  • (১) দ্বিতীয়, পঞ্চম ও ত্রয়োদশ শিলালিপিতে অশোক তার রাজ্যের সীমান্তে যারা বসবাস করত তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। এরা হল, যোন অর্থাৎ যবন বা গ্রীক, কম্বোজ, ভোজ, গান্ধার, নভক, রাষ্ট্রিক, অন্ধ্র, পরিন্দ। এই জাতিগুলির সকলের সনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি।
  • (২) যোন বা গ্রীক উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে কান্দাহারে, কম্বোজ জাতি রজৌরি, কাবুল, বেগ্রাম অঞ্চলে, গান্ধার জাতি তক্ষশীলায় বসবাস করত বলে জানা যায়। ভোজ ও রাষ্ট্রিক উভয়েই মহারাষ্ট্রে বসবাস করত। মহারাষ্ট্রের নাসিক ও পুনা জেলায় রাষ্ট্রিকরা বাস করত। থানা ও কোলাবা জেলায় ভোজরা বাস করত।
  • (৩) এছাড়া মধ্যপ্রদেশ, হায়দরাবাদেও ভোজরা বাস করত। অন্ধ্ররা বর্তমান অন্ধ্রদেশে বসবাস করত। নভক ও পরিন্দদের বাসস্থান সঠিক জানা যায় নি। বিভিন্ন পণ্ডিত এই দুই উপজাতির বিভিন্ন স্থানে বাসস্থান নির্দেশ করেছেন।
  • (৪) যাই হোক, ডঃ রায়চৌধুরী পরিন্দদের অন্ধ্রের প্রতিবেশী ছিল বলে মনে করেন। আর নভকরা সম্ভবত নেপাল সীমান্তে বসবাস করত। এই উপজাতিগুলি ছিল অশোকের সীমান্তে বসবাসকারী প্রজা।

প্রতিবেশী রাজ্য

  • (১) অশোক তার দ্বিতীয় ও ত্রয়োদশ শিলালিপিতে ‘অন্ত’ অর্থাৎ সীমান্তের পারে প্রতিবেশী দেশগুলির নাম দিয়েছেন। এ থেকেও মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানা সম্পর্কে জানা যায়। দক্ষিণে তাঁর প্রতিবেশীরা ছিল চোড বা চোলগণ, পাণ্ড্যগণ, সতিয়পুত্র, কেরলপুত্র বা কেরল। এখানে লক্ষ্য করা যায় যে, অশোক চোল ও পাণ্ড্যদের ক্ষেত্রে বহু বচন, সতিয়পুত্র ও কেরলপুত্রের ক্ষেত্রে একবচন ব্যবহার করেছেন।
  • (২) অশোকের আমলে দুটি চোল রাজ্যের কথা জানা যায়। দক্ষিণ চোল রাজ্যের রাজধানী টলেমির মতে ছিল ওরখৌরা। কানিংহাম এই স্থানটিকে ত্রিচিনপল্লীর কাছে উরাইয়ূব বলে চিহ্নিত করেছেন। আর উত্তর চোল রাজ্যের রাজধানী ছিল আর্কট।
  • (৩) পাণ্ড্যদেরও দুটি রাজ্যের কথা জানা যায়। টলেমির মতে মাদুরাই, তিরুনেলভেলি ও তৎসংলগ্ন জেলা নিয়ে একটি পাণ্ড্য রাজ্য এবং সম্ভবত মহীশূর নিয়ে অপর পাণ্ড্য রাজ্য ছিল।
  • (৪) কানাড়া, কুর্গ, মালাবার ও মহীশূরের একাংশ নিয়ে কেরল, সতিষপুত্র ছিল উত্তর মালাবার ত্রিবাঙ্কুরের বৃহত্তর অংশ। এ অঞ্চল বাদ দিয়ে বাকি দক্ষিণ ভারত ছিল অশোকের অধিকারে। দক্ষিণের পেন্নার নদী থেকে মহারাষ্ট্রের উত্তরাংশ পর্যন্ত তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলা যায়।

বাংলা

বাংলাদেশ মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ বাংলায় অশোকের কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তবে ব্রাহ্মী হরফে লেখা মহাস্থানগড় শিলালিপি আবিষ্কারের পর এবং তাম্রলিপ্ত বন্দরে অশোকের স্তূপের কথা হিউয়েন সাঙ উল্লেখ করায় স্বভাবতই বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের ভেতরে ছিল বলে মনে করা হয়।

কাশ্মীর

কলহনের সাক্ষ্য থেকে কাশ্মীর মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল জানা যায়। তবে কামরূপ মৌর্য সাম্রাজ্যের বাইরে ছিল বলে মনে করা হয়। কাশ্মীরের শ্রীনগর ও নেপালের স্থাপত্যের ঐতিহ্য থেকে অনুমান করা হয় যে, এই দুই স্থান অশোকের রাজ্যভুক্ত ছিল। কলহন রাজতরঙ্গিনীতে কাশ্মীরে অশোকের আধিপত্য ও তার বংশধর জলৌকার শাসনের কথা বলেছেন।

স্থাপত্য নিদর্শন থেকে প্রমান

অশোকের সাম্রাজ্যের সীমা সম্পর্কে অপর যে প্রমাণগুলি পাওয়া যায় তা হল ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা তার স্থাপত্য নিদর্শনগুলি। এই স্থাপত্যগুলির ভৌগোলিক অবস্থান অশোকের রাজাসীমার ইঙ্গিত দেয়। এক্ষেত্রে হিউয়েন সাঙ ভারতে আসার সময় ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের সময় অশোকের স্তূপ নিম্নলিখিত স্থানগুলিতে দেখেন। যথা –

  • (১) কপিশ বা কাফ্রীস্থান,
  • (২) নগরহার বা জালালাবাদ,
  • (৩) তাম্রলিপ্তি বা বাংলার তমলুক,
  • (৪) সমতট বা পূর্ববাংলা,
  • (৫) পুণ্ড্রবর্ধন বা উত্তর বাংলা,
  • (৬) কর্ণসুবর্ণ (উত্তর বাংলা ),
  • (৭) দক্ষিণের চোল ও দ্রাবিড় দেশেও তিনি অশোকের স্তূপ দেখেন।

উপসংহার :- বিভিন্ন স্থানে নির্মিত স্তূপ গুলির সঙ্গে অশোকের শিলালিপির ভৌগোলিক অবস্থান মোটামুটি মিলে যায়, সুতরাং উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ পর্বত থেকে দক্ষিণের পেন্নার নদী বা ১৪° অক্ষাংশ পর্যন্ত তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।

(FAQ) অশোকের সাম্রাজ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে?

সম্রাট অশোক।

২. সম্রাট অশোক কোন ধর্ম গ্ৰহণ করেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

৩. সম্রাট অশোকের সময় বাংলার বন্দরের নাম কি ছিল?

তাম্রলিপ্ত।

৪. সম্রাট অশোক কোন রাজ্য জয় করেন?

কলিঙ্গ।

Leave a Reply

Translate »