চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয়

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয় প্রসঙ্গে পুরাণের বর্ণনা, মুদ্রা রাক্ষসের বর্ণনা, ঢুণ্ডিরাজের ব্যাখ্যা, গ্ৰিকদের মত, মতের দুর্বলতা, শূদ্র বংশজাত নয়, জৈন ও বৌদ্ধ সাহিত্যের বর্ণনা সম্পর্কে জানবো।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয়

মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
রাজ্য মগধ
রাজধানী পাটলিপুত্র
পূর্ববর্তী রাজা ধননন্দ
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয়

ভূমিকা :- আনুমানিক ৩২৪ খ্রিস্ট পূর্বে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নন্দ বংশের ধননন্দকে পরাজিত করেন। মৌর্য সাম্রাজ্যের স্থাপয়িতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিতর্ক আছে।

পুরাণের বর্ণনা

বিষ্ণুপুরাণ, মুদ্রারাক্ষস নাটকে ও কিংবদন্তীতে চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্রবংশ জাত বলা হয়েছে। পুরাণে বলা হয়েছে যে, নন্দ বংশের পতনের পর মগধে শূদ্রবংশ রাজত্ব করবে। সেই অর্থে চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্র বলে ধরা হয়।

মুদ্রারাক্ষসের বর্ণনা

মুদ্রারাক্ষস নাটকে চন্দ্রগুপ্তকে “বৃষল”, “কুলহীন” বলে অভিহিত করা হয়েছে। মুদ্রারাক্ষসের সাক্ষ্য নিয়ে কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন যে, চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন নন্দ রাজার উপপত্নী মুরার গর্ভজাত সন্তান।

ঢুণ্ডিরাজের ব্যাখ্যা

মুদ্রারাক্ষসের টীকাকার চুণ্ডিরাজ এই ব্যাখ্যা দেন যে, নন্দ রাজার দাসী মুরার গর্ভে চন্দ্রগুপ্তের জন্ম হয়। এজন্য তাঁর উপাধি হয় মৌর্য।

গ্রীকদের মত

চন্দ্রগুপ্তের বংশ পরিচয় সম্পর্কে গ্রীক লেখক জাষ্টিনের মন্তব্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, চন্দ্রগুপ্তের জন্ম হয়েছিল “সাধারণ বংশে।

মতের দুর্বলতা

হিন্দু গ্রন্থগুলি ও গ্রীক সূত্র থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয় সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তা তেমন যুক্তিসহ নয়। কারণ,

  • (১) পাণিনির সূত্র অনুসারে মুরার পুত্র হবে “মৌরেয়”। কিন্তু চন্দ্রগুপ্তের উপাধি ছিল মৌর্য। এটা লক্ষ্য করা দরকার।
  • (২) মুদ্রারাক্ষস মৌর্য যুগের সমকালীন রচনা ছিল না। ৮০০ বছর পরে গুপ্তযুগে এই নাটক রচিত হয়েছিল সুতরাং এই নাটকের তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়।
  • (৩) মুদ্রারাক্ষসের টীকাকার চুণ্ডিরাজ ছিলেন আরও পরের যুগের লোক। পুরাণ, কথাসরিতসাগর প্রভৃতি গ্রন্থের তথ্য দ্বারা তাঁর মত সমর্থিত হয় না।
  • (৪) পুরাণে কোটিল্য চন্দ্রগুপ্তের অভিষেক অনুষ্ঠান করান বলে বলা হয়েছে। ক্ষত্রিয় না হলে চন্দ্রগুপ্তের অভিষেক অনুষ্ঠান হত না।
  • (৫) গ্রীক লেখক জাষ্টিনের বিবরণ হতে চন্দ্রগুপ্ত নীচু বংশের লোক ছিলেন এমন প্রমাণ সঠিক পাওয়া যায় না। কারণ জাষ্টিন চন্দ্রগুপ্তকে “সাধারণ বংশজাত” (born of humble origin) বলেছেন।

শূদ্র বংশ জাত নয়

মুদ্রারাক্ষসে চন্দ্রগুপ্তকে “বৃষল” বলে অভিহিত করা হলেও মনুসংহিতা অনুসারে যে সকল ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ্যরীতিনীতি মানেন না তাকে বৃষল বলা হয়। অর্থশাস্ত্র অনুসারে যে ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ্যধর্মে আস্থাশীল নন তাকে বৃষল বলা হয়। চন্দ্রগুপ্ত জৈনধর্মের প্রতি আগ্রহশীল ছিলেন। কাজেই তাঁকে বৃষল বলা হয়েছে। বৃষল কথার অর্থ শূদ্র বংশজাত নয়।

বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের প্রমাণ

আধুনিক পণ্ডিতেরা হিন্দু বা গ্রীক প্রমাণ অপেক্ষা বৌদ্ধ ও জৈন সূত্র থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাকে বেশী নির্ভরযোগ্য মনে করেন। কারণ, তাতে অসঙ্গতি নেই এবং বিভিন্ন বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থে একই কথা বলা হয়েছে। যেমন –

(১) বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্ৰন্থের প্রমাণ

বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশে চন্দ্রগুপ্তের জন্ম ক্ষত্রিয় মৌর্য বংশে হয় একথা দেখা যায়। মহাবোধি বংশ, দিঘনিকায়, দিব্যবদান প্রভৃতি বৌদ্ধ গ্রন্থে চন্দ্রগুপ্তকে ক্ষত্রিয় মৌর্য বংশোদ্ভব বলা হয়েছে।

(২) মহাপরিনির্বাণ সূত্রের বর্ণনা

মহাপরিনির্বাণ সূত্র হল সব থেকে প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। তাতে দেখা যায় যে, চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার পিপ্পলীবনের ক্ষত্রিয় মৌর্য বংশের সন্তান। এই মতকেই পণ্ডিতেরা প্রামাণ্য বলে মনে করেন।

(৩) পরিশিষ্ট পার্বনের বর্ণনা

জৈন গ্রন্থ পরিশিষ্ট পার্বনে চন্দ্রগুপ্তকে “ময়ূর পোষক” গ্রামের নায়কের দৌহিত্র বলেছেন। বৈরাটলিপিতে চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র অশোক নিজেকে ক্ষত্রিয় বংশীয় বলে দাবী করেছেন।

উপসংহার :- সম্প্রতি পণ্ডিতেরা বৌদ্ধ ও জৈন সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চন্দ্রগুপ্তকে পিপ্পলীবনের ক্ষত্রিয় মৌর্য বংশ থেকে উদ্ভূত বলে মনে করেন। এই মতই প্রামাণ্য বলে মনে করা হয়।

(FAQ) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।

২. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে কোথায় বৃষল ও কুলহীন বলা হয়েছে?

মুদ্রারাক্ষস নাটকে।

৩. কোন লিপিতে অশোক নিজেকে ক্ষত্রিয় বলে দাবি করেন?

বৈরাট লিপি।

৪. চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্র বংশজাত বলা হয়েছে কোথায়?

বিষ্ণুপুরাণ, মুদ্রারাক্ষস নাটক ও কিংবদন্তিতে।

Leave a Reply

Translate »