দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী শান্তি প্রক্রিয়া

শান্তি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা সম্পর্কে ল্যাস্কির মন্তব্য, তারকা যুদ্ধ, শান্তি প্রক্রিয়ার পন্থা, নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, পরবর্তী শান্তি প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রসংঘ বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্যোগ, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্যোগের মূল্যায়ন ও পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে জানবো।

শান্তি প্রক্রিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ

ঐতিহাসিক ঘটনাশান্তি প্রক্রিয়া
গ্ৰোমিকো পরিকল্পনারাশিয়া
বারুস পরিকল্পনাআমেরিকা
Nuclear Test Ban Treaty৫ আগস্ট ১৯৬৩ খ্রি
পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি১ জুলাই ১৯৬৮
কাশ্মীর সমস্যাভারতপাকিস্তান
শান্তি প্রক্রিয়া

ভূমিকা :- হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে বর্ষিত আণবিক বোমার ধ্বংস ক্ষমতা দেখে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আতঙ্কিত হয়েছিলেন। তাই তিনি ভবিষ্যতের জন্য সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে, “আণবিক শক্তির যুগে মানবজাতিকে বেঁচে থাকতে হলে ব্যাপকভাবে নতুন ধরনের ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন।”

পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা সম্পর্কে ল্যাস্কির মন্তব্য

অধ্যাপক হ্যারল্ড ল্যাস্কিও ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সকলকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, “আমাদের সভ্যতার জন্য অবশ্যই সুপরিকল্পিত পথের সন্ধান করতে হবে, নইলে আমাদের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।”

তারকা যুদ্ধ

বর্তমান কালে যুদ্ধ বলতে বোঝায় ‘তারকা যুদ্ধ’ বা ‘সামগ্রিক যুদ্ধ’। বৃহৎ শক্তিগুলি-সহ অন্যান্য দেশগুলির হাতে বর্তমানে যে পরিমাণ পরমাণু অস্ত্র মজুত রয়েছে তার ক্ষুদ্রতম অংশ ব্যবহার করলেও গোটা পৃথিবীর মানবজাতি-সহ জীবজগৎ সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হবে।

শান্তি প্রক্রিয়ার পন্থা

এই ভয়ানক ধ্বংসের হাত থেকে বিশ্বের মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে রক্ষা করার অন্যতম দুটি পন্থা হল –

  • (ক) নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ,
  • (খ) রাষ্ট্রসংঘ বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরোধের মীমাংসা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

(ক) নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ

এই দুইয়েরই লক্ষ্য হল যুদ্ধের সম্ভাবনাকে কমিয়ে বা সম্ভব হলে সম্পূর্ণ দূর করে ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা। অর্থাৎ এদের মধ্যে প্রকৃতিগত কোনো পার্থক্য নেই, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হল পরিমাণগত। নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভার প্রথম বিশেষ অধিবেশনের চূড়ান্ত দলিলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে, মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি যথার্থই সম্পর্কযুক্ত। এতে বলা হয়েছে যে, মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা আছে – “হয় অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করে আমরা নিরস্ত্রীকরণের দিকে অগ্রসর হব, নয় সম্পূর্ণ ধ্বংসের সম্মুখীন হব।”

(১) নিরস্ত্রীকরণের প্রাথমিক উদ্যোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে নিরস্ত্রীকরণ অর্থে যে-কোনো মারণাস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধের বিষয়কে বোঝাত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে নিরস্ত্রীকরণ বলতে শুধু পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়। এই সময় থেকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এই পদক্ষেপগুলি হল –

(i) গ্রোমিকো পরিকল্পনা

নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সোভিয়েত রাশিয়া ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন ‘গ্রোমিকো পরিকল্পনা” (Gromyko Plan) নামে এক প্রস্তাব পেশ করে। এতে এমন একটি চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব দেওয়া হয় যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে এবং বর্তমানে মজুত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করে ফেলতে হবে। এতে শান্তির উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক শক্তি কমিশন গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু মজুত অস্ত্রাদি ধ্বংসের প্রস্তাব আমেরিকা গ্রহণ করে নি।

(ii) বারুস পরিকল্পনা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুন জাতিপুঞ্জের আণবিক শক্তি বিষয়ক একটি কমিশনের কাছে ‘বারুস পরিকল্পনা’ (Baruch Plan) পেশ করে। এর দ্বারা একটি আন্তর্জাতিক আণবিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (International Atomic Development Authority বা IADA) গঠন করে পারমাণবিক শক্তির উৎসগুলি সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলা হয়। আরও বলা হয় যে, কোনো দেশ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বন্দোবস্ত থাকতে হবে। রাশিয়া এই পরিকল্পনার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের মূল নীতিটি সমর্থন করলেও অন্যান্য কিছু নীতির বিষয়ে আপত্তি জানায়।

(iii) রুশ সক্রিয়তা

আণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে প্রধান যে সমস্যাটি দেখা দিয়েছিল সেটি হল আমেরিকা তার মজুত করা অস্ত্রভাণ্ডার যথারীতি অক্ষত রেখে নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। আর রাশিয়ার দাবি ছিল মজুত অস্ত্রের ধ্বংসসাধন এবং নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ উভয়ই করতে হবে। যাই হোক, ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া আণবিক বোমা তৈরি করে ফেললে পরবর্তী ২ বছরের জন্য নিরস্ত্রীকরণের আলোচনা স্তিমিত হয়ে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে আরও উন্নত অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়।

(২) পরবর্তী শান্তি প্রক্রিয়া

কিছুকাল নীরব থাকার পর ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে আবার নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি উজ্জীবিত হয়। এই সময় আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নিরস্ত্রীকরণের প্রসঙ্গটি তোলে। এই পর্যায়ে শান্তি প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেমন –

(i) রুশ প্রস্তাব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে যখন পুনরায় পশ্চিম জার্মানির অস্ত্রশক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছিল তখন রাশিয়া নিরস্ত্রীকরণের একটি নতুন পরিকল্পনা পেশ করে। এতে বলা হয় যে, নিরস্ত্রীকরণের জন্য শীঘ্রই মার্কিন বৈদেশিক ঘাঁটিগুলি ধ্বংস করা হোক। কিন্তু আমেরিকার পক্ষে এই প্রস্তাব গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। এরপর রুশ প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন সফরে গিয়ে জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভার বক্তৃতায় ‘সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের’ দাবি জানিয়ে বলেন যে, শুধু সীমিত অস্ত্রে সজ্জিত জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী রেখে ৪ বছরের মধ্যে সব দেশের সামরিক বাহিনী ও বৈদেশিক ঘাঁটিগুলি অপসারণ করা হোক। কিন্তু আমেরিকার কাছে এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি।

(ii) পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি

১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট মস্কোতে রাশিয়া ও আমেরিকা পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধের চুক্তি (Nuclear Test Ban Treaty)-তে স্বাক্ষর করলে সর্বপ্রথম পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি ঘটে। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ‘আংশিক’ পরীক্ষা বন্ধ চুক্তি। কেননা, এই চুক্তিতে বায়ুমণ্ডল, মহাশূন্য ও জলের নীচে পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হলেও ভূগর্ভে পরীক্ষার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নি। ফলে ভূগর্ভে বিভিন্ন দেশের পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে কোনো বাধা ছিল না। এজন্য চিন এই চুক্তিটিকে ‘প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেছিল।

(iii) পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি

ইতিমধ্যে নতুন কয়েকটি দেশ পরমাণু শক্তিধর হয়ে উঠলে আমেরিকা, রাশিয়া ও ব্রিটেন পরমাণু শক্তিধর হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠতর অবস্থান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে অন্য শক্তিগুলিকে পরোক্ষে দমনের কৌশল নেয়। এই উদ্দেশ্যে তারা ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি (Nuclear non-Proliferation Treaty) সম্পাদন করে এবং এতে অন্যান্য দেশগুলিকে যোগদানের আহ্বান জানায়। কিন্তু এই চুক্তিতে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টির চেষ্টা থাকায় ফ্রান্স ও চিন এতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয় নি। চিন এটিকে সম্পূর্ণরূপে অসম চুক্তি বলে সমালোচনা করে।

(খ) রাষ্ট্রসংঘ বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্যোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা পৃথিবীর মানব ইতিহাসের যাবতীয় ধ্বংসলীলাকে হার মানিয়েছে। যুদ্ধকালেই বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতা উপলব্ধি করেন যে, ভবিষ্যতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে একটি বিশ্ব-সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা দরকার। রাষ্ট্রনেতাদের এই চিন্তা থেকে যুদ্ধের পর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশন্‌স অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সফল উদ্যোগ গ্রহণ করে। যেমন –

(১) আরব-ইজরায়েল যুদ্ধাবসানে উদ্যোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আরব-অধ্যুষিত প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের রাষ্ট্র ইজরায়েল প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে মীমাংসাহীন আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষের সূচনা হয়। রাষ্ট্রসংঘ সেখানে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ আপাতত বন্ধ করতে সক্ষম হয়।

(২) কাশ্মীর সমস্যায় সক্রিয়তা

কাশ্মীরের অধিকারকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘর্ষ শুরু হয়। রাষ্ট্রসংঘ যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়ে এক্ষেত্রেও উভয় পক্ষের সংঘর্ষ বন্ধ করতে সক্ষম হয়।

(৩) কোরীয় যুদ্ধের মীমাংসার সাফল্য

উত্তর কোরিয়া ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করলে কোরিয়া যুদ্ধের (১৯৫০-৫৩ খ্রি.) সূচনা হয়। জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার এই আগ্রাসন নীতির নিন্দা করে এবং জাতিপুঞ্জের উদ্যোগেই উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানো হয়। শেষপর্যন্ত উত্তর কোরিয়া পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং উভয় কোরিয়ার মধ্যে স্থিতাবস্থা ফিরে আসে।

(৪) সুয়েজ সংকটে ভূমিকা

মিশরের রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে সুয়েজ খালের জাতীয়করণের কথা ঘোষণা করেন। এমতাবস্থায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইজরায়েল তাদের পূর্ব বোঝাপড়ার ভিত্তিতে মিশর আক্রমণ করলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রসংঘ ইউনাইটেড নেশন্‌স এমারজেন্সি ফোর্স গঠন করে তা ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে মিশরের সমর্থনে প্রেরণ করে। রাষ্ট্রসংঘের এই হস্তক্ষেপের ফলে সুয়েজ খালকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত সংঘর্ষের দ্রুত অবসান ঘটে।

(৫) কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে ভূমিকা

আফ্রিকার কঙ্গোয় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তার অবসান ঘটাতে রাষ্ট্রসংঘ সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব হ্যামারশিল্ড জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে কুড়ি হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী কঙ্গোয় পাঠান। পরবর্তী মহাসচিব উ থান্ট-ও কঙ্গোর গৃহযুদ্ধ দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলে কঙ্গোয় শান্তি ফিরে আসে।

(৬) সাইপ্রাস সংকটে ভূমিকা

গ্রিস ও তুরস্কের মদতে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রাসে তীব্র জাতিদাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে উদবিগ্ন জাতিপুঞ্জ সাইপ্রাসে শান্তি রক্ষা বাহিনী পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

(৭) ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে উদ্যোগ

১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে জাতিপুঞ্জ সেখানে অতি দ্রুত পর্যবেক্ষক দল পাঠায়। শেষপর্যন্ত জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

(৮) লেবানন সমস্যার সমাধানে ভূমিকা

১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে লেবানন জাতিপুঞ্জের কাছে অভিযোগ জানায় যে, প্রতিবেশী দেশ সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। জাতিপুঞ্জ এই সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান করে।

(৯) ইয়েমেন সমস্যার সমাধানে ভূমিকা

জাতিপুঞ্জ ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেন সমস্যারও শান্তিপূর্ণ সমাধান করে। ও

(১০) ডোমিনিকান রিপাবলিক-এ শান্তি প্রতিষ্ঠা

১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে ডোমিনিকান রিপাবলিক-এ জাতিপুঞ্জের পর্যবেক্ষক দল এসে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করে।

অন্যান্য সমস্যার সমাধানে ভূমিকা

উপরোক্ত গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষের ক্ষেত্রগুলি ছাড়াও জাতিপুঞ্জ আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। যেমন – জাতিপুঞ্জ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায়, ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে লেবাননে, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে, ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে অ্যাঙ্গোলা ও নামিবিয়ায়, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে যুগোশ্লাভিয়া ও কম্বোডিয়ায় তার শান্তিবাহিনী বা সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে সেসব স্থানের উত্তেজনার প্রশমন ঘটায়।

রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগের মূল্যায়ন

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করেছে। আবার বহু ক্ষেত্রেই সে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিপুঞ্জ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও অশান্তিকে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পথ থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার যুদ্ধ (১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ), প্যালেস্টাইন যুদ্ধ, সুয়েজ সংকটের ফলে মিশরের যুদ্ধ (১৯৫৬ খ্রি.), ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৯৬৫ খ্রি.) প্রভৃতি বিভিন্ন যুদ্ধকালে রাষ্ট্রপুঞ্জ সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়ার ফলে এসব যুদ্ধগুলি স্বল্পকালের মধ্যেই শেষ হয়েছে এবং মানবসম্পদও বহু পরিমাণে রক্ষা পেয়েছে।

পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ

নিরস্ত্রীকরণ বা পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এবিষয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছানো আজও হয় নি। বহু চেষ্টা বা উদ্যোগ সত্ত্বেও আজও পর্যন্ত প্রতিযোগিতা বন্ধ করা যায় নি। বহু ক্ষেত্রেই নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এই ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলি হল –

(১) ঠান্ডা লড়াই

কোনো কোনো দেশ মুখে নিরস্ত্রীকরণের কথা বললেও বাস্তব ক্ষেত্রে সে ভয়ানক আগ্রাসন চালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে আমেরিকা ও রাশিয়া উভয় শক্তি নিরস্ত্রীকরণের কথা বললেও এবিষয়ে তাদের আন্তরিকতা ছিল না। কেন-না, নিজেদের মধ্যে ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পক্ষে অস্ত্র হ্রাস করা সম্ভব ছিল না।

(২) যুদ্ধই শান্তির পথ

অনেক রাষ্ট্রনেতাই মনে করেন যে, যুদ্ধই শান্তিপ্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়। বিভিন্ন রাষ্ট্রেই পররাষ্ট্রনীতির দায়িত্বেও ছিলেন সামরিক বিভাগের লোকজন। তাঁরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন যে, নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেতে পারে। এজন্য তারা নিজ নিজ দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে অস্ত্র তৈরির কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন।

(৩) পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব

নিরস্ত্রীকরণ কর্মসূচি কার্যকর করার জন্য বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভরসার বিশেষ প্রয়োজন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে সেই বিশ্বাসের যথেষ্ট অভাব ছিল। রাশিয়া ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে গোপনে আণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটালে আমেরিকার বিশ্বাস ভঙ্গ হয়। আবার ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে আমেরিকা তার U-2 পর্যবেক্ষণ বিমান থেকে রাশিয়ার ওপর গুপ্তচর বৃত্তি চালালে রাশিয়ার অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। এই ধরনের অবিশ্বাসের ঘটনা নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে।

(৪) অস্ত্রের ধরন নিয়ে সমস্যা

কোন দেশের কোন অস্ত্র ‘আক্রমণাত্মক’ এবং কোন অস্ত্র ‘রক্ষণাত্মক’ তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিরোধ থাকে। এক দেশ যে অস্ত্রকে ‘আক্রমণাত্মক’ বলে বিবেচনা করে অন্য দেশ তাকেই ‘রক্ষণাত্মক’ বলে মনে করতে পারে। এই বিতর্কের ফলে কোনো মীমাংসায় পৌঁছোনো সম্ভব হয় না এবং নিরস্ত্রীকরণের বাস্তবায়নও অধরা থেকে যায়।

(৫) গুণগত নিরস্ত্রীকরণের সমস্যা

নিরস্ত্রীকরণ বলতে সাধারণত অস্ত্রের পরিমাণ হ্রাস বা অস্ত্রের বিলুপ্তি বোঝানো হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে পরিমাণগত নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব হলেও গুণগত নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয়। এর কারণ হিসেবে ড. কিসিঞ্জার বলেছেন যে, প্রকৃত অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলে গবেষণাগারে। তাই কোনো দেশের সৈন্য সংখ্যা যতই হ্রাস করা হোক না কেন, এর দ্বারা প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয়।

(৬) চুক্তি লঙ্ঘন

নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরও বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সময় চুক্তি লঙ্ঘন করার ফলে এই বিষয়ে যথেষ্ট সমস্যার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা গোপনে অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতের কাজ চালিয়ে যায়।

উপসংহার :- ড. ডি.সি. ভট্টাচার্য মনে করেন যে, যেসব সংঘর্ষের ক্ষেত্রে বৃহৎ শক্তিগুলির স্বার্থ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল না, সেসব ক্ষেত্রে তারা সংঘর্ষের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে নি। এর ফলেই জাতিপুঞ্জের পক্ষে ওইসব সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব হয়েছে।

(FAQ) শান্তি প্রক্রিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

গ্ৰোমিকো পরিকল্পনা কে কখন পেশ করে?

রাশিয়া ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন

বারুস পরিকল্পনা কে কখন পেশ করে?

আমেরিকা ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই জুন

রাশিয়া কখন আণবিক বোমা তৈরি করে?

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে

নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটি কখন কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে

পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি কখন স্বাক্ষরিত হয়?

১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জুলাই

Leave a Comment