বার্লিন সংকট

বার্লিন সংকট প্রসঙ্গে ইয়াল্টা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত, বার্লিন শহরের বিভাজন, বার্লিন নিয়ে সমস্যার কারণ, বার্লিন নিয়ে বিরোধ, বার্লিন সংকটের ধারাবাহিকতা ও ঐক্যবদ্ধ জার্মানির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে জানবো।

বার্লিন সংকট

ঐতিহাসিক ঘটনাবার্লিন সংকট
ইয়াল্টা সম্মেলন১৯৪৫ খ্রি
বার্লিন অবরোধরাশিয়া
বার্লিন এয়ারলিফ্টআমেরিকা
বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ১৯৬১ খ্রি
বার্লিন প্রাচীর ধূলিসাৎ১৯৮৯ খ্রি
ঐক্যবদ্ধ জার্মানি৩ অক্টোবর ১৯৯০ খ্রি
বার্লিন সংকট

ভূমিকা :- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অখন্ড জার্মানির রাজধানী বার্লিন ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির দ্বারা ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২ মে বার্লিনের পতন ঘটে এবং ১৭ মে সমগ্র জার্মানি চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তিবর্গ জার্মানি দখল করে।

পূর্বের সিদ্ধান্ত

আগের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স রাশিয়ার লালফৌজকে বার্লিন দখলের সুযোগ দেয়।

ইয়াল্টা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত

ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ইয়াল্টা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে, জার্মান ভূখণ্ড আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে চারভাগে বিভক্ত হয় এবং প্রত্যেকেই নিজ অধিকৃত অঞ্চলে পৃথক শাসন চালু করে।

বার্লিন শহরের বিভাজন

জার্মানির রাজধানী সমগ্র বার্লিন শহরটি রাশিয়ার অধিকৃত জার্মান ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত হলেও এই শহর উক্ত চারটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত করা হয়। ফলে শীঘ্রই সমস্যা দেখা দেয়।

বার্লিন নিয়ে সমস্যার কারণ

পশ্চিমি দেশগুলির অধীনস্থ বার্লিনের অংশ রুশ অধিকৃত জার্মান ভূখণ্ডের দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এমনকি, পশ্চিমি শক্তিবর্গের অধিকৃত অঞ্চল থেকে তাদের অধিকৃত বার্লিনের সর্বনিম্ন দূরত্ব ছিল প্রায় ১০০ মাইল। ফলে জার্মানিতে পশ্চিমি দেশগুলির অধিকৃত অঞ্চল থেকে বার্লিনে তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করা হবে তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।

বার্লিন নিয়ে বিরোধ

রাশিয়া জার্মানিতে তার অধিকৃত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে আপাতত যাতায়াতের রাস্তা দিলেও জার্মানিকে কেন্দ্র করে কিছুদিনের মধ্যেই পশ্চিমি দেশগুলির সঙ্গে রাশিয়ার তীব্র বিরোধ শুরু হয়। কারণ-

  • (১) রাশিয়া সমগ্র জার্মানিতে রুশ প্রভাবিত একটি কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমি শক্তিবর্গ তাতে সায় দেয় নি।
  • (২) রাশিয়া জার্মানির কাছ থেকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ লাভের আশা করলেও পশ্চিমি শক্তিবর্গ জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে অন্যগ্রহ দেখায়।
  • (৩) জার্মানি তথা রাজধানী বার্লিনে নিজ নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পশ্চিমি শক্তিবর্গের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের এমন অবনতি হয় যে, জার্মানি শাসনের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘নিয়ন্ত্রণ পরিষদ’-এ উত্যপ্ত বাক্য বিনিময়ের পর রাশিয়ার প্রতিনিধি পরিষদের আলোচনা ছেড়ে বেড়িয়ে যান (২০ মার্চ, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে)।
  • (৪) রাশিয়া ৩০ মার্চ পশ্চিমি দেশগুলিকে জানিয়ে দেয় যে, ১ এপ্রিল থেকে বার্লিনে অবস্থিত পশ্চিমি সামরিক যানগুলি রাশিয়ার অধীনে আসবে। পশ্চিমি দেশগুলি এর চরম বিরোধিতা করে।
  • (৫) ২২ জুন রাশিয়া ঘোষণা করে যে, ২৩ জুন থেকে রাশিয়া তার অধীনস্থ জার্মানির জন্য মুদ্রা সংস্কার করবে যা সমগ্র বার্লিনেও কার্যকরী হবে। কিন্তু পশ্চিমি দেশগুলি এর প্রতিবাদ করে বার্লিনে তাদের নিজস্ব মুদ্রার প্রচলন করে।

বার্লিন সংকটের ধারাবাহিকতা

বার্লিনে পশ্চিমি দেশগুলির নিজস্ব মুদ্রা সংস্কার চালু করার ঘটনায় রুশ রাষ্ট্রপ্রধান স্ট্যালিন যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। রাশিয়া বার্লিনের পশ্চিমি দখলিকৃত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে তাদের দিয়ে পশ্চিমি শক্তিগুলিকে বার্লিন ত্যাগে বাধ্য করার উদ্যোগ নেয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) বার্লিন অবরোধ

সমগ্র বার্লিনে রুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাশিয়া ২৪ জুলাই বার্লিনে প্রবেশের সড়কপথগুলিতে অবরোধ শুরু করে। এই ঘটনা ‘বার্লিন অবরোধ’ (Berlin Blockade) নামে পরিচিত। অবরোধের ফলে বার্লিনের ২০ লক্ষ মানুষ অনাহার ও বিনা চিকিৎসার মুখোমুখি হয়।

(খ) আমেরিকার পদক্ষেপ

রাশিয়ার অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমি দেশগুলি অত্যন্ত দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে বার্লিনে তাদের ন্যায্য অধিকার রক্ষার চেষ্টা চালায়। আমেরিকা দীর্ঘ ১১ মাস ধরে আকাশপথে বার্লিনে খাদ্য, ঔষধ, তেল, কয়লা প্রভৃতির জোগান দিয়ে যায়। এই ঘটনা ‘Berlin Airlift’ নামে পরিচিত। শেষ পর্যন্ত ১২ মে, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া অবরোধ প্রত্যাহার করে।

(গ) পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানির প্রতিষ্ঠা

রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাব স্বরূপ পশ্চিমি শক্তিবর্গের দখলে থাকা অঞ্চলগুলিকে নিয়ে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২১ মে ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মান বা পশ্চিম জার্মান রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ফলে বাধ্য হয়ে রাশিয়াও অক্টোবর মাসে পৃথক পূর্ব জার্মানিতে জার্মান গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিম জার্মানি আমেরিকার প্রতি এবং পূর্ব জার্মানি রাশিয়ার প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে চলতে থাকে।

(ঘ) স্ট্যালিনের পরবর্তী জটিলতা

১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে রুশ রাষ্ট্রপ্রধান স্ট্যালিনের মৃত্যুর পরবর্তীকালে বার্লিন সমস্যা আবার জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান নিকিতা ক্রুশ্চেভ বার্লিন থেকে সমস্ত বিদেশি সেনা অপসারণের দাবি জানালে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর কিছুকাল পর সোভিয়েত রাশিয়া পূর্ব জার্মানির বাসিন্দাদের পশ্চিম জার্মানিতে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দেয় এবং পূর্ব জার্মান সেনাবাহিনী পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যে কংক্রিটের প্রাচীর প্রতিষ্ঠা করে (১৯৬১ খ্রি.)। এভাবে বার্লিন সমস্যা দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত থাকে।

(ঙ) ন্যাটো গঠনের প্রেক্ষাপট

রাশিয়ার বার্লিন অবরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিষয়ে পশ্চিমি দেশগুলি আরও সচেতন হয়ে ওঠে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান যে ‘রুশ আগ্রাসনের’ কথা বলতেন তা এতদিন বহু মার্কিন সাংসদ অমূলক বলে মনে করতেন। কিন্তু রাশিয়ার বার্লিন অবরোধের পর তারা ট্রুম্যানের নীতিকে সমর্থন জানান। রাশিয়ার বার্লিন অবরোধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন কংগ্রেস আমেরিকাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তি সম্পাদন করার অনুমতি দেয়। এর অন্যতম ফলশ্রুতি হল ‘ন্যাটো’ গঠন।

উপসংহার :- প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জার্মান অনৈক্যের প্রতীক বার্লিন প্রাচীর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর গণরোষের আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। জার্মান জনমতের চাপে এবং বৃহৎ শক্তিবর্গের সহযোগিতায় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আবার ঐক্যবদ্ধ হয়। ঐক্যবদ্ধ জার্মানির চ্যান্সেলার হন হেলমুট কোল্। পূর্বতন পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর রাষ্ট্রের অবলুপ্তিকে ‘অশ্রুহীন বিদায়যাত্রা’ (a farewell without tears) বলে অভিহিত করেন।

(FAQ) বার্লিন সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইয়াল্টা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কখন?

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে।

২. ইয়াল্টা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে কোন চারটি রাষ্ট্রের মধ্যে বার্লিন শহর বিভক্ত করা হয়?

আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া।

৩. রাশিয়া বার্লিন অবরোধ করে কখন?

২৪ শে জুলাই ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে।

৪. বার্লিন এয়ার লিফ্ট কি?

আমেরিকা দীর্ঘ ১১ মাস ধরে আকাশ পথে বার্লিনে খাদ্য, ওষধ, তেল, কয়লা প্রভৃতি যোগান দিয়ে যায়। এই ঘটনা বার্লি এয়ারলিফ্ট নামে পরিচিত।

৫. রাশিয়া বার্লিন অবরোধ প্রত্যাহার করে কখন?

১২ই মে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে।

৬. পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যে কংক্রিট এর প্রাচীর প্রতিষ্ঠিত হয় কখন?

১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে।

৭. বার্লিন প্রাচীর কখন কিভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়?

৯ই নভেম্বর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে গণরোষের আঘাতে।

Leave a Comment