কোরীয় সংকট

কোরীয় সংকট প্রসঙ্গে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের আবর্তে কোরিয়া, কোরিয়ায় দুই সরকার, দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের সূচনা, কোরীয় যুদ্ধের অগ্ৰগতি, কোরীয় যুদ্ধবিরতি, কোরীয় যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে কোরীয় সংকট প্রসঙ্গে দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের সূচনা, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের আবর্তে কোরিয়া, কোরিয়া সংকটের কারণ, কোরীয় যুদ্ধের অগ্ৰগতি, কোরীয় সংকটের ফলাফল ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানব।

কোরীয় সংকট

ঐতিহাসিক ঘটনাকোরীয় সংকট
সূচনাকাল১৯৫০ খ্রি
কোরিয়া বিভাজন৩৮ ডিগ্ৰি অক্ষরেখা
উত্তর কোরিয়ারাশিয়া
দক্ষিণ কোরিয়াআমেরিকা
কিম ইল সুঙউত্তর কোরিয়া
কোরীয় সংকট

ভূমিকা :- কোরিয়ায় ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-এর সূচনা পর্যন্ত জাপানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে কোরিয়ার উত্তরাংশ অর্থাৎ ৩৮ ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখার উত্তরাংশ সোভিয়েত রাশিয়ার কাছে এবং ৩৮ ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখার দক্ষিণাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে কোরিয়ার ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখার উত্তরাংশে সোভিয়েত রাশিয়া এবং দক্ষিণাংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঠাণ্ডা লড়াইয়ের আবর্তে কোরিয়া

৩৮ ডিগ্রি বরাবর সোভিয়েত রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোরিয়ার বিভাজন ক্ষণস্থায়ী হবে বলে প্রথমে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তা শীঘ্রই ভুল প্রমাণিত হল। উভয় পক্ষই কোরিয়ার নিজ নিজ অধিকৃত অঞ্চলে নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। এভাবে কোরিয়া ঠান্ডা লড়াইয়ের আবর্তে জড়িয়ে পড়ে। যেমন –

(১) স্বাধীন সরকার গঠনের পরিকল্পনা

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মস্কোয় সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয় পক্ষকে নিয়ে কোরিয়ার বিষয়ে একটি যুগ্ম কমিশন গঠিত হবে। এই কমিশন কোরিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে একটি অস্থায়ী স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

(২) জাতিপুঞ্জের অস্থায়ী কমিশন

এরপর আমেরিকা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে কোরিয়ার বিষয়টি জাতিপুঞ্জ-এর সাধারণ সভায় উত্থাপন করে। কোরিয়ার সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সাধারণ সভা ৯ জন সদস্য নিয়ে একটি অস্থায়ী কমিশন (United Nations Temporary Commission on Korea বা UNTCOK) গঠন করে। বিশিষ্ট ভারতীয় কূটনীতিবিদ কে. পি. এস. মেনন এই কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

(৩) UNTCOK কমিশনের দায়িত্ব

এই কমিশনের দায়িত্ব ছিল বিদেশি সেনা অপসারণ করে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে কোরিয়ায় একটি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

কোরিয়ায় দুই সরকার

উত্তর কোরিয়া ছিল শিল্পপ্রধান এবং দক্ষিণ কোরিয়া ছিল কৃষিপ্রধান। তাই কোরিয়ার সামগ্রিক উন্নতির জন্য উভয় কোরিয়ার ঐক্য অপরিহার্য ছিল। কিন্তু এই সময় রুশ-মার্কিন সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, দুই কোরিয়ার ঐক্য অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। রুশ-মার্কিন ঠান্ডা লড়াইয়ের আবর্তে পড়ে শীঘ্রই দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়ায় দুটি পৃথক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন –

(ক) দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার

  • (১) জাতিপুঞ্জের অস্থায়ী কমিশনের সদস্যরা উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করতে চাইলে রাশিয়া অনুমতি দেয়নি। এমতাবস্থায় জাতিপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রভাবিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকারের প্রধান হন মার্কিন অনুগত ড. সিংম্যান রি (Dr. Syngman Rhee)।
  • (২) ১২ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে জাতিপুঞ্জ এই সরকারকে সমগ্র কোরিয়ার একমাত্র বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি দেয়। নবগঠিত দক্ষিণ কোরিয়ার নাম হয় প্রজাতান্ত্রিক কোরিয়া। এর রাজধানী হয় সিওল। কিছুদিনের মধ্যেই আমেরিকা-সহ অন্তত ৩১টি রাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
  • (৩) আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়াকে নানাভাবে সহায়তা করতে থাকে। ইতিপূর্বে আগস্ট, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষরিত এক গোপন চুক্তি অনুসারে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়াকে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সাহায্য দেয়। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্যসংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।
  • (৪) ১৯৫০ সালের জুন মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও কট্টর কমিউনিস্ট-বিরোধী জন ফস্টার ডালেস দক্ষিণ কোরিয়ার আইনসভায় এক ভাষণে সাম্যবাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। এভাবে সুদূর প্রাচ্যে দক্ষিণ কোরিয়া একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

(খ) উত্তর কোরিয়ার সরকার

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা কিম ইল সুঙ (Kim II Sung) এর নেতৃত্বে সেখানে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে একটি সোভিয়েত অনুগামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। নবগঠিত এই রাষ্ট্রের নাম হয় ‘গণতান্ত্রিক কোরিয়া’ এবং রাজধানী হয় পানমুনজম। রাশিয়া এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধের সূচনা

দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন একাধিপত্য সোভিয়েত রাশিয়া মেনে নিতে পারে নি। তাই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুন রুশ মদতে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করে এবং দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) জাতিপুঞ্জ কর্তৃক সেনা অপসারণের দাবি

জাতিপুঞ্জের কোরিয়া সংক্রান্ত কমিশন উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে চিহ্নিত করে। জাতিপুঞ্জের নিরপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে অভিহিত করে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তার সমস্ত সেনা অপসারণের দাবি জানায়।

(২) মার্কিন প্রতিক্রিয়া

২৫ জুন ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান দক্ষিণ কোরিয়াকে সব ধরনের সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। মার্কিন সেনাপতি জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থার-কে নৌ ও বিমানবাহিনী প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

(৩) যুদ্ধে জাতিপুঞ্জের অংশগ্রহণ

২৭ জুন জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ এক প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে ঘোষণা করে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে দক্ষিণ কোরিয়াকে সব ধরনের সাহায্য দানের জন্য সকল সদস্য রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানায়। ৭ জুলাই নিরাপত্তা পরিষদ কোরিয়ায় জাতিপুঞ্জের সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

(৪) আমেরিকার ভূমিকা

আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, গ্রিস, কানাডা-সহ ১৬টি দেশ জাতিপুঞ্জের বাহিনীতে সেনা পাঠালেও এই সেনাদলের স্থলবাহিনীর ৬০%, নৌবাহিনীর ৮৬% এবং বিমান বাহিনীর ৯৩% ছিল মার্কিন সেনা। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সেনাবাহিনীই জাতিপুঞ্জের পতাকাতলে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকে। মার্কিন সেনাপতি ম্যাক আর্থারকে এই সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কোরীয় যুদ্ধের অগ্রগতি

জাতিপুঞ্জের বাহিনীর বিপুল উদ্যোগ সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি দক্ষিণ কোরিয়ার ৯৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) দক্ষিণ কোরিয়া দখলমুক্ত

যুদ্ধে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমেরিকা এই অঞ্চলে নতুন করে সেনা ও অস্ত্র আমদানি করে। নতুন ৫০ হাজার পদাতিক সেনা দক্ষিণ কোরিয়ায় অবতরণ করে। জাতিপুঞ্জের বাহিনী আক্রমণের গতি বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়ার দখল থেকে মুক্ত করে। এর ফলে জাতিপুঞ্জের নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়।।

(২) ম্যাকআর্থারের অগ্রগতি

জাতিপুঞ্জের নির্দেশ বাস্তবায়িত হওয়ার পরও মার্কিন সেনাপতি ম্যাক আর্থারের নেতৃত্বে তাঁর সেনাদল জয়ের আনন্দে ৯ অক্টোবর ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করে। এই বাহিনী মাত্র ৩ সপ্তাহের মধ্যে উত্তর কোরিয়া দখল করে চিন সীমান্তে ইয়ালু নদীর তীরে উপস্থিত হয় এবং নিকটবর্তী অঞ্চলে বোমাবর্ষণ শুরু করে।

(৩) চিনের পালটা আক্রমণ

চিনের ভূখণ্ডে জাতিপুঞ্জের নামে মার্কিন আধিপত্য মাও-সে-তুঙ মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তাঁর উদ্দ্যোগে রাশিয়ার মদতপুষ্ট চিনের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী জাতিপুঞ্জের বাহিনীর ওপর পালটা আক্রমণ চালায় । চিনের বাহিনী জাতিপুঞ্জের বাহিনীকে উত্তর কোরিয়া থেকে বিতাড়িত করে, এমনকি ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা অতিক্রম করে চিনা বাহিনী ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওল দখল করে নেয়।

(৪) ম্যাক আর্থারের অপসারণ

মার্কিন নেতৃবৃন্দ ম্যাক আর্থারের কট্টর জঙ্গি নীতি পছন্দ করেন নি। রাষ্ট্রপতি ট্রম্যান-ও অকারণে সুদূর প্রাচ্যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চাইছিলেন না। তাই ট্রুম্যান সুদূর প্রাচ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে ১১ এপ্রিল, ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ম্যাক আর্থারকে পদচ্যুত করে ম্যাথু রিজওয়ে-কে সেনাপতি পদে নিয়োগ করেন।

কোরীয় যুদ্ধবিরতি

মার্কিন সেনাপতি ম্যাক আর্থারের অপসারণের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং যুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস পায়। এই পদচ্যুতির মাধ্যমে আমেরিকা বোঝাতে চেয়েছিল যে, সে চিনের সঙ্গে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না। শেষপর্যন্ত ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে রাশিয়া উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া ও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়। এরপর অসংখ্য বৈঠক ও দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পানমুনজমে উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়। এর দ্বারা –

  • (১) ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রসীমা নির্ধারিত হয়।
  • (২) যুদ্ধবন্দিদের ৬০ দিনের মধ্যে নিজ নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
  • (৩) ভারত-এর সভাপতিত্বে একটি নিরপেক্ষ কমিশনের (Neutral Nations Repatriation Commission) হাতে বন্দি বিনিময়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কোরীয় যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব

আপাত দৃষ্টিতে কোরিয়ার যুদ্ধ ছিল একটি নিরর্থক যুদ্ধ। তবে বাস্তবক্ষেত্রে এই যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন –

(১) কোরিয়ার বিভাজন

দুই কোরিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যকে এই যুদ্ধ পূরণ করতে পারে নি। দুই কোরিয়ার বিভাজন মোটামুটি স্থায়ী ঘটনা বলে বিবেচিত হয়। উভয় দেশের মধ্যে প্রবল সন্দেহ দেখা দেয়।

(২) কোরিয়ার ক্ষরক্ষতি

দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে দুই কোরিয়াকে চরম মূল্য দিতে হয়। যুদ্ধে ৪ মিলিয়ন কোরীয় সেনা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়, ৫ মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন হয় এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দুই কোরিয়ার অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

(৩) ঠাণ্ডা লড়াইয়ের প্রসার

আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে ঠান্ডা লড়াই এতদিন ইউরোপীয় ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও কোরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে তা এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়। এই যুদ্ধের দ্বারা আমেরিকার বিরুদ্ধে ঠান্ডা লড়াইয়ে রাশিয়ার সঙ্গে চিন-ও শামিল হয়। এ ছাড়া এতদিন ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিস্থিতিতে কোনো প্রত্যক্ষ যুদ্ধ না হলেও কোরিয়ার ঘটনার মাধ্যমে ঠান্ডা লড়াই বাস্তব যুদ্ধে পরিণত হয়।

(৪) জাতিপুঞ্জের মর্যাদা হ্রাস

রাশিয়া জাতিপুঞ্জের বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার সুযোগে মার্কিন মদতে জাতিপুঞ্জের বাহিনী উত্তর কোরিয়া আক্রমণ করে। পরবর্তীকালে রাশিয়া জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যোগদান শুরু করলে মার্কিন মদতে জাতিপুঞ্জের সনদের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদকে নিষ্ক্রিয় করে সাধারণ সভার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে জাতিপুঞ্জের নিরপেক্ষ চরিত্র ও মর্যাদা নষ্ট হয়।

(৫) রুশ-চিন মৈত্রী

আমেরিকা কোরিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে চিনকে দুর্বল করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল তা ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধের দ্বারা মার্কিন-চিন বিরোধ বৃদ্ধি পায় এবং রুশ-চিন সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।

(৬) পরিবর্তিত মার্কিন নীতি

কোরিয়া যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে কিছু পরিবর্তন ঘটে। এতদিন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন-বিরোধী। যুদ্ধের সময় তা বৃহত্তর সাম্যবাদ-বিরোধী হয়ে ওঠে।

(৭) সামরিক জোট গঠন

কোরিয়া যুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও এশিয়া মহাদেশে বিভিন্ন সামরিক জোট গঠনে উদ্যোগী হয়। যেমন –

  • (ক) আমেরিকা ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ফিলিপিনস-এর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে।
  • (খ) ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ‘আনজাস’ (ANZUS) নামে একটি নিরাপত্তা চুক্তি সম্পাদিত হয়।
  • (গ) ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৮ সেপ্টেম্বর আমেরিকা জাপানের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং জাপান-সহ আরও ৪৮টি দেশের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে।

উপসংহার :- কোরীয় যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আমেরিকা ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে তাইওয়ানের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।  এই অঞ্চলের অন্যান্য বহু দেশের সঙ্গেও আমেরিকা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

(FAQ) কোরীয় সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

কোরীয় সংকটের সূচনা হয় কখন?

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে।

কত ডিগ্ৰি অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়া বিভাজিত হয়?

৩৮ ডিগ্ৰি।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী কোথায় ছিল?

সিওল

উত্তর কোরিয়ার রাজধানী কোথায় ছিল?

পানমুনজম

কোরীয় যুদ্ধে জাতিপুঞ্জের অস্থায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন কে?

ভারতের কূটনীতিবিদ কে পি এস মেনন

Leave a Comment