বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন

বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন প্রসঙ্গে বৌদ্ধ সংগীতি, প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি, দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি, সর্বাস্তিবাদ, মহাসঙ্ঘিকা, তৃতীয় সংগীতি ও চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি সম্পর্কে জানবো।

বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন

বিষয় বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন
প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ
ধর্মগ্ৰন্থ ত্রিপিটক
সমকালের অন্য ধর্ম জৈন ধর্ম
পূর্ববর্তী ধর্ম ব্রাহ্মণ্যধর্ম
বৌদ্ধ সংগীতি চারটি
বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন

ভূমিকা:- ভারতে প্রায় সমকালে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থান ঘটে। গৌতম বুদ্ধ প্রচার করেন বৌদ্ধ ধর্ম ও মহাবীর প্রচার করেন জৈন ধর্ম। তৎকালীন সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল।

বৌদ্ধ সংগীতি

বুদ্ধের নির্বাণ লাভের পর তাঁর শিষ্যরা তার বাণীগুলিকে সঙ্কলন করার জন্য কয়েকটি ধর্ম সম্মেলন আহ্বান করেন। এগুলি বৌদ্ধ ধর্মসংগীতি নামে পরিচিত।

প্রথম সংগীতি

  • (১) বুদ্ধের মৃত্যুর অল্পকাল পরে রাজগৃহের নিকটে সপ্তপর্ণী গুহায় ৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বে প্রথম সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বুদ্ধের শিষ্য আনন্দ বিনয় পিটক ও শিষ্য উপালি সুত্তপিটক সঙ্কলন করেন।
  • (২) কোনো কোনো পণ্ডিত রাজগৃহের সম্মেলনের ঐতিহাসিকতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বৌদ্ধধর্মের কাহিনী অনুসারে মগধ -এর সম্রাট অজাতশত্রুর আনুকূলো বুদ্ধের শিষ্য মহাকশ্যপ রাজগৃহের সঙ্গীতি আহ্বান করেন। অনেকে এই কাহিনীর সত্যতায় সন্দেহ প্রকাশ করেন।

দ্বিতীয় সংগীতি

  • (১) রাজগৃহে সংগীতির প্রায় একশ বছর পরে বৈশালীতে দ্বিতীয় সংগীতি ৩৮৭ খ্রিস্ট পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়। বৈশালী সম্মেলনে ভারতীয় ভিক্ষুগণ ১০টি নুতন আচার গ্রহণ করেন। পশ্চিম ভারতীয় ভিক্ষুরা এই সকল আচারে আপত্তি করেন।
  • (২) পূর্ব ভারতীয় ভিক্ষুরা মধ্যাহ্ন ভোজন, অতি ভোজন, লবণ সঞ্চয়, তালরস সেবন প্রভৃতি আচার গ্রহণ করেন। এই উপলক্ষে সঙ্ঘে ঘোর মতভেদ দেখা দেয়। পশ্চিম ভারতীয় ভিক্ষুগণ যাঁরা বুদ্ধের প্রবর্তিত আদি পথ অনুসরণ করেন তাদের নাম হয় থেরবাদ বা স্থবিরবাদ।
  • (৩) পূর্ব ভারতীয় সন্ন্যাসীদের নাম হয় মহাসঙ্ঘিকা বা আচার্যবাদ। এই বিভেদ ক্রমে বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত থেরবাদীরা ১১টি এবং মহাসঙ্ঘিকারা ৭টি সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে যান।

সর্বাস্তিবাদ

  • (১) থেরবাদ সম্প্রদায় থেকে সর্বাস্তিবাদি নামে এক উপ সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। রাহুল ভদ্র ছিলেন এই উপ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। রাহুল ভদ্র ছিলেন শূদ্র বংশীয় ও ধনবান ব্যক্তি। পরে তিনি ভিক্ষু ব্রত নেন এবং নাগার্জুনের শিষ্য আর্যদেবের শিষ্যত্ব গ্ৰহণ করেন। তিনি নালন্দার অধ্যক্ষ হন।
  • (২) সর্বাস্তিবাদিরা সংস্কৃত ভাষায় পিটকগুলি রচনা করেন। সর্বাস্তিবাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল মথুরা। কুষাণ যুগ পর্যন্ত থেরবাদী বা সর্বাস্তিবাদী মতই বৌদ্ধধর্মে প্রাধান্য লাভ করে। থেরবাদী ও সর্বাস্তিবাদীদের মধ্যে বহু সাদৃশ্য থাকলেও একটি বিষয়ে থেরবাদীদের থেকে তা আলাদা।
  • (৩) সর্বাস্তিবাদীরা মনে করতেন যে, ৭৫টি উপাদান ৫টি ধর্মের দ্বারা দেহ গঠিত। এই উপাদানগুলির ক্ষয় হয় নি। সুতরাং এক দেহ থেকে অন্য দেহে তা চলে আসে। সর্বাস্তিবাদীরা বৌদ্ধধর্মের মূল সূত্রের ওপর নির্ভর না করে তার টীকা ভাষ্য বা বিভাষার ওপর বেশী নির্ভর করেন।
  • (৪) খ্রিস্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতকে বিভাষাগুলি সঙ্কলিত হয়। সর্বাস্তিবাদী বা বৈভাষিকদের বিরুদ্ধ পক্ষের নাম ছিল সৌত্রান্তিক। কারণ এঁরা মূলসূত্র বা ‘বিনয়’গুলির ওপর নির্ভর করতেন। অশ্বঘোষ, নাগার্জুন, কুমারলব্ধ ছিলেন সৌত্রান্তিক।
  • (৫) থেরবাদীরা সকল বস্তুর অনিত্যতার কথা বলেন। সেক্ষেত্রে সর্বাস্তিবাদিরা পঞ্চভূত ও ৭৫টি মৌলিক উপাদানের ক্ষয় নেই বলেন। সর্বাস্তিবাদিদের ওপর ন্যায় দর্শনের প্রভাব পড়েছিল।

মহাসঙ্ঘিকা

  • (১) মহাসঙ্ঘিকা সম্প্রদায় উত্তর ভারতে বৈশালীতে তাদের প্রধান কেন্দ্র এবং দক্ষিণ ভারতে অন্ধ্রদেশে অমরাবতী ও নাগার্জনীকোণ্ডতে তাদের কেন্দ্র গঠন করেন। তাঁরা প্রাকৃত ভাষায় তাদের শাস্ত্র রচনা করেন।
  • (২) তারা বুদ্ধ ভগবানের অবতার এবং অহং বলে প্রচার করতেন। মহাসঙ্ঘিকাদের মধ্যে বহু উপসম্প্রদায় ছিল। মহাসঙ্ঘিকা সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিংবদন্তী অনুসারে বুদ্ধশিষ্য মহাকাশ্যপ।
  • (৩) উত্তর ভারতে বৈশালী এবং পরে অন্ধ্রের অমরাবতী ও নাগার্জনীকোণ্ড এই সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

মহাসঙ্ঘিকা সম্প্রদায়ের পৃথক দিক

মহাসঙ্ঘিকারা থেরবাদীদের থেকে কয়েকটি দিকে আলাদা। যেমন –

  • (১) তাঁরা বুদ্ধকে দেবতা বলে পূজা করেন।
  • (২) বুদ্ধ বলে যাকে বলা হয়, তিনি হলেন প্রকৃত বুদ্ধের অপচ্ছায়া। প্রকৃত বুদ্ধ হলেন লোকোত্তর।
  • (৩) মহাসাঙ্খিকদের কাছে ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল বুদ্ধত্ব লাভ। নির্বাণ লাভ অপেক্ষা যা মহত্তর।

তৃতীয় সংগীতি

  • (১) বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে ভেদাভেদ দূর করার জন্য মৌর্য সম্রাট অশোক ভিক্ষু মোগগলিপুত্ত তিসসের পরামর্শে ২৫১ খ্রিস্ট পূর্বে পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি ডাকেন। এই সম্মেলনে অভিধম্ম পিটকের একটি স্বীকৃত সংস্করণ প্রকাশ করা হয় এবং সকল ভিক্ষুকে এই নিয়মগুলি মেনে চলতে বলা হয়। নতুবা শাস্তি দান করা হবে বলা হয়।
  • (২) কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, অশোক এরূপ সম্মেলন ডাকেন নি। চীনা গ্রন্থে এর উল্লেখ নেই। সংস্কৃত কিংবদন্তীতেও এই সম্মেলনের উল্লেখ নেই। অশোকের রাজত্বের শেষদিকের লিপিগুলিতেও এই বিষয়ে উল্লেখ নেই।
  • (৩) যাই হোক, এই সম্মেলনে থেরবাদীরা প্রাধান্য পায়। পাটলিপুত্র সম্মেলনে মহাসঙ্ঘিকাদের মতকে সম্মান দেওয়া হয়নি বলে এই সম্প্রদায় মনে করত। ফলে মতভেদ থেকেই যায়। 
  • (৪) অশোকের আমলে ভারতের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ তৈরি করে তাতে বুদ্ধের দেহের অংশ বা ভস্ম রাখা হয়। এভাবে প্রতীক পুজোর ব্যবস্থা হয়। এই স্তূপকে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের ও বোধি বৃক্ষকে অশোকের বোধি প্রাপ্তির প্রতীক বলে মনে করা হত।
  • (৫) মৌর্য পরবর্তী যুগে ব্যাকট্রীয় সম্রাট মিনান্দার বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরাগ দেখান। হিন্দুকুশ থেকে সিন্ধুনদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে তিনি বৌদ্ধধর্ম প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন।

চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি

  • (১) কুষাণ যুগে কুষাণ সম্রাট কণিষ্ঠ বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ দেখান। তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে মতভেদ দূর করার জন্য কাশ্মীরের কুণ্ডল বন বিহারে চতুর্থ ও শেষ সংগীতি আহ্বান করেন। বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুমিত্র এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।
  • (২) বৌদ্ধ পণ্ডিত পার্শ্ব এই সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে বৌদ্ধ শাস্ত্রগুলি সংস্কৃত ভাষায় সংকলন করেন। পার্শ্বের রচনার নাম ছিল বিভাসা শাস্ত্র। ডঃ বি. সি. লাহার মতে, বৌদ্ধ পণ্ডিত অশ্বঘোষ চতুর্থ বৌদ্ধ সম্মেলনের পর বৌদ্ধ শাস্ত্র সংকলন করেন বলে যে প্রবাদ আছে তার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

উপসংহার:- গৌতম বুদ্ধ বারাণসীর কাছে সারনাথে প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। তিনি সমাজের দরিদ্র পতিতদেরও তার করুণা থেকে বঞ্চিত করেন নি। এর ফলে বৌদ্ধ ধর্ম সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

(FAQ) বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্তন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক কে?

গৌতম বুদ্ধ।

২. বৌদ্ধ ধর্মগ্ৰন্থের নাম কি?

ত্রিপিটক।

৩. প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি কবে কোথায় আয়োজিত হয়?

৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বে রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায়।

৪. দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি কবে কোথায় আয়োজিত হয়?

৩৮৭ খ্রিস্টপূর্বে বৈশালীতে।

৫. তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি কবে কোথায় আয়োজিত হয়?

২৫১ খ্রিস্টপূর্বে।

৬. পাটলিপুত্রে বৌদ্ধ সংগীতি কোথায় আয়োজিত হয়?

কাশ্মীরের কুন্ডল বন বিহারে।

Leave a Reply

Translate »