শকুন্তলা

অপ্সরা মেনকার কন্যা শকুন্তলা প্রসঙ্গে তার জন্ম কাহিনী, নামকরণ, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার সাথে শকুন্তলার দিন অতিবাহিত, শকুন্তলা ও রাজা দুষ্মন্তের গান্ধর্ব্য বিবাহ, শকুন্তলার প্রতি ঋষি দুর্বাসার অভিশাপ, অভিশাপ খণ্ডানোর উপায় লাভ, শকুন্তলার বিবাহ সম্পর্কে কণ্বের কাছে দৈববাণী, ঋষি কণ্বের আশ্রমে প্রত্যাবর্তন, শকুন্তলার পতি গৃহে যাত্রা, শচীতীর্থে শকুন্তলার অঙ্গুরীয় স্খলন, দুষ্মন্ত কর্তৃক শকুন্তলাকে অস্বীকার, নিরুপায় শকুন্তলা, কশ্যপ মুনির আশ্রমে শকুন্তলার পুত্র সন্তানের জন্ম, এক ধীবর কর্তৃক শকুন্তলার অঙ্গুরীয় লাভ, শকুন্তলাকে দেওয়া অঙ্গুরি দেখে অনুতপ্ত রাজা দুষ্যন্ত, শকুন্তলার আশ্রমে দুষ্মন্তের আগমন, দুষ্মন্ত কর্তৃক শকুন্তলা পুত্র ভরতকে দর্শন, শকুন্তলা ও রাজা দূষ্মন্তের মিলন সম্পর্কে জানবো।

হিন্দু পুরাণে বর্ণিত রাজা দুষ্মন্তের স্ত্রী ও সম্রাট ভরতের মা শকুন্তলা প্রসঙ্গে শকুন্তলার জন্ম কাহিনী, শকুন্তলার নামকরণ, শকুন্তলার প্রিয় সখী অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা, কণ্ব মুনির আশ্রমে শকুন্তলার প্রতিপালন, শকুন্তলা ও রাজা দুষ্মন্তের গান্ধর্ব্য বিবাহ, শকুন্তলা ও রাজা দূষ্মন্তের বিচ্ছেদ এবং শকুন্তলা ও রাজা দূষ্মন্তের পুনরায় মিলন সম্পর্কে জানব।

মেনকার কন্যা শকুন্তলা

ঐতিহাসিক চরিত্রশকুন্তলা
পরিচিতিমহাভারতে উল্লেখিত তিলোত্তমা
পিতাঋষি বিশ্বামিত্র
মাতাঅপ্সরা মেনকা
স্বামীরাজা দুষ্মন্ত
পুত্রভরত
মেনকার কন্যা শকুন্তলা

ভূমিকা :- মহাভারতে উল্লেখিত রাজা দুষ্মন্তের পত্নী ছিলেন শকুন্তলা। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ তিলোত্তমা। তিনি কণ্ব মুনির আশ্রমে বড় হয়েছিলেন।

শকুন্তলার জন্ম কাহিনী

কোনো এক সময়ে বিশ্বামিত্র ঋষি মহাতপে নিমগ্ন হন। দেবতারা সেই তপস্যা দর্শনে ভীত হয়ে মেনকা নামে অপ্সরাকে তাঁর তপস্যার বিঘ্ন ঘটাবার জন্য প্রেরণ করেন। মেনকা রূপমোহে বিশ্বামিত্রকে মুগ্ধ করেন। ফলে মেনকার গর্ভে তার ঔরসে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। মেনকা সন্যঃপ্রসূতা সেই কন্যাকে ত্যাগ করিয়া স্বর্গে চলিয়া গেলেন। এই কন্যাই হলেন শকুন্তলা।

শকুন্তলা নামকরণের কারণ

বিশ্বামিত্রও কন্যাটি গ্রহণ করলেন না। অসহায়া কন্যাটিকে একটি শকুনি তার পক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত করে রক্ষা করতে লাগল। দৈবযোগে মহর্ষি কণ্ব সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে কন্যাটিকে দেখতে পান। স্বভাষকরুণ ঋষি শিশুটিকে নিজের আশ্রমে নিয়ে এলেন। নিজের কন্যার ন্যায় লালন পালন করতে লাগলেন। শকুনি বা পক্ষী পালন করেছিল বলে তার নাম হল শকুন্তলা।

অনসূয়া ও প্রিয়ংবদার সাথে শকুন্তলার দিন অতিবাহিত

শকুন্তলা দিন দিন শশিকলার মত বাড়তে লাগলেন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা নামে দুটি সহচরীর সাথে মনের আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন। আশ্রমের বৃক্ষমূলে জল সেচন করেন, তরুলতার বিবাহ দেন, আদর করে তরুলতার কত নাম রাখেন। সখীরা তার সব কাজে সহায়তা করত। ক্রমে ক্রমে শকুন্তলা যৌবনদশায় উপস্থিত হলেন, রূপ উছলে পড়তে লাগল।

শকুন্তলা ও রাজা দুষ্মন্তের গান্ধর্ব বিবাহ

ইতিমধ্যে একদিন মহারাজ দুষ্মন্ত মৃগয়া করতে এসে মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে উপস্থিত হন। কণ্ব সেই সময় তীর্থপর্যটনে বাইরে ছিলেন, আশ্রমের ভার শকুন্তলার উপরই ছিল। শকুন্তলাকে দেখে রাজা মুগ্ধ হন এবং শকুন্তলাও দুষ্মন্তদর্শনে মুগ্ধা হলেন। সখীদের মুখে দুষ্মন্ত শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত অবগত হয়ে বিবাহযোগ্যা বলে মনে করে তাকে গান্ধর্ব মতে বিবাহ করেন। বিবাহ-সাক্ষী স্বরূপ শকুন্তলাকে একটি অঙ্গুরী দিয়ে রাজা রাজধানীতে ফিরে গেলেন। বলে গেলেন তিনি শীঘ্রই তাকে রাজধানীতে নিয়ে যাবেন।

শকুন্তলাকে ঋষি দুর্বাসার অভিশাপ

একদিন শকুন্তলা কুটীরদ্বারে বসে দুষ্মন্ত-চিন্তায় মগ্ন আছেন। এমন সময় দুৰ্বাসা ঋষি এসে আতিথ্য প্রার্থনা করলেন। শকুন্তলা পতিচিন্তায় বাহুজ্ঞানশূন্য, তিনি দুর্বাসার কোন কথা শুনতে পেলেন না। দুৰ্বাসা তখন ক্রোধে তাকে শাপ দিলেন, “তুই যার চিন্তায় মগ্ন হয়ে আমাকে অবমাননা করলি, আমি অভিশাপ দিচ্ছি, যে তুই স্মরণ করিয়ে দিলেও সে তোকে স্মরণ করতে পারবে না”।

অভিশাপ খণ্ডানোর উপায় লাভ

শকুন্তলা কিছুই জানতে পারলেন না, অনসূয়া নিকটে ছিল, সে কাঁদতে কাঁদতে ঋষির নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগল। বহু আরাধনায় ঋষির ক্রোধ একটু প্রশমিত হল। তিনি বললেন, “যদি কোনো চিহ্ন দর্শাইতে পারে, তবেই ইহাকে স্মরণ করিবে, অন্যথা নয়।” অনসূয়া প্রিয়ংবদাকে এই ঘটনা জানাল, শকুন্তলাকে কেউ কিছু বলল না।

শকুন্তলার বিবাহ সম্পর্কে কণ্বের কাছে দৈববাণী

কণ্ব তীর্থে দৈববাণী হতে জানলেন যে দুষ্মন্তের সাথে শকুলার বিবাহ হয়ে গিয়েছে এবং শকুন্তলা গর্ভবতী। তিনি পূর্ব থেকেই শকুন্তলার উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করছিলেন, এক্ষণে দুষ্মন্তের সাথে বিবাহে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন, কেননা দুষ্মন্ত অপেক্ষা অধিকতর উপযুক্ত পাত্র কে হতে পারে।

ঋষি কণ্বের আশ্রমে প্রত্যাবর্তন

তিনি সত্ত্বর আশ্রমে ফিরে এলেন এবং শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠাবার জন্য বন্দোবস্ত করতে লাগলেন। দুর্বসার শাপে দুষ্মন্ত শকুন্তলার কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেন, সুতরাং তিনি স্বয়ং তাকে নিয়ে যান নি।

শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা

শুভদিনে কণ্ব দুই শিষ্য ও ভগ্নী গৌতমীকে সঙ্গে দিয়ে শকুন্তলাকে রাজধানীতে পাঠালেন। শকুন্তলা কাঁদতে কাঁদতে পিতা ও অন্যান্য গুরুজন, সখীগণ ও আশ্রমের বৃক্ষ সকলের নিকট বিদায় গ্রহণ করলেন। সখীগণ কাঁদতে কাঁদতে নিভৃতে বলেছিলেন, “রাজা অবিশ্বাস করলে এই অঙ্গুরীয় তাঁকে দেখাইও।” তারা আশ্রম ত্যাগ করলেন।

শচীতীর্থে শকুন্তলার অঙ্গুরীয় স্খলন

পথে শচীতীর্থে স্নান করবার সময় শকুন্তলার সেই অঙ্গুরীয় স্খলিত হয়ে জলমগ্ন হল, শকুন্তলা তা বুঝতে পারলেন না।

দুষ্মন্ত কর্তৃক শকুন্তলাকে অস্বীকার

অবশেষে সকলে রাজপ্রসাদে উপস্থিত হলেন। দুর্বাসার শাপে শকুন্তলা সম্বন্ধে কোনো কথাই দুষ্মন্তের মনে ছিল না। সুতরাং তিনি কোন ক্রমেই শকুন্তলাকে পত্নীরূপে স্বীকার করে গ্রহণ করতে সম্মত হলেন না। শকুন্তলা লজ্জায় মৃতপ্রায় হলেন।

নিরুপায় শকুন্তলা

শিষ্যদের সাথে রাজার অনেক তর্কের পর শকুন্তলা নিজেই তাঁর পত্নীত্ব প্রমাণ করতে লাগিলেন, কিন্তু সকলই বিফল হল। পরে অঙ্গুরীর কথা তাঁর মনে পড়ল, কিন্তু তা দেখাতে গিয়ে দেখেন অঙ্গুরীয় তাঁর নিকট নেই। শকুন্তলা নিরুপায় হলেন।

কশ্যপ মুনির আশ্রমে শকুন্তলার পুত্র সন্তানের জন্ম

শিষ্যেরা শকুন্তলাকে সেখানে রেখে আশ্রমে ফিরে গেল। শকুন্তলা একাকী কাঁদতে লাগলেন, মেনকা এসে আকাশ পথে তাঁকে নিয়ে সুমেরু পর্বতে ভগবান কশ্যপের নিকট উপস্থিত হল। কশ্যপ তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে লাগলেন। যথাকালে শকুন্তলা সেখানে একটা পুত্র-সন্তান প্রসব করলেন। পুত্রের নাম হল ভরত।

এক ধীবর কর্তৃক শকুন্তলার অঙ্গুরীয় লাভ

ইতিমধ্যে এক ধীবর শচীতীর্থে একটা রোহিত মাছ ধরে খণ্ড খণ্ড করে তার পেটের মধ্যে একটা অঙ্গুরীয় প্রাপ্ত হয়। সে তা বিক্রি করার জন্য এক স্বর্ণকারের নিকট উপস্থিত হয়। স্বর্ণকার তাতে রাজনামাঙ্কিত দেখে তাকে চোর বলে সন্দেহ করে নগরপালের হাতে সমর্পণ করে।

শকুন্তলাকে দেওয়া অঙ্গুরি দেখে অনুতপ্ত রাজা দুষ্যন্ত

নগরপাল চোরকে অঙ্গুরীর সাথে রাজার নিকট উপস্থিত করে। অঙ্গুরীয় দর্শন মাত্রেই রাজার শকুন্তলা সম্বন্ধে সমস্ত কথাই মনে পড়ল, এবং শকুন্তলার প্রতি দুর্ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত অনুতপ্ত হলেন এবং কিরূপে শকুন্তলাকে পুনরায় লাভ করবেন সেই চিন্তায় দিবানিশি অস্থির হলেন।

শকুন্তলার আশ্রমে দুষ্মন্তের আগমন

একদিন ইন্দ্রসারথি মাতলি এসে দানব বিজয়ের জন্য ইন্দ্ৰ আহ্বান করিয়াছেন বলে দুষ্মন্তকে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। স্বর্গ হতে প্রত্যাবর্তন কালে মাতলি সুমেরু পর্বতের নিকট উপস্থিত হয়। দুষ্মন্ত মহর্ষি কশ্যপের সাথে সাক্ষাৎ করবার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করলেন। দুষ্মন্ত রথ থেকে অবতরণ করে পদব্রজে মহর্ষির কুটিরের দিকে যেতে লাগলেন। পথিমধ্যে দেখলেন একটি বালক এক ভীষণ সিংহকে নির্যাতন করছে। তিনি স্তম্ভিত হলেন। বালক কারও কথা শুনছে না। অবশেষে ‘খেলনা দিব’ এই কথায় সে শান্ত হল।

দুষ্মন্ত কর্তৃক শকুন্তলা পুত্র ভরতকে দর্শন

বালককে দর্শনাবধি দুষ্মন্তের মনে এক অনির্বচনীয় বাৎসল্যভাবের সঞ্চার হল। তাঁর মনে হতে লাগল যেন সে তাঁর পুত্র। তাকে কোলে নেওয়ার জন্য তিনি বড় ব্যগ্র হলেন। একটী মাটির ময়ূর এনে বালককে দেওয়া হল।

শকুন্তলা ও রাজা দুষ্মন্তের মিলন

“দেখ, কেমন শকুন্তলাবণ্য দেখ” – এই কথা শুনে বালকটি “কৈ মা কৈ?” বলেয উঠল। রাজা বিস্ময়ান্বিত হলেন। এ কি শকুন্তলার পুত্র ! ঘৃণিতা, অপমানিতা, বিতাড়িতা, নিজের পরিণীতা পত্নী শকুন্তলার পুত্র! রাজা অস্থির হলেন। কিছু পরেই শকুন্তলা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। দীনা, হীনা, মলিনা, ব্রহ্মচারিণী। উভয়েই উভয়কে চিনতে পারলেন। উভয়ের চক্ষুজলেই যেন সমস্ত অপরাধ ধৌত হয়ে গেল। রাজা ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।

উপসংহার :- মহর্ষি কশ্যপের আশীর্বাদ নিয়ে পত্নী পুত্র সঙ্গে নিয়ে দুষ্মন্ত রাজধানীতে ফিরে এলেন। যথাকালে ভরতকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করে দুষ্মন্ত সস্ত্রীক বাণপ্রস্থ অবলম্বন করলেন। শকুন্তলার পুত্র ভরতের নাম থেকেই আমাদের দেশের নাম ‘ভারতবর্ষ‘ হয়েছে।

(FAQ) অপ্সরা মেনকার কন্যা শকুন্তলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শকুন্তলা কে ছিলেন?

বিশ্বামিত্র ঋষি ও অপ্সরা মেনকার কন্যা।

২. শকুন্তলার লালন পালন করেন কে?

ঋষি কণ্ব।

৩. শকুন্তলার বিবাহ হয় কার সাথে?

রাজা দুষ্মন্ত।

৪. শকুন্তলার পুত্রের নাম কি?

ভরত।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment