অব-শিল্পায়ন

অব-শিল্পায়ন কি, অব-শিল্পায়নের অবশ্যম্ভাবী ফল, দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ, শিল্প ও বাণিজ্য সমৃদ্ধ ভারত, ইংল্যান্ডে ভারতীয় সুতিবস্ত্রের জনপ্রিয়তা, ইংল্যান্ডে ভারতীয় সুতিবস্ত্রের ওপর আঘাত, অব-শিল্পায়নের কারণ হিসেবে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব, অবাধ বাণিজ্য, অসম শুল্কনীতি, কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ ভারত, দেশীয় শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের কারণ, দেশীয় শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের ফলাফল, অব-শিল্পায়ন অলীক কল্পনা, মরিস ডেভিড মরিসের অভিমত, মরিস ডেভিড মরিসের যুক্তি খণ্ডন ও অমীয় বাগচীর অভিমত সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

অব-শিল্পায়ন (De-industrialisation)

অর্থশিল্প-বাণিজ্য ধ্বংস
প্রবক্তাদাদাভাই নৌরজি, রমেশচন্দ্র দত্ত
অলীক কল্পনামরিস ডেভিড মরিস
অব-শিল্পায়ন

ভূমিকা :- ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সর্বাপেক্ষা কুফল হল ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যমণ্ডিত কুটিরশিল্প বা হস্তশিল্পের ধ্বংস সাধন। এই ঘটনা ‘অব-শিল্পায়ন’ বা ‘De industrialisation’ নামে পরিচিত।

অবশ্যম্ভাবী ফল

অব-শিল্পায়নের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে দুটি কথা বলা যায়। যথা –

  • (১) ভারত ইংল্যাণ্ডের কলকারখানায় তৈরি পণ্যের খোলাবাজারে পরিণত হয় এবং ভারত থেকে ইংল্যাণ্ডে কাঁচামাল রপ্তানি হতে থাকে।
  • (২) ভারতের বেকার শিল্পী ও কারিগরেরা তাদের চিরাচরিত পেশা ত্যাগ করে কৃষিতে ভিড় করতে থাকে। এর ফলেকৃষির ওপর চাপ বৃদ্ধি পায় এবং ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়।

দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ

দাদাভাই নৌরজি, রমেশচন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রাণাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী লেখকরা এই ব্যাপারে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বিস্তারিত আলোচনা

পরবর্তীকালে রজনী পাম দত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচী এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাকরেছেন।

শিল্প ও বাণিজ্য-সমৃদ্ধ ভারত

  • (১) অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে শিল্প ও বাণিজ্যে বাংলা তথা ভারতবর্ষ যথেষ্ট সমৃদ্ধশালী ছিল। এই সময় বাংলার সুতি, রেশম ও পশম বস্ত্র, কাঁচা রেশম, চিনি, লবণ, পাট, সোরা ও আফিম বিদেশে রপ্তানি হত।
  • (২) বিদেশের বাজারে ঢাকার মসলিনের চাহিদা ছিল প্রবল। বাংলা ছাড়াও বারাণসী, লক্ষ্ণৌ, আগ্রা, মুলতান, লাহোর, বুরহানপুর, সুরাট, ব্রোচ, আমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, মাদুরাই,বিশাখাপত্তনম ও মাদুরা ছিল সুতিবস্ত্রের বিখ্যাত কেন্দ্র।
  • (৩) বারাণসী ও আমেদাবাদের কিংখাব, পুণা ও সন্নিহিত অঞ্চলের রঙিন তাঁতের কাপড়, কাশ্মীর ও পাঞ্জাবের পশমের শালের চাহিদাও বিদেশের বাজারে যথেষ্ট ছিল। লোহা, তামা, রূপা ও সোনা প্রভৃতি ধাতুনির্মিতদ্রব্যের জন্যও ভারত বিখ্যাত ছিল।
  • (৪) সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ভারতের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের খ্যাতি দূর-দূরান্তে বিস্তৃত হয়। গোয়া, বেসিন, সুরাট, মসুলিপট্টম, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছিল জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিশিষ্ট কেন্দ্র। জনৈক ইংরেজ পণ্ডিতের মতে, জাহাজ নির্মাণ সম্পর্কে ইংরেজদের অপেক্ষা ভারতীয়দের জ্ঞান অনেক উন্নত ছিল।
  • (৫) লোহার অস্ত্রশস্ত্র, তরোয়াল, তির-ধনুক, বর্শা, কামান, বন্দুক প্রভৃতি নির্মাণেও ভারতীয়রা দক্ষ ছিল। দস্তা, পারদ, মৃৎশিল্প, চর্মশিল্প প্রভৃতিতেও ভারত যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে। বিদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যাদির ব্যাপক চাহিদা ছিল।
  • (৬) এদেশের সুতিবস্ত্র ও মসলিনের চাহিদা ছিল সর্বত্র। ইউরোপীয় বণিকরা—বিশেষত ইংরেজরা ইউরোপে ভারতীয় সুতিবস্ত্র ও মশলার ব্যবসা করে প্রচুর লাভবান হয়েছিল।
  • (৭) বিদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদার ফলে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে শিল্পোৎপাদনের হারও বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদার জন্যই বিভিন্ন ইউরোপীয় বণিক ভারতে তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।

ইংল্যাণ্ডে ভারতীয় সুতিবস্ত্রের জনপ্রিয়তা

  • (১) ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে ভারতের সুতি ও রেশম বস্ত্র প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ব্রিটেনের নারীদের কাছে ভারতীয় রঙিন সুতিবস্ত্রের যথেষ্ট চাহিদা হয়।
  • (২) গৃহসজ্জার জন্য তাঁরা বিভিন্ন রঙের ভারতীয় পর্দা ব্যবহার করতে থাকেন। ভারতীয় বস্ত্রাদির এই জনপ্রিয়তার জন্য একসময় ইংল্যাণ্ড এই সব পণ্যাদির ওপর আমদানি শুল্ক হ্রাস করে। এর ফলে ইংল্যাণ্ডে এর রপ্তানি যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়।
  • (৩) ‘রবিনসন ক্রুসো’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থের লেখক ডেফো দুঃখ করে লেখেন যে, ইংল্যাণ্ডের ঘরে ঘরে, বসবার ঘর ও শোবার ঘর—সর্বত্রইভারতীয় বস্ত্র ঢুকে পড়েছে।

ইংল্যাণ্ডে ভারতীয় সুতিবস্ত্রের ওপরআঘাত

  • (১) ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের এই জনপ্রিয়তা ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপের বস্ত্র-উৎপাদনকারীরা সুনজরে দেখেনি। এর ফলে ইংল্যাণ্ড সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কলকারখানায় মন্দা দেখা দেয়, শ্রমিক ছাঁটাই হতে থাকে এবং তাঁতিরা বেকার হয়ে পড়ে।
  • (২)ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্পপতিরা ভারতীয় সুতি ও রেশমি বস্ত্র আমদানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে এবং সংরক্ষণ নীতি গ্রহণের দাবি জানাতে থাকে।
  • (৩)শিল্পপতিদের চাপে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে এক আইন পাশ করে ইংল্যাণ্ডে বাংলা, পারস্য ও চীনের রেশম বস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের এক আইনে ভারত থেকে রঙিন সুতিবস্ত্র আমদানি নিষিদ্ধ হয়।
  • (৪) ১৭৪৭, ১৭৫৯ এবং ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে আমদানিকৃত সুতিবস্ত্রের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয়। ইংল্যাণ্ডের বাইরে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এই অবস্থা চলতে থাকে। এতেও কিন্তু ভারতীয় বস্ত্রের চাহিদা বিন্দুমাত্র হ্রাস করা সম্ভব হয় নি।

অব-শিল্পায়নের কারণ

ঔপনিবেশিক ভারতে অব-শিল্পায়নের বিভিন্ন কারণ গুলি হল –

(ক) কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য

  • (১) ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কোম্পানি তার রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্য ভারতীয় ও পাইকারি ক্রেতাদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করে।
  • (২) আগে উত্তর ভারত থেকে বহু পাইকারি ক্রেতা বাংলায় কাপড় কিনতে আসত। কোম্পানির বিধি-নিষেধের ফলে তারা বাংলায় আসা বন্ধ করে। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর অন্যান্য ইওরোপীয় কোম্পানিগুলি বাংলা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। এইভাবে বাংলার বাণিজ্যে কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৩) পলাশির যুদ্ধের পর কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা ‘দস্তক’-এর অপব্যবহার করে বাংলাদেশে বিনা শুল্কে অবাধ বাণিজ্য শুরু করে। এই অসম প্রতিযোগিতার ফলে দেশীয় বণিকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
  • (৪) মিরকাশিম এই অন্যায়ের প্রতিকার করতে গিয়ে রাজ্যহারা হন। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি অধিকৃত অঞ্চলে লবণ, সুপারি ও তামাকের ব্যবসা কোম্পানিরকর্মচারীদের জন্য একচেটিয়া করা হয়। বলা বাহুল্য, এর ফলে দেশীয় ব্যবসায়ীরা এই সকল দ্রব্যাদির বাণিজ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

(খ) রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ

  • (১) পলাশির যুদ্ধের পর থেকে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাংলার বুকে ব্যাপক শোষণ ও অত্যাচার শুরু করে। রাজা, প্রজা, জমিদার, বণিক, সাধারণ মানুষ সবার কাছ থেকেই তারা জোর করে অর্থ সংগ্রহ করত।
  • (২) কোম্পানির কর্মচারীরা দেশীয় ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র প্রকৃত মূল্যের এক-চতুর্থাংশ দিয়ে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যেত। প্রতিবাদ করলে লাঞ্ছনা ও অত্যাচার জুটত।
  • (৩) বাংলার দরিদ্র তাঁতিরা কোম্পানির কর্মচারী ও দেশীয় দালালদের দ্বারা কীভাবে শোষিত ও উৎপীড়িত হত তার সুন্দর বর্ণনা মিলবে উইলিয়ম বোল্টস্-এর রচনায়।
  • (৪) কোম্পানির দালালরা তাঁতিদের ভয় দেখিয়ে তাদেরকে একমাত্র তাদের জন্যই সুতিবস্ত্র বুনতে বাধ্য করত এবং এর জন্য তারা জোর করে তাঁতিদের অগ্রিম নিতেও বাধ্য করত। অগ্রিম নেওয়া তাঁতি বাজার দরের চেয়ে শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ কম মূল্যে লোকসান স্বীকার করে তার বস্ত্র কোম্পানিকে বিক্রি করতে বাধ্য থাকত।
  • (৫) তাঁতিদের এক ধরনের মুচলেকা সই করতে হত— মুচলেকা সই না করেও কোনও উপায় ছিল না, কারণ অবাধ্যতার জন্য চরম শাস্তি জুটত। কোনও ভারতীয় বণিকের কাছে তারা বস্ত্র বিক্রি করতে পারত না বা তাদের জন্য বস্ত্র তৈরি করতেও পারত না।
  • (৬) উইলিয়ম বোল্টস্ লিখছেন যে, তাঁতিদের যেভাবে ঠকানো হচ্ছে তা কল্পনার অতীত। এভাবে একদিকে তারা সস্তায় মাল-সংগ্রহ করত, আবার অন্যদিকে সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকেও দূরে সরিয়ে রাখত।
  • (৭) কোম্পানি কাঁচা তুলোর ব্যবসা একচেটিয়াভাবে নিজেদের হাতে রেখে দেয়। তাঁতিরা আগে দক্ষিণ ভারত থেকে তুলো আমদানি করত, কিন্তু কোম্পানি পরে নিজেরাই সেই তুলোর সবটাই কিনে নিয়ে মণ প্রতি ১৪/১৫ টাকা বেশি দামে তাঁতিদের তা কিনতে বাধ্য করে।
  • (৮) এর ফলে তাঁতি বেশি দামে তুলো কিনে কম দামে বস্ত্র বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কেনা ও বেচা দু’দিকেই তাকে ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। বলা বাহুল্য, এই লোকসান ও অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হাজার হাজার তাঁতি দেশত্যাগ করে এবং অনেকে দায়িত্ব এড়াবার জন্য নিজের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে ফেলত।
  • (৯) ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ডেরেলেস্ট লিখছেন যে, বহু তাঁতি তাদের ব্যবসা ত্যাগ করেছে। এর ফলে ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, আগ্রা, বারাণসী, সুরাট, আমেদাবাদ প্রভৃতি নগরীগুলি শ্রীহীন ও জনশূন্য হয়ে পড়ে।
  • (১০) ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় বস্ত্রবয়ন শিল্পে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। এর এগারো বছর পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ত্রিশ হাজারে। উইলিয়ম বোল্টস্ লিখছেন যে, জঙ্গলবাড়ির চারধারের জেলাগুলিতে প্রায় সাতশ’ তাঁতি পরিবার এই ধরনের অত্যাচারের দরুন একই সঙ্গে দেশ ও জীবিকা পরিত্যাগ করে।
  • (১১) মুর্শিদাবাদে অবস্থিত কোম্পানির রেসিডেন্ট মিঃ বেচার ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে বলেন—“ইতিপূর্বে বাংলা ছিল জাতিসমূহের শস্যাগার এবং প্রাচ্যের বাণিজ্য, শিল্পকর্ম এবং সম্পদের ভাণ্ডার। কিন্তু আমাদের অপশাসনের ফলে কুড়ি বৎসরের মধ্যে দেশের বহু অংশ প্রায় মরুভূমির রূপ পরিগ্রহ করেছে।”

(গ) ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব

  • (১) ইতিমধ্যে ইংল্যাণ্ডে শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়। যন্ত্রের সাহায্যে অনেক অল্প সময়ে অনেক উন্নত মানের ও সস্তা দামের দ্রব্যাদি—বিশেষত সুতিবস্ত্র ইংল্যাণ্ডের কলকারখানায় তৈরি হতে থাকে।
  • (২) এই সব পণ্যাদি বিক্রয় ও কারখানার কাঁচামালেরজন্য ইংল্যাণ্ডের বণিককুলের কাছে ভারতের বাজার অতি প্রয়োজনীয় ছিল। তারা ভারতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকারের বিরোধিতা করতে থাকে এবং ভারতের দরজা সকল ইংরেজ বণিকের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানাতে থাকে।
  • (৩) প্রখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ওয়েলথ অব নেশনস্’ গ্রন্থে ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকারকে ব্রিটিশ বাণিজ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক ও ভারতীয় স্বার্থ-বিরোধী বলে অভিহিত করেন।
  • (৪) ব্রিটিশ শিল্পপতিদের চাপে সরকার ভারতের দরজা তাদের জন্য ‘ঈষৎ’ খুলে দিতে বাধ্য হন। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির মারফৎ তারা ভারতে ৩০০০ টন পণ্য পাঠাবার অধিকার পায়। পরে এর পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। সস্তা দরের বিলাতি পণ্যের আগমনে ভারতীয় শিল্পীদের অবস্থাসঙ্গিন হয়ে পড়ে।

(ঘ) অবাধ বাণিজ্য

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইন দ্বারা ভারতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকারের অবসান ঘটে এবং ভারতে ইংল্যাণ্ডের অন্যান্য বণিকদের অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটে। ইংল্যাণ্ড-জাত বিভিন্ন দ্রব্যবিশেষত ম্যাঞ্চেস্টারও ল্যাঙ্কাশায়ারের মিলে তৈরি সুতিবস্ত্রে ভারতের বাজার পূর্ণ হয়ে যায়।

(ঙ) অসম শুল্কনীতি

  • (১) ঔপনিবেশিক শাসনের স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে ইংল্যাণ্ড-জাত দ্রব্যগুলি বিনা শুল্কে ভারতে আসতে থাকে এবং ভারতীয় দ্রব্যাদির ওপর চাপানো হয় বিরাট শুল্কের বোঝা।
  • (২) ঐতিহাসিক বি. ডি. বসু তাঁর ‘Ruin of Indian Trade and Industries’ গ্রন্থে ভারত থেকে ইংল্যাণ্ডে আমদানিকৃত বিভিন্ন দ্রব্যের ওপর বসানো শুল্কসমূহের একটি বিস্তৃত তালিকা দিয়েছেন।
  • (৩) এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কীভাবে ব্রিটিশ সরকার নিজ শিল্প পোষণ ও ভারতীয় শিল্পোদ্যোগ ব্যাহত করার সুপরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করেছিল। ১৭৯৭ সালে ভারতীয় ক্যালিকোর ওপর ইংল্যাণ্ডে (আমদানি শুল্কের হার ছিল ১৮%। ১৮২৪-এ তা দাঁড়ায় ৬৭.৫%।
  • (৪) মসলিনের ওপর শুল্ক ছিল ৩৭.৫% এবং চিনির ওপর ধার্য শুল্ক ছিলচিনির দামের তিন গুণ এবং অনেক সময় চার গুণ। এই অসম প্রতিযোগিতায় ভারতীয় বণিকরাপিছুহঠতেথাকে।১৭৮০-তেইংল্যাণ্ডথেকেভারতেরপ্তানিকৃত দ্রব্যাদির মূল্য ছিল ৩ লক্ষ ৮০ হাজার পাউন্ড।
  • (৫) ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যাণ্ডে তৈরি সূক্ষ্ম রেশমের কাপড় ভারতের বাজারে আসত বছরে ৩০ লক্ষ গজ। ১৮৭০-এ তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াল ৬ কোটি ৪০ লক্ষ গজ।
  • (৬) কেবল সুতিবস্ত্রই নয়—রেশম ও পশমজাত দ্রব্য, লোহা, মৃৎশিল্প, কাচ, অস্ত্রশস্ত্র, ঢাল-তলোয়ার, খোদাই ও কারুকার্যের সঙ্গে জড়িত প্রভৃতি দেশীয় শিল্পগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

(চ) কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ ভারত

  • (১) ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যাণ্ডে কাঁচামাল রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। ভারত পরিণত হয় ইংল্যাণ্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে।
  • (২) ভারতীয় অর্থনীতি ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়। ভারত থেকেতুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইংল্যাণ্ডে পাঠানো হতে থাকে।
  • (৩) ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইন দ্বারা ভারতে কোম্পানির বাণিজ্যাধিকার লুপ্ত হয় এবং ইংল্যাণ্ডের অন্যান্য ব্যবসায়ীরা ব্যাপক হারে ভারতে আসতে থাকে।
  • (৪) তারা জমিজমা কিনে তাতে নীল, কফি, রবার, তামাক, তুলো প্রভৃতির চাষ শুরু করে এবং এই সব কাঁচামাল ইংল্যাণ্ডে রপ্তানি করতে থাকে।
  • (৫) ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে রেল ব্যবস্থার প্রবর্তন হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রিটিশ পণ্যাদির অনুপ্রবেশ ঘটে। শিল্পপ্রধান ভারত কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়।

দেশীয় শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের কারণ

ভারতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনে এদেশের শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। এর বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন—

(১) বিলাতি সস্তা পণ্য

ইংল্যান্ড থেকে যেসব শিল্পজাত সামগ্রী বিক্রির উদ্দেশ্যে ভারতের বাজারে প্রবেশ করে, সেগুলি ভারতীয় পণ্যের চেয়ে দামে সস্তা ছিল। ফলে এদেশের দরিদ্র মানুষ ভারতের দামি পণ্য ছেড়ে সস্তাপণ্যের দিকেঝুঁকেছিল।

(২) উন্নত শিল্পসামগ্রী

ইংল্যান্ডের কলকারখানায় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর মান ছিল ভারতের কুটিরশিল্পজাত পণ্যের চেয়ে উন্নত। তাই এদেশে ধনী ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় বিদেশি পণ্যের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হত।

(৩) অভিজাত সম্প্রদায়ের অবলুপ্তি

ভারতের দেশীয় রাজন্যবর্গ ও অভিজাত সম্প্রদায় দেশীয় শিল্পপণ্যের পৃষ্ঠপোষক ছিল। পরবর্তীকালে এই সম্প্রদায়ের অবলুপ্তি দেশীয় শিল্পের ক্ষতি করে।

(৪) শিল্পবিপ্লবের প্রভাব

ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লব ঘটার ফলে অল্প সময়ে প্রচুর পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হতে থাকে। ভারতের বাজারে এগুলির নিয়মিত জোগান দেশীয় পণ্যকে পিছিয়ে দেয়। রাসব্রুক উইলিয়ামস, হ্যামিলটন প্রমুখ মনে করেন যে, ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবই ছিল ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্যের ধ্বংসের মূল কারণ।

(৫) কাঁচামাল সরবরাহ

ব্রিটিশ সরকার ভারতে শিল্পের বিকাশ না ঘটিয়ে ভারতকে কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করে। ফলে ভারতে শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হয়।

(৬) শুল্ক সংরক্ষণ নীতি

ব্রিটিশ সরকার শুল্ক সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যের ওপর বিপুল পরিমাণ শুল্ক চাপালেও বিলাতি পণ্যের ওপর শুল্ক ছাড় দেয়। ফলে ভারতীয় পণ্য বাণিজ্য-প্রতিযোগিতায় পিছু হঠতে বাধ্য হয়। রমেশচন্দ্র দত্ত মনে করেন যে, ভারতীয় বস্ত্র রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক এবং ব্রিটিশ সুতিবস্ত্র আমদানির ওপর ২ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করাই ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের ধ্বংসের অন্যতম কারণ।

দেশীয় শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের ফলাফল

ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্যের ধ্বংসের ফলাফল ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী।যেমন –

(১) শিল্পপণ্য আমদানি

শিল্প-বাণিজ্যের ধ্বংসের ফলে ভারত একটি রপ্তানিকারী থেকে আমদানিকারী দেশে পরিণত হয়। ইংল্যান্ড থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ শিল্পজাত সামগ্রী ভারতে আমদানি শুরু হয়।

(২) কাঁচামাল রপ্তানি

ভারতীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি ভারতের কাঁচামাল ইংল্যান্ডে রপ্তানি হতে শুরু করে। ভারতে উৎপাদিত কাঁচা তুলো, কাঁচা রেশম, নীল, চা, প্রভৃতি কাঁচামাল নিয়মিত ইংল্যান্ডের কারাখানাগুলিতে চলে যেতে থাকে। এর ফলে ভারত শিল্পপ্রধান দেশ থেকে কৃষিপ্রধান দেশে পরিণত হয়।

(৩) বেকারত্ব বৃদ্ধি

শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের ফলে দেশে তীব্র বেকার সমস্যা দেখা দেয়। বেকার শিল্পী ও কারিগররা অন্য পেশায় মন দেয় এবং অধিকাংশই কৃষিকার্যে নিযুক্ত হয়। ফলে কৃষির ওপর চাপ বাড়ে। এভাবে দেশে কৃষিজীবী ও ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

(৪) নগরের অবক্ষয়

অষ্টাদশ শতকে ঢাকা, মুরশিদাবাদ, সুরাট, মসুলিপট্টম, তাঞ্জোর প্রভৃতি ছিল শিল্পসমৃদ্ধ ওঘনবসতিপূর্ণ নগর। শিল্প বাণিজ্য ধ্বংসের ফলে এই সব নগর ক্রমে জনবিরল হতে থাকে এবং নগরের অবক্ষয় শুরু হয়।

(৫) দারিদ্র্য বৃদ্ধি

শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংসের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হলে ভারত একটি দরিদ্র দেশে পরিণত হয়। দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ভারতীয় জনজীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।

অব-শিল্পায়ন অলীক কল্পনা?

‘অব-শিল্পায়নের’ ব্যাপারটি নিয়ে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক এবং আধুনিক পণ্ডিত ডেনিয়েল থর্নার (Daniel Thorner), মরিস ডেভিড মরিস (Morris David Morris), স্যার থিওডোর মরিসন ( Theodore Morrison) ও অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্যের অন্ত নেই।

মরিস ডেভিড মরিসের অভিমত

মার্কিন গবেষক মরিস ডেভিড মরিস-এর মতে, অব-শিল্পায়নের পুরো ব্যাপারটিই হল ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের দ্বারা বহুল প্রচারিত একটি নিছক ‘অলীক কল্পনা’ বা ‘Myth’। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরা এর ওপর অযথা গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

মরিস ডেভিড মরিসের যুক্তি

অব-শিল্পায়ন যে অলীক কল্পনা এই ব্যাপারে মরিস ডেভিড মরিসের যুক্তি গুলি হল –

  • (১) জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরা শিল্পদ্রব্যের আমদানি বৃদ্ধি মানেই অব-শিল্পায়ন ধরে নিয়ে ভুল করেছেন। যদি জনসংখ্যা ও জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়, তবে দেশীয় শিল্প অক্ষত রইল এবং আমদানি বাড়ল—এমনও হতে পারে।
  • (২) শিল্পদ্রব্যের আমদানির ফলে কোনও কোনও দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য দেশীয় শিল্পের শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে পারে। উনিশ শতকের সূচনায় সুতো আমদানির ফলে ভারতের সুতো-কাটুনিরা মার খেল, কিন্তু তাঁতিরা সস্তায় সুতো পেয়ে সস্তা কাপড় তৈরি করে এবং সস্তা বিলেতি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পেরেছিল।
  • (৩) ভারতীয় কুটির শিল্পের একটি নিজস্ব বাজার ছিল, যেখানে কোনও বিদেশি প্রতিযোগিতা ছিল না। দামি শাড়ি, যা মিলে তৈরি হত না, বা পাটের শাড়ি, যা ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হত— সেগুলির বাজার অক্ষুণ্ণই ছিল, কারণ সেখানে কোনও বিদেশি প্রতিযোগিতা ছিল না।

মরিস ডেভিড মরিসের সিদ্ধান্ত

তাই মরিস-এর বক্তব্য এই সময় কোনও অব-শিল্পায়ন ঘটে নি—বরং আর্থিক উন্নয়নই হল এই যুগের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য।

মরিসের যুক্তি খণ্ডন

জাপানি ঐতিহাসিক তরু মাৎসুই (Toru Matsui) ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে মরিসের যুক্তি খণ্ডন করেছেন।তাঁর যুক্তি গুলি হল –

  • (১) উনিশ শতকে তাঁতিদের সংখ্যা ভয়াবহরূপে কমে যায় এবং তাদের অবস্থারও অবনতি হয়।
  • (২) তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ভারতে যে-পরিমাণ সুতো এসেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি-কাপড় আসে।
  • (৩) ইংল্যাণ্ডে তৈরি কাপড় এ দেশের বাজার দখল করার অনেক পরে ভারতে সুতো আমদানি শুরু হয়। ততদিনে ভারতীয় বস্ত্রশিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
  • (৪) সুতরাং সস্তায় সুতো কিনে ভারতীয় তাঁতিরা সস্তা দামে বস্ত্র তৈরি করে বিলেতি বস্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে—মরিসের এই যুক্তি একেবারেই ভিত্তিহীন।

অমিয় বাগচীর অভিমত

অর্থনীতিবিদ ডঃ অমিয় বাগচী পরিসংখ্যান-সহ দেখিয়েছেন যে, ১৮০৯-১৯০১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গাঙ্গেয় বিহারে কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল কারিগরদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। এই একশ’ বছরে শিল্পে নিয়োজিত লোকসংখ্যার অনুপাত ১৮.৬% থেকে ৮.৫%-এ নেমে আসে। জনসংখ্যার অনুপাত থেকেও অব-শিল্পায়নের চিত্র পরিষ্কার হয়ে যায়।

উপসংহার :- ডঃ সব্যসাচী ভট্টাচার্য, ডঃ তপন রায়চৌধুরী, ডঃ বিপান চন্দ্র কেউই মরিসের বক্তব্য গ্রহণে রাজি নন। তাঁদের মতে অব-শিল্পায়ন একটি বাস্তব সত্য।

(FAQ) অব-শিল্পায়ন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অব-শিল্পায়ন কী?

অব-শিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। টিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনে ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যমণ্ডিত কুটিরশিল্প বা হস্তশিল্পের বিপর্যয়কে অব-শিল্পায়ন বলা হয়।

২. অব-শিল্পায়ন বিষয়ে দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কারা?

দাদাভাই নৌরজি, রমেশচন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রাণাডে প্রমুখ।

৩. অব-শিল্পায়নকে অলীক কল্পনা বলেছেন কে?

মরিস ডেভিড মরিস।

Leave a Reply

Translate »