মোগল আফগান দ্বন্দ্ব

মোগল আফগান দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ, ঘর্ঘরার যুদ্ধ, হুমায়ুনের সময় দ্বন্দ্ব ও পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ সম্পর্কে জানবো।

মোগল আফগান দ্বন্দ্ব

ঐতিহাসিক ঘটনামোগল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতা
পানিপথের প্রথম যুদ্ধ১৫২৬ খ্রি:
খানুয়ার যুদ্ধ১৫২৭ খ্রি:
ঘর্ঘরার যুদ্ধ১৫২৯ খ্রি:
পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ১৫৫৬ খ্রি:
মোগল আফগান দ্বন্দ্ব

ভূমিকা :- ভারতে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা ছিল আফগানদের বিরোধিতা। ভারতের শাসকশ্রেণি আফগানরা এবং যোদ্ধাশ্রেণি রাজপুতরা মুঘলদের সামনে প্রাচীর তুলে দাঁড়ায়। আফগানদের বিরোধিতাই ছিল মোগলদের চিন্তার কারণ। তাই প্রাথমিক পর্বে বাবরকে আফগানদের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। তাঁর পুত্র হুমায়ুনের আমলেও মোগল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে থাকে।

মোগল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পানিপথের প্রথম যুদ্ধ

  • (১) দিল্লির শাসক ইব্রাহিম লোদী ছিলেন দাম্ভিক ও উদ্ধত প্রকৃতির মানুষ। ফলে আফগান অভিজাতরা ইব্রাহিম লোদীকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। পাঞ্জাবের আফগান শাসক দৌলত খাঁ মোগল নেতা বাবরকে ভারত আক্রমণের প্ররোচনা দেন।
  • (২) ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে বাবর ভারত আক্রমণ করেন, কিন্তু দৌলত খাঁর সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে কাবুলে ফিরে যেতে বাধ্য হন। পর বৎসর পূর্ণশক্তি নিয়ে বাবর পুনরায় ভারত অভিযান করেন এবং দৌলত খাঁকে পরাজিত করে পাঞ্জাব দখল করেন। অতঃপর মোগলবাহিনী দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়।
  • (৩) দিল্লির অদূরে পানিপথের প্রান্তরে মোগল-আফগান বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয় (১৫২৬ খ্রি)। কুশলী নেতৃত্ব দ্বারা বাবর মাত্র বারো হাজার সৈন্যের সাহায্যে বিশাল আফগান বাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদী নিহত হন। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ভারত ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। তুর্কি-আফগানদের পরিবর্তে মুঘল বংশের শাসনের সূচনা ঘটে।

মোগল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খানুয়ার যুদ্ধ

  • (১) মুঘল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতা চূড়ান্ত হওয়ার মাঝপথে বাবর রাজপুতদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহ (সঙ্গ) সুলতানি সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপে স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। এই লক্ষ্যে তিনি মাড়োয়ার, অম্বর, চান্দেরি, গোয়ালিয়র, আজমির প্রভৃতি রাজ্যের রাজপুত রাজাদের সংঘবদ্ধ করেন।
  • (২) মুঘলবিরোধী রাজপুত জোটের সাথে যোগ দেন আফগান দলপতি মামুদ লোদী। খানুয়ার প্রান্তরে সম্মিলিত রাজপুতদের পরাজিত (১৫২৭) করে বাবর পুনরায় তাঁর সামরিক দক্ষতার পরিচয় দেন। খানুয়ার যুদ্ধের ফলে ভারতে রাজপুতদের রাষ্ট্র স্থাপনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ বিলোপ হয়, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দৃঢ় হয়।

মোগল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঘর্ঘরার যুদ্ধ

  • (১) রাজপুতদের শক্তি ধ্বংস করার পর বাবর পুনরায় আফগানদের মুখোমুখি হন। পানিপথের যুদ্ধের পরেও আফগানদের শক্তি নিঃশেষিত হয়নি। ইব্রাহিম লোদীর ভ্রাতা মামুদ লোদী আফগান সর্দারদের একত্রিত করে মোগলের ওপর আক্রমণ হানার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
  • (২) বাংলার শাসক নসরৎ শাহও মামুদ লোদীকে সমর্থন জানান। বাবর কালক্ষেপ না করে বারাণসী, এলাহাবাদ ও চুনার দখল করে নেন। অতঃপর পাটনার উত্তরে গঙ্গা ও ঘর্ঘরা (গোগরা) নদীর সংযোগস্থলে বাবর আফগান বাহিনীর মুখোমুখি হন। এক্ষেত্রেও দক্ষ সেনাপতি বাবর আফগানদের পরাজিত ও বিধ্বস্ত করেন।
  • (৩) নসরৎ শাহ সহ বহু আফগান সর্দার বাবরের আনুগত্য মেনে নেন। এই যুদ্ধের ফলে পশ্চিমে কাবুল থেকে পূর্বে ঘর্ঘরা নদী এবং উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে গোয়ালিয়র পর্যন্ত মুঘল কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়। ঘর্ঘরার যুদ্ধের (১৫২৯) পরেই বাবর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৫৩০-এর ২৬শে ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

হুমায়ুনের আমলে মোগল-আফগান দ্বন্দ্ব

  • (১) বাবরের মৃত্যুর পর দিল্লির সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র হুমায়ুন (১৫৩০ খ্রিঃ)। আফগানরা নতুন উদ্যমে মোগলদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়। এই কাজে বিশেষ উদ্যোগী ছিলেন মামুদ লোদী, বাংলার আফগানশাসক গিয়াসউদ্দিন মামুদ শাহ এবং বিহারের উদীয়মান আফগান যুবক শের খাঁ।
  • (২) বাবরের হাতে পরাজিত হবার পরেও আফগান নেতা মামুদ লোদী হাল ছেড়ে দেননি। তিনি আফগানদের সংগঠিত করে দিল্লি দখলের পরিকল্পনা করতে থাকেন। গুজরাটের আফগান শাসক বাহাদুর শাহকে দিল্লি দখল করতে উদগ্রীব ছিলেন। অন্যদিকে বিহারের উদীয়মান আফগান নেতা শের খাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধিও মোগল সাম্রাজ্যের পক্ষে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
  • (৩) এমতাবস্থায় হুমায়ুন আফগানদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে তিনি বুন্দেলখণ্ডের কালিঞ্জর দুর্গ আক্রমণ করেন। এই দুর্গের হিন্দু অধিপতি প্রতাপরুদ্র আফগানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এখান থেকে তিনি বিপুল অর্থ আদায় করেন।
  • (৪) এরপর তিনি দৌরার যুদ্ধে মামুদ লোদী ও তাঁর আফগান সহযোগীদের পরাজিত করেন (১৫৩২ খ্রিঃ)। এরপর হুমায়ুন আফগান বীর শের খার অধীনস্থ চুনার দুর্গ অবরোধ করেন। চার মাস অবরোধের পর শের খাঁ মৌখিক আনুগত্য স্বীকার করলে হুমায়ুন অবরোধ তুলে নেন।
  • (৫) এরপর হুমায়ুন গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। বাহাদুর শাহের সাথে হুমায়ুনের যুদ্ধে লিপ্ত থাকার সুযোগে শের খা পূর্ব ভারতে নিজ শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বেশ কিছু এলাকা দখল করে রাজধানী গৌড় অবরোধ করেন।
  • (৬) শের খাঁর ক্ষমতাবৃদ্ধিতে হুমায়ুন শঙ্কিত বোধ করেন। হুমায়ুন চুনার দুর্গ অবরোধ করেন। শের খাঁ গৌড়ে পালিয়ে যান। ৬ মাস পরে তিনি যখন গৌড়ে যান, তখন শের খাঁ সেখান থেকে সরে এসে কনৌজ ও জৌনপুর দখল করে নেন। ফলে আগ্রার নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে ওঠে।
  • (৭) হুমায়ুন দ্রুত দিল্লি প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পথিমধ্যে বক্সারের নিকট ‘চৌসা’ গ্রামে শের খাঁ হুমায়ুনের পথ অবরোধ করেন। চৌসার যুদ্ধে (১৫৩৯ খ্রিঃ) হুমায়ুন পরাজিত ও বিধ্বস্ত হন। কোনোক্রমে আগ্রায় পালিয়ে তিনি প্রাণরক্ষা করেন। এই বিজয়ের ফলে বাংলা, বিহার, জৌনপুর, শের খাঁ’র রাজ্যভুক্ত হয়।
  • (৮) চৌসার যুদ্ধের পর শের খাঁ ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। এবং নিজেকে দিল্লির মসনদের বৈধ দাবিদার বলে ঘোষণা করেন। হুমায়ুন পুনরায় শক্তি সংগ্রহ করে এক বছরের মধ্যেই শের শাহকে আক্রমণ করেন। বিল্বগ্রাম বা কনৌজের যুদ্ধে হুমায়ুন আবার পরাজিত হন (১৫৪০ খ্রিঃ)।
  • (৯) আগ্রা ও দিল্লি শেরশাহের হস্তগত হয়। হুমায়ুন পারস্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এইভাবে মোগল-আফগান দ্বন্দ্বের পরিণতিতে দিল্লির সিংহাসনে আফগান-বীর শেরশাহের অধিষ্ঠান ঘটে। তিনি পাঁচ বছর রাজত্ব করেন।

মুঘল শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা

  • (১) শের শাহের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তাঁর দুর্বল বংশধরেরা আত্মকলহে লিপ্ত থেকে ক্ষমতা হ্রাস করেন। এই সময় শের শাহের আত্মীয় মুরারিজ খাঁ ষড়যন্ত্র দ্বারা দিল্লির ক্ষমতা দখল করেন। তিনি উপাধি নেন ‘মহম্মদ আদিল শাহ’। শাসক হিসেবে তিনিও ছিলেন অপদার্থ। এই সুযোগে তাঁর হিন্দু মন্ত্রী হিমু সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন।
  • (২) আফগান সর্দার ইব্রাহিম খাঁ, সিকন্দর শূর প্রমুখ দিল্লি, আগ্রা, সিন্ধু ও গঙ্গার মধ্যবর্তী অঞ্চল দখল করে নেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রাজ্যচ্যুত মুঘল শাসক হুমায়ুন পারস্যের শাহ তহমাস্পের সহায়তায় দিল্লি ও আগ্রা পুনর্দখল করেন (১৫৫৫ খ্রি)। কিন্তু পরের বছরেই তিনি মারা যান।

মোগল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ

  • (১) সিংহাসন আরোহণ কালে আকবর ছিলেন মাত্র তেরো বছরের কিশোর। তাই মোগলদের বিশ্বস্ত অনুচর ও পাঞ্জাবের শাসনকর্তা বৈরাম খাঁ তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন। এই সময় মুঘল সাম্রাজ্য আগ্রা, দিল্লি ও পাঞ্জাবের ক্ষুদ্র অংশে সীমাবদ্ধ ছিল।
  • (২) শের শাহের আত্মীয় মহম্মদ আদিল শাহ পূর্ব ভারতে প্রভূত শক্তি সঞ্চয় করে দিল্লি দখলের স্বপ্ন দেখেছিলেন। হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যু আদিলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করে। আদিল শাহের মন্ত্রী হিমু সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে আগ্রা, দিল্লি জয় করে নিজেকে স্বাধীন সুলতান রূপে ঘোষণা করেন। কিশোর আকবর তখন পাঞ্জাব সীমান্তে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন।
  • (৩) ইতিমধ্যে বৈরাম খাঁ আকবরকে দিল্লির মোগল বাদশা বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। এখন বৈরাম খাঁ ও আকবর হিমুর বিরুদ্ধে সসৈন্যে অগ্রসর হন। পাণিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে (১৫৫৬খ্রিঃ) হিমুকে পরাজিত ও নিহত করে আকবর দিল্লি পুনরুদ্ধার করেন।

উপসংহার :- এইভাবে তিনদশক ধরে চলা মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব সমাপ্ত হয়। ভারতে মোগল শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়।

(FAQ) মোগল আফগান দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কখন হয়?

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে।

২. খানুয়ার যুদ্ধ কখন হয়?

১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে।

৩. ঘর্ঘরার যুদ্ধ কখন হয়?

১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে।

৪. পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ কখন হয়?

১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment