মৌর্য বৈদেশিক সম্পর্ক

মৌর্য বৈদেশিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে মণ্ডলতত্ত্ব, উত্তর-পশ্চিমে মুক্তিযুদ্ধ, সেলকাসের সাথে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সম্পর্ক, সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, বিন্দুসারের বৈদেশিক নীতি, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিদেশে অশোকের ধর্মপ্রচার ও তার ফলাফল, সিংহলের সাথে সম্পর্ক, দক্ষিণের তামিল রাজ্য, নেপাল ও খোটানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে জানবো।

মৌর্য বৈদেশিক সম্পর্ক

বিষয় মৌর্য-বৈদেশিক সম্পর্ক
মণ্ডলতত্ত্ব কৌটিল্য
অর্থশাস্ত্র কৌটিল্য
গ্ৰীক দূত মেগাস্থিনিস
ধর্ম প্রচার সম্রাট অশোক
মৌর্য বৈদেশিক সম্পর্ক

ভূমিকা :- মৌর্য সম্রাটদের বৈদেশিক নীতি অনেকটা কৌটিল্যের দেওয়া ছকে চলত। ভারতের রাজাদের সঙ্গে তারা তত সম্প্রীতি না রাখলেও ভারতের সীমান্তে গ্রীক রাজাদের সঙ্গে সম্প্রীতি রেখে চলা ছিল মৌর্য রাজাদের নীতি। সেলুকাসের সঙ্গে যুদ্ধের পর থেকে চন্দ্রগুপ্ত, বিন্দুসার, অশোক এই নীতি নিয়ে চলেন।

মণ্ডলতত্ত্ব

কৌটিল্য তার অর্থশাস্ত্রে মণ্ডলতত্ত্বের অবতারণা করেছেন। কৌটিল্য বলেছেন যে, প্রতিবেশী রাজ্য হল প্রকৃতিগত শত্রু এবং তার পরের প্রতিবেশী রাজ্য হল স্বভাব মিত্র। রাজার কাজ হবে নিকট প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে জোট বেঁধে তাকে বেষ্টন বা মণ্ডলীকরণ করা।

উত্তর-পশ্চিমে মুক্তিযুদ্ধ

  • (১) গ্রীক বিজেতাদের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সম্পর্ক সিংহাসনে বসার আগেই শুরু হয়। জাস্টিনের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, চন্দ্রগুপ্ত পাঞ্জাবে আলেকজাণ্ডারের শিবিরে গিয়ে তাকে নন্দ রাজাদের আক্রমণ করার প্ররোচনা দেন। ক্রুদ্ধ আলেকজাণ্ডার এই অজ্ঞাতকুলশীল যুবকের স্পর্ধায় বিরক্ত হয়ে তাকে প্রাণনাশের আদেশ দিলে, তিনি দ্রুত পালিয়ে প্রাণ বাঁচান।
  • (২) এর পর আলেকজাণ্ডার ভারত ছাড়লে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর গ্রীক শাসিত অঞ্চলকে মুক্ত করার কাজে চন্দ্রগুপ্ত এগিয়ে আসেন। জাস্টিনের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ম্যাসিডোনীয় শাসনকর্তাদের তিনি বিতাড়িত করে সিন্ধু নদ পর্যন্ত অধিকার করেন।

সেলুকাসের সাথে চন্দ্রগুপ্তের সম্পর্ক

  • (১) আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর তার পূর্ব দিকের সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন তার সেনাপতি সেলুকাস। তিনি ভারতে তার লুপ্ত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ৩০০ খ্রিস্ট পূর্বে অভিযান করে।
  • (২) সেলুকাসের সঙ্গে গ্রীক বিবরণ থেকে মনে হয় যে, সেলুকাস যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে চন্দ্রগুপ্তকে কাবুল, কান্দাহার, হিরাট ও বেলুচিস্থান ছেড়ে দেন। চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসকে ৫০০ হাতি দেন। উভয়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক

  • (১) এর পর থেকে চন্দ্রগুপ্ত গ্রীক রাজাদের সঙ্গে কৌটিল্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মণ্ডলতত্ত্ব পালন করেন। তিনি ভারতীয় রাজাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ-বিগ্রহ করলেও গ্রীক রাজাদের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক রেখে চলেন।
  • (২) সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্রে মেগাস্থিনিস নামে এক রাষ্ট্রদূত পাঠান। চন্দ্রগুপ্ত ভারতীয় দূত পাঠান কিনা তা জানা যায় নি। তবে তিনি সিরিয়ার গ্রীক রাজার জন্য কিছু ঔষধ পাঠান বলে জানা যায়।
  • (৩) ডিওডোরাস চন্দ্রগুপ্তের গ্রীক প্রীতির উল্লেখ করেছেন। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্রে বহু বিদেশী বসবাস করত বলে মেগাস্থিনিস বলেছেন। এই বিদেশীদের মধ্যে হয়ত অনেক গ্রীক ছিল।

বিন্দুসারের বৈদেশিক নীতি

  • (১) বিন্দুসার সিংহাসনে বসে তাঁর পিতার নীতি অনুসরণ করেন। অনেকের মতে, তাঁর মা ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের গ্রীকজাতীয়া পত্নী। তবে এই বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানা যায় না। ডিওডোরাসের রচনা থেকে জানা যায় যে, সিরিয়ার রাজা এন্টিওকাস পাটলিপুত্রে ডেইমাকস নামে এক দূত পাঠান।
  • (২) মিশরের রাজা টলেমি ফিলাডেলফাস পাটলিপুত্রে ডাইওনিসাস নামে এক দূত পাঠান। সিরিয়ার গ্রীক রাজার নির্দেশে পেট্রোক্লেস বলে এক নাবিক ভারত সমুদ্রে অভিযান করে বহু তথ্য যোগাড় করেন। সম্ভবত বাণিজ্যের রাস্তা আবিস্কারের জন্যে এই অভিযান পাঠান হয়।
  • (৩) হেজিসেণ্ডারের রচনা থেকে দেখা যায় যে, বিন্দুসার সিরিয়ার গ্রীক রাজার কাছে কিছু মিষ্ট মদ, শুকনো ডুমুর ও একজন গ্রীক দার্শনিক চেয়ে পাঠান। সিরিয়ার রাজা জানান যে, গ্রীসের আইনে দার্শনিক বিক্রয় করা যায় না তবে তিনি অন্য সব জিনিষ পাঠাবেন।

বাণিজ্যিক সম্পর্ক

  • (১) অশোকের আমলে বৈদেশিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। এর কারণ এই ছিল যে, মৌর্য যুগে বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। তক্ষশীলা থেকে উত্তর-পশ্চিমের গিরিপথ দিয়ে এবং পশ্চিম উপকূলের ভৃগুকচ্ছ বন্দর থেকে সমুদ্রপথে নিয়মিত ভারতীয় মাল পশ্চিম এশিয়ায় রপ্তানি হত।
  • (২) এই সূত্রে বহু ভারতীয় বিদেশে যেত এবং বহু বিদেশী ভারতে আসত। আলেকজাণ্ডারের ভারত আক্রমণের ফলে ভারতের বিচ্ছিন্নতা দূর হয়। বহু ভারতীয় বিদেশে বাণিজ্যের জন্য এবং বিদেশীরা ভারতে আসতে থাকে। এই বিদেশীদের মধ্যে ছিল বহু গ্রীক।
  • (৩) মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, পাটলিপুত্রে বিদেশীদের ভালমন্দ ও বসবাসের বিষয় দেখার জন্যে একটা সরকারী দপ্তর ছিল। অশোকের আমলে এই বৈদেশিক সংযোগ অনেক বেশী বাড়ে। ভারতের বাইরে অশোক ধর্মদূত পাঠান। এর ফলে বৈদেশিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।

বিদেশে অশোকের ধর্মপ্রচার

ত্রয়োদশ শিলালিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অশোক ধর্মপ্রচার ও কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য পশ্চিমের গ্রীক রাজাদের দেশে দূত পাঠান। ত্রয়োদশ শিলালিপিতে বেশ কিছু গ্রীক রাজার নাম করা হয়েছে। যথা –

  • (১) সিরিয়ার যোন বা যবন রাজা এ্যান্টিয়োকাস,
  • (২) মিশরের রাজা টলেমি ফিলাডেলফাস,
  • (৩) ম্যাসিডোনিয়ার রাজা আম্বিকিনি বা এ্যান্টিগোনাস,
  • (৪) কাইরেনির রাজা মক বা ম্যাগাস এবং
  • (৫) এপিরাসের রাজা অলিকসুন্দর বা আলেকজাণ্ডার।

বিদেশে অশোকের ধর্মপ্রচারের ফলাফল

  • (১) অনেকে বলেন যে, অশোক এই সকল রাজ্যে যে দূত পাঠান তারা তেমন সফলতা পায়নি। কারণ, সপ্তম স্তম্ভলিপি ছিল সর্বসাধারণের জন্য অশোকের শেষতম ঘোষণা। তাতে এই সকল দূতের কথা বলা হয়নি।
  • (২) তবে সপ্তম স্তম্ভলিপি অশোকের রাজ্যের আভ্যন্তরীন বিষয়ে ঘোষিত হয়। তাতে বিদেশ নীতির খবর নাও থাকতে পারে। এর দ্বারা অশোকের বিফলতা প্রমাণিত হয় না। তবে গ্রীক ঐতিহাসিকেরা অশোকের পাঠান দূতের কোনো উল্লেখ করেননি। এ থেকে মনে হয়, সিরিয়া ছাড়া অন্য অঞ্চলে অশোক তেমন সফলতা পাননি।
  • (৩) সিরিয়া ছিল ভারতের নিকটতম গ্রীক প্রতিবেশী রাজ্য। হয়ত এজন্য সিরিয়ায় অশোক অনেক বেশী সফলতা পান। অশোকের অধীনস্থ প্রদেশ সৌরাষ্ট্রে এক গ্রীক বা যবন শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়। তাঁর নাম ছিল তুষাস্প।
  • (৪) পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে অশোকের প্রভাব ছিল। তার ধর্মদূতেরা এই অঞ্চলে প্রচার চালায়। পশ্চিম এশিয়ায় বৌদ্ধ ভিক্ষুধর্মের প্রভাব পরবর্তীকালে খ্রীষ্টীয় চিন্তাধারায় দেখা গিয়েছিল। অশোকের লিপিতে পারসিক সম্রাটদের লিপির প্রভাব আছে বলে অনেকে মনে করেন।

সিংহলের সাথে সম্পর্ক

ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে দক্ষিণের সিংহলে অশোকের প্রভাব পড়েছিল। তার পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সঙ্ঘমিত্রা সিংহলে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিলেন। তাদের চেষ্টায় সিংহল রাজ তিষ্য ও সিংহলবাসীরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন।

দক্ষিণের তামিল রাজ্য

দক্ষিণের তামিল রাজ্যগুলি অশোকের নেতৃত্ব মেনে চলত। তাঁর ধর্মমহামাত্ররা এই সকল রাজ্যে ধর্মপ্রচার করত।

নেপাল ও খোটান

উত্তরে নেপালের অনেকটাই মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নেপালের তরাই অঞ্চল তাঁর রাজ্যভুক্ত ছিল। আর অশোক খোটানে গিয়েছিলেন বলে একটি তিব্বতী কিংবদন্তীতে পাওয়া যায়। খোটানেও তার প্রভাব ছিল।

উপসংহার :- কাশ্মীরে অশোকের প্রভাব সম্পর্কে রাজতরঙ্গিনী, হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণ থেকে জানা যায়। কিন্তু কাশ্মীরে তার কোনো শিলালিপি বা স্তূপ পাওয়া যায়নি। এই উপাদানগুলির সাহায্যে মনে করা হয় যে, কাশ্মীর প্রত্যক্ষভাবে তাঁর সাম্রাজ্যের হয়ত অধীনে ছিল না কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে ছিল।

(FAQ) মৌর্য বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অর্থশাস্ত্র কার লেখা?

কৌটিল্য বা চাণক্য।

২. মৌর্য রাজাদের বৈদেশিক সম্পর্ক কোন নীতি অনুযায়ী চলতি?

কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব।

৩. মেগাস্থিনিস কোন রাজার আমলে ভারতে আসেন?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।

৪. মৌর্য রাজাদের রাজধানী কোথায় ছিল?

পাটলিপুত্র।

Leave a Reply

Translate »