মালিনী

প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী মালিনী প্রসঙ্গে মালিনীর পরিচয়, মালিনীর শিক্ষা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরাগ, মালিনী কর্তৃক বৌদ্ধ শ্রমণদের ভোজন করানো ও দান, মালিনীর বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ ও পন্ডিতদের অভিযোগ মালিনীর নির্বাসনদন্ড, মালিনী ও রাজার কথোপকথন, রাজা কর্তৃক মালিনীর বক্তৃতার উদ্দেশ্যে সভার আয়োজন, মালিনীর বক্তৃতা শুনার আগ্রহ, বিদুষী মালিনী কর্তৃক বক্তৃতা প্রদান, মালিনীর বক্তৃতা শুনে দশ সহস্র লোকের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা, মালিনীর প্রভাবে রাজপ্রাসাদে বুদ্ধ মন্ত্র, অভিভাবিকা ও আচার্যা রূপে মালিনী সম্পর্কে জানবো।

প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী মালিনী

ঐতিহাসিক চরিত্রমালিনী
পরিচিতিবৌদ্ধ যুগের বিদুষী নারী
পিতাকৃকী রাজা
রাজ্যবারাণসী
ধর্মবৌদ্ধ ধর্ম
প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী মালিনী

ভূমিকা :- মালিনীর নাম বৌদ্ধযুগে বিশেষ প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন প্রাচীন বারাণসি রাজ্যের রাজ কন্যা।

মালিনীর পরিচয়

প্রায় দু হাজার বছর পূর্বে বারাণসী নগরে কৃকী নামে একজন প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। তিনি সেকালের বৌদ্ধ প্রভাবের মধ্যে থাকেও বৈদিক ধর্মালম্বী হিন্দু ছিলেন। রাজা কৃকীর সুশাসনে বারাণসি রাজ্য বিশেষ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। মালিনী এই কৃকী নৃপতির কন্যা।

মালিনীর শিক্ষা

সেই যুগে রাজা ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সকলেই নিজ নিজ কন্যা ও ভগিনীকে সুশিক্ষিতা করতেন। কৃকী বারাণসীর প্রসিদ্ধ বেদজ্ঞ পণ্ডিতগণের সাহায্যে কন্যা মালিনীকে বৈদিক ধর্মে শিক্ষা প্রদান করেছিলেন। মালিনীর যেমন ছিল রূপের খ্যাতি, তেমনি ছিল তাঁর গুণের খ্যাতি।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি মালিনীর অনুরাগ

মালিনী হিন্দুরাজার কন্যা হয়েও বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগিণী ছিলেন। বৌদ্ধ শ্রমণদেরকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। গোপনে পিতার অজ্ঞাতে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে অসাধারণ জ্ঞানলাভ করেছিলেন।

মালিনী কর্তৃক বৌদ্ধ শ্রমণদের ভোজন করানো ও দান

একদিন রাজার অজ্ঞাতে রাজপ্রাসাদে কতিপয় বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীকে নিমন্ত্রণ করে মালিনী দেবী তাঁদেরকে অতি পরিতোষ সহকারে ভোজন করিয়েছিলেন। তাঁদের প্রস্থান সময়ে রাজকুমারী পুঁথিবন্ধনের জন্য প্রত্যেককে ক্ষৌমবস্ত্রখণ্ড দান করেছিলেন। বৌদ্ধ শ্রমণেরা রাজকুমারীর এরূপ প্রীতিপূর্ণ ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে প্রস্থান করলেন।

মালিনীর বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতদের অভিযোগ

  • (১) কথাটা গোপন রইল না। ক্রমে ঘটনা রাজা কৃকীর কানে গিয়ে পৌঁছল। এদিকে বৌদ্ধধর্মবিদ্বেষী ব্রাহ্মণদের কাছেও তা গোপন রইল না। তাঁরা রাজাকে বললেন, “মহারাজ! আপনার কুমারী কন্যা এই কাজটি অত্যন্ত অন্যায় করেছেন।
  • (২) তার যদি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদেরকে ভোজন করানই অভিপ্রায় ছিল, তাহলে অনায়াসেই বৌদ্ধমঠে খাদ্য দ্রব্যাদি প্রেরণ করতে পারতেন। শাস্ত্রে আছে অবিবাহিতা কন্যা পিতার অধীন। অতএব আপনার অনুমতি গ্রহণ না করে স্বাধীনভাবে শ্রমণদেরকে নিমন্ত্রণ করে ভোজন করান ব্যাপারটা শুধু বিগর্হিত যে হয়েছে তা নয়, রাজদ্রোহও হয়েছে।
  • (৩) বৌদ্ধরা আজকাল শুধু যে ধর্মালোচনাই করছেন তা নয়। তাঁরা সাম্রাজ্যবৃদ্ধির দিকেও মনোনিবেশ করেছেন। এইরূপ স্থলে হিন্দুরাজা হয়েও যখন রাজকুমারী বৌদ্ধদের সাথে মিলিত হচ্ছেন, তখন নিশ্চয়ই তিনি কোনোরূপ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন।
  • (৪) আমাদের শঙ্কা হয় যে, আপনার এই স্বাধীন বারাণসি রাজ্য আপনার কন্যার চক্রান্তে পরহস্তগত হবে। এরূপ স্থলে রাজনৈতিক যুক্তি হিসাবেও আপনার কর্তব্য এই কন্যাকে নির্বাসনদণ্ডে দণ্ডিত করা। আশা করি আপনি অচিরে এই দণ্ডবিধান করবেন।”

মালিনীর নির্বাসন দণ্ড

ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতগণের এই উপদেশ অনুসারে রাজা মালিনীকে চিরনির্বাসন করলেন। মালিনী পিতার এই নিষ্ঠুর আদেশ শ্রবণ করে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হলেন না, বরং নির্ভীকভাবে আনন্দের সাথেই সেই আদেশ গ্রহণ করলেন। মালিনী শুধু পিতাকে একটি অনুরোধ করলেন । তিনি বললেন “আমি রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেছি। আমি রাজকন্যা জন্ম হতে এপর্যন্ত সুখ ও বিলাসের মধ্যেই লালিতাপালিতা; অতএব নির্বাসনদণ্ড গ্রহণ করবার জন্য প্রস্তুত হবার নিমিত্ত আমি আপনার নিকট এক সপ্তাহ সময় চাইছি।

মালিনীর ষড়যন্ত্রের চিন্তায় রাজ্যে কড়া পাহারা

মহারাজ কৃকী এই অনুরোধ সেই মুহূর্তেই পালন করলেন। রাজা ভাবলেন সাত দিনের মধ্যে মালিনী কি এমন ষড়যন্ত্র করতে পারবে যাতে আমার রাজ্যের অনিষ্ট করতে পারে ? এজন্য তিনি সাতদিন সময় দিতে কোনো প্রকার দ্বিধা করলেন না। কিন্তু এদিকে তিনি রাজবাড়ীর সর্বত্র কড়া পাহারার ব্যবস্থাও করলেন। শ্রমণদের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ লাভ নিষিদ্ধ হল।

মালিনী ও রাজার কথোপকথন

রাজা: “তুমি আমার কন্যা। পিতার সম্মান ও বংশগৌরব রক্ষা করা তোমার একান্ত কর্তব্য। তুমি নির্বাসনদণ্ড পালন করতে চলেছ, তথাপি তোমার প্রতি আমার যে কর্তব্য আছে তা আমি সম্পাদন করতে চাই। তোমার নির্বাসনে বাসোপযোগী কি কি দ্রব্য গ্রহণ করবে তা আমাকে বল, আমি সে সকলের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

মালিনী: “পিতঃ! আমার নির্বাসনবাসের জন্য আমাকে কোন জবাই দিতে হবে না। আমি আপনার নিকট শুধু একটি অনুমতি চাইছি, সেই অনুমতি প্রদান করলেই আনন্দিত হব।”

রাজা: কি তোমার প্রার্থনা বল !

মালিনী: আমি এই সাতদিন কাল আপনাদের সকলের নিকট বক্তৃতা করতে চাই। সাতদিন আমার বক্তৃতা শুনে যদি আমাকে নির্বাসিত করেন তাহলেই আমি সুখী হব।

রাজা: চিন্তা করে বললেন  “আচ্ছা, আমি তোমাকে বক্তৃতা করতে অনুমতি দিলাম ।”

মালিনী: “তাহলে আপনি রাজপ্রাসাদ-মধ্যে বক্তৃতার আয়োজন করুন। রাজবাড়ীর বৈদিক পণ্ডিতগণ এবং মন্ত্রিগণকে আহ্বান করুন। আমি বক্তৃতা প্রদান করব।”

রাজা কর্তৃক মালিনীর বক্তৃতার উদ্দেশ্যে সভার আয়োজন

রাজা সভার ব্যবস্থা করলেন। ষোড়শবর্ষীয়া তরুণী মালিনীদেবীর বক্তৃতা দেবার কথা রাষ্ট্র হবার পর রাজপুরীতে বিস্তর লোক সমাগত হল। সকলেই রাজকুমারীর মুখের কথা, তাঁর অপরূপ রূপলাবণ্যশ্রীমণ্ডিত মুখশ্রী এবং সঙ্গে সঙ্গে এরূপ অসম্ভব ব্যাপারের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে সমুৎসুক হয়ে রাজপুরীতে সমবেত হলেন।

মালিনীর বক্তৃতা শোনার আগ্ৰহ

  • (১) রাজবাড়ীর সুপ্রশস্ত প্রাঙ্গণ। চন্দ্রাতপতলে সুসজ্জিত আসনে শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী স্বয়ং রাজা, মন্ত্রিগণ, পণ্ডিতসকল, রাজসেনাপতি, সৈনিকগণ, পুরবাসিগণ সকলে সমবেত হয়েছেন। দশসহস্র লোক নীরব ও নিষ্পন্দভাবে রাজকুমারী মালিনীর বক্তৃতা শুনছেন।
  • (২) উচ্চ বেদীর উপর দাঁড়িয়ে তিনি নির্ভীকভাবে বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা করছেন। তাঁর অপূর্ব দেহের শোভা, রত্নালঙ্কার বিভূষিতা সাজসজ্জা এবং দীপ্ত যৌবন প্রভা চারিদিক আলোকিত করল। মুখ থেকে বিমল প্রতিভার জ্যোতিঃ প্রকাশিত হচ্ছিল।

বিদুষী মালিনী কর্তৃক বক্তৃতা প্রদান

  • (১) মালিনী বলতে লাগলেন গৌতম বুদ্ধের পবিত্র ধর্মের কথা। কেমন করে অবিদ্যা মানুষের সকল দুঃখের মূল হয়ে তাকে বিপদাপন্ন করে। কেমন করে মানুষ শোক, দুঃখ, জরা, ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও, প্রলোভনের মধ্যে বাস করে। অবিদ্যা হতেই সংস্কার। সংস্কার হতেই বিজ্ঞান। বিজ্ঞান হতে নামরূপ। নামরূপ হতে ষড়ায়তান, অর্থাৎ মন ও পঞ্চেন্দ্রিয়।
  • (২) ষড়ায়তন হতে স্পর্শ। স্পর্শ হতে বেদনা। বেদনা হতে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা হতে উপাদান বা আসক্তি। উপাদান হতে ভব। ভব হতে জন্ম। জন্ম হতে রোগ, শোক, জরা, মৃত্যু ও দুঃখের উদ্ভব। যদি অবিদ্যাকে নাশ করতে পারা যায়, তাহলে পর্যায়ক্রমে সংস্কার, সংজ্ঞা, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, তৃষ্ণা, আসক্তি প্রভৃতি বিনষ্ট হয়ে জন্মবন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর পরিশেষে জরা, মৃত্যু, রোগ, শোক প্রভৃতি সর্বদুঃখের বিনাশ হয়।
  • (৩)  বুদ্ধদেব এই যে দুঃখের মূল কারণ এবং তার বিনাশের কারণ তাই ধ্যানযোগে লাভ করেছেন। মালিনী একে একে বৌদ্ধদর্শন ও বৌদ্ধধর্মের বিস্তারিত আলোচনা করে, বৌদ্ধশাস্ত্রে নির্বাণের যে কথা আছে তা বললেন। বুদ্ধদেবের নির্বাণ যে ভাবাভাব এই দুইয়ের অতীত তা বললেন, বললেন,

“ন চাভাবোঽপি নির্ব্বাণং কুত এবাস্য ভাবতা।

ভাবাভাব বিনির্মুক্তঃ পদাৰ্থ নিৰ্বাণ মুচ্যতে।”

  • (৪) দুঃখ, শোক, পাপতাপ হতে মুক্তিলাভ শান্তি, আনন্দ, পবিত্রতাই হল নির্বাণের অবস্থা। বেদান্তের মতে যেমন জীবাত্মার পরব্রহ্মে লীন হওয়া, বৌদ্ধমতে নির্বাণপ্রলয়-সাগরে ডুবে যাওয়া, এর উর্ধ্বে আর কিছু নেই। অন্ধকার, নিস্তব্ধতা, শূন্যতা, বিনাশ !

মালিনীর বক্তৃতা শুনে দশ সহস্র লোকের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা

বিদুষী মালিনী সাতদিন পর্যন্ত অহিংসা পরমধর্মের মূলসূত্র, ধর্মের মূল সত্য একে একে বর্ণনা করলেন। তাঁর এইরূপ উপদেশ ও সারগর্ভ বক্তৃতা শুনে, বিশেষতঃ বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে রাজকন্যা মালিনীর অসাধারণ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য দেখে কোথায় গেল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের কূটতর্কনীতি! কোথায় গেল তাদের বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধভাব! কোথায় গেল তাঁদের রাজকন্যার প্রতি বিদ্বেষভাব ! দেখতে দেখতে এই সপ্তাহকালমধ্যে রাজা রাণী, ভ্রাতা, ভগিনী, মন্ত্রী, ব্রাহ্মণ, পৌরজনগণ সহ দশসহস্র লোক বৌদ্ধধর্মে দীক্ষালাভ করলেন।

মালিনীর প্রভাবে রাজপ্রাসাদে বুদ্ধ মন্ত্র

রাজপ্রাসাদের সুপ্রশস্ত প্রাঙ্গণমধ্যে সহস্ৰ সহস্ৰ কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল –

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।

ধর্মং শরণং গচ্ছামি।

সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি ।

মালিনীর নির্বাসন দণ্ড বহনের অনুমতি

এইভাবে সপ্তাহকাল পার হলে মালিনী নির্বাসনদণ্ড বহন করবার জন্য প্রস্তুত হলেন। তিনি বললেন “পিতা, সাতদিন অতিবাহিত হয়েছে, এবার আমাকে নির্বাসনদণ্ড গ্রহণ করবার ব্যবস্থা করে দিন।”

মালিনীর রাজাকে ব্যাখ্যা প্রদান

  • (১) এখন কে কাকে নির্বাসনদণ্ড দেবে ? রাজা নীরব রইলেন। মালিনী বললেন, “পিতা, আমাকে আপনি বারাণসি রাজ্যের ধ্বংসকারিনী মনে করেছেন, মনে করেছেন আমার দ্বারা আপনার স্বাধীনতা হ্রাস পাবে, কাজেই বিঘ্নকারিণী কন্যাকে রাজপুরীতে রাখা কোনরূপেই আপনার কর্তব্য নয়।
  • (২) তবে একটা কথা এই যে, আমি কোনো অপরাধেই অপরাধিনী নই। সংসারত্যাগী বৌদ্ধ শ্রমণদেরকে রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণ করে ভোজন করেছি বলিয়া কোনো অপরাধ করি নি। সে যাই হোক, আমি আপনার কন্যা। পিতৃ-আদেশ পালন করা সন্তানের অবশ্য কর্তব্য।
  • (৩) সপ্তাহকাল অতীত হয়েছে । আমি আপনার আদেশ পালন করিতে প্রস্তুত। আমার নির্বাসনবাসের ব্যবস্থা করুন। আমারও আর এই দুঃখপূর্ণ সংসারে বাস করবার ইচ্ছা নাই।”

মালিনীর বক্তৃতা শুনে রাজার মনোভাব পরিবর্তন

  • (১) রাজা কৃকী বলিলেন “মা, তুমি আর নির্বাসনদণ্ডে দণ্ডিত হবে কেন ? তোমার ধর্মোপদেশ, তোমার জ্ঞান ও শিক্ষা এবং বক্তৃতার গুণে রাজ্যের শ্রেষ্ঠ নরনারীগণ সকলেই বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছেন। আমরা সকলেই যে মহাত্মা গৌতমের ধর্মকেই গ্রহণ করেছি। বুঝেছি মহাত্মা বুদ্ধদেবের আবির্ভাবে
  • (২) ভারতবর্ষের ধর্ম, ভারতবর্ষের জাতীয়তা রক্ষা পাবে। যজ্ঞক্ষেত্র এতদিন পশুমাংসলোলুপ যাজ্ঞিকগণের যজ্ঞক্রিয়া দ্বারা রক্তস্রোতে প্লাবিত হত। ভারতে পশুধ্বংসই একমাত্র ধর্ম বলে পরিগণিত হত। অমিতাভ আজ দেশে শান্তির বার্তা, প্রেমের বার্তা, মুক্তির বার্তা আনিয়া দিলেন ।

মালিনীর প্রতি রাজার উপদেশ

  • (১) তুমি আমার একটি অনুরোধ পালন কর। সারনাথ অতি সুন্দর স্থান। আমার রাজধানীর নিকটবর্তী হলেও, জনকোলাহলে মুখরিত নয়। তুমি সেই শান্তিপূর্ণ পবীত্র স্থানে বৌদ্ধ নারীদের জন্য একটি বিদ্যালয় স্থাপন কর। আমি ঐ বিদ্যালয়ের সমুদয় ব্যয়ভার বহন করব।
  • (২) নারীর কর্তব্য নারীর মঙ্গলবিধান। তুমি যখন নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছ তখন তোমার প্রধান কর্তব্য নারীসমাজের কল্যাণবিধান। ভারতবর্ষের মহিলারা যদি জ্ঞানগরিমা অলঙ্কৃতা হন তাহলে ভারতবর্ষ চিরদিন পৃথিবীর শীর্ষস্থান অধিকার করে থাকবে।

রাজা কর্তৃক সারনাথে বিদ্যাদানের কাজে নিয়োজিত মালিনী

“কিন্তু তুমি যদি লোকালয় পরিত্যাগ করে বনে গিয়ে বাস কর, তাহলে জগতের কোনো কল্যাণই সাধিত হবে না। আমি জানতাম না যে তুমি এতদূর জ্ঞান ও বিচার অধিকারিণী হয়েছে। আমি জানতাম না, বুঝতে পারি নি তাই তোমাকে সভাপণ্ডিতগণের কূট পরামর্শে নির্বাসন দণ্ড প্রদান করেছিলাম। তুমি পিতার প্রতি অসন্তুষ্ট হও না। আমার এই আদেশ পালন কর। তুমি সারনাথে গিয়ে মহিলাদের বিদ্যাদানের ব্যবস্থা কর।” মালিনী পিতাকে প্রণাম করে বললেন “আপনার আদেশ আমার শিরোধার্য।”

অভিভাবিকা ও আচার্যা রূপে মালিনী

মহারাজ কৃকীর আদেশে সারনাথে সুবৃহৎ বিদ্যায়তন নির্মিত হল। তিনি সন্তুষ্ট চিত্তে দশ হাজার বৌদ্ধমহিলার শিক্ষার ও ভরণপোষণের ব্যয়ভার বহন করবার ভার নিলেন। ছাত্রীদের থাকার জন্য মঠ নির্মিত হল। তাদের অন্নবস্ত্র প্রভৃতির সংস্থানের জন্য কোনো ভাবনা ছিল না। মালিনী রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগ করে বিদ্যাভবনে এসে ছাত্রীদের অভিভাবিকা এবং আচার্যা রূপে বাস করতে লাগলেন। অধ্যয়ন, অধ্যাপন এবং নারীদেকে ধর্মশিক্ষা প্রদানই হল মালিনীর জীবনের একমাত্র ব্রত।

মালিনীর বিদ্যাদানের খ্যাতির বিস্তার

মালিনীর বিদ্যাদানের খ্যাতি অচিরেই চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে পড়েছিল। ভারতবর্ষের নানাস্থান হতে দলে দলে মহিলারা সারনাথের বিদ্যায়তনে এসে শিক্ষালাভ করতেন। সারনাথ বৌদ্ধ মহিলা-শিক্ষালয়ের কেন্দ্রস্থান হয়ে উঠল। সারনাথের সমৃদ্ধি দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগল।

সমবেত সুরে গাওয়া গান

প্রতিদিন প্রভাতে ও সন্ধ্যায় বিদ্যার্থিনী তরুণীগণের কণ্ঠে নির্বাণমুক্তির বাণী ধ্বনিত হত। সকলে একসুরে গাইতেন,

“রাগের সমান অগ্নি নাই, হিংসার ন্যায় আর দ্বিতীয় পাপ নাই। শরীর ধারণের ন্যায় আর দুঃখ নাই, শান্তির ন্যায় সুখ নাই, হিংসাই হচ্ছে মানুষের পরম ব্যাধি, সংসার পরম দুঃখ, নির্বাণ পরম সুখ, যিনি এটি জানতে পেরেছেন, তিনিই পরম সত্যকে লাভ করেছেন।

ছাত্রীদের নৈতিক উৎকর্ষ বিধানের বাণী

আরোগ্য পরম লাভ, সন্তোষ পরম ধন,

বিশ্বাস পরমাত্মীয়, নির্বাণই পরম সুখ।

সন্তোষ সুখের মূল ইথে নাহি ভুল,

অসন্তোষ যত কিছু অসুখের মূল।

অন্ত কভু নাহি জানে দুরন্ত পিয়াস,

সন্তোষ কেবলি এক সুখের নিবাস।

ক্ষমাই পরম শান্তি, ধর্মই কল্যাণ মূর্তিমান

বিদ্যাই পরম তৃপ্তি, অহিংসাই সুখের নিদান।

– এই বাণী সারনাথের বিদ্যায়তনে ধ্বনিত হয়ে ছাত্রীগণের নৈতিক চরিত্রের উৎকর্ষ বিধান করত।

পৌরাণিক সারনাথের বর্তমান অবস্থা

  • (১) সারনাথ বৌদ্ধতীর্থ। এই স্থানেই বুদ্ধদেব তাঁর ধর্মচক্র প্রথম প্রবর্তিত করেন। সারনাথ বুদ্ধদেবের জীবিতকাল হতেই প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল। এই স্থানে দুই হাজার বছর পূর্বে বৌদ্ধদের অনেক দেবালয়, শ্রীমূর্তি, এবং উৎকৃষ্ট বিদ্যালয় ছিল।
  • (২) কতদিন চলে গেছে, কত বৌদ্ধ বিদ্বেষী নরপতির অভ্যুদয় হয়েছে। ফলে অসংখ্য বৃহৎ ও সুন্দর বিদ্যাভবন, মঠমন্দির, স্তূপ ইত্যাদি ধ্বংস হয়ে গিয়াছে। মহারাজ অশোক এই স্থানে যে একটি স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন তা এখনও বিদ্যমান আছে।
  • (৩) বর্তমান সময়ে মৃত্তিকা খননের সঙ্গে সঙ্গে সারনাথের নিকটবর্তী স্থান হতে বিবিধ দেবমূর্তি, বৃহৎ অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ ইত্যাদি বের হয়ে, প্রাচীন গৌরবস্মৃতি প্রকাশিত করছে। কিছুকাল হল সেখানে সরকার একটি যাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে প্রাচীন কীর্তিসমূহ সযত্নে রক্ষা করছেন ।

উপসংহার :- বিদুষী মালিনী দেবী সেই অতি প্রাচীনকালে জন্মগ্রহণ করে শিক্ষা ও জ্ঞানের বিস্তার দ্বারা মহিলাকুলের যে কল্যাণসাধন করে গিয়েছেন, তাতে প্রাচীন ভারতের এই শিক্ষিতা মহিলার অপূর্ব কীর্তিকাহিনী আমাদের নিকট উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের কিরণের ন্যায় আজও শান্ত-স্নিগ্ধপ্রভাবিমণ্ডিত বলে প্রতীতি জন্মে।

(FAQ) প্রাচীন ভারতের বিদুষী নারী মালিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মালিনী কে ছিলেন?

প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধ যুগের একজন বিদুষী নারী।

২. মালিণী কার কন্যা?

কৃকী রাজা।

৩. মালিনী কোন রাজ্যের রাজকন্যা?

বারাণসী।

৪. মালিনী কোন ধর্মের অনুরাগিনী ছিলেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment