বৈদিক ধর্ম

বৈদিক ধর্ম প্রসঙ্গে ঋগ্বেদে ধর্মবিশ্বাস, প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের অনুসৃতি, প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তিন ধরনের দেবদেবী, পুরুষ দেবতার প্রাধান্য, ধর্মীয় স্তরভেদ, ধর্মের সরল আচার, জটিলতার সৃষ্টি, নৈবেদ্য নিবেদনে পরিবর্তন ও দার্শনিক চিন্তা সম্পর্কে জানবো।

বৈদিক ধর্ম

ঐতিহাসিক ঘটনাবৈদিক ধর্ম
নদীমাতাদেবী সরস্বতী
আকাশচারী দেবতামিত্র ও বরুণ
মধ্য-নভোমণ্ডলের দেবতাইন্দ্র
মর্ত্যের দেবতাঅগ্নি ও সোম
বৈদিক ধর্ম

ভূমিকা :- বৈদিক সাহিত্য থেকে বৈদিক ভারতের ধর্মজীবনের একটি চিত্র পাওয়া যায়। বৈদিক যুগের আর্যদের ধর্মীয় চিন্তা ও আচার বিবর্তনের মাধ্যমে নব রূপ লাভ করেছিল।

ঋগ্বেদে ধর্মবিশ্বাস

ঋগ্বেদে আদিম ধর্মীয় চেতনার সরল উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। এতে যে ধর্মবিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায় তা পুরোহিতগণের চেষ্টার এবং পরস্পর বিরুদ্ধ ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে সামঞ্জস্য সাধনের প্রয়াসের পরিণাম।

প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের অনুসৃতি বৈদিক ধর্ম

বৈদিক ভারতীয়দের ধর্ম আর্য জাতির প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের অনুসৃতি মাত্র। তাদের দেবতাগণের মধ্যে কেউ কেউ আর্যগণের ভারতে আগমনের পূর্ব থেকে পূজিত হয়ে আসছিলেন। আবার কোনো কোনো দেবদেবীর যেমন নদীমাতা সরস্বতীর পূজা প্রচলিত হয় তাদের ভারতবর্ষে আগমনের পর।

বৈদিক ধর্ম প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত

অধিকাংশ বৈদিক দেবদেবীই প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই প্রসঙ্গে দ্যৌ, অগ্নি ও পর্জন্যের নাম করা যায়। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মহিমা নিঃসন্দেহে বৈদিক ঋষিগণের কল্পনাকে উদ্দীপিত ও তাদের মনে ভক্তিভাবের সঞ্চার করেছিল।

বৈদিক ধর্মে তিন ধরনের দেবদেবী

বৈদিক সাহিত্যে অগণিত দেবদেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। কখনও কখনও তাদের বিহারভূমি অনুসারে তাদেরকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা –

  • (১) আকাশচারী দেবতা – মিত্র ও বরুণ।
  • (২) মধ্য-নভোমণ্ডলের দেবতা – ইন্দ্র ও মরুৎগণ এবং
  • (৩) মর্ত্যের দেবতা – অগ্নি ও সোম।

বৈদিক ধর্মে পুরুষ দেবতার প্রাধান্য

পুরুষ দেবতার প্রাধান্য বৈদিক দেবতাচক্রের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। দেবগণের মধ্যে মর্যাদাভিত্তিক কোনো সুস্পষ্ট স্তরভেদ নেই, অর্থাৎ কোনো দেবতা অপর কোনো দেবতা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এমন স্বীকৃতি নেই।

বৈদিক ধর্মে ধর্মীয় স্তরভেদ

  • (১) কোনো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ধারণাও দেখা যায় না। প্ৰতি দেব বা দেবী তার পুজার বহুল প্রচলনহেতু প্রাধান্য পেয়েছেন, অথবা পূজার সীমিত প্রচলনের ফলে অকিঞ্চিৎকর রূপে গণ্য হয়েছেন।
  • (২) এইজন্য এই ধর্মীয় স্তরকে বহু দেববাদ বলা হয় নি, একেশ্বরবাদও বলা হয় নি। এর মধ্যে দুই দিকেই প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু ধর্মবিশ্বাস তখনও এতদূর পরিণত হয় নাই যে ইহাদের কোনটির সাথে তাকে অভিন্ন মনে করা যায়।”

বৈদিক ধর্মের আচার সরল

আনুষ্ঠানিক ধর্মের বিকাশ মানবভাগ্যের নিয়ন্তারূপে দেবদেবীগণের গুরুত্ব ক্রমশ অনেক নিষ্প্রভ করে দিয়েছিল। প্রাচীন বৈদিক আচার অত্যন্ত সরল ছিল। দেবগণের উদ্দেশ্যে দুগ্ধ, শস্য ও ঘৃতের অনাড়ম্বর নৈবেদ্য নিবেদিত হত। পূজার লক্ষ্য ছিল পার্থিব সুখ-সন্তান ও গোধন লাভ অথবা শত্রুবিনাশ।

বৈদিক ধর্মে জটিলতার উদ্ভব

ব্রাহ্মণের যুগ থেকে জটিলতার উদ্ভব হতে থাকে। অর্ঘ্যের উপকরণ বৃদ্ধি পেল, আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠল। যজ্ঞের সুষ্ঠু সম্পাদনের জন্য বহু সংখ্যক পুরোহিতের প্রয়োজন হত। হোত্রীগণ মন্ত্র আবৃত্তি করতেন, অধ্বর্য়ু প্রার্থনা মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে নানাবিধ পুজা প্রকরণের অনুষ্ঠান করতেন, উদগাতৃ সামগান করতেন, এবং অপর কয়েকজন সহকারীর কাজ করতেন।

বৈদিক ধর্মে নৈবেদ্য নিবেদনে পরিবর্তন

ক্রমশঃ যে মনোভাবের সাথে নৈবেদ্য নিবেদন করা হত তার মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হল। দেবগণের তুষ্টিবিধানের পরিবর্তে যজ্ঞের মাধ্যমে যজ্ঞকারীর আকাঙ্ক্ষিত বস্তুদানে দেবতাকে বাধ্য করাই উদ্দেশ্য হয়ে উঠল। এইভাবে দেবতারও উপরে যজ্ঞের মর্যাদা নির্ধারিত হল। এর স্বাভাবিক পরিণাম স্বরূপ পূর্ব মীমাংসা দর্শনে দেবগণ সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হলেন।

বৈদিক ধর্মে আরণ্যকে দার্শনিক চিন্তা

দার্শনিক চিন্তা, অর্থাৎ সত্য ও পরম সত্তার সন্ধানের চেষ্টার সূচনা হয় আরণ্যকে। উপনিষদগুলিতে এই চেষ্টার স্বাভাবিক পরিণতি দেখা যায়। ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে এই রচনাগুলি বিশেষ মূল্যবান স্থানের অধিকারী।

উপসংহার :- দার্শনিক ও আরণ্যকের অন্তর্নিহিত মূল ভাবটি এই যে এই দৃশ্যমান পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে এক অপরিবর্তনীয় সত্তা (অর্থাৎ ব্রহ্ম) বিদ্যমান আছেন, এই পরম সত্তা মানবাত্মার সাথে অভিন্ন। এই দার্শনিক দিক থেকে একেশ্বরবাদের চরম বিকাশ।

(FAQ) বৈদিক ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বৈদিক যুগে নদীমাতা বলা হত কাকে?

সরস্বতী।

২. বৈদিক যুগে আকাশচারী দেবতা কারা ছিলেন?

মিত্র ও বরুণ।

৩. বৈদিক যুগে মধ্য-নভোমণ্ডলের প্রধান দেবতা কে ছিলেন?

ইন্দ্র।

৪. বৈদিক যুগে মর্ত্যের দেবতা কারা ছিলেন?

অগ্নী ও সোম।

Leave a Comment