লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

রুশ বিপ্লবের নায়ক লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রসঙ্গে পটভূমি হিসেবে সামরিক সাম্যবাদ, কৃষি সংকট, শিল্প সংকট, নতুন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ, নীতি ঘোষণা, স্থায়ীত্ব, গৃহীত ব্যবস্থা, নীতির স্বরূপ, বাস্তব প্রয়োজন ও লেনিনের অন্যতম কৃতিত্ব সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

ঘটনা লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি
সময়কাল ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ
প্রবর্তক বলশেভিক নেতা লেনিন
স্থায়ীত্বকাল ১৯২১-১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ
রুশ বিপ্লব -এর জনক লেনিন
লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি

ভূমিকা :- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ -এর পর রাশিয়ার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। গৃহযুদ্ধ ও বৈদেশিক আক্রমণের সমস্যায় রাশিয়ার অবস্থা ছিল শোচনীয়। এই সময় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে লেনিন এক নতুন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন, যা নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা New Economic Policy নামে পরিচিত।

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির পটভূমি

লেনিনের এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্ৰহণের পটভূমি ছিল নিম্নরূপ। –

(ক) সামরিক সাম্যবাদ

গৃহযুদ্ধ (১৯১৮-১৯২১ খ্রিঃ) এবং বৈদেশিক আক্রমণের মোকাবিলার জন্য লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় এক বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, যার নাম ‘যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ’ বা ‘সামরিক সাম্যবাদ’। এর বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যাভিসারী করা হয় এবং দেশের অর্থনীতির প্রতিটি শাখায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের ছোটো-বড়ো সব শিল্প, কলকারখানা, জমি, ব্যাঙ্ক, ব্যক্তিগত ব্যবসা ও মূলধন, যানবাহন, বণ্টনব্যবস্থা, গির্জার জমি ও সম্পত্তি, বেসরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান – সবই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়।

(২) খাদ্য সরবরাহ

সেনাবাহিনী ও সাধারণ নাগরিকদের খাদ্য সরবরাহের জন্য কৃষকদের উদ্বৃত্ত শস্য অধিগ্রহণ করা হয়। খাদ্যবণ্টনের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং শহরের প্রতিটি পরিবারকে রুটির জন্য কার্ড দেওয়া হয়। শ্রমিকরা তাদের কাজের জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে রেশন পেত।

(৩) সংকটের হাত থেকে মুক্তি

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বলশেভিক সরকার গৃহযুদ্ধ ও বৈদেশিক আক্রমণজনিত সংকটের হাত থেকে মুক্তি পায়। এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক সেনাকে খাদ্য ও যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

(৪) সমস্যা

তা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, এই ব্যবস্থা রুশ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয় এবং জনজীবনে প্রবল সমস্যার সৃষ্টি করে। কৃষি উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে এবং অনাহার ও অর্ধাহারে প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই সময় বৈদেশিক সাহায্য এসে পড়ায় কয়েক মিলিয়ন মানুষ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়।

(খ) কৃষি সংকট

এই সময় বিভিন্ন কারণে রাশিয়ায় কৃষি সংকট দেখা দেয়। যেমন –

(১) কৃষকদের বিদ্রোহ

কৃষকরা তাদের জমি রাষ্ট্রায়ত্ত করার বিরোধিতা করে এবং উদ্বৃত্ত ফসল সরকারকে দিতে অস্বীকার করে। এই ব্যাপারে সরকার জোর-জবরদস্তি করলে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বাড়তি জমিতে চাষবাস বন্ধ করে দেয়। এর ফলে রাশিয়ার ৪০% জমি অনাবাদি থাকে এবং ৪৭% ফসল কম উৎপাদন হয়।

(২) দুর্ভিক্ষ

১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভলগা ও ডন উপত্যকায় ভয়াবহ অনাবৃষ্টি দেখা দেয়। এর ফলে দেশে খাদ্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করে এবং ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে বহু প্রাণহানি ঘটে।

(৩) বিভিন্ন দেশের সাহায্য

বিশিষ্ট সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি-র আবেদনে সাড়া দিয়ে আমেরিকাইউরোপ -এর দেশগুলি সাহায্য পাঠিয়ে রুশ জনসাধারণের প্রাণ বাঁচায়।

(গ) শিল্প সংকট

এই সময় রাশিয়ার শিল্পক্ষেত্রেও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেয়। কারণ,

(১) অনভিজ্ঞ শ্রমিক

ইতিপূর্বে ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব শিল্প-প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয় এবং শিল্প-পরিচালনার দায়িত্বও দেওয়া হয় শ্রমিকদের হাতে। এইসব শ্রমিকদের কোনও শিক্ষাগত যোগ্যতা বা শিল্প পরিচালনার কোনও পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছিল না। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক কমিটি গুলির মধ্যেও কোনও যোগাযোগ বা সংহতি ছিল না। এর ফলে শিল্পোৎপাদন দারুণভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং কারখানাগুলি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে।

(২) সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক পরিষদ

এই অবস্থায় ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক পরিষদ’ নামক একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে তার উপর কারখানাগুলিতে কাঁচামাল, কয়লা ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং শ্রমিকদের খাদ্য ও বেতন দান প্রভৃতি দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। বলা বাহুল্য, রাশিয়ার তদানীন্তন পরিস্থিতিতে এই সংস্থার পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিল না।

(৩) অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা

এর ফলে শিল্পক্ষেত্রে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, শিল্পসামগ্রী দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে এবং দ্রব্যমূল্য প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। জনসাধারণ সীমাহীন দুর্দশার মধ্যে পড়ে এবং গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শহরগুলিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয়।

(৪) কৃষক বিদ্রোহ

অবস্থার সুযোগ নিয়ে ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট’-রা কৃষক বিদ্রোহে ইন্ধন যোগাতে শুরু করে। নানা স্থানে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয় এবং তাদের সহায়তায় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রনস্ট্যাডেনে নৌ-বিদ্রোহ ঘটে।

নতুন অর্থনৈতিক নীতি গ্ৰহণ

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তববাদী লেনিন বিশুদ্ধ সাম্যবাদের পথ থেকে সরে এসে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এক নতুন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন।

লিপসনের মন্তব্য

ঐতিহাসিক লিপসন বলেন যে উৎপাদনের ভয়াবহ অবনতি, কৃষক অভ্যুত্থান ও নৌ-বিদ্রোহ লেনিনকে তাঁর নতুন অর্থনীতি গ্রহণে বাধ্য করে।

ডেভিড টমসনের মন্তব্য

অধ্যাপক ডেভিড টমসনও অনুরূপ মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কৃষকদের অসন্তোষ এবং লেনিনের বাস্তববোধের ফলেই নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তিত হয়েছিল।

নীতি ঘোষণা

লেনিন ‘পুঁথিপড়া কমিউনিস্ট’ ছিলেন না। তাই সহকর্মীদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যুগের প্রয়োজনে কৌশলগত কারণে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশুদ্ধ মার্কসবাদ থেকে সরে এসে এক নতুন অর্থনৈতিক নীতি’ বা ‘New Economic Policy’ (N.E.P) ঘোষণা করেন।

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির স্থায়ীত্ব

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে রুশ কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেসে এই বিখ্যাত নীতি গৃহীত হয়। ১৯২১ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা স্থায়ী হয়। এই নীতি অনুসারে বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গৃহীত হয়। যেমন –

(ক) কৃষি

  • (১) এই ব্যবস্থায় ছোটো ছোটো জমির মালিকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। স্থির হয় যে, কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত ফসল আর কেড়ে নেওয়া হবে না। তারা তাদের জন্য নির্ধারিত নির্দিষ্ট পরিমাণ কর মিটিয়ে দেওয়ার পর তাদের উদ্বৃত্ত ফসল বাজারে বিক্রি করতে পারবে।
  • (২) বলা বাহুল্য, এর ফলে কৃষকরা উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত হয় এবং চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। জমির উপর সরকারের কর্তৃত্ব বজায় থাকলেও মালিকানা স্বত্ব কৃষকদেরই থাকে।
  • (৩) কৃষি খামারের বিকাশের জন্য সমবায় প্রথায় উৎসাহ দেওয়া হয়। এর দ্বারা কৃষকরা নানা সুবিধা পায়। ঐতিহাসিক লিপসন বলেন যে, বলশেভিকদের সামাজিক তত্ত্বের উপর কৃষকদের গোঁড়ামি জয়যুক্ত হয়।

(খ) শিল্প

  • (১) ছোটো ও মাঝারি শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে সেগুলিতে ব্যক্তিগত মালিকানা মেনে নেওয়া হয়। পূর্বে জাতীয়করণ করা ৩,৮০০টি শিল্প-প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বৃহৎ ও ভারী শিল্প যথা – লোহা, কয়লা, ইস্পাত, রেলপথ প্রভৃতি থাকে সরকারি মালিকানাধীনে।
  • (২) শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলিকে কতকগুলি স্বতন্ত্র সংস্থায় বিভক্ত করে সেগুলির উপর কাঁচামাল সংগ্রহ, নির্দিষ্ট মূল্যে শিল্পজাত পণ্যাদি বিক্রি প্রভৃতি দায়িত্ব অর্পিত হয়। বলপূর্বক শ্রমিক নিয়োগ নীতি এবং শ্রমিক মাত্রই ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার নীতি পরিত্যক্ত হয়।
  • (৩) শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা, কাজের পরিমাণ ও মানের উপর ভিত্তি করে উপযুক্ত মজুরি, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়।
  • (৪) শিল্পে বিদেশি মূলধন আকর্ষণের জন্য অনেক কারখানা বিদেশি মূলধনকারীদের সহজ শর্তে ইজারা দেওয়া হয়। তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, নির্দিষ্ট কালের মধ্যে এইসব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করা হবে না।

(গ) ব্যবসা-বাণিজ্য

  • (১) ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্য থাকে সরকারের হাতে। বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিদেশি বাণিজ্য পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যাক্তিগত মূলধন বিনিয়োগের নীতি স্বীকৃত হয়। এর ফলে ব্যক্তিগত বাণিজ্য প্রসার লাভ করে।
  • (২) মূল্যস্তর যাতে কৃত্রিম উপায়ে বৃদ্ধি না পায় সেজন্য সরকারি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ক্রেতাদেরও সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা ও বাণিজ্যিক লেনদেনের নীতি স্বীকৃত হয়। বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের নীতিও মেনে নেওয়া হয়।

লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির স্বরূপ

লেনিনের এই ‘নতুন অর্থনৈতিক নীতির স্বরূপ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত প্রচলিত আছে। যেমন –

(১) ধনতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন

অনেকে লেনিনের এই নীতিকে সাম্যবাদ থেকে বিচ্যুতি ও ধনতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন। লেনিন নিজেও একে ‘পুঁজিবাদে আংশিক প্রত্যাবর্তন’ বলে অভিহিত করেছেন।

(২) সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের সমন্বয়

বলা হয় যে, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ঐতিহাসিক কালটন হেজ ও পার্কার মুন-এর মতে, এটি সমাজতন্ত্র বা ধনতন্ত্র কোনোটিই নয় বরং এই দুইয়েরই সাময়িক সমন্বয়।

(৩) প্রয়োজন ভিত্তিক সাম্যবাদ

বলা বাহুল্য বিশেষ প্রয়োজনে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক নীতিকে ‘প্রয়োজনভিত্তিক সাম্যবাদ’ বা ‘মিশ্র অর্থনীতি’ বলা যায়। বিশেষ প্রয়োজনে সাময়িকভাবে তিনি ধনতন্ত্রের কিছু উপাদানের সঙ্গে সাম্যবাদের সমন্বয়সাধন করেন।

(৪) মার্কসীয় দর্শন ক্ষুণ্ণ

বলা বাহুল্য, মার্কসীয় মতাদর্শ কিছুটা পূর্ণ হলেও এই নীতির দ্বারা কৃষি ও শিল্পে অভাবনীয় উন্নতি ঘটে, রাশিয়া ঘোরতর অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় এবং রুশ বিপ্লবের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়ে ওঠে।

(৫) উৎপাদন বৃদ্ধি

অ্যালেক নভ বলেন যে, এই ব্যবস্থার ফলে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ৩৮ মিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫১ মিলিয়নে দাঁড়ায়। শিল্প-কারখানাতেও উৎপাদনের পরিমাণ ছিল দ্বিগুণ।

(৬) কৃষির দ্রুত উন্নতি

শিল্পের তুলনায় কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি ঘটেছিল অনেক দ্রুতগতিতে। ১৯২২-১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে খাদ্যশস্যের ফলন আশাতীতভাবে দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়ে ওঠে। সে তুলনায় শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন কার্যত সীমিত ছিল।

(৭) অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনা

সাময়িক ভাবে খাদ্যশস্যের মূল্য হ্রাস পেতে থাকে এবং পণ্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক সমস্যা দেখা দেয়। ট্রটস্কি একে ‘Scissors crisis’ বলেছেন। কিছুদিন বাদে অবশ্য পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনা হয়।

(৮) শ্রমিকদের দুরবস্থা

এই নীতির ফলে কৃষকরা শ্রমিকদের তুলনায় অনেক সুবিধাজনক জায়গায় ছিল। শ্রমিকদের মধ্যে বেকারত্ব ছিল যথেষ্ট। ১৯২৪ সালের সূচনায় বেকারের সংখ্যা ছিল ১.২৫ মিলিয়ন। এই কারণে এই সময় এই অর্থনৈতিক নীতিকে ব্যঙ্গ করে বলা হত ‘New Exploitation of the Proletariat। এ সত্ত্বেও এই নীতির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

রুশ বিপ্লবের জনক

তাত্ত্বিক, সংগঠক ও বাস্তববাদী রাজনৈতিক নেতা লেনিন ছিলেন বলশেভিক দলের অবিসংবাদী নেতা ও ‘রুশ বিপ্লবের জনক’। কেবল জারতন্ত্রের উচ্ছেদসাধনই নয়, পুনর্গঠনের মাধ্যমে রুশ বিপ্লবকে তিনি সফলতার পথে নিয়ে যান।

বাস্তব প্রয়োজন

গৃহযুদ্ধ ও বিদেশি আক্রমণ-বিধ্বস্ত রাশিয়াকে তিনি নবজীবন দান করেন। তার নতুন অর্থনৈতিক নীতি তার দুরদর্শিতা ও রাজনীতিজ্ঞানের পরিচায়ক। এই ব্যবস্থা ছিল অস্থায়ী। বাস্তব প্রয়োজনে এই নীতি সাময়িকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল।

অন্যতম কৃতিত্ব

ডেভিড টমসন বলেন যে, এটি ছিল ভবিষ্যতে দু’ কদম এগোবার জন্য এক কদম পিছু হটা। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে রুশ অর্থনীতি অনেক সুদৃঢ় হয়। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রগুলির ঐক্যসাধন করে এক যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠন তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব।

লেনিনের মৃত্যু

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি নিরবচ্ছিন্ন কর্মজীবনের পর ৫৪ বছর বয়সে এই মহানায়কের মৃত্যু ঘটে

উপসংহার :- ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রশিয়া ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক’ (U.S.S.R) বা ‘সংযুক্ত সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রূপে ঘোষিত হয় এবং ওই বছরের মধ্যেই ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, গ্রিস, হাঙ্গেরি, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশ এই সাম্যবাদী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

(FAQ) লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. লেনিন কখন রাশিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক নীতি ঘোষণা করেন?

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে।

২. লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতি কি নামে পরিচিত?

New Economic Policy.

৩. লেনিনের নতুন অর্থনৈতিক নীতির স্থায়ীত্বকাল কত?

১৯২১-১৯২৮ সাল পর্যন্ত।

৪. রুশ বিপ্লবের জনক কাকে বলা হয়?

লেনিন।

Leave a Reply

Translate »