নৌ বিদ্রোহ (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ)

নৌ বিদ্রোহ -এর কারণ, বিদ্রোহের সূচনা, প্রসার, বিপ্লবীদের ধ্বনি, বিদ্রোহের বর্ণনা, জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া, বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ, ব্যর্থতার কারণ ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

নৌ বিদ্রোহ (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ)

সময়কাল১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ
স্থানবোম্বাই, করাচি, কলকাতা, কোচিন
ফলাফলব্যর্থতা
নৌ বিদ্রোহ

ভূমিকা :- ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতীয় নৌ-বাহিনীর বিদ্রোহ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অতি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ভারত ছাড়ো আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফোজ -এর সংগ্রাম ইত্যাদির চাপে ব্রিটিশ সরকারের যখন নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম ঠিক তখনই নৌবিদ্রোহ (১৯৪৬) যেন ভারতের ব্রিটিশ শাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছিল।

বিদ্রোহের কারণ বা পটভূমি

নৌ বিদ্রোহের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ নজরে পড়ে। কারণগুলি হল –

(১) বেতন বৈষম্য

ভারতীয় নৌবাহিনীতে প্রবল বর্ণ বৈষম্য ছিল। বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও ভারতীয় নাবিকরা ইংরেজদের মত বেতন পান নি।

(২) বর্ণবৈষম্য

ভারতীয় নাবিকরা ইংরেজ ও শ্বেতাঙ্গ অফিসারদের দ্বারা সর্বদাই লাঞ্ছিত হতেন। জাতি ও বর্ণগত কারণে তাঁরা এই লাঞ্ছনার শিকার হতেন।

(৩) নিম্ন মানের খাদ্য

ভারতীয় নৌসেনারা ইয়রোপীয়দের তুলনায় নিম্নমানের ও অল্প পরিমাণে খাবার পেতেন।

(৪) পদোন্নতির অভাব

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় নৌসেনাদের পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হত।

(৫) বিপজ্জনক কেন্দ্রে নিয়োগ

অনিচ্ছা সত্বেও ভারতীয় নৌসেনাদের বিপজ্জনক অঞ্চলে নিয়োগ করা হত।

(৬) সেনা ছাঁটাই

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ -এর সময় প্রচুর নৌসেনা নিয়োগ করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সরকার তাদের বিনা কারণে বরখাস্ত করে।

(৭) বিশ্ব-পরিস্থিতির জ্ঞান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতীয় নৌসেনারা বিশ্ব-পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। ফলে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাদেরও ক্ষোভ জন্মায়।

(৮) অভ্যন্তরীন ঘটনাবলি

দেশের অভ্যন্তরে ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, পুলিশ ও বিমান বাহিনীর ধর্মঘট ইত্যাদি ঘটনা নাবিকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

(৯) আজাদ হিন্দ সেনার বিচার

সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রাম ভারতীয় নৌসেনাদের খুবই অনুপ্রাণিত করে। এই পরিস্থিতিতে পরাজিত সেনাদের বিচার শুরু হলে দেশের জনগণের সঙ্গে তাঁরাও ক্ষোভে ফেটে পড়ে

বিদ্রোহের সূচনা

এই সমস্ত কারণে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ( ১৮-২৩) ভারতীয় নৌসেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা নৌবিদ্রোহ নামে পরিচিত।

বিদ্রোহের প্রসার

  • (১) বোম্বাইয়ের ‘তলোয়ার’ নামক জাহাজে প্রথম নৌবিদ্রোহ শুরু হয়। ক্রমে আরও ২২টি জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে।
  • (২) ১৯ শে ফেব্রুয়ারি তারা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ (ব্রিটিশ পতাকা) নামিয়ে জাহাজে কংগ্রেস, লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির তিনটি পতাকা তুলে দেয়।
  • (৩) ‘রয়াল ইণ্ডিয়ান নেভি’-র নাম রাখে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল নেভি’ এবং ঘোষণা করে যে, জাতীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়া তারা অন্য কারো আদেশ মানবে না।
  • (৪) এরপর দ্রুত তা করাচি, কলকাতা, মাদ্রাজ, কোচিন, জামনগর, চট্টগ্রাম, বিশাখাপত্তনম, আন্দামান প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
  • (৫) বিদ্রোহ পরিচালনার জন্য ‘কেন্দ্রীয় ধর্মঘট কমিটি’ গঠিত হয়। দেশের ছাত্র সমাজ ও সাধারণ মানুষ বিদ্রোহীদের সমর্থন করে ধর্মঘটে সামিল হয়। বিভিন্ন সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ লোক নিহত এবং ২ হাজার আহত হয়।

বিপ্লবীদের ধ্বনি

বোম্বাই এর বিদ্রোহী নৌ-সেনারা কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা নিয়ে রাস্তার মিছিল বের করে। তাদের কন্ঠে—”জয় হিন্দ’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, “হিন্দু-মুসলিম এক হও’, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো”, “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি দাও’, ‘ইন্দোনেশিয়া থেকে সৈনা প্রত্যাহার করা প্রভৃতি ধ্বনি ছিল।

বিদ্রোহের বর্ণনা

  • (১) বোম্বাইয়ের বিদ্রোহীরা অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে। নৌ-সেনাপতি অ্যাডমিরাল গডফ্রে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। বলা বাহুল্য, এতে কোন কাজ হল না।
  • (২) তিনি তখন স্থলবাহিনীকে কামান দাগার নির্দেশ দিলে মারাঠা সেনাবাহিনী সে নির্দেশ অমান্য করে ব্যারাকে ফিরে যায়।
  • (৩) ২১শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গোলাগুলি নিয়ে বিদ্রোহী নৌ সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাত ঘণ্টা ধরে। বোম্বাইয়ের রাজপথ রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হল।
  • (৪) কলকাতাতেও বিক্ষোভ শুরু হয়। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি হয়। মিটিং মিছিলে শহর উত্তাল হয়ে ওঠে। ডাকঘর, ট্রাম, ট্রেন ও ইউরোপীয়দের ওপর আক্রমন চলতে থাকে।
  • (৫) বিদ্রোহীদের সমর্থনে ২২শে ফেব্রুয়ারি বোম্বাই-এ সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। ১০ লক্ষ শ্রমিক এই ধর্মঘটে সামিল হয়। পুলিশ শোভাযাত্রার ওপর গুলি চালালে বোম্বাইয়ের রাজপথ ও ডক এলাকায় জনতা-পুলিশ রক্তাক্ত সংঘর্ষ চলতে থাকে।
  • (৬) ২২-২৪ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন ও খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে এবং বিদ্রোহীরা ইম্পিরিয়াল ব্যান্ডের শাখাগুলি, পোস্ট অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি তচনচ করে, ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
  • (৭) সামরিক বাহিনীর চল্লিশটি লরিও তাদের হাতে ধ্বংস হয়। এই সংঘর্ষে প্রায় তিনশ’ লোক নিহত ও দু’হাজার লোক আহত হয়।
  • (৮) বিদ্রোহ দমনের জন্য ডক এলাকায় বিদ্রোহীদের ওপর বিমান থেকে আক্রমণ চালানো হয়। ঐ একই সময়ে বোম্বাই, পুণা মাদ্রাজ, কলকাতা, যশোহর, আম্বালা, আন্ধেরী ও অন্যান্য স্থানে বিমানবাহিনীর পাইলট ও কর্মীরা ধর্মঘট করেন।
  • (৯) জব্বলপুর, কোলাবা প্রভৃতি স্থানের ভারতীয় স্থলবাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ফলে জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে লড়াই শুরু হয়।

জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া

  • (১) বিদ্রোহীরা মনে করেছিল যে, জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাদের সাহায্য করবেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হয় নি।
  • (২) বিদ্রোহীরা শ্রীমতী অরুণা আসফ আলি-র সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বোম্বাই ত্যাগ করেন।
  • (৩) কমিউনিস্ট পার্টির গঙ্গাধর অধিকারী একটি বিবৃতি মারফৎ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বলে কর্তব্য শেষ করেন।
  • (৪) জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, আজাদ বিদ্রোহীদের নিন্দা করেন। সর্দার প্যাটেলের মতে “নৌ-বিদ্রোহ হচ্ছে অরাজকতা, একে এখনই বন্ধ করা দরকার” (অমৃতবাজার পত্রিকা)
  • (৫) জিন্না ও লিয়াকত আলি খান আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। জিন্না-র মতে, “নৌ-বিদ্রোহ একটি অসময়োচিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড।”
  • (৬) গান্ধীজি বলেন যে “এ সব হল স্বরাজের কফিনে পেরেক মারার চেষ্টা। ….. হিন্দু, মুসলিম ও অন্যান্যদের ঐক্য যদি হিংসাত্মক সংগ্রামের পথে গড়ে ওঠে, তবে তা পাপ, তা ভারতের পক্ষে অশুভ”।

আত্মসমর্পণ

নৌ-সেনাপতি গডফ্রে গোলাবর্ষণ করে বোম্বাই শহর ধ্বংসের হুমকি দিলে কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল দু’পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা শুরু করেন এবং তারই নির্দেশে বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেন।

ব্যর্থতার কারণ

অল্প সময়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করলেও এই বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। এই ব্যর্থতার পিছনে বিদ্যমান কারণগুলি হল-

(১) জাতীয় নেতাদের বিরোধিতা

কংগ্রেসের অনেক নেতা এই বিদ্রোহকে সমর্থন করে নি। নেহেরু, সর্দার প্যাটেল, গান্ধিজি প্রমুখ নেতা বিদ্রোহীদের সমালোচনা করেন। সম্ভবত তাঁরা জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব হাতছাড়া হওয়ার ভয় পাচ্ছিলেন।

(২) বিমান হানার ভয়

আকাশ থেকে বিমান হানার ভয় ও জাতীয় নেতাদের চাপ আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়।

(৩) বল্লভভাই এর মধ্যস্ততা

সর্দার প্যাটেল সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব আনলে বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে।

বিদ্রোহের গুরুত্ব

এভাবে অনেক আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত নৌবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক এর গুরুত্বকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। যেমন –

(১) ব্রিটিশ শাসনের মৃত্যুঘন্টা

শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহ ভারতে ব্রিটিশ সরকারের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে দেয়।

(২) ব্রিটিশ ভীতির অবসান

নৌসেনাদের বিদ্রোহ সাধারণ মানুষের মনে ব্রিটিশ ভীতি দূর করেছিল।

(৩) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য

হিন্দু-মুসলিম নাবিক, এমনকি সাধারণ মানুষও এই সময় সাম্প্রদায়িক ঐক্যের পরিচয় দিয়েছিল।

(৪) মন্ত্রী মিশনের আগমন

ঐতিহাসিক রজনী পামদত্তের মতে, নৌবিদ্রোহের ফলে ইংরেজ সরকার কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের সঙ্গে আলোচনা করতে বিদ্রোহ শুরুর পরের দিনই মন্ত্রী মিশনকে ভারতে পাঠানর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

(৫) ভারত ত্যাগের ভাবনা

ভারতে এমন আর একটি বিদ্রোহ শুরু হলে তার পরিণাম যে ভয়ংকর হবে একথা বুঝতে পারে। ফলে শীঘ্রই ভারত ত্যাগের কথা ভাবতে শুরু করে।

মূল্যায়ন

অমলেশ ত্রিপাঠি, সুচেতা মহাজন প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেছেন যে, এই বিদ্রোহ গ্রামাঞ্চলে ও সাধারণ জনমানসে বিশেষ ছাপ ফেলতে পারে নি। তা সত্বেও একথা নিশ্চিত যে এই বিদ্রোহ ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারকে ভাবতে বাধ্য করেছিল।

উপসংহার :- সব শেষে বলতে হয় যে, সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতের অভ্যন্তরে এত বড় সেনাবিদ্রোহ আর কখনও সংঘঠিত হয় নি। এই প্রথম ভারতীয় সেনা ও সাধারণ মানুষের রক্ত একটি অভিন্ন আদর্শের জন্য একসঙ্গে মিশে গেল। এই বিদ্রোহের ফলে ইংরেজ সরকার স্পষ্টই বুঝতে পারে যে, ভারতে তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে।

(FAQ) নৌ বিদ্রোহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. নৌ বিদ্রোহ প্রথম কোথায় শুরু হয়?

বোম্বাইয়ের তলোয়ার জাহাজে।

২. নৌ বিদ্রোহ কখন শুরু হয়?

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি।

৩. সরকার ও নৌবিদ্রোহীদের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন কে?

বল্লভভাই প্যাটেল।

৪. নৌ বিদ্রোহীরা সভাপতি এবং সহ-সভাপতি হিসেবে কাদের নিযুক্ত করেন।

সভাপতি এস. এন. রয় এবং সহ-সভাপতি মানসিংহ।

Leave a Reply

Translate »