ফ্রাঙ্কদের পরিচয়

ফ্রাঙ্কদের পরিচয় প্রসঙ্গে ফ্রাঙ্কদের শাখা ফ্রাঙ্কদের সময়কাল, মেরোভিঞ্জিয়ান শাসনকাল, ক্যারোলিঞ্জিয়ান শাসনকাল ও ক্যারোলিঞ্জিয় সাম্রাজ্য সম্পর্কে জানবো।

ফ্রাঙ্কদের পরিচয়

ঐতিহাসিক ঘটনাফ্রাঙ্কদের পরিচয়
বিশেষত্বযুদ্ধপ্রিয় জাতি
মেরোভিঞ্জিয়ান৪৮২-৭৫১ খ্রি
ক্যারোলিঞ্জিয়ান৭৫১-৮৯১ খ্রি
সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাটশার্লামেন
ফ্রাঙ্কদের পরিচয়

ভূমিকা :- ফ্রাঙ্কদের পরিচয় আলোচনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হল Tours-এর Gregory-এর লেখা গ্রন্থ “The History of the Franks”। এই গ্রন্থটি পরবর্তী সময়কালে Lewis Thorpe অনুবাদ করেছিলেন। ফ্রাঙ্কদের ইতিহাস জানবার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থটির কোনো বিকল্প ছিল না বললেই চলে।

ফ্রাঙ্কদের পরিচয়

  • (১) ফ্রাঙ্কদের সম্বন্ধে বহু তথ্য ও পরিচিতি এই গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ছিল। পশ্চিম ইউরোপে ফ্রাঙ্করা শক্তিশালী জনগোষ্ঠী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। পশ্চিম জার্মান জনগোষ্ঠীর অংশ ছিল ফ্রাঙ্করা। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য বিভিন্ন উপজাতির আক্রমণের ফলে তছনছ হয়ে গিয়েছিল।
  • (২) এই উপজাতিগুলির মধ্যে একটি উপজাতি ছিল Teuton। Teutonদের বিভিন্ন শাখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল Frank-রা। পশ্চিম জার্মানির একটি গোষ্ঠী ছিল Frank-গণ। তারা ছিল অত্যন্ত যুদ্ধপ্রিয় জাতি। তারা তাদের লাল চুলের জন্য বিখ্যাত ছিল।

ফ্রাঙ্কদের সম্বন্ধে Wallace-Hadrill এর মন্তব্য

লম্বা ও লাল চুলের বিষয়টি তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকায় ফ্রাঙ্কদের সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে J. M. Wallace-Hadrill একটি গ্রন্থের নামকরণ করেছিলেন “The Long Haired Kings” অর্থাৎ “লম্বা চুলের সম্রাটগণ।”

ফ্রাঙ্কদের শাখা

ফ্রাঙ্কদের প্রধানত দুটি শাখা ছিল উল্লেখযোগ্য।

  • (i) পঞ্চম শতকে আধুনিক বেলজিয়ামের উত্তর-পশ্চিম অংশে যারা বসতি গড়ে তুলেছিল তারা “Salian Franks” নামে পরিচিত।
  • (ii) মধ্য রাইন অঞ্চলে আরেকটি শাখা “Ripuarian Franks নামে পরিচিত ছিল।

ফ্রাঙ্কদের শাসনকাল

R.HC. Davis এর ‘A History of Medieval Europe” গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে ফ্রাঙ্কদের শাসনকালকে দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। (i) মেরোভিঞ্জিয়ান সময়কাল (৪৮২-৭৫১ খ্রিস্টাব্দ), (ii) ক্যারোলিঞ্জিয়ান সময়কাল (৭৫১-৮৯১ খ্রিস্টাব্দ)।

(i) মেরোভিঞ্জিয়ান সময়কাল

  • (১) বর্তমান জার্মানি ও ফ্রান্সের বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে ফ্রাঙ্করা এই অঞ্চলে বসবাস করত। তারা ধীরে ধীরে উন্নত জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসের মধ্যে থেকেই নতুন ইউরোপ গড়ে তোলায় উদ্যোগী হয়েছিল।
  • (২) Edward James তাঁর ‘The origin of France’ গ্রন্থে আলোচনা করেছিলেন যে, মধ্যযুগের ইউরোপে ফ্রাঙ্করা প্রাচীন গলের যে অংশে বসতি স্থাপন করেছিল, তা ‘Frankia’ নামে পরিচিত হয়। ‘Frankia’ থেকেই পরবর্তীকালে ‘France’ এর নামকরণ হয়েছিল।”
  • (৩) ফ্রাঙ্কদের শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম ছিলেন ‘Merovius’। তাঁর নাম অনুসারে ফ্রাঙ্কদের এই গোষ্ঠী ‘মেরোভিঞ্জিয়ান’ বলে পরিচিত হয়। F. Fessier এর “Clovis” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মেরোভিঞ্জিয়ানদের শাসক Childeric-এর সন্তান ছিলেন Clovis।
  • (৪) Clovis ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। তাই তাঁকে “Battle of Glory” বলা হত। ৪৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন। Clovis কে মেরোভিঞ্জিয়ান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা হয়। তার শাসনকাল ছিল ৪৮১ থেকে ৫১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি ‘Salian Franks’-দের প্রতিনিধি ছিলেন এবং ফ্রান্স-এর রূপকার ছিলেন।
  • (৫) Clovis। বার্গান্ডির রাজকন্যা Clotildকে বিয়ে করে বার্গাণ্ডির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। Clovis ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২২শে নভেম্বর Rheims-এ বিশপ রেমিজিয়াসের দ্বারা খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। যা তার জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি জনগণকে খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
  • (৬) Clovis প্রভাস, সেষ্টিমানিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ও রাইন নদীর উভয় তীরে ফ্রাঙ্ক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ফ্রাঙ্কদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আকড়ে ধরেছিলেন। তাঁর কূটনীতি ও সমরকুশলতা ফ্রাঙ্কদের সাম্রাজ্য বিস্তারে সহায়তা করেছিল।
  • (৭) Clovis এর পরবর্তী সময়কালে অত্যন্ত অযোগ্য সম্রাটরা সিংহাসনে বসেছিলেন। এই সময় মেরোভিঞ্জিয়ানদের ইতিহাস ছিল অরাজকতা, হিংসা, ষড়যন্ত্র, হত্যা ও রক্তপাতের ইতিহাস। “Mayors of the Palace” অর্থাৎ “প্রাসাদের মেয়র”-রাই সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। সম্রাট মেয়রদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন।
  • (৮) মেরোভিঞ্জিয়ানদের শেষ উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন Dagobert (৬২৯-৩১ খ্রিস্টাব্দ) Dagobert-এর মৃত্যুর পর ফ্রাঙ্ক রাজ্য তথা মেরোভিঞ্জিয়ান রাজবংশ দুর্বল হতে শুরু করে। শেষ মেরোভিঞ্জিয়ান শাসক ছিলেন Chilperic (তৃতীয়) ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে Soissons তে পোপের সম্মতি নিয়ে St. Boniface আনুষ্ঠানিকভাবে মেরোভিঞ্জিয়ান শাসক Chilperic (তৃতীয়)-কে সিংহাসনচ্যুত করে তৃতীয় পিপিনকে রাজপদে অভিষিক্ত করেছিলেন।

(ii) ক্যারোলিঞ্জিয়ান শাসনকাল

  • (১) U. M. Dalton ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে Gregory of Tours এর “History of the Franks” নামক গ্রন্থটি অনুবাদ করেছিলেন। এই গ্রন্থে ক্যারোলিঞ্জিয়ানদের শাসনকাল সম্বন্ধেও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। মেরোভিঞ্জিয়ানদের পর ক্যারোলিঞ্জিয়ানরা শাসনকার্য চালিয়েছিল।
  • (২) মেরোভিঞ্জিয়ানদের সময়কালে সম্রাটকে ‘পুতুল’ সম্রাট হিসাবে সিংহাসনে বসিয়ে প্রাসাদের মেয়ররা সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিল। মেয়রদের পদটি Arnolfini-দের একচেটিয়া হয়ে পড়েছিল। Arnulfings ছিল Metz এর Bishop Arnulfings-এর বংশধর। Arnulfingsদের বংশধর Pepin II Neustria, Burgundy এবং Austrasia-এর পরিচিত ছিলেন।
  • (৩) Pepin II এর সন্তান ছিলেন Charles Martel। তিনি ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের মুসলমানদের Tours এর যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। যার ফলে পশ্চিম ইউরোপে মুসলমানদের অগ্রগতির চেষ্টাকে বাধা দিতে সফল হয়েছিলেন। তাঁর ডাকনাম ছিল “The Hammer” অর্থাৎ “হাতুড়ি”।
  • (৪) বিদেশি শত্রুদের কাছে হাতুড়ির আঘাতের মতই ভয়ঙ্কর ছিলেন Charles Martel। তাঁর সামরিক সাফল্যের জন্যই তাঁর এইরকম নাম রাখা হয়েছিল। ৭৪১ খ্রিস্টাব্দে Charles Martel এর মৃত্যু হয়েছিল। এরপর তার পুত্র Pepin III ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। তিনি “The Short” নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সময়কাল ছিল ৭৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে।
  • (৫) পরবর্তীকালে Pepin III প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের নাম হয় ক্যারোলিঞ্জিয়ান রাজবংশ। Pepin III এর সন্তান শার্লামেনের (Charlemagne) নাম অনুসারে ক্যারোলিঞ্জিয়ান নামকরণ হয়েছিল। ৭৬৮ খ্রিস্টাব্দের Pepin III এর মৃত্যুর পর শার্লামেন ফ্রাঙ্ক সম্রাট হিসাবে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসে শার্লামেন-এর সময়কাল ছিল বর্ণাঢ্যময় ও ঘটনাবহুল।

ক্যারোলিঞ্জিয় সাম্রাজ্য

Heinrich Fichtenau তাঁর “The Carolingian Empire” গ্রন্থে ক্যারোলিঞ্জিয় সাম্রাজ্যের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। মধ্যযুগীয় লাতিন Karolingi থেকে “Carolingian” শব্দটি এসেছিল। ক্যারোলিঞ্জিয় রাজবংশের শার্লেমান ছিলেন উল্লেখযোগ্য সম্রাট।

উপসংহার :- সমস্ত ফ্রাঙ্ক সম্রাটদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন শার্লামেন। তিনি কেবলমাত্র ফ্রাঙ্ক জাতির ইতিহাসেই নয় মধ্যযুগের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তি।

(FAQ) ফ্রাঙ্কদের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে কখন?।

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে।

২. ফ্রাঙ্করা কোন গোষ্ঠীর শাখা ছিল?

পশ্চিম জার্মানি।

৩. ফ্রাঙ্কদের কটি শাখা ছিল?

দুটি, মেরোভিঞ্জিয়ান ও ক্যারোভিঞ্জিয়ান।

৪. সমস্ত ফ্রাঙ্ক সম্রাটদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন কে?

শার্লামেন।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment