টমাস হবসের রাষ্ট্রতত্ত্ব

টমাস হবসের রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রসঙ্গে পিউরিটান বিপ্লবের পটভূমি, বিখ্যাত গ্রন্থ, প্রকৃতির রাজ্য, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সার্বভৌমিকতা, চরম আনুগত্য, রাজতন্ত্র, তার রাষ্ট্রচিন্তার ত্রুটি ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

টমাস হবসের রাষ্ট্রতত্ত্ব

ঐতিহাসিক ঘটনাটমাস হবসের রাষ্ট্রচিন্তা
পরিচিতি ব্রিটিশরাষ্ট্রচিন্তাবিদ
দেশইংল্যান্ড
গ্ৰন্থলেভিয়াথান
পিউরিটান বিপ্লব১৬৪৮ খ্রি
রাষ্ট্রচিন্তার বৈশিষ্ট্যধর্মনিরপেক্ষতা
টমাস হবসের রাষ্ট্রতত্ত্ব

ভূমিকা :- আধুনিক বৃহদায়তন রাষ্ট্রের বস্তুতান্ত্রিক ভিত্তি রচনায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হলেন টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯ খ্রি.)।

পিউরিটান বিপ্লবের পটভূমি

সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ (১৬৪৮ খ্রি.) করে পিউরিটান বিপ্লব সম্পন্ন হয়। এই বিপ্লব ও পরবর্তী ক্রমওয়েলের প্রজাতন্ত্রের প্রতি অবিশ্বাসের পটভূমিতে হবস আধুনিক ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের রাষ্ট্রচিন্তাকে সমৃদ্ধ করেন।

হবসের বিখ্যাত গ্ৰন্থ

এই বিষয়ে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘লেভিয়াথান’(‘Leviathan’)।

হবসের রআষ্ট্রচিন্তা

হবস রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ হলেও রাষ্ট্রনৈতিক তত্ত্ব রচনার ক্ষেত্রে তিনি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাজতন্ত্রী ও প্রজাতন্ত্রী উভয়ের দোষত্রুটি তুলে ধরেন। তাঁর রাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি নীচে উল্লেখ করা হল –

(ক) প্রকৃতির রাজ্য

হবস এক ধরনের প্রাচীন প্রকৃতির রাজ্যের কল্পনা করেছেন যেখানে মানুষ ঈশ্বরের সন্ধানী নয়, ক্ষমতার সন্ধানী।

(১) প্রকৃতির রাজ্যে নৈরাজ্য

হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল দরিদ্র, নিঃসঙ্গ, ঘৃণ্য, পাশবিক, সংকীর্ণ ইত্যাদি। এই রাজ্যে প্রতিটি মানুষ একে অপরের শত্রু ছিল বলে এখানে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করত। মানুষে মানুষে বিরোধ, সংঘাত, যুদ্ধ প্রভৃতি প্রকৃতির রাজ্যের বৈশিষ্ট্য।

(২) রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা

এরূপ নৈরাজ্যের পরিস্থিতিতে মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে হবস মনে করেন।

(খ) সার্বভৌমিকতা

এক্ষেত্রে হবসের আলোচনার বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা

হবসের মতে, রাষ্ট্রের অন্তর্গত সকলের শক্তির মিলিত রূপ হল রাষ্ট্রশক্তি। মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নিজেদের যাবতীয় ক্ষমতা ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। এভাবে সকলের শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েই বৃহদায়তন ও সার্বভৌম ক্ষমতাবিশিষ্ট আধুনিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে।

(২) চুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌম ক্ষমতার উদ্ভব

হবসের মতে, মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্থাৎ কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অস্তিত্ব ছিল না। চুক্তির মাধ্যমেই চূড়ান্ত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সার্বভৌম ক্ষমতার উদ্ভব ঘটেছে।

(গ) চরম আনুগত্য

চুক্তিবদ্ধ মানুষের নিজেদের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রয়োজনেই হবস চূড়ান্ত সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, একবার রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠলে তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা বলার কোনো অধিকার থাকতে পারে না। অর্থাৎ জনগণের পক্ষ থেকে সার্বভৌম শক্তির বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদ করার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ চূড়ান্ত সার্বভৌম শক্তি চুক্তির ঊর্ধ্বে।

(ঘ) রাজতন্ত্র

হবস রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং গণতন্ত্রের মধ্যে রাজতন্ত্রকেই শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা বলে মনে করেন। সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি রাজতন্ত্রকেই কার্যকরী ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রাচীন এথেন্সের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এথেন্সের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে নির্দেশ করে অভিজাততান্ত্রিক স্পার্টার শাসন কাঠামোকে সমর্থন করেছেন।

হবস-এর রাষ্ট্রচিন্তার ত্রুটি

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টমাস হবস-এর রাষ্ট্রচিন্তার সমালোচনা করা হয়। যেমন –

(১) কাল্পনিক মতবাদ

প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবসের মতবাদ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

(২) একপক্ষের চুক্তি অসম্ভব

চুক্তি হয় সর্বদা একাধিক পক্ষের মধ্যে। কিন্তু হবস তাঁর আলোচনায় বলেছেন যে, চুক্তি হয়েছিল কেবল একপক্ষের মধ্যে। এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব বিষয়।

(৩) নিন্দুকের দৃষ্টিভঙ্গি

হবস সর্বদা নিন্দুকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মানব চরিত্রের কেবলমাত্র ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলিই প্রত্যক্ষ করেছেন। মানুষের চরিত্রের বিভিন্ন ভালো দিকগুলি তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।

(৪) চরম ক্ষমতাকে সমর্থন

হবস রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমিকতার নামে বাস্তবক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের চরম স্বৈরাচারী ক্ষমতাকেই সমর্থন করেছেন।

হবসের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব

বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও টমাস হবসের রাষ্ট্রচিন্তার বিভিন্ন গুরুত্ব রয়েছে। যেমন –

(১) আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি

হবস উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের নিজের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের এবং চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য জানানো কর্তব্য। এভাবে তিনি ইউরোপের শক্তিশালী আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

(২) আধুনিক সার্বভৌম তত্ত্বের প্রবক্তা

সার্বভৌম তত্ত্ব বলতে আধুনিক কালে আমরা যা বুঝি তার প্রবক্তা হলেন হবস। তিনি সার্বভৌমিকতার সংজ্ঞা প্রদান করেন এবং এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।

(৩) ধর্মনিরপেক্ষতা

হবস ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনা করেন। তিনি রাজনীতিকে ধর্মের ওপরে স্থান দেন। মার্সিলিও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার চর্চার যে প্রয়াস শুরু করেন হবস তাকে পূর্ণ রূপ দেন।

(৪) উপযোগিতাবাদের অগ্ৰদূত

হবসের চিন্তাধারা ছিল পরবর্তীকালের মিল ও বেন্থামের উপযোগিতাবাদের উৎস। এজন্য হবসকে উপযোগিতাবাদের অগ্রদূত বলা হয়।

উপসংহার :- তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্ব অনুধাবন করে ইংরেজ ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার হিল হবসের রাষ্ট্রনৈতিক তত্ত্বকে বৈপ্লবিক বলে অভিহিত করেছেন।

(FAQ) মহাপ্রজাপতি গৌতমী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হবস কোন দেশের নাগরিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ?

ইংল্যান্ড।

২. হবসের বিখ্যাত গ্ৰন্থের নাম কি?

লেভিয়াথান।

৩. ইংল্যান্ডে পিউরিটান বিপ্লব সংঘটিত হয় কখন?

১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে।

৪. আধুনিক সার্বভৌম তত্ত্বের প্রবক্তা কে?

টমাস হবস।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment