ভারতের সামন্ততন্ত্র

ভারতের সামন্ততন্ত্র প্রসঙ্গে সময়কাল, গুপ্ত যুগে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি, গুপ্ত যুগের সামন্ততান্ত্রিক উপাদান, গুপ্ত যুগের অগ্রহার প্রথা, সামন্ততন্ত্রের বিকাশে অগ্রহার প্রথার ভূমিকা, গুপ্ত যুগের সামন্ততন্ত্র পরিপন্থী উপাদান, ভারতের সুলতানি আমলে সামন্ততন্ত্র ও সুলতানি আমলে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে জানবো।

ভারতের সামন্ততন্ত্র

ঐতিহাসিক ঘটনাভারতের সামন্ততন্ত্র
অগ্ৰহার প্রথাগুপ্ত সাম্রাজ্য
সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বরামশরন শর্মা, ডি ডি কোশাম্বী
সামন্ততন্ত্রের অনস্তিত্বরণবীর চক্রবর্তী, হরবনস মুখিয়া
ইক্তা ব্যবস্থাসুলতানি সাম্রাজ্য
প্রবর্তকইলতুৎমিস
ভারতের সামন্ততন্ত্র

ভূমিকা :- মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা যেরূপ ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছিল অনুরূপ ব্যাপকতা ভারতে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ভারতে প্রাচীন যুগে গুপ্ত রাজাদের শাসনকালে এবং মধ্যযুগে দিল্লি সুলতানির শাসনকালে শাসনব্যবস্থার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো লক্ষ্য করা যায়। তবে ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের বিচারে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব খুবই দুর্বল। অবশ্য প্রাচীন যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব প্রকৃতই ছিল কি না তা নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

ভারতে সামন্ততন্ত্রের সময়কাল

প্রাচীন যুগে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত অর্থাৎ ৩০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। ইতিহাসবিদ ড. রামশরণ শর্মা প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব, বিকাশ ও অবক্ষয়ের সময়কালকে তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন। যথা  –

  • (১) ৩০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে ভারতে সামন্ততন্ত্রের উত্থান ঘটে।
  • (২) ৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তীকালে ভারতে সামন্ততন্ত্রের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে।
  • (৩) ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় পর্ব চলে।

গুপ্ত যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব

প্রাচীন রোমান বা মধ্যযুগের ইউরোপের মতো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব প্রাচীন ভারতে, বিশেষ করে গুপ্ত যুগে ছিল কি না সে সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের সপক্ষে যুক্তি

  • (১) প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন যে, সে যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, ড. রামশরণ শর্মা, ড. ডি. ডি. কোশাম্বী, ড. দ্বিজেন্দ্রনাথ ঝা, অধ্যাপক বি. এন. এস. যাদব, এস. গোপাল, ভকতপ্রসাদ মজুমদার প্রমুখ এই অভিমতের সমর্থক।
  • (২) তাদের মতে, প্রাচীন যুগে সামন্ততন্ত্রের সহায়ক কয়েকটি উপাদানের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এই উপাদানগুলি হল দাসপ্রথা, অগ্রহার ব্যবস্থা, কৃষকের বদ্ধ জীবন, বাণিজ্যের ক্রমাবনতি, নগরের অবক্ষয় প্রভৃতি।
  • (৩) অবশ্য প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের সমর্থনকারী পণ্ডিতরা মনে করেন যে, ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তীকালে ইউরোপে যে ধাঁচের সামন্ততন্ত্রের উত্থান ঘটেছিল ভারতীয় সামন্ততন্ত্র সেই ধাঁচের ছিল না।

(খ) সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের বিপক্ষে যুক্তি

  • (১) অন্যদিকে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, মধ্যযুগের পশ্চিম ইউরোপের মতো প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না। ড. দীনেশচন্দ্র সরকার, হরবনস মুখিয়া, ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, রণবীর চক্রবর্তী প্রমুখ এই অভিমতের সমর্থক। এই প্রসঙ্গে তাঁরা প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন সামন্ততন্ত্র-বিরোধী উপাদানের উপস্থিতির উল্লেখ করেন।
  • (২) তাঁদের মতে, প্রাচীন ভারতে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির অস্তিত্ব ছিল, সে যুগে জমিতে কৃষকের মালিকানা স্বত্ব ছিল, কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি সেই সময় ভারতে সমৃদ্ধ ব্যাবসাবাণিজ্য ছিল, প্রাচীন ভারতে নগরসভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। প্রাচীন ভারতে সামন্ততন্ত্র-বিরোধী উক্ত উপাদানগুলির উপস্থিতির উল্লেখ করে পণ্ডিতরা অভিমত দিয়েছেন যে, সে যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না।

গুপ্ত যুগে সামন্ততান্ত্রিক উপাদান

প্রাচীন যুগে ভারতে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় থাকলেও এই সময় সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য ভারতীয় সমাজ ও অর্থনীতিতে অবশ্যই উপস্থিত ছিল। এগুলি হল –

(ক) দাসপ্রথার অস্তিত্ব

সামন্ততন্ত্রের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ক্রীতদাসপ্রথা বা দাসপ্রথার উপস্থিতি। প্রাচীনকালের বিভিন্ন বৈদিক সাহিত্য, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, অশোকের শিলালিপি, মনুসংহিতা প্রভৃতি থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রাচীন ভারতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল। এই প্রথা পরবর্তী গুপ্ত যুগেও একইভাবে প্রচলিত ছিল বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়।

(খ) অগ্রহার ব্যবস্থা

  • (১) ইতিহাসবিদ ড. রামশরণ শর্মা দেখিয়েছেন যে, ভারতে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের পরবর্তীকালে পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণকে ও ধর্মপ্রতিষ্ঠানে নিষ্কর জমি দান করার প্রথা চালু হয়। এই প্রথা ‘অগ্রহার’ বা ‘ব্রহ্মদেয়’ নামে পরিচিত।
  • (২) অগ্রহার প্রথার মাধ্যমে জমির প্রাপক যে জমি লাভ করত সেই জমির যাবতীয় অধিকার তাঁর হাতে চলে যেত। এর ফলে জমির প্রাপকের ক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় এবং তিনি ভূস্বামীতে পরিণত হন। তাঁর প্রাপ্ত জমিতে বসবাসকারী কৃষকরা তাঁর প্রজায় পরিণত হয় এবং তাদের ওপর প্রভুর শোষণ চলতে থাকে। এভাবে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের পথ প্রস্তুত হয়।

(গ) কৃষকের বদ্ধ জীবন

গুপ্ত যুগে, বিশেষ করে আদি-মধ্যযুগে ভারতের কৃষকসমাজ ভূমির মালিকানা হারিয়ে প্রভুর জমিতে শ্রমদানে বাধ্য হয়েছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন। ড. যাদব দেখিয়েছেন যে, আদি মধ্যযুগে ‘হালকর’, ‘বদ্ধহল’ প্রভৃতি শব্দগুলি কৃষকের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এর থেকে তিনি অনুমান করেন যে, সে যুগে কৃষকরা নিজস্ব অধিকার হারিয়ে প্রভুর জমিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। প্রভুর অধীনে কৃষকদের পরিশ্রমে উৎপাদনকার্য চলতে থাকে এবং দেশে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ঘটে।

(ঘ) বাণিজ্যের অবনতি

  • (১) সামন্ততন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল কৃষি-অর্থনীতির উপর বেশি নির্ভরতা এবং বাণিজ্যের অবনতি। ড. রামশরণ শর্মা ও ড. যাদব দেখিয়েছেন যে, গুপ্ত যুগে অগ্রহার ব্যবস্থার বিকাশের ফলে স্বনির্ভর গ্রামীণ কৃষি-অর্থনীতিই মুখ্য হয়ে ওঠে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সঙ্গে রোমের সক্রিয় বাণিজ্যিক সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়।
  • (২) এর ফলে ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাস পায় ও কৃষি উৎপাদন কমে যায়। অর্থনীতি ক্রমে আঞ্চলিক হয়ে উঠতে থাকে। এই সময় মুদ্রার সংখ্যা কমে গিয়ে ভারতের মুদ্রা-অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়।

(ঙ) নগরের অবক্ষয়

অগ্রহার প্রথাকে ভিত্তি করে গুপ্ত যুগে উদ্ভূত নতুন ভূস্বামীরা কৃষি উৎপাদনে শ্রমের ওপর জোর দিলে শিল্প ও বাণিজ্য অবহেলিত হয়। শিল্প ও বাণিজ্যের অবনতির ফলে নগরগুলির অবক্ষয় শুরু হয়। এই সময় প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধ বহু নগর অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হয়। কপিলাবস্তু, শ্রাবস্তী, কুশীনগর, বৈশালী প্রভৃতি প্রাচীন নগরগুলির অবক্ষয় এই সময় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছোয়। নগরজীবনের অবক্ষয় এবং গ্রামজীবনের প্রসার সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

(চ) সম্রাট ও কৃষকের মধ্যবর্তী শাসকগোষ্ঠী

ড. দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বীর মতে, গুপ্ত যুগের শেষদিকে সম্রাটের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছিল এবং সাম্রাজ্যের অধিকাংশ প্রদেশের শাসনক্ষমতা স্থানীয় সামন্তপ্রভুদের হাতে চলে গিয়েছিল। যেমন –

  • (১) ড. কোশাম্বীর মতে, খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যে ভারতে সম্রাট তাঁর অধীনস্থ বিভিন্ন স্থানীয় শাসকদের নিজেদের এলাকায় রাজস্ব আদায়, শাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে কিছু কিছু অধিকার দেন।ঊর্ধ্বতন সম্রাট কর্তৃক স্থানীয় শাসকদের এরূপ অধিকারদানকে ড. কোশাম্বী ওপর থেকে সামন্ততন্ত্র’ (Feudalism from Above) বলে অভিহিত করেছেন।
  • (২) ড. কোশাম্বীর মতে, খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতক নাগাদ সম্রাট ও কৃষকের মধ্যবর্তী স্তরে নতুন ভূম্যধিকারী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে যারা কৃষকদের ওপর বলপ্রয়োগ করে কৃষি উৎপাদনকে সচল রাখত। ড. কোশাম্বী একে ‘নীচু থেকে সামন্ততন্ত্র’ (Feudalism from Below) বলে অভিহিত করেছেন।

গুপ্ত যুগে অগ্ৰহার প্রথা

ভারতে গুপ্ত যুগে সম্রাট এবং বিভিন্ন ধনী ব্যক্তি পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমি দান করতেন। দান গ্রহীতা স্বয়ং প্রাপ্ত জমি বা গ্রামের রাজস্ব আদায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসন ও বিচারকার্য পরিচালনা প্রভৃতি যাবতীয় বিষয়ের অধিকারী হতেন। এটি ‘অগ্রহার’ বা ‘ব্রহ্মদেয়’ প্রথা নামে পরিচিত।

গুপ্ত যুগে সামন্ততন্ত্রের বিকাশে অগ্রহার প্রথার ভূমিকা

গুপ্ত যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের বিকাশে সহায়তা করার জন্য অগ্রহার প্রথাকে ‘সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অগ্রদূত’ বলা হয়। অগ্রহার প্রথা যেসব উপায়ে সামন্ততন্ত্রের বিকাশে সহায়তা করেছিল সেই উপায়গুলি হল –

(ক) ভূমিদান

  • (১) গুপ্ত যুগে সম্রাট ও অন্যান্য ধনী ব্যক্তিরা পুণ্য অর্জনের লক্ষ্যে ধর্মস্থান ও ব্রাহ্মণদের যে নিষ্কর ভূমিদান করতেন তার যাবতীয় অধিকার চলে যেত দানগ্রহীতা অর্থাৎ জমির প্রাপকের হাতে। জমির প্রাপক এই দানপ্রাপ্ত জমির যাবতীয় রাজস্ব আদায় ও ভোগ করতেন। এই জমিতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারকার্য পরিচালনা প্রভৃতি অধিকারও জমির প্রাপকের হাতে চলে যেত।
  • (২) দান-প্রাপ্ত ভূমির ওপরে অবস্থিত যাবতীয় সম্পদ, এমনকি ভূমির নীচে অবস্থিত খনিজ সম্পদেও জমির প্রাপকের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হত। এভাবে ভূমিদান ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে স্থানীয় বিভিন্ন ভূস্বামীর আবির্ভাব ঘটে যা সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি রচনা করে।

(খ) ব্যক্তিমালিকানা

গুপ্ত যুগে ভারতে জমির ওপর রাজকীয় ও গোষ্ঠীমালিকানা সংকুচিত হয়ে ব্যক্তিমালিকানার প্রসার ঘটতে শুরু করেছিল বলে ইতিহাসবিদ ড. রামশরণ শৰ্মা মনে করেন। এই সময় ব্যক্তিমালিকানার প্রসারে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল ‘অগ্রহার’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বা ব্রাক্ষ্মণদের ভূমিদান করা হত। রাজা ধর্মস্থানে ও ব্রাহ্মণদের যে ভূমি দান করতেন তাতে রাজার অধিকার লুপ্ত হয়ে জমি প্রাপকের ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত হত।

(গ) ত্রিস্তর ব্যবস্থা

গুপ্ত যুগের বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রগুলি থেকে জানা যায় যে, সে যুগে ভূমিদানের ফলে ভূমি ব্যবস্থায় তিনটি স্তরের সৃষ্টি হয়েছিল – মহীপতি অর্থাৎ রাজা, স্বামী অর্থাৎ জমির প্রাপক এবং কর্ষক অর্থাৎ শোষিত কৃষকশ্রেণি। এই স্তরবিন্যাসের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করতেন রাজা, মধ্যবর্তী স্তরে থাকতেন বিভিন্ন স্থানীয় ভূস্বামী এবং সর্বনিম্ন স্তরে থাকত অগণিত শোষিত কৃষক। এই ভাবে গুপ্ত যুগে ভারতে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোটি গড়ে ওঠে।

গুপ্ত যুগে সামন্ততন্ত্র-পরিপন্থী উপাদান

বিভিন্ন পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ গুপ্ত যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের সহায়ক বিভিন্ন উপাদানের উল্লেখ করলেও ড. দীনেশচন্দ্র সরকার, হরবনস মুখিয়া, ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, রণবীর চক্রবর্তী প্রমুখ এই সময় ভারতের সমাজ ও অর্থনীতিতে সামন্ততন্ত্র পরিপন্থী বিভিন্ন উপাদানের উল্লেখ করে বলেছেন যে, উক্ত সময়কালে ভারতে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটে নি। তাঁরা উক্ত সময়কালে ভারতে সামন্ততন্ত্র-বিরোধী যে সব উপাদানের অস্তিত্বের উল্লেখ করেছেন সেগুলি হল –

(ক) শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার

ড. সরকার, ড. চক্রবর্তী প্রমুখ দেখিয়েছেন যে, গুপ্ত যুগে ভারতে কেন্দ্ৰীয় শক্তি যথেষ্ট সুদৃঢ় ছিল। ড. চক্রবর্তী দেখিয়েছেন যে, এই যুগের রাজ-অনুশাসনগুলিতে দানগ্রহীতাকে রাজ-বিরোধী কাজ থেকে দূরে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে তার জমি কেড়ে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

(খ) কৃষকের মালিকানা

ড. হরবনস মুখিয়ার মতে, সামন্ততন্ত্রের প্রতিষ্ঠার জন্য উৎপাদনের উপকরণের ওপর ভূস্বামীর মালিকানা থাকা দরকার। কিন্তু গুপ্ত যুগে তথা প্রাচীন ভারতে উৎপাদনের উপকরণগুলির ওপর সামন্তপ্রভুর পরিবর্তে কৃষকদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতে কৃষকরা ভূস্বামীর অধীন ছিল না বা প্রাচীন রোমের মতো ক্রীতদাসপ্রথাও ভারতে গড়ে ওঠে নি। তাই ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের সন্ধান করা অর্থহীন বলে ড. মুখিয়া মনে করেন ৷

(গ) বাণিজ্যের বিকাশ

সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাণিজ্যের বিকাশ সম্ভব নয়। কিন্তু ৩০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় প্রকার বাণিজ্যের যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল বলে অনেকে মনে করেন। উদ্‌বৃত্ত কৃষি উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করেই বাণিজ্যের এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল। এই সময় ভারতে রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন বাণিজ্যের সহায়ক হয়েছিল বলে ড. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় মনে করেন। উক্ত সময়কালে বণিকসংঘেরও অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়।

(ঘ) নগরের প্রসার

অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, আদি-মধ্যযুগে ভারতে তৃতীয় পর্বের নগরায়ণ প্রক্রিয়া চলছিল। এই সময় প্রাচীন নগরগুলি যেমন নতুন করে বিকশিত হচ্ছিল তেমনি গাঙ্গেয় উপত্যকায় বহু নতুন নগরের উদ্ভব ঘটেছিল। নগরজীবনের বিকাশ সামন্ততন্ত্রের প্রসারের বিরোধী উপাদান হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকে।

‘আধা সামন্ততান্ত্রিক’ ব্যবস্থা

যাই হোক, গুপ্ত যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিতর্কের কোনো সুস্পষ্ট মীমাংসা এখনও হয় নি। তবে এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ ড. এ. এল. বাসাম-এর অভিমত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তিনি আদি-মধ্যযুগের ভারতীয় আর্থসামাজিক অবস্থাকে বড়োজোর ‘আধা সামন্ততান্ত্রিক’ বা ‘সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচের’ বলে অভিহিত করেছেন।

দিল্লি সুলতানির আমলে ভারতে সামন্ততন্ত্র

  • (১) প্রাচীন যুগে, বিশেষ করে গুপ্ত যুগে ও পরবর্তীকালে আদি-মধ্য যুগে ভারতীয় সমাজ ও অর্থনীতিতে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান কিছুটা সক্রিয় থাকলেও ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে তুর্কি মুসলিমদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেই এর অবসান ঘটেছিল।
  • (২) তবে দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় আবার সামন্ততান্ত্রিক কিছু কিছু উপাদান প্রবেশ করে। তবে অবশ্যই তা পশ্চিম ইউরোপের সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে তুলনীয় নয়। দিল্লি সুলতানির কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচ লক্ষ্য করা গিয়েছিল মাত্র।
  • (৩) এই সময় রাজকীয় জমি ছোটো-বড়ো বিভিন্ন অংশে ভাগ করে সেনাধ্যক্ষ, সৈনিক এবং অন্যান্য মুসলিম অভিজাতদের মর্যাদা অনুসারে তাদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করা হত। এটি ইক্তা ব্যবস্থা নামে পরিচিত। দিল্লি সুলতানির শাসনকালে কেন্দ্রীয় শাসন যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও ইক্তা ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে এই সময় সুলতানি শাসনব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোটি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।

সুলতানি আমলে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো

ইক্তা ব্যবস্থাকে ভিত্তি করে সুলতানি আমলে ভারতে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো তৈরি হয়। যেমন –

(ক) ইক্তা ব্যবস্থা

আক্ষরিক অর্থে ‘ইক্তা’ বলতে ‘এক অংশ’ বোঝায়। ইক্তা ব্যবস্থা ইসলামীয় জগতে প্রচলিত ছিল এবং সেখান থেকে তুর্কিরা এই ব্যবস্থা ভারতে আমদানি করে। ইতিহাসবিদ কে. এ. নিজামি লিখেছেন, “ভারতের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য দিল্লির প্রথম দিকের তুর্কি সুলতানগণ বিশেষ করে ইলতুৎমিস ইক্তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।” কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন সুলতানের আমলে ইক্তা ব্যবস্থায় নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সুলতানি যুগে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর আত্মপ্রকাশ ঘটে।

(খ) ইক্তা ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

ইক্তা ব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচের কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন –

  • (১) এই ব্যবস্থার দ্বারা সুলতান তাঁর ‘খালিসা’ জমির বাইরে অবস্থিত জমিগুলি নির্দিষ্ট শর্ত ও কর্তব্য পালনের বিনিময়ে তাঁর সেনাধ্যক্ষ, সৈনিক ও অভিজাতদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন।
  • (২) বিনিময়ে ইক্তাদার’ বা ‘মুক্তি’ বা ‘মাকতি’ নামে ইক্তার প্রাপকরা সুলতানকে প্রয়োজনে সৈন্য সরবরাহ করতেন।
  • (৩) সুলতানের নামে মাকতি তাঁর ইক্তা এলাকায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। এক কথায়, সুলতানকে সৈন্য সরবরাহ ও কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে ইক্তাদারকে নগদ অর্থের পরিবর্তে ভূমিদান করা হত যেখান থেকে ইজাদার রাজস্ব আদায় করে তাঁর যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করতেন।

(গ) ইক্তা ব্যবস্থায় বিবর্তন

ইলতুৎমিসের পরবর্তীকালে কোনো কোনো সুলতান ইক্তা ব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক প্রবণতা রোধ করার উদ্যোগ নিলেও কোনো কোনো সুলতানের পদক্ষেপে ইক্তা ব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোটি আরও প্রবল হয়ে ওঠে। যেমন –

  • (১) আলাউদ্দিন খলজি ইক্তা ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করলেও গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের আমলে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে।
  • (২) ফিরোজ শাহ তুঘলক ইক্তা ব্যবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করে এই প্রথাকে বংশানুক্রমিক করেন। ফলে ইক্তাদারের আত্মীয়রা বংশানুক্রমে ইক্তার ভোগ দখলের অধিকার পায়। পরবর্তীকালে এদের মধ্যে স্বাধীনতালাভের আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। এই ভাবে ইক্তা প্রথায় সামন্ততান্ত্রিক প্রবণতা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

(ঘ) সামন্ততান্ত্রিক প্রবণতা

  • (১) সামন্ততান্ত্রিক ভূমিদান ব্যবস্থায় দেখা যেত যে, একজন সামন্ত যে শর্তে রাজার কাছ থেকে ভূমি লাভ করেছেন, তিনি আবার একই শর্তে তাঁর অধীনস্থ সামন্তকে ভূমি বিতরণ করতে পারতেন। এভাবে সামন্তপ্রভু নিজ এলাকায় রাজার মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চাইতেন।
  • (২) একইভাবে সুলতানি যুগে ইক্তাদাররাও সর্বদা নিজ ইক্তার আদায়িকৃত অর্থ নিজে আত্মসাৎ করতে এবং স্বাধীনভাবে তাঁর ইক্তা এলাকা শাসন করতে চাইতেন। এভাবে ইক্তা প্রথার মধ্যে সামন্ততান্ত্রিক প্রবণতা লুকিয়েছিল।
  • (৩) পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ইক্তাদাররা দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসনকে অগ্রাহ্য করতে থাকে। ফলে সুলতানি শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেশের বিভিন্ন অংশে সামন্তপ্রভুর শাসন শুরু হয়। ইক্তা ব্যবস্থার কাঠামোটি থেকে পরবর্তী মোগল আমলে সামন্ততান্ত্রিক ধাঁচের জায়গিরদারি ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে।

(ঙ) অভিজাতদের ক্ষমতা

সুলতানি রাষ্ট্রের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ অভিমত দিয়েছেন যে, সুলতানি রাষ্ট্র ছিল বিভিন্ন তুর্কি অভিজাতগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত একটি সংগঠন। –

  • (১) বিভিন্ন অঞ্চলে অভিজাতরা স্থানীয় সামন্তপ্রভুর মতো সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করতেন। নিজ নিজ অঞ্চলে অভিজাতদের বিপুল ক্ষমতা ছিল।
  • (২) অভিজাতদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ইক্তার রাজস্ব বা নগদ বেতন। এ ছাড়া তাদের বিপুল সম্পত্তি থেকেও প্রচুর আয় হত।
  • (৩) অভিজাতদের সীমাহীন আর্থিক শক্তি কখনো-কখনো সুলতানের আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াত। এর ফলে দিল্লির অধিকাংশ সুলতান অভিজাতগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে তোষণ করেই চলতেন।
  • (৪) অভিজাতরা সীমাহীন বিলাসিতার মধ্যে জীবন যাপন করতেন। তাঁরা সুলতানের অনুকরণে হারেম-সহ সুবিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করতেন, অসংখ্য দাসদাসী ও পরিবারের ভরণ-পোষণ বহন করতেন। অভিজাতরা বংশানুক্রমিক ভাবে তাদের ক্ষমতা ও সম্পত্তি ভোগদখল করতেন।
  • (৫) বিভিন্ন সময় অভিজাতদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত এবং এই উপলক্ষ্যে তাঁরা বিপুল অর্থ ব্যয় করতেন।
  • (৬) মূলত অভিজাতদের ক্ষমতার ওপরই সুলতানের ক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। অবশ্য গ্রামীণ হিন্দু অভিজাতদের ক্ষমতা শহরের তুর্কি অভিজাতদের তুলনায় অনেক কম ছিল।

উপসংহার :- ভারতে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি সম্পর্কে বিতর্ক এখনো বিদ্যমান সামন্ততন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হলেও পশ্চিম ইউরোপের মত ভারতে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো কখনোই গড়ে ওঠে নি।

(FAQ) ভারতের সামন্ততন্ত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত যুগে সামন্ততন্ত্রের বিকাশে কোন প্রথা সাহায্য করেছিল?

অগ্রহার প্রথা।

২. অগ্রহার প্রথা কি?

ভারতে গুপ্ত যুগে সম্রাট ও বিভিন্ন ধনী ব্যক্তি পূণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমি দান করতেন। এই দান প্রথা অগ্রহার বা ব্রহ্মদেয় প্রথা নামে পরিচিত।

৩. গুপ্ত যুগে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের পক্ষে মত দিয়েছেন কারা?

ডক্টর রামসরণ শর্মা, ডক্টর ডি ডি কোসাম্বি।

৪. গুপ্ত যুগে সামন্ততন্ত্রের অস্তিত্বের বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন কারা ?

ডক্টর দিনেশচন্দ্র সরকার, হরবনস মুখিয়া, ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, রণবীর চক্রবর্তী।

৫. দিল্লি সুলতানি আমলে কোন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো গড়ে ওঠে?

ইক্তা ব্যবস্থা।

৬. সুলতানি আমলে ইক্তা প্রথা প্রবর্তন করেন কে?

সুলতান ইলতুৎমিস।

Leave a Comment