মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান

মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান, উপাদানের শ্রেনীবিভাগ, সাহিত্য উপাদান হিসেবে জীবন চরিত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, সরকারি নথি ও চিঠিপত্র, ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বিবরণ ও বাণিজ্য কুঠির নথিপত্র এবং মোগল যুগের মুদ্রা ও শিল্প নিদর্শন সম্পর্কে জানবো।

মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান

সাহিত্যিক উপাদানতুজুক-ই-বাবরী, আইন-ই-আকবরী, আকবর নামা, হুমায়ুন নামা
আঞ্চলিক সাহিত্য উপাদানপৃথ্বীরাজ রাসো, পদ্মাবৎ, গ্ৰন্থ সাহেব
আকবর নামাআবুল ফজল
হুমায়ুন নামাগুলবদন বেগম
মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান

সূচনা :- ভারত ইতিহাসের প্রাচীন যুগে লিখিত ঐতিহাসিক গ্রন্থের প্রচণ্ড অভাব পরিলক্ষিত হলেও মোগল যুগ সম্পর্কে এই কথা বলা যায় না। ইতিহাস চর্চার দিক থেকে মোগল যুগ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান

মোগল যুগের প্রচুর ঐতিহাসিক গ্রন্থাদি পাওয়া গেছে এবং এগুলি থেকে এই যুগের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বহু তথ্যাদি পাওয়া যায়।

উপাদানের শ্রেণী বিভাগ

এই যুগের ইতিহাসের উপাদানগুলিকে মোটামুটি চারভাগে বিভক্ত করা যায়—

  • (ক) সাহিত্য,
  • (খ) সরকারি নথিপত্র, ফরমান ও চিঠিপত্র,
  • (গ) ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বিবরণ ও বাণিজ্যকুঠির নথিপত্র এবং
  • (ঘ) মুদ্রা ও শিল্প-নিদর্শন।

(ক) সাহিত্য

সাহিত্য এই যুগের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিভিন্ন মোগল বাদশা ও রাজপরিবারের সদস্যদের রচিত স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী থেকেইতিহাসের অনেক তথ্যাদি পাওয়া যায়। যেমন –

(১) জীবন চরিত্র
  • (i) মোগল সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-বাবরী’ বা ‘বাবরনামা’ ইতিহাসের এক অমূল্য উপাদান। বাবর কন্যা ও হুমায়ুন -এর ভগিনী গুলবদন বেগম রচিত ‘হুমায়ুননামা’ থেকে বাবর ও হুমায়ুনের রাজত্বকাল এবং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা তথ্যাদি পাওয়া যায়।
  • (ii) মোগল সম্রাট আকবর -এর ঘনিষ্ঠ সহচর আবুল ফজল রচিত ‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই আকবরী’ এই যুগের ইতিহাসের অমূল্য উপাদান।
  • (iii) জাহাঙ্গীর -এর আত্মজীবনী তুজুক-ই জাহাঙ্গীরী’ থেকে সম্রাটের চরিত্র, সাহিত্যানুরাগ এবং তাঁর রাজত্বকালের বিভিন্ন ঘটনার খোলামেলা বিবরণ পাওয়া যায়।
  • (iv) শাহজাহানের রাজত্বকাল -এর উল্লেখযোগ্য উপাদান হল আবদুল হামিদ লাহোরি রচিত ‘পাদশাহনামা’। এগুলি থেকে মোগল সম্রাট শাহজাহান সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
  • (v) ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল মির্জা মহম্মদ কাজিম-এর ‘আলমগীর-নামা’ এবং মহম্মদ কাফি খান-এর ‘মুস্তাখাব-উল-লুবাব’।

(২) আঞ্চলিক ইতিহাস

  • (i) আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গুজরাট, রাজস্থান, পাঞ্জাব, বাংলা ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রাদেশিক গ্রন্থগুলিও এই যুগের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।
  • (ii) মোগল যুগে মারাঠাদের ইতিহাস রচনার অনেক মূল্যবান উপাদান আছে।এর মধ্যে শিবাজির সমসাময়িক কৃষ্ণজি অনন্ত সভাসদ -এর রচিত ‘শিব-ছত্রপতিচেন চরিত্র’ এবং দত্তজি রচিত ‘কলমী বখর’ থেকে শিবাজির জীবনের নানা কথা জানা যায়।
  • (iii) রাজপুত কবিদের গাথা, ‘পৃথ্বীরাজ রাসো’, ‘পদ্মাবৎ’, শিখদের ‘গ্রন্থসাহেব’ ও গুরুগোবিন্দ সিংহের রচনাবলী এবং বাংলার ইতিহাসের জন্য সলিমউল্লাহ রচিত ‘তারিখ-ই-বাঙলা’ ও গোলাম হোসেন সালিম রচিত ‘বিয়াজ-উস-সালাতিন’ অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • (iv) হিন্দি গ্রন্থগুলির মধ্যে বিকানীরের রাজপুত্র দলপত সিংহ রচিত দলপত বিলাস’ ও কেশব দাস-এর ‘জাহাঙ্গীর চন্দ্রিকা’ এই যুগের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে খুবই উল্লেখযোগ্য।
  • (v) বাংলা ভাষায় জয়ানন্দ রচিত ‘শ্রীচৈতন্যমঙ্গল’, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম-এর ‘চন্ডীমঙ্গল’ কাব্য, বৃন্দাবন দাস-এর ‘চৈতন্যভাগবত’ থেকে বাংলার সামাজিক, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের চিত্র পাওয়া যায়।

(খ) সরকারি নথি ও চিঠিপত্র

  • (১) মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরকারি দলিল-দস্তাবেজ, নথিপত্র, ফরমান ও চিঠিপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।
  • (২) মোগল আমলে এই সব গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও, কালের প্রকোপে তার অধিকাংশই বিনষ্ট হয়েছে।
  • (৩) তা সত্ত্বেও যেটুকু আজও টিকে আছে, সেগুলি থেকে মোগল যুগের নানা তথ্যাদি পাওয়া যায়। মোগল যুগের ইতিহাস রচনায় এগুলি মহামূল্যবান সম্পদ।

(গ) ইউরোপীয় ভ্রমণকারীদের বিবরণ ও বাণিজ্যকুঠির নথিপত্র

  • (১) মোগল আমলে পর্তুগিজ, স্পেনীয়, ফরাসি, ওলন্দাজ, ইতালিয়, ইংরেজ প্রভৃতি জাতির বহু পর্যটক ও বণিক ভারতে আসেন। তাঁদের মধ্যে র‍্যালফ ফিচ পার্চাস, টেরি, মানরিক, ট্যাভার্নিয়ে, বার্নিয়ার, হকিন্স, টমাস রো, বার্টন, কার্টরাইট, মানুচি অতি উল্লেখযোগ্য।
  • (২) তাঁদের রচনা থেকে সমকালীন জনজীবন, রাজ্যের শাসনব্যবস্থা প্রভৃতি সম্পর্কে বিবিধ তথ্যাদি পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে বিভিন্ন বিদেশি বণিকদের বাণিজ্যকুঠির নথিপত্রও গুরুত্বপূর্ণ।
  • (৩) এই সব পর্যটকদের বিবরণ বা বাণিজ্যকুঠির বিবরণ সর্বদা সঠিক নয়। দেশীয় ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁদের কোনও ধারণা ছিল না। এই কারণে বহুক্ষেত্রে তাঁরা শোনা কথা ও গুজবের ওপর ভিত্তি করে তাদের বিবরণ রচনা করেছেন। তা সত্ত্বেও মোগল যুগের ইতিহাস রচনায় এই উপাদানগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

(ঘ) মুদ্রা ও শিল্প নিদর্শন

মোগল যুগের মুদ্রাগুলি থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ধাতুশিল্প -এর অগ্রগতি ও অবনতির কথা জানা যায়। মোগল আমলের বহু শিল্পকীর্তি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি থেকে মানুষের সুকুমার বৃত্তি, শিল্প-নৈপুণ্য ও সাংস্কৃতিক জীবনের কথা জানা যায়।

উপসংহার :- মোগল যুগে ঐতিহাসিক গ্ৰন্থে অভাব নেই। সেই কারণে মোগল যুগে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান অপেক্ষা সাহিত্যিক উপাদান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

(FAQ) মোগল যুগের ইতিহাসের উপাদান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মোগল যুগের দুটি সাহিত্যিক উপাদানের নাম লেখ।

বাবর নামা, আকবর নামা, হুমায়ুন নামা।

২. আইন-ই-আকবরী কার রচনা?

আবুল ফজল।

৩. আকবর নামা গ্ৰন্থে কার রাজত্বকালের কথা জানা যায়?

মোগল সম্রাট আকবর।

৪. হুমায়ুন নামা কার রচনা?

গুলবদন বেগম।

Leave a Reply

Translate »