স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ

স্বদেশী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ হিসেবে সরকারের দমননীতি, সাংগঠনিক ত্রুটি, ভদ্রলোক শ্রেণীর আন্দোলন, কৃষকদের অনুপস্থিতি, মুসলিম সমাজের গৌণ ভূমিকা, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের গৌণ ভূমিকা, জমিদারদের অনুপস্থিতি ও গণভিত্তির অভাব সম্পর্কে জানবো।

স্বদেশী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ (Failure and Limitations of the Swadeshi Movement)

সূচনাকাল১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ
কারণবঙ্গভঙ্গ
নেতৃত্ববাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপৎ রায়
ফলাফলবঙ্গভঙ্গ রদ
স্বদেশী আন্দোলনের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা

ভূমিকা :- প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে শুরু হলেও স্বদেশী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। (১) বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ঠিকই এবং বাংলার নেতৃবৃন্দ এটি তাঁদের বিরাট সাফল্য বলে দাবি করেন, কিন্তু বাংলার সেই পুরোনো সীমানা আর ফিরেআসে নি।

বাংলা ও বাঙালির গুরুত্ব লোপ

বাংলার মানচিত্র নতুন ভাবে অঙ্কিত হয় এবং ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হওয়ায় বাংলা ও বাঙালি তাঁদের গুরুত্ব হারায়।

স্বদেশী ও বয়কটের আদর্শ ব্যর্থ

বাংলার স্বদেশী ও বয়কটের আদর্শও বিশেষ সাফল্যমণ্ডিত হয় নি। চিনির আমদানি যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। লবণ ও তুলাজাত পণ্যের আমদানি সামান্য হ্রাস পায়। এই হ্রাসটুকুও বাঙালির দেশাত্মবোধের কারণে নয়।আসলে ইংরেজ উৎপাদকের সাথে মারোয়াড়ি আমদানি কারকদের বাণিজ্যিক মতপার্থক্যের জন্য একসময় নতুন মালের বরাত দেওয়া হয় নি।

সুমিত সরকারের অভিমত

ডঃ সুমিত সরকার বলেন, “ব্যবসায়িক স্বার্থ জাতীয়তাবাদী মানসিকতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। ফলে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আগের মতোই আমদানি শুরু করেছিল।”

জাতীয় শিক্ষার সম্প্রসারণ ব্যহত

নানা কারণে জাতীয় শিক্ষাও বিশেষ সম্প্রসারিত হয় নি। এই কালপর্বে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সমিতিগুলিও ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ে ও উঠে যায়।

ব্যর্থতার কারণ

ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন যে, প্রবল উদ্দীপনার মধ্যে শুরু হলেও কাতর-ধ্বনির মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের অবসান ঘটে। এই ব্যর্থতার পশ্চাতে নানা কারণ ছিল। যেমন –

(ক) সরকারি দমননীতি

  • (১) বলা হয়ে থাকে যে, সরকারের প্রবল দমন-পীড়ন নীতির ফলে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল। সরকারের দমন-পীড়ন সম্পর্কে কোনও সংশয় নেই।
  • (২) স্বৈরাচারী সরকার সভা-সমিতি-শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়, ছাত্রদের ওপর নানাভাবে নিপীড়ন চালানো হয়, জেল জরিমানা, পুলিশী অত্যাচার ছিল সাধারণ ব্যাপার।
  • (৩) নেতৃবৃন্দকে দ্বীপান্তরে পাঠাতেও তাঁরা কসুর করেন নি। এর ফলে আন্দোলন যে কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই।
  • (৪) ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী কিন্তু পুলিশী অত্যাচারের কথা মানতে রাজি নন। সরকারি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে তিনি দেখান যে, আন্দোলন দমনের জন্য এই সময় পুলিশ খুবই কম সংখ্যক মামলা রুজু করে এবং তার মধ্যে অর্ধেক মামলা পুলিশ প্রমাণ করতে পারে নি। শাস্তিপ্রাপ্তদেরও খুব গুরুদণ্ড দেওয়া হয় নি।
  • (৫) বলা বাহুল্য, ডঃ ত্রিপাঠী-র এই মত গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ পুলিশের খাতায় সব অত্যাচারের কথা লেখা থাকে না।সমকালীন সংবাদপত্র এবং নেতৃবৃন্দের স্মৃতিচারণা ও আত্মজীবনীতে এই সব অত্যাচারের বিস্তৃত বিবরণ মিলবে।

(খ) সাংগঠনিক ত্রুটি

  • (১) ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী এবং ডঃ সুমিত সরকার এ ব্যাপারে কিছু আভ্যন্তরীণ দুর্বলতারকথা বলেছেন এবং এই আভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলিই যে আন্দোলনকে ধ্বংস করেছিল সে সম্পর্কে কোনও সংশয় নেই।
  • (২) আন্দোলন পরিচালনার জন্য কোনও কেন্দ্রীয় সংগঠন ছিল না। বয়কটের প্রয়োগ নিয়েও নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল।এছাড়া, কংগ্রেস সংগঠনও তখন ঐক্যবদ্ধ ছিল না।
  • (৩) স্বদেশী ও বয়কট অপেক্ষা নেতৃমণ্ডলী তখন নরমপন্থী-চরমপন্থী বিরোধ নিয়েই মত্ত ছিলেন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশন শাসক গোষ্ঠীর কাছে ছিল এক বিরাট জয়।

(গ) ভদ্রলোক শ্রেণীর আন্দোলন

  • (১) এই আন্দোলন মূলত মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মধ্যবিত্ত ইংরেজি-শিক্ষিত চাকুরিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও জমিদাররাই এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং ছাত্র ও যুবকরা ছিল স্বেচ্ছাসেবক।
  • (২) নিম্নবর্ণের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকদের সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক ছিল না। স্বদেশী আন্দোলন পরিচালনার জন্য যে সমিতিগুলি গঠিত হয় তাতেও প্রাধান্য ছিল ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর—শ্রমিক-কৃষককে সেখানেও সামিল করা হয় নি।
  • (৩) উদাহরণ-স্বরূপ বলা যায় যে, ‘স্বদেশ বান্ধব সমিতি’-র ৭৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে ছিলেন ৭ জন জমিদার, ১৯ জন উকিল এবং ১৫ জন শিক্ষক। অনেকের মতে এটি ছিল ‘এলিটিস্ট (Elitist) আন্দোলন।
  • (৪) মার্কসবাদী পণ্ডিত রজনীপাম দত্ত, রুশ গবেষক কুমারোভ এই আন্দোলনকে ‘শহরে পাতি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ বলে অভিহিত করেছেন।
  • (৫) ডঃ বিপান চন্দ্র বলেন যে, প্রবল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও “এই আন্দোলন নগরকেন্দ্রিক অভিজাত, মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছিল।”

(ঘ) কৃষকদের অনুপস্থিতি

  • (১) আন্দোলনকে জনমুখী করার জন্য এর সঙ্গে অর্থনৈতিক আন্দোলন যুক্ত করা উচিত ছিল। শ্রমিক-কৃষকদের দুরবস্থার প্রতিকার, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি বা কৃষকদের খাজনা বৃদ্ধি প্রতিরোধ, জমিদারি অত্যাচার প্রভৃতি বিষয়কে উপেক্ষা করায় শ্রমিক-কৃষকরা এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনও আত্মিক যোগ খুঁজে পায় নি।
  • (২) স্বদেশী নেতারা শ্রমিক আন্দোলনে কিছু পরিমাণে যোগ দিলেও কৃষকদের সম্পর্কে তাঁরা কোনও চিন্তাভাবনা করেন নি।
  • (৩) ডঃ সুমিত সরকার বলেন যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন ‘সুনির্দিষ্ট কৃষিভিত্তিক কর্মসূচির’ অভাবের জন্য দরিদ্র কৃষকদের এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে নি।
  • (৪) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ’ সংক্রান্ত এক প্রবন্ধে অরবিন্দ ঘোষ খাজনা বন্ধ করার আন্দোলনের সম্ভাবনা বাতিল করে সেন, কারণ এর ফলে দেশপ্রেমিক জমিদাররা ক্ষুব্ধ হবেন।
  • (৫) ডঃ বিপান চন্দ্র বলেন যে,এই আন্দোলন আশাপ্রদরূপে বাংলার চাষি-কৃষক সমাজকে স্পর্শ করতে পারে নি।”
  • (৬) ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন যে, “শ্রমিক-কৃষকদের বিপ্লবমুখী করে তোলায় চরমপন্থীদের অক্ষমতার মধ্যেই গোটা আন্দোলনের ব্যর্থতার মূল নিহিত আছে।”

(ঙ) মুসলিম সমাজ

  • (১) স্বদেশী আন্দোলনের সূচনার বেশ কিছু জাতীয়তাবাদী মুসলিম এই আন্দোল সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন, কিন্তু ঢাকার নবাব সলিমুল্লা ও কিছু মৌলবির সাম্প্রতি প্রচারকার্য হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে তীব্রতর করে তোলে।
  • (২) এই ব্যাপারে হিন্দু নেতৃবৃন্দের দায়িত্বও কিন্তু নেহাৎ কম নয়। হিন্দু জাগরণবাদ ও প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার জিগির (মাতৃ-মতবাদ, কৃষ্ণ-মতবাদ, শিবাজি উৎসব, গণপতি উৎসব, কালীঘাটের মন্দিরে শপথ গ্রহণ, গঙ্গাস্নান) মুসলিম-মনে সন্দেহ ও ত্রাসের সৃষ্টি করে।
  • (৩) নেতৃবৃন্দ ভুলে গিয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষ শুধু হিন্দুর দেশ নয় এবং হিন্দু সভ্যতার মতোই মধ্যযুগের ইসলামিয় সভ্যতার জন্যও তাদের গর্ববোধ করা উচিত। এই সব কারণে মুসলিম নেতৃমণ্ডলীও ক্রমশ এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে আসতে থাকেন।
  • (৪) ডঃ সুমিত সরকার বলেন যে, নেতৃমণ্ডলী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হন নি। অরবিন্দ ঘোষ বা অন্যান্য নেতৃবৃন্দ কখনোই সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, কিন্তু ভেবেছিলেন যে, মুসলিম সমর্থন ছাড়াই আন্দোলন সফল হবে।
  • (৫) এর ফলে আন্দোলনের পরিধি সীমিত হয়ে যায় এবং তা উচ্চবিত্ত হিন্দু আন্দোলনের চরিত্র ধারণ করে। পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা স্বদেশী আন্দোলনের জনপ্রিয়তাকে খর্ব করে।

(চ) নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সম্প্রদায়

ডঃ অমলেন্দু দে তাঁর ‘বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’ গ্রন্থে এবং ডঃ শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর The Namasudra Movement in Bengal” গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ তফসিলি হিন্দু, বিশেষত নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সম্প্রদায় স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি বিরূপ ছিলেন।কারণ, তাঁরা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের শোষণে জর্জরিত ছিলেন এবং এই উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।”

(ছ) জমিদার শ্রেণি

  • (১) ডঃ সুমিত সরকার বলেন যে, এই আন্দোলনে জমিলার শ্রেণীর ভূমিকা নিয়ে অহেতুক উচ্চ ধারণা প্রচলিত আছে। আন্দোলনের সূচনা-পর্বে বেশ কিছু জমিদার এর সঙ্গে জমিদার যুক্ত থাকলেও তাঁরা ক্রমশ আন্দোলন-বিরোধী হয়ে ওঠেন।
  • (২) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ই আগস্ট ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন-এর ১০৭ জন জমিদার এক প্রতিবেদনে “অরাজকতার অবসানের জন্য সরকারি ব্যবস্থার প্রতি” পূর্ণ সমর্থন জানান। তাই বৃহৎ জমিদার-গোষ্ঠী নয়, মাঝারি ধরনের কিছু ভূস্বামী এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।

(জ) গণভিত্তির অভাব

  • (১) এই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল উকিল, মোক্তার, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাধারী ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা জমিদার না হলেও মধ্যস্বত্বভোগী ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করে সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনে রাজি ছিলেন না।
  • (২) ডঃ অমলেন্দু দে দেখিয়েছেন যে, চরমপন্থী নেতাদের দু-চারজন হিন্দু-মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম বাংলায় জমিদার ও ‘বাবু’ শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সচেষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের সেই উদ্যোগ সফল হয় নি।

উপসংহার :- একদিকে হিন্দু কৃষক ও নিম্নবর্ণ শ্রেণী এবং অপরদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই আন্দোলনের কোনও আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি। ফলে গণভিত্তিক আন্দোলনের একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

(FAQ) স্বদেশী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন শুরু হয়?

লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে।

২. বয়কট কথার অর্থ কী?

বিদেশি দ্রব্য বর্জন।

৩. স্বদেশী আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য ফল কি ছিল?

বঙ্গভঙ্গ রদ।

Leave a Reply

Translate »