সুলতানি যুগের স্থাপত্য ও চিত্রকলা

সুলতানি যুগের স্থাপত্য প্রসঙ্গে হিন্দু ও ইসলামীয় শিল্পের সমন্বয়, ইন্দো ইসলামীয় স্থাপত্য, বিকাশের কারণ, আইবকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য, ইলতুৎমিসের আমলে নির্মিত স্থাপত্য, বলবনের আমলে নির্মিত স্থাপত্য, আলাউদ্দিনের আমলে নির্মিত স্থাপত্য, মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য, ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য সম্পর্কে জানবো।

সুলতানি যুগের স্থাপত্য ও চিত্রকলা

ঐতিহাসিক ঘটনাসুলতানি যুগের স্থাপত্য ও চিত্রকলা
আড়াই দিন কা ঝোপড়াকুতুবউদ্দিন আইবক
আলাই দরওয়াজাআলাউদ্দিন খলজি
জাহানপানামহম্মদ বিন তুঘলক
ফিরোজাবাদফিরোজ শাহ তুঘলক
সুলতানি যুগের স্থাপত্য ও চিত্রকলা

ভূমিকা :- ভারতে ইসলামের বিজয়ের সময় ইসলাম তার নিজস্ব সভ্যতা ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আসে। যদিও হিন্দু সভ্যতা একদা বহিরাগত শক, হূণ ব্যাকট্রিয়, কুষাণদের আত্মস্থ করেছিল তথাপি ইসলামের নিজস্ব জীবনী শক্তির জন্য তাকে উদরস্থ করা হিন্দু সভ্যতার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

হিন্দু ও ইসলামীয় শিল্পের সমন্বয়

দীর্ঘকাল পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সভ্যতার অবস্থানের ফলে উভয়ের মধ্যে শিল্পের ক্ষেত্রে আদান-প্রদান ঘটে। এই আদান-প্রদান স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দেখা যায়। এইভাবে ইন্দো-ইসলামীয় শিল্পকলার উদ্ভব হয়।

ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্য

ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যে কোন সভ্যতার প্রভাব বেশী তা বলা সম্ভব নয়। উভয় সভ্যতার মিলনে এই শিল্পকলার বিকাশ হয় এই কথাই একমাত্র বলা চলে।

ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যের বিকাশের কারণ

ইসলামীয় স্থাপত্যের সঙ্গে ভারতীয় রীতির সংমিশ্রণের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন –

  • (১) ইরাণের সঙ্গে ভারতের শিল্প ভাবনার বিনিময় বহু আগে ঘটেছিল। ইরাণীয় শিল্পীরা ভারতীয় রীতির সঙ্গে ইরাণীয় ঘরাণার মিশ্রণ ঘটায়। ভারতে তুর্কী বিজয়ীরা এলে তারা এই ইন্দো-ইরানীয় শিল্প ঘরাণাকে সঙ্গে আনে।
  • (২) তুর্কী শাসনকর্তারা ভারতীয় স্থপতিদের বিভিন্ন স্থাপত্য তৈরির কাজে নিয়োগ করায় ইসলামীয় স্থাপত্যের সঙ্গে ভারতীয় স্থাপত্যের মিশ্রণ ঘটে। ভারতীয় স্থপতিরা তাদের শিল্পভাবনাকে ইসলামীয় রীতির সঙ্গে অজ্ঞাতসারে মিশিয়ে ফেলে।
  • (৩) মুসলিম শাসকরা অনেক্ষ ক্ষেত্রে হিন্দু বা বৌদ্ধ মন্দির বা স্তূপগুলির ভগ্ন অংশকে তাদের প্রাসাদ তৈরির জন্য ব্যবহার করেন। ফলে হিন্দু-বৌদ্ধ স্থাপত্যের নিদর্শনগুলি ইসলামীয় স্থাপত্যের সঙ্গে মিশ্রিত হয়।
  • (৪) অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু-বৌদ্ধ মন্দিরগুলির উর্ধ্বাংশ ভেঙে তার ওপর ইসলামীয় রীতিতে গম্বুজ তৈরি করা হয়।
  • (৫) হিন্দু ও ইসলামীয় স্থাপত্য উভয়েই ছিল অলঙ্কারবহুল ও ভাস্কর্যবহুল, এজন্য উভয়ের মধ্যে মিশ্রণ ঘটে।

দিল্লী সুলতানির স্থাপত্য

এই সময় স্থাপত্যগুলি প্রধানত দিল্লী সুলতানদের দ্বারা তৈরি হয়। এগুলির বিশেষ ধরণ বা রীতি লক্ষ্য করা যায়, যা প্রাদেশিক স্থাপত্যে নেই।

আইবকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

কুতবউদ্দিন আইবেকের তৈরি আড়াই দিন-কা ঝোপড়া নামে আজমীরে একটি মসজিদ তৈরি হয় এবং দিল্লীতে কোয়াৎ-উল-ইসলাম নামে অপর এক মসজিদ তৈরি হয়। কোয়াৎ-উল-ইসলাম ছিল আদিতে একটি বিরাট মন্দির। সুলতান কুতবউদ্দিন এর সঙ্গে তিনটি খিলান জুড়ে দেন।

ইলতুৎমিসের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

  • (১) ইলতুৎমিসের আমলে কুতবমিনারের নির্মাণ সমাপ্ত হয়, কুতবউদ্দিনের আমলে এর সূত্রপাত হয়। এটি ২২৫ ফুট উঁচু। ফিরোজ শাহ তুঘলক এর পুননির্মাণ করে ২৩৪ ফুট উঁচু করেন। এটি পুরোপুরি ইসলামীয় স্থাপত্যের রীতিতে গঠিত।
  • (২) ফার্গুসনের মতে, পৃথিবীর যে কোনো স্তম্ভ অপেক্ষা কুতুবমিনার শ্রেষ্ঠ। ইলতুৎমিস এই মিনারটি সুফীসন্ত কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর নামে উৎসর্গ করেন। এছাড়া ইলতুৎমিস বদাউনে জামি মসজিদ তৈরি করেন। তিনি হাউজ-ই-শামসি, শামসি-ই-দর্গা প্রভৃতি স্থাপত্য নির্মাণ করেন।

বলবনের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লীতে তাঁর লাল প্রাসাদ তৈরি করেন। বলবনের স্মৃতিসৌধও ছিল ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন।

আলাউদ্দিনের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

  • (১) আলাউদ্দিন খলজি জামাইত খাঁ মসজিদ শেখ নিজামুদ্দিন আওলিয়ার সমাধিস্থলে তৈরি করেন। কুতুবমিনারের নিকটে তিনি বিখ্যাত আলাই দরওয়াজা তৈরি করেন। আলাউদ্দিন দিল্লীর নিকট সিরি নামে এক নগর নির্মাণ করেন। এই নগরের কোনো চিহ্ন এখন নেই।
  • (২) পুরাতন দিল্লীর সিরি নগরের কাছেই হাউজ-খাসে তিনি এক বিরাট জলাশয় খোদাই করেন। আলাই দরওয়াজার খিলানগুলি অতি মনোরম এবং তার ওপরে একটি সুউচ্চ গম্বুজ নির্মাণ করা হয়।

গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

তুঘলক যুগে গিয়াসউদ্দিন তুঘলক তুঘলকাবাদ নামে এক প্রাসাদ দুর্গ কুতুবমিনারের পূর্বদিকে নির্মাণ করেন। যমুনা নদীর স্রোতকে নিয়ন্ত্রিত করে এই প্রাসাদের চারদিকে হ্রদ তৈরি করা হয়। গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের সমাধি লাল পাথরে উচ্চ বেদীর উপর নির্মাণ করা হয়, যাতে দিকচক্রবাল পর্যন্ত সমাধিটির পটভূমি পাওয়া যায়। এই সমাধি সৌধের গম্বুজ মর্মর পাথরে তৈরি করা হয়।

মহম্মদ তুঘলকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

মহম্মদ বিন তুঘলক পুরাতন দিল্লীর কাছে জাহানপানা নামে এক প্রাসাদ দুর্গ তৈরি করেন। তাঁর দক্ষিণের রাজধানী দৌলতাবাদেও তিনি এক অসাধারণ দুর্গ ও বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করেন। দিল্লীর বিজয় মণ্ডল প্রাসাদটি এখনও তাঁর স্থাপত্য প্রীতির সাক্ষ্য দেয়।

ফিরোজ তুঘলকের আমলে নির্মিত স্থাপত্য

  • (১) ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমলে মুসলিম খিলান ও হিন্দু বীমযুক্ত ছাদের সমন্বয় তাঁর স্থাপত্যে দেখা যায়। পুরাতন দিল্লীতে তিনি ফিরোজাবাদ প্রাসাদ দূর্গ তৈরি করেন। এর ভেতরে তাঁর প্রাসাদ ফিরোজ শা কোটলার ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখা যায়।
  • (২) সুলতান ফিরোজ তার প্রাসাদকে সুসজ্জিত করার জন্য পাঞ্জাবের টোপরা থেকে একটি অশোকের স্তম্ভ তুলে আনেন। তিনি তাঁর প্রাসাদের ছাদে এই স্তম্ভটি আড়াই ফুট গর্ত করে বসিয়ে দেন। ফিরোজের সমাধি হৌজ খাসে তৈরি হয়।
  • (৩) ফিরোজের অভিজাতদের মধ্যে খান-ই-জাহান জৌনা শাহ কালি মসজিদ ও খিড়কি মসজিদ নির্মাণ করেন। তুঘলক স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ঢালু দেয়াল। এই যুগের প্রাসাদগুলিতে মুসলিম খিলান ও হিন্দু বীম, চৌকাঠের সমন্বয় লক্ষণীয়। ফিরোজ শা কোটলা প্রাসাদে এই সমন্বয় দেখা যায়।

লোদী স্থাপত্য রীতি

লোদী ও সৈয়দ বংশীয় সুলতানদের প্রাসাদে বীম, ছাদ ও খিলানের সমন্বয় আরও বেশী দেখা যায়। সিকান্দর লোদী মঠ-কি-মসজিদ নির্মাণ করেন। তাছাড়া লোদী স্থাপত্যে রাজস্থানী ও গুজরাটি স্থাপত্যগুলিও গ্রহণ করা হয়। লোদীদের তৈরি সমাধিগুলি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটকোনা এবং বেদীর ওপর স্থাপিত। হিন্দু স্থাপত্যরীতি লোদীরা এইভাবে ইসলামীয় স্থাপত্যের সঙ্গে মিশান।

প্রাদেশিক স্থাপত্য

প্রাদেশিক শাসনকর্তারাও সুলতানি যুগে বহু স্থাপত্যকীর্তি রচনা করেন। প্রাদেশিক স্থাপত্যগুলিতে স্থানীয় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মুলতানে রুকুনুদ্দিনের স্মৃতিস্তস্ত বিখ্যাত।

বাংলার স্থাপত্য কীর্তি

বাংলার সুলতানরা বিভিন্ন স্থাপত্যকীর্তি গৌড়-পাণ্ডুয়ায় স্থাপন করেন। সিকান্দর শাহের নির্মিত পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ ভারতের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ। পাণ্ডুয়ার একলাখি মসজিদও বিশেষ বিখ্যাত। গৌড়ের নওন মসজিদ, বড় সোনা মসজিদ, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ, গৌড়ের কদম রসুল ও দাখিল দরওয়াজা বিশেষ বিখ্যাত।

বাংলার স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য

বাংলার স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য ছিল থামের ওপর চালার আকৃতির খিলান। বাংলার খড়ের চালার আকারে খিলানগুলি তৈরি হয়।

জৌনপুর স্থাপত্য

জৌনপুর স্থাপত্যের নিদর্শন জামি মসজিদ, লাল দরওয়াজার ইব্রাহিম শাহ শার্কি তৈরি করেন। মালবে হিন্দোলা মহল, লাল মসজিদও ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শনরূপে গণিত হয়। তেলেঙ্গানায় মহম্মদ আদিল শাহের সমাধিও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য।

হিন্দু স্থাপত্য

  • (১) সুলতানি যুগে হিন্দু স্থাপত্যরও বিকাশ ঘটে। বিজয়নগর রাজ্যে বহু স্থাপত্যকীর্তি নির্মিত হয়। রাজস্থানের মেবারের রাণা কুম্ভের স্তম্ভ ও দুর্গ এবং বিভিন্ন রাজপুত রাজাদের তৈরি প্রাসাদের কথা উল্লেখ্য। রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের তৈরি বিঠঠলনাথের মন্দির বিশেষ বিখ্যাত।
  • (২) দক্ষিণ ভারতের বিজয়নগরের রাজাদের তৈরি গোপুরম, মণ্ডপ প্রভৃতি হিন্দু স্থাপত্য শৈলীর পরিচয় দেয়। কাঞ্চির একাম্বরনাথ ও বরদারাজ স্বামী মন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে অতিশয় সমৃদ্ধ।

চিত্রকলা

  • (১) একদা মনে করা হত যে, সুলতানি আমলে চিত্রকলার কোনো সমাদর ছিল না। এই কারণে এই যুগে চিত্রকলার বিকাশ হয়নি। তৎকালে ইসলামে চিত্র অঙ্কন নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে হারম্যান গোয়েৎস সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন যে, সুলতানি আমলে চিত্রকলার অনুশীলন চলত।
  • (২) কোনো কোনো চিত্র ও চিত্রের পাণ্ডুলিপিগুলিকে তিনি সুলতানি আমলের আঁকা বলে সনাক্ত করেন। সুতরাং সুলতানি আমলে চিত্রাঙ্কন চলত। সমকালীন পারসিক সাহিত্যে চিত্রকলার উল্লেখ দেখা যায়।

উপসংহার :- সমালোচক পার্সি ব্রাউনের মতে, ভেলোরের ‘কল্যাণ মণ্ডপ’ ছিল “এই ধরনের স্থাপত্যের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দর ও শিল্প সম্পদে সমৃদ্ধ”।

(FAQ) সুলতানি যুগের স্থাপত্য ও চিত্রকলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কুতুব মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু করেন কে?

কুতুবউদ্দিন আইবক।

২. কুতুব মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ করেন কে?

ইলতুৎমিস।

৩. আড়াই দিন কা ঝোপড়া নির্মাণ করেন কে?

কুতুবউদ্দিন আইবক।

৪. আলাই দরওয়াজা নির্মাণ করেন কে?

আলাউদ্দিন খলজি।

৫. সিরি নগর নির্মাণ করেন কে?

আলাউদ্দিন খলজি।

৬. জাহানপানা নগর নির্মাণ করেন কে?

মহম্মদ বিন তুঘলক।

৭. ফিরোজাবাদ প্রাসাদ তৈরি করান কে?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

Leave a Comment