ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও পতন

ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও পতন প্রসঙ্গে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের কারণ হিসেবে অনুগত্য পৃষ্ঠপোষক সম্পর্ক, কমিটেটাস প্রথা, বর্বর আক্রমণ, মুসলিম আক্রমণ, সামন্ততন্ত্রের পতনের কারণ হিসেবে গতিহীন উৎপাদন ব্যবস্থা, জনসংখ্যা হ্রাস, কৃষক বিদ্রোহ, ভূমিদাস বিদ্রোহ, বাণিজ্যের বিকাশ ও বাণিজ্যিক পণ্যের চাহিদা সম্পর্কে জানবো।

ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও পতন

ঐতিহাসিক ঘটনাইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও পতন
অনুগত-পৃষ্ঠপোষক সম্পর্করোমান সাম্রাজ্য
কমিটেটাস প্রথাজার্মানি
শার্লামেনের মৃত্যু৮১৪ খ্রি
উৎপাদন ব্যবস্থাগতিহীন
জনসংখ্যা হ্রাসচতুর্দশ-পঞ্চদশ শতক
ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও পতন

ভূমিকা :- প্রাচীন ও মধ্য যুগের ইউরোপ-সহ ভারতের অর্থনীতিতে কখনো কখনো বিশেষ ধরনের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল যেখানে কেন্দ্রীয় শক্তির অধীনে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ ঘটেছিল। এই কাঠামো সামন্ততন্ত্র নামে পরিচিত।

ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের কারণ

খ্রিস্টীয় নবম শতক থেকে পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ঘটে এবং পরবর্তীকালে তা ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। নর্মান্ডির ডিউক উইলিয়াম ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে সামন্তপ্রথার প্রবর্তন করেন। ফ্রান্সে দশম ও একাদশ শতকের মধ্যে সামন্তপ্রথার উত্থান ঘটে। ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের কারণগুলি ছিল –

(ক) অনুগত-পৃষ্ঠপোষক সম্পর্ক

  • (১) ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের অবলুপ্তি এবং নবম শতকে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভবের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপে কিছু প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব সামন্ততন্ত্রের উত্থানে সহায়তা করেছিল। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে বহু সাধারণ মানুষ কোনো ধনী অভিজাত ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য জানাত এবং অভিজাত ব্যক্তি সেইসব সাধারণ মানুষদের রক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন।
  • (২) অভিজাত ব্যক্তির কাছ থেকে নিজেদের জীবনের সুরক্ষা লাভের বিনিময়ে সেইসব সাধারণ মানুষ অভিজাত ব্যক্তির প্রতি সীমাহীন আনুগত্য জানিয়ে তাকে সেবাদান করত। এই সম্পর্ক ‘অনুগত-পৃষ্ঠপোষক সম্পর্ক’ নামে পরিচিত। এই সম্পর্ক ক্রমে চতুর্দিকে বিস্তারলাভ করে সামন্ততন্ত্রের বিকাশে সহায়তা করেছিল বলে মনে করা হয়।

(খ) কমিটেটাস প্রথা

  • (১) জার্মানরা রোমান ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে সেখানকার ধ্রুপদি যুগের অবসান ঘটিয়েছিল এবং সামন্ততন্ত্রের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। প্রাচীন জার্মানিতে ‘কমিটেটাস’ (Comitatus) নামে এক ধরনের প্রথা প্রচলিত ছিল। এই প্রথা অনুসারে, স্বাধীন যোদ্ধারা স্বেচ্ছায় কোনো শক্তিশালী সামরিক নেতা বা সেনাপতির প্রতি আনুগত্য জানিয়ে তাঁর স্বার্থ পূরণের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দান করত।
  • (২) এই আনুগত্যের বিনিময়ে সেই শক্তিশালী সামরিক নেতা বা সেনাপতি তাঁর প্রতি অনুগত যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দান করতেন। নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকারী এরূপ সামরিক সেনাপতি ও তাঁর অনুগত যোদ্ধাদের সম্পর্ক সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠতে সহায়তা করেছিল।

(গ) বর্বর আক্রমণ

  • (১) ক্যারোলিঞ্জীয় সাম্রাজ্যের রাজপরিবারে অন্তর্বিরোধের ফলে খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে এই সাম্রাজ্য ভেঙে ফ্রান্স, জার্মানি, বারগাণ্ডি, আর্লেস, ইতালি, ইংল্যান্ড প্রভৃতি রাজ্যের সৃষ্টি হয়। এভাবে কেন্দ্রীয় শাসন ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। এরূপ অবস্থায় ম্যাগিয়ার, সারাসেন, ভাইকিং প্রভৃতি বিভিন্ন বর্বর জাতি ক্ষয়িষ্ণু পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যে অভিযান চালালে ইউরোপে চরম নৈরাজ্য ও অশান্তি শুরু হয়।
  • (২) এভাবে ইউরোপের বিভিন্ন সাম্রাজ্য ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা রক্ষার বিশেষ প্রয়োজন দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ উচ্চ স্তরের কোনো শক্তিশালী ব্যক্তির ওপর নিজেদের দায়িত্ব অর্পণ করে। মন্তেস্কুও সামন্ততন্ত্রের উত্থানের কারণ হিসেবে ইউরোপে বর্বর আক্রমণের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন।

(ঘ) মুসলিম আক্রমণ

  • (১) ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট শার্লামেনের মৃত্যুর পরবর্তীকালে রোমের কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম ও অন্যান্য বৈদেশিক জাতিগুলি ইউরোপে আক্রমণ চালিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে ত্রস্ত করে তোলে। ফলে আতঙ্কিত মানুষ নিজেদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার প্রয়োজনে কোনো ঊর্ধ্বতন প্রভাবশালী স্থানীয় ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
  • (২) এভাবে স্থানীয় ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রভুর উত্থান ঘটে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থানীয় প্রভুরা আবার তাদের ঊর্ধ্বতন প্রভুর প্রতি আনুগত্য জানায়। ফলে নীচে থেকে ক্রমে ওপরের দিকে এক ধরনের সামাজিক ও আর্থিক স্তরবিন্যাস গড়ে ওঠে।

সামন্ততন্ত্রের পতনের কারণ

খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতক নাগাদ পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পশ্চিম ইউরোপের সামন্ততন্ত্র ক্রমে পতনের দিকে এগিয়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের পতনের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন –

(ক) গতিহীন উৎপাদন ব্যবস্থা

  • (১) সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল রক্ষণশীল ও গতিহীন। সামন্ততান্ত্রিক রক্ষণশীল উৎপাদন ব্যবস্থায় জমিতে কৃষকের কায়িক পরিশ্রম বেড়েছিল, কিন্তু কৃষি উৎপাদন তেমনভাবে বাড়ে নি। দশম শতক থেকে ইউরোপে জনসংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে।
  • (২) কিন্তু এই বর্ধিত জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ম্যানরগুলিতে খাদ্য উৎপাদন বেড়ে উঠতে পারেনি বলে অধ্যাপক মরিস ডব মনে করেন।
  • (৩) ফলে বাড়তি জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর চাহিদা মেটাতে প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল। উৎপাদন ব্যবস্থায় এরূপ গতিহীনতা ও রক্ষণশীলতা সামন্ততন্ত্রে সংকট সৃষ্টি করেছিল।

(খ) জনসংখ্যা হ্রাস

  • (১) ইতিহাসবিদ লাদুরি ও পোস্তান বলেছেন যে, খ্রিস্টীয় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে ইউরোপে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, প্লেগ প্রভৃতির ফলে জনসংখ্যা ভীষণভাবে কমে যায়। ফলে মানুষের সংখ্যার অনুপাতে জমির পরিমাণ বেড়ে যায়৷ কিন্তু সেই তুলনায় কৃষকের অভাবের ফলে বহু জমি অনাবাদি পড়ে থাকে।
  • (২) এর ফলে কৃষি উৎপাদন বিশেষভাবে ব্যাহত হয় ও উৎপাদন হ্রাস পায়। উৎপাদন হ্রাস পেলে সামন্তপ্রভুর আয় কমে যায়। কৃষি ছাড়া সামন্তপ্রভুর আয়ের অন্য কোনো উৎস না থাকায় প্রভুর আর্থিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে যা সামন্ততন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

(গ) কৃষক বিদ্রোহ

  • (১) সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার চালিকা শক্তি ছিল কৃষকের শ্রম। কিন্তু সামন্ততন্ত্রে এই কৃষকরা ছিল শোষিত ও নির্যাতিত। সামন্তপ্রভু, চার্চ প্রভৃতির আরোপিত বিভিন্ন ধরনের কর প্রদান করে কৃষক নিঃস্ব হয়ে যেত। কৃষকের উৎপাদনের তিন-চতুর্থাংশের বেশি কর প্রদানেই চলে যেত।
  • (২) এ ছাড়াও প্রভুর জমিতে বিনা পারিশ্রমিকে বেগার খাটার ফলে কৃষকের দুর্দশা চরমে উঠত। সীমাহীন শোষণে জর্জরিত কৃষক শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে সামন্তপ্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে পা বাড়াত। এই বিদ্রোহে কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত হত দিনমজুর, কারিগর প্রভৃতি শোষিত শ্রেণি।

(ঘ) ভূমিদাস বিদ্রোহ

সামন্ততন্ত্রে সর্বাপেক্ষা শোষিত শ্রেণি ছিল নিঃস্ব ভূমিদাসরা। এই যুগের ভূমিদাসরা ক্রীতদাসের পর্যায়ভুক্ত না হলেও তাদের স্বাধীনতা প্রায় ছিল না বললেই চলে। তীব্র শোষণ, অত্যাচার ও শারীরিক নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে ভূমিদাসরা মাঝেমধ্যেই তাদের প্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত। বারংবার ভূমিদাস বিদ্রোহ সামন্ততন্ত্রের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করে দেয়।

(ঙ) বাণিজ্যের বিকাশ

মধ্যযুগের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইউরোপে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরজীবনের প্রসার ঘটতে থাকে। এর ফলে বাণিজ্যের অগ্রগতি সম্ভব হয়। ইতিহাসবিদ হেনরি পিরেন উল্লেখ করেছেন যে, এর ফলে সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ ম্যানরগুলির শোষিত ও নির্যাতিত বহু কৃষক ও ভূমিদাস গ্রাম ছেড়ে শ্রমিকের কাজ করতে শহরে চলে আসতে থাকে। এভাবে ম্যানরের শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে এবং সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় শুরু হয়।

(চ) বাণিজ্যিক পণ্যের চাহিদা

  • (১) অর্থনীতিবিদ পল সুইজি মনে করেন যে, দশম শতক থেকে ইউরোপে বাণিজ্য ও রপ্তানি পণ্য উৎপাদন বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাণিজ্যিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পণ্য উৎপাদনের চাহিদার এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ম্যানরগুলিতে এসব পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি।
  • (২) কারণ, ম্যানরগুলিতে মূলত সেখানকার মানুষের ভোগ্যপণ্যই উৎপাদিত হত। ফলে বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে ম্যানরগুলির প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতির সামঞ্জস্য ঘটানো সম্ভব হয় নি। এর ফলে ম্যানরগুলিতে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ক্রমে ভেঙে পড়তে থাকে।

উপসংহার :- উক্ত বিভিন্ন কারণে খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় শুরু হয়। কিন্তু এই সময় আশ্চর্যজনকভাবে পূর্ব ইউরোপে আবার নতুন করে সামন্ততন্ত্রের প্রসার ঘটতে শুরু করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রাশিয়ায় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এর পরও দীর্ঘদিন অটুট থাকে।

(FAQ) ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব ও পতন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোথায় নতুন করে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসার ঘটতে থাকে?

পূর্ব ইউরোপে।

২. সামন্ততন্ত্রের পতনের অন্যতম কারণ কি ছিল?

কৃষক ও ভূমিদাস বিদ্রোহ।

৩. কোন সময় ইউরোপে জনসংখ্যা ভীষন ভাবে কমে যায়?

চতুর্দশ -পঞ্চদশ শতকে।

৪. কমিটেটাস প্রথা প্রচলিত ছিল কোথায়?

জার্মানিতে।

৫. রোমান সম্রাট শার্লামেনের মৃত্যু কখন হয়?

৮১৪ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment