গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে উপাদান, রাজার ক্ষমতা, রাজার উপাধি, রাজার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কেন্দ্রীয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় কর্মচারী, প্রাদেশিক শাসন, গ্ৰামীন শাসন, বিচার ব্যবস্থা , রাজস্ব নীতি সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

বিষয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
শ্রেষ্ঠ সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

ভূমিকা :- ইতিহাসের ধারা প্রবহমান হলেও, কতকগুলি কার্যকারণের জন্য তাতে পরিবর্তনের স্রোত দেখা যায়। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতের রাজনীতিতে যে বিচ্ছিন্নতা, আঞ্চলিকতার প্রকাশ ও বৈদেশিক শক্তিগুলির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল তাতে ছেদ পড়ে এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটে।

উপাদান

  • (১) গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে গুপ্ত শিলালিপিগুলি, বিশেষত দামোদরপুর লিপি, বসরা সীল লিপি, বিভিন্ন ভূমিপট্টলী, ফা-হিয়েনের বিবরণ প্রভৃতি থেকে বহু তথ্য পাওয়া যায়। গুপ্তযুগে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে কামন্দকের নীতিসার, স্মৃতিশাস্ত্রগুলি যথা, নারদ, যাজ্ঞ্যবল্ক স্মৃতি প্রভৃতি এবং মনুস্মৃতি বিশেষভাবে সাহায্য করে।
  • (২) কিন্তু রাষ্ট্রনীতির এই গ্রন্থগুলিতে তাত্ত্বিক আলোচনা বিশদভাবে করা হলেও গুপ্ত শাসনের বাস্তব বিবরণ তেমন আলোচনা করা হয়নি। এজন্য এই গ্রন্থগুলি গুপ্ত শাসনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।

রাজার ক্ষমতা

  • (১) গুপ্ত শাসন ব্যবস্থায় আপাত দৃষ্টিতে রাজা ছিলেন সকল ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল। সেনাদল, কর্মচারীবৃন্দ তাঁরই নির্দেশে চলত। তিনি তাদের নিয়োগ করতেন এবং তাদের আনুগত্য ভোগ করতেন। রাজ্য শাসনের কাজে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজাকে নিতে হত।
  • (২) প্রাদেশিক কর্মচারীরাও তার দ্বারা নিযুক্ত হত এবং তাকে আনুগত্য দিত। তিনি ছিলেন রাজ্যের সর্বপ্রধান বিচারক। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপীল শুনতেন। তিনি বংশানুক্রমিক অধিকারে শাসন করতেন। রাজ্যে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার মত কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা ছিল না।

রাজার উপাধি

  • (১) গুপ্ত সম্রাটরা তাদের এই উচ্চ ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আড়ম্বরপূর্ণ উপাধি নেন। যে ক্ষেত্রে মৌর্য সম্রাটরা কেবলমাত্র দেবতাদের প্রিয় এই উপাধি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, সে ক্ষেত্রে গুপ্তরা নিজেদের ঐশ্বরিক গুণযুক্ত ঈশ্বরের অংশ বলে দাবী করতেন।
  • (২) তারা নিজেদের “পরমদৈবত”, “লোকধাম-দেব” ইন্দ্র, বরুণ, কুবেরের সমান বলে দাবী করতেন। রাজপদ বংশানুক্রমিক হলেও কখনও কখনও সম্রাট তার জ্যষ্ঠ পুত্রের স্থলে অন্য পুত্রকে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করতেন।

রাজার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

  • (১) গুপ্ত সম্রাটরা তাত্ত্বিক দিক থেকে অপরিসীম ক্ষমতা দাবী করলেও, হাতে-কলমে তাঁদের ক্ষমতা বেশী ছিল না। মৌর্য সম্রাটদের তুলনায় গুপ্ত সম্রাটদের ক্ষমতা ছিল বাস্তবে সীমিত। রাজা নিজেকে দেবতার সমকক্ষ বলে দাবী করলেও বাস্তবে তাকে বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হত।
  • (২) সামন্ত শক্তি রাজ ক্ষমতাকে কোণঠাসা করেছিল। রাজাকে দেশ শাসন ও যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য সামসন্তদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হত। স্মৃতি শাস্ত্রগুলিতে আর মৌর্য যুগের মত রাজাকে দেবতার সৃষ্টি মনে করা হত না। দেবতার মত রাজা অভ্রান্ত একথাও ভাবা হত না। তবে স্মৃতি শাস্ত্র রাজাকে সম্মান জানাতে বলত।
  • (৩) মৌর্য যুগে শাসন ব্যবস্থা ছিল কেন্দ্রীভূত। একটি গ্রামে বা জেলায় কি ঘটছে, অশোক তাঁর গুপ্তচরদের দ্বারা তা জেনে নিতেন। কিন্তু গুপ্ত যুগে শাসন ব্যবস্থা ছিল বিকেন্দ্রীভূত। প্রদেশ ও বিষয় বা জেলা স্তরে প্রায় স্বায়ত্ব শাসন চলত। কেন্দ্রের মূলনীতির বিরোধিতা না করলে, প্রদেশের ও জেলার শাসনকর্তা বহু ক্ষমতা ভোগ করতে পারতেন।
  • (৪) গুপ্ত যুগে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বৈদেশিক আক্রমণ চলার ফলে রাজার স্বৈর ক্ষমতা কার্যকরী হতে পারেনি। তাকে যুদ্ধের প্রয়োজনে স্থানীয় সামন্ত ও প্রাদেশিক শাসকদের ওপর বহু পরিমাণে নির্ভর করতে হত।
  • (৫) রাজা ইচ্ছামত আইন তৈরি করতে পারতেন না। তাকে চিরাচরিত প্রথা, ধর্ম শাস্ত্র, ব্রাহ্মণদের বিধান মেনে চলতে হত।
  • (৬) বিকেন্দ্রীকরণ নীতি অনুসারে গ্রাম ও বিষয়গুলির শাসন স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাহায্যে কর্মচারীরা চালাত। এর ফলে রাজা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তেমন পেতেন না।
  • (৭) গুপ্ত যুগে গ্রামগুলি স্বয়ম্ভর ছিল। ফলে বাড়তি উৎপাদন না করে গ্রামের প্রয়োজন মাফিক লোকে উৎপাদন করত। এজন্য বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। গুপ্ত সম্রাটরা কর্মচারীদের বেতন না দিতে পেরে জমি বা জাগীর দেন। কর্মচারীরা জমিতে অধিকার পেলে তারা খুবই শক্তিশালী হয়ে পড়ে। রাজার পক্ষে সর্বদা তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না।
  • (৮) রাজা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। অন্যায় কাজ করলে তার বিরুদ্ধে জনসাধারণ বিদ্রোহ করতে পারত।
  • (৯) রাজার মত মন্ত্রীরাও ছিলেন বংশানুক্রমিক। মন্ত্রী ও অমাত্যরা রাজার সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতেন। এই সকল কারণে অনেকে বলেন যে, গুপ্ত যুগে রাজার ক্ষমতা, মৌর্য যুগের তুলনায় দুর্বল ছিল।

কেন্দ্রীয় প্রশাসন

  • (১) কেন্দ্রে রাজাকে শাসনের কাজে সাহায্যের জন্য মন্ত্রী, যুবরাজ ও উচ্চ কর্মচারীরা ছিল। গুপ্ত যুগে মন্ত্রীরা এককভাবে রাজাকে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সাহায্য দিত। কিন্তু মৌর্য যুগের মত কোনো মন্ত্রী পরিষদ গুপ্ত যুগে ছিল না।
  • (২) কারও কারও মতে, মনুসংহিতায় মন্ত্রী পরিষদের আভাষ পাওয়া যায়। কিন্তু বেশীর ভাগ পণ্ডিত এমত অগ্রাহ্য করেন। কারণ, গুপ্ত যুগের কোনো শিলালিপিতে মন্ত্রী পরিষদের উল্লেখ নেই। মন্ত্রী পদ এই যুগে বংশানুক্রমিক ছিল।
  • (৩) উদয়গিরি গুহালিপি থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী বীর সেনের পিতাও মন্ত্রী ছিলেন। তিনি নিজেকে “অন্বয় প্রাপ্ত সচিব্য” বলেছেন। সন্ধি বিগ্রাহিক হরিসেনের পিতা ধ্রুবভূতিও মন্ত্রী ছিলেন। পশ্চিম ও মধ্য ভারতে গোপ্তৃ পদও বংশানুক্রমিক ছিল বলে জানা যায়। কখনও কখনও একই মন্ত্রী একাধিক পদ অধিকার করতেন।

কেন্দ্রীয় কর্মচারী

  • (১) গুপ্ত সম্রাটরা কেন্দ্রে বহু কর্মচারী নিয়োগ করতেন। মহাবলাধিকৃত ছিলেন সেনাপ্রধান। তার অধীনে বিভিন্ন সামরিক পদ যথা, অশ্ব বাহিনীর প্রধান বা মহাশ্বপতি, হস্তীবাহিনীর প্রধান মহাপীলুপতি প্রভৃতি থাকত। মহাদণ্ডনায়ক সম্ভবত প্রধান সেনাপতি বা রক্ষী বাহিনীর প্রধান ছিলেন। তাঁর অধীনে অন্যান্য রক্ষীরা কাজ করত।
  • (২) মহাপ্রতীহার ছিলেন রাজপ্রাসাদের রক্ষী বাহিনীর প্রধান। সন্ধি-বিগ্রহিক নামে একটি নতুন পদের কথা জানা যায়। এই কর্মচারী রাজাকে বৈদেশিক ব্যাপার, যুদ্ধ, সন্ধি প্রভৃতির বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। হরিষেণ ছিলেন সমুদ্রগুপ্তের সন্ধি-বিগ্রাহিক।
  • (৩) অক্ষ-পটলাধিকৃত নামে কর্মচারী সরকারী দলিলপত্র রচনা ও রক্ষা করতেন। এঁদের নীচে আরও নিম্নবর্গের কর্মচারী ছিল। যথা – করণিক বা কেরাণী, দৌবারিক বা দরওয়ান প্রভৃতি।

কুমারমাত্য

  • (১) গুপ্ত যুগে কেন্দ্রের সঙ্গে প্রাদেশিক সরকারের সংযোগ রাখার জন্য কুমারমাত্য নামে কর্মচারী নিযুক্ত হত। কুমারমাত্যের ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। রাজবংশের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কুমারকে অমাত্য নিয়োগ করা হত; এজন্য কুমারমাত্য হতে পারে।
  • (২) কুমার অথবা যুবরাজ অমাত্য হিসেবে কাজ করলে কুমারমাত্য হতে পারে। কারও কারও মতে, যুবরাজের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে কুমারমাত্য বোঝায়। কুমার অর্থাৎ অবিবাহিত অবস্থা থেকে যিনি মন্ত্রী আছেন তাকেও বলা যায়। আবার অনেকের মতে, যে মন্ত্রী বা অমাত্যের পিতা জীবিত তখনও অমাত্য পদে আসীন, তাকেই কুমার অমাত্য বলা হত।
  • ৩) দু ধরনের কুমারমাত্য ছিলেন। পরমভট্টারক স্থানীয় কুমার মাত্যরা সম্রাটের কাজে নিযুক্ত হত। অন্য কুমারমাত্যরা যুবরাজের কাজ করত। যাই হোক, কুমারমাত্যরা কেন্দ্রের বিশ্বাসভাজন কর্মচারী হিসেবে প্রাদেশিক ও জেলা বা বিষয়ে কাজ করত।

আযুক্ত

গুপ্ত যুগে কেন্দ্রের সঙ্গে প্রাদেশিক সরকারের সংযোগ রাখার জন্য আযুক্ত নামে কর্মচারী নিযুক্ত হত। আযুক্তরা জেলা ও শহরে কাজ করত। বিজিত রাজার রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার সময় জায়গা ও সম্পত্তির হিসেব আযুক্তরা রাখত।

প্রাদেশিক শাসন

গুপ্ত সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে শাসন করা হত। যেমন –

(১) ভুক্তি

এযুগে প্রদেশগুলির নাম ছিল দেশ বা ভুক্তি অথবা ভোগ। সাধারণত গাঙ্গেয় উপত্যকার প্রদেশগুলিকে ভূক্তি বলা হত। যথা – তীরভুক্তি বা ত্রিহুত, পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি, শ্রাবস্তীভূক্তি, অহিচ্ছত্রভুক্তি।

(২) দেশ

দেশ নামধারী অঞ্চল ছিল পশ্চিম ভারতে যথা, সৌরাষ্ট্র দেশ, সুকুলি দেশ। গোপ্তৃ উপাধিধারী কর্মচারীরা দেশ শাসন করত।

(৩) জেলা বা বিষয়

ভূক্তিগুলিকে জেলা বা বিষয়ে ভাগ করা হত। গুপ্ত প্রাদেশিক শাসনে বিষয় ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এরকম অনেকগুলি বিষয় বা জেলার নাম জানা যায়, যথা কোটিবর্ষ বিষয় বা দিনাজপুর জেলা, অন্তর্বেদী বিষয় বা দোয়াব জেলা প্রভৃতি। বিষয়ের শাসনের জন্য কুমারমাত্য, বিষয়াপতি, আযুক্ত প্রভৃতি কর্মচারীরা নিযুক্ত হত।

ভুক্তির শাসক

ভূক্তির শাসকের উপাধি ছিল উপারিক। কখনও কখনও রাজপরিবারের লোকেরা উপারিকের পদে কাজ করত। দামোদরপুর লিপি থেকে পুণ্ড্রবর্ধনের উপারিক মহারাজপুত্র দেবভট্টারকের নাম শোনা যায়।

বিষয় শাসন

  • (১) বিষয়ের শাসনকর্তা সাধারণত প্রাদেশিক শাসনকর্তার দ্বারাই নিযুক্ত হত। তবে ইন্দোর লিপি থেকে জানা যায় যে, কখনও কখনও সম্রাট সরাসরি বিষয়ের শাসককে নিযুক্ত করতেন। অন্তর্বেদী বা দোয়াব বিষয়ের শাসনকর্তা সর্বনাগ ছিলেন সম্রাটের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে।
  • (২) দামোদরপুর লিপি থেকে জানা যায় যে, সাধারণত উপারিকরাই বিষয়পতিদের নিয়ন্ত্রণ করত। আযুক্ত ও কুমারমাত্যরা বিষয়ের শাসনে নিযুক্ত থাকলেও তারা কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করত। বিষয়পতিরা নগর পরিষদের সাহায্যে রাষ্ট্রীয় জমি বিক্রি করত।

নির্বাচিত পরিষদ

  • (১) গুপ্ত যুগে বিষয়ের শাসনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটান হয়। বিষয়ের শাসন কাজে পরামর্শ দেওয়ার জন্য অধিকরণ বা পরিষদ নামে একটি সভা থাকত। এই পরিষদের নাম ছিল অধিষ্ঠান-অধিকরণ। এই পরিষদ বা সভায় বিভিন্ন শ্রেণীর স্থানীয় প্রতিনিধি থাকত।
  • (২) সার্থবাহ প্রধান বা প্রধান ব্যবসায়ী, নগর শ্রেষ্ঠী, নিগম প্রধান, প্রথম কুলিক বা প্রধান কারিগরদের নিয়ে এই পরিষদ গঠিত হত। এরা পদাধিকার বলে সদস্য হত। বাকি সদস্যরা কিভাবে নিযুক্ত হত তা জানা যায় নি।
  • (৩) স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে শাসন পরিচালনার ফলে গুপ্ত শাসনের ভিত্তি বেশ মজবুত হয়। যে ক্ষেত্রে মৌর্য সম্রাটরা, স্থানীয় মতামতের অপেক্ষা না রেখে তাঁদের কর্মচারীদের দ্বারা শাসন করতেন সে ক্ষেত্রে গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা ছিল অনেক বেশী উদার ও প্রতিনিধিত্বমূলক। গ্রামের শাসনের ক্ষেত্রেও গুপ্ত যুগে প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার নিয়ম প্রবর্তন করা হয়।

অন্যান্য প্রাদেশিক কর্মচারী

  • (১) প্রাদেশিক স্তরে গুপ্ত যুগে কুমারমাত্য ও আযুক্ত ছাড়া আরও নানা ধরনের কর্মচারী ছিল। আগেই বলা হয়েছে যে, প্রদেশের শাসনের দায়িত্ব ছিল উপারিক বা গোপ্তৃগণের হাতে। বিষয়ের শাসনের দায়িত্ব ছিল কুমারমাত্য ও আযুক্তদের হাতে। এছাড়া দণ্ডিক, দণ্ডপাণিক নামে পুলিশ বিভাগের কর্মচারী ছিল।
  • (২) পুষ্টপাল দলিল-পত্রাদি রচনা করত। তালবর ছিল সেনাপতি। বিনয়- স্থিতিস্থাপক সম্ভবত ন্যায়নীতি রক্ষার দায়িত্ব বহন করত। সম্ভবত প্রাদেশিক কর্মচারীরা মর্যাদা ও পদাধিকারে কেন্দ্রিয় কর্মচারী থেকে পৃথক ছিল।
  • (৩) প্রদেশে প্রদেশে সামরিক বিভাগের দপ্তর গুপ্ত যুগে রাখা হত বলে জানা যায়। এ সম্পর্কে গুপ্তবংশীয় যুবরাজ গোবিন্দ গুপ্তের বৈশালী লিপি গুরুত্বপূর্ণ। এই লিপিতে তীরভূক্তি বা ত্রিহুত বিষয়ের শাসনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন কর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। এই কর্মচারীদের নাম ও পদমর্যাদা দেখে বোঝা যায় যে, প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় কর্মচারীর মধ্যে পার্থক্য ছিল। বিভিন্ন কর্মচারী বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করত।

গ্রামীণ শাসন

গুপ্ত যুগে গ্রামের শাসন ব্যবস্থায় গ্রামিকরা সরকারী কর্মচারী হিসেবে কাজ করত। গ্রামের প্রধান বা মোড়লকে বলা হত মহত্তর বা ভোজক। এই ব্যক্তি গ্রাম শাসনে গ্রামিককে সাহায্য করত। গ্রামসভা বা মহাসভার সাহায্যে গ্রমিকরা পতিত জমি, কর্ষিত জমির আলাদা তালিকা করত, জমি মাপ করত, পথ ঘাট, বাজার, মন্দির, পুস্করিণী প্রভৃতি পরিচালনার ব্যবস্থা করত।

বিচার ব্যবস্থা

  • (১) গুপ্ত বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায় যে, গ্রামসভাগুলি প্রধানত গ্রামের বিচারের নিষ্পত্তি করত। বিষয় ও প্রাদেশিক শহরে সরকারী আদালত ছিল। এই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে রাজার কাছে আপীল করা যেত। ফা-হিয়েন গুপ্ত ফৌজদারী আইনের উদারতার কথা বলেছেন।
  • (২) রাজদ্রোহ ছাড়া অন্য অপরাধে অঙ্গচ্ছেদ করা হত না। লোকে সরকারী নিয়ন্ত্রণ-মুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবন যাপন করত। রাষ্ট্রের খরচায় রাস্তাঘাট, পুল, বাঁধ ইত্যাদি তৈরি করা হত। লোকে যাতে ন্যায় পথে চলে এটা দেখবার জন্য বিনয় স্থিতিস্থাপক নামে কর্মচারীরা চেষ্টা চালাত।

রাজস্ব নীতি

গুপ্ত রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায় যে,

  • (১) জমির ফসল থেকে রাজা বা ভাগ রাজস্ব পেতেন। এর নাম ছিল “ভাগ”।
  • (২) কর্মচারীদের বেতনের ওপর কর ধার্য করা হত। এই করের নাম ছিল ভোগ।
  • (৩) শুল্ক অর্থাৎ বাণিজ্য ও শিল্প দ্রব্য হতে প্রত্যয় বা আবগারী কর আদায় করা হত।
  • (৪) জঙ্গল, খনি, ফেরিঘাট, বাজার হতে কর আদায় করা হত।

ডঃ ঘোষালের অভিমত

ডঃ ঘোষালের মতে, গুপ্ত যুগে কৃষক জমি চাষ করলেও জমির মালিকানা ছিল রাজার। দান-বিক্রয় করতে হলে রাজার সম্মতির দরকার হত। অবশ্য অনেকে এই ব্যাখ্যা মানেন না। তাদের মতে, জমির মালিকানা ছিল কৃষকের। কিন্তু জমি দান-বিক্রয় করতে হলে স্থানীয় পরিষদ ও রাজার সম্মতিক্রমে তা করা যেত। রাজা কিছু কর্মচারীদের নগদ বেতন দিলেও, বেশীর ভাগ বেতনের বদলে জমি বন্দোবস্ত দিতেন।

প্রত্যক্ষ শাসনের বাইরের অঞ্চল

গুপ্ত সাম্রাজ্যে সম্রাটের প্রত্যক্ষ শাসনের বাইরে সামন্ত রাজাদের শাসিত অঞ্চল ও গণরাজ্য ছিল। এই অঞ্চলগুলি স্বায়ত্ব শাসন ভোগ করত। সম্রাটের প্রতি অধীনতা স্বীকারের বিনিময়ে তারা স্বায়ত্ব শাসন পেত। তারা সম্রাটের অনুমতি ছাড়া ভূমিপট্টলী দান করত। সম্রাটকে এরা কর দিত।

শাসন ব্যবস্থার প্রশংসার দিক

  • (১) গুপ্ত শাসন ব্যবস্থার প্রশংসার দিক ছিল এর বিকেন্দ্রীকরণ নীতি এবং প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা। এর দ্বারা স্থানীয় অভাব-অভিযোগের প্রতিকার করা সহজ ছিল। দূরবর্তী সম্রাটের সঙ্গে স্থানীয় লোকেদের প্রতিনিধি সভার দ্বারা সংযোগ ঘটত।
  • (২) মৌর্য সম্রাটদের মত গুপ্তচরদের দ্বারা খবর যোগাড় করতে হত না। শাসন ব্যবস্থা উদারপন্থী হওয়ার ফলে লোকে স্বাধীনতা ও স্বচ্ছন্দতার মধ্যে দিন কাটাত। তাদের দৈনন্দিন জীবনে সরকার হস্তক্ষেপ করত না। বিশেষভাবে কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছিল।

শাসন ব্যবস্থার দুর্বল দিক

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থার দুর্বল দিক ছিল যে, বিকেন্দ্রীকরণের ফলে আঞ্চলিকতা ও বিচ্ছিন্নতা প্রবল হতে থাকে। গুপ্ত কর্মচারীদের জমি দেওয়ার ফলে সামন্ত প্রথার প্রবলতা বাড়ে। ক্রমে সামন্তরা শক্তিশালী হয়ে স্বাধিকার-প্রমত্ত হয়ে ওঠে। গুপ্তযুগে নগর অপেক্ষা গ্রাম ও বিষয়গুলি প্রাধান্য পায়। প্রাচীন নগরগুলি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

উপসংহার :- ফা-হিয়েনের বর্ণনা পড়লে মনে হয় গুপ্তযুগ প্রকৃতই সুবর্ণ যুগ ছিল। কারণ শাসনব্যবস্থা ছিল উদার ও বিকেন্দ্রিত। কিন্তু এই যুগের সমৃদ্ধি বিশেষ শ্রেণী ও কয়েকটি নগরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে মৌর্য যুগ অপেক্ষা সরকারী স্বৈরতন্ত্র ও শোষণ এই যুগে অপেক্ষাকৃত কম ছিল সন্দেহ নেই।

(FAQ) গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

শ্রীগুপ্ত।

২. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথম সার্বভৌম রাজা কে ছিলেন?

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।

৩. গুপ্ত সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে ছিলেন?

সমুদ্রগুপ্ত।

৪. লিচ্ছবি দৌহিত্র এবং ভারতের নেপোলিয়ন কাকে বলা হয়?

সমুদ্রগুপ্ত।

৫. শকারি কে ছিলেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »