পাল যুগের শাসন ব্যবস্থা

পাল যুগের শাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে সর্বভারতীয় শক্তি, রাজাদের ক্ষমতা, সামন্ত প্রথা, রাজার ক্ষমতা, রাজার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কর্মচারী, বিভিন্ন বিভাগ ও তার কর্মচারী, বিচার ব্যবস্থা ও রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে জানবো।

পাল যুগের শাসন ব্যবস্থা

বিষয় পাল যুগের শাসন ব্যবস্থা
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
শ্রেষ্ঠ রাজা দেবপাল
পাল যুগের শাসন ব্যবস্থা

ভূমিকা :- চার শতাব্দী ব্যাপী পালবংশের শাসন বাংলার জীবনে নতুন যুগের সৃষ্টি করেছিল। ডঃ আর সি মজুমদারের মতে, “এই সাম্রাজ্য রাজনৈতিক গুরুত্ব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালীর নতুন জাতীয় জীবনের সূত্রপাত হয়।”

সর্বভারতীয় শক্তি

পাল শক্তির উত্থানের আগে যদিও শশাঙ্ক কিছুকাল উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেন, তাঁর সাম্রাজ্য স্থায়ী হয়নি। পালশক্তিই সর্বপ্রথম বাংলায় অরাজকতা, মাৎস্যন্যায় দমন করে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করে বাংলাকে এক সর্বভারতীয় শক্তিতে পরিণত করে।

রাজাদের খ্যাতি

পাল সম্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের আমলে পাল শক্তি সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। বর্হিভারতেও পাল রাজাদের খ্যাতি বিস্তৃত হয়। সুমাত্রা, জাভা প্রভৃতি স্থান হতে পাল রাজাদের দরবারে দূত আসে।

ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য

ডঃ নীহার রঞ্জনের মতে, “পাল শাসনে দক্ষিণ-পূর্ব ভারত একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যে আবদ্ধ হয়। ডঃ রায়ের মতে, “বাঙালীর জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পাল সম্রাটরা কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন।”

সামন্ত প্রথা

  • (১) পাল যুগে বাংলায় সামন্ত প্রথার ভিত্তি দৃঢ় হয়। ডঃ আর এস শর্মা দেখিয়েছেন যে, এই যুগের ভূমিপট্টিলীগুলি দেখলে বাংলার সামন্ত প্রথার রীতি প্রকৃতি বুঝা যায়। দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে সামন্ত বিদ্রোহ এবং রামপালের সিংহাসন লাভের জন্য সামন্ত সাহায্য লাভ একথা প্রমাণ করে।
  • (২) খলিমপুর লিপি থেকে জানা যায় যে, সামন্ত রাজারা ধর্মপালের কনৌজ দরবারে উপস্থিত হয়ে তার প্রতি বশ্যতা জানায়। সামন্ত রাজাদের শ্রেণী বা স্তর ভেদ ছিল। পাল লিপিতে সামন্তরাজাদের মহারাজা, রাজন, রাজক, মহাসামন্ত, সামন্ত প্রভৃতি অভিধার ব্যবহার তা প্রমাণ করে।
  • (৩) দ্বিতীয় মহীপাল সামন্তচক্রের বিদ্রোহে সিংহাসনচ্যুত হন। দিব্য ছিলেন এক সামন্ত। রামপাল ১৩ জন প্রধান সামন্ত রাজার সামরিক সাহায্যে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। এজন্য তাকে উপঢৌকন হিসেবে মিত্র সামন্ত রাজাদের ভূমিদান ও কর হ্রাস করতে হয়।
  • (৪) এই সব দিক থেকেই সামন্ত প্রথার প্রভাব অনুমান করা যায়। এই সামন্ত প্রথা পাল সাম্রাজ্যের সংহতির পক্ষে এবং সাধারণ প্রজাদের পক্ষে কল্যাণজনক ছিল না একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাজার ক্ষমতা

পাল যুগে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই ছিল প্রচলিত নিয়ম। রাজাই ছিলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তার ক্ষমতার ওপর কোনো সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পাল সম্রাটরা “পরম ভট্টারক”, “মহারাজাধিরাজ” উপাধি নেন। পাল শাসনব্যবস্থায় রাজপুত্র, যুবরাজ রাজ ভ্রাতারা অংশ নিতেন। তারা প্রদেশ পাল, অমাত্য হিসেবে কাজ করতেন।

রাজার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

তবে বংশানুক্রমিক মন্ত্রী প্রথা ও সামন্ত প্রথার ফলে রাজার ক্ষমতা বাস্তবে অনেকটা কমে যায়। বাদল প্রশস্তিতে মন্ত্রী গর্গ, দর্ভপানি, কেদার মিশ্রের কৃতিত্বের কথা বলা হয়েছে।

কর্মচারী

  • (১) মন্ত্রীরা ছাড়া রাজপুত্ররা অমাত্য, সেনাপতি, বিষয়পতি, দন্ড শক্তি, চৌরদ্ধরনিক, দূত, গমাগমিক বলাধ্যক্ষ প্রভৃতি উপাধিধারী বহু কর্মচারীবর্গ শাসনকার্যের ভার বইত এবং রাজার আদেশে কাজ করত। খলিমপুর লিপি ও নালন্দা পটে এই সকল কর্মচারীর নাম পাওয়া যায়।
  • (২) ধর্মকার্য ও ধর্ম বিষয়ক অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য পাল রাজারা আলাদা কর্মচারী নিযুক্ত করতেন। তবে পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও রাষ্ট্রনীতিতে তারা কোনো বিশেষ ধর্মের প্রাধান্য স্থাপন করেননি। তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ দেখাতেন। তাদের ব্রাহ্মণ মন্ত্রী নিয়োগ ধর্ম-সহিষ্ণুতা নীতির পরিচয় দেয়।

বিভিন্ন বিভাগ ও তার কর্মচারী

  • (১) পাল সাম্রাজ্যকে শাসনের সুবিধার জন্য ভুক্তিতে ভাগ করা হয়। তীরভুক্তি বা ত্রিহুত, শ্রীনগর ভুক্তি ছিল বিহারে। বাংলায় ছিল পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি, বর্ধমান ভুক্তি, দণ্ডভুক্তি প্রভৃতি। ভুক্তির শাসকের নাম ছিল উপারিক বা ভূক্তিপতি।
  • (২) ভুক্তিকে মন্ডল বা বিষয়ে ভাগ করা হত। বিষয়পতি ছিলেন বিষয়ের শাসনকর্তা, মান্ডলিক ছিলেন মন্ডলের শাসনকর্তা। এছাড়া বীথি নামে আর একটি বিভাগ ছিল। বিষয় বা মন্ডলের শাসনের কাজে কোনো জন-প্রতিনিধি সংযুক্ত থাকত কিনা তা সঠিক জানা যায় নি।
  • (৩) খলিমপুর লিপিতে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। দাশ গ্রামিক ছিলেন দশটি গ্রামের কর্তা। মন্ডলের নীচের বিভাগ ছিল গ্রাম। গ্রামপতি গ্রাম শাসন করত। গ্রামপতি রাজার বেতনভোগী কর্মচারী ছিল।

বিচার ব্যবস্থা

মহানণ্ডনায়ক ছিলেন রাজ্যের সর্বোচ্চ বিচারক। তাঁর রায়ের ওপরে বিশেষ ক্ষেত্রে রাজা একমাত্র আপীলের বিচার করতেন। মহাদণ্ডনায়কের নীচের স্তরের বিচারক ছিলেন দণ্ডনায়ক। দশাপারাধিক দশ প্রকার অপরাধের বিচার করতেন।

রাজস্ব ব্যবস্থা

ভূমি-রাজস্ব ছিল সাধারণত ফসলের ১/৬। ষষ্ঠাধিকৃত নামে কর্মচারী তা আদায় করত। ফসলের অংশকে বলা হত “ভাগ”। ভোগপতি ‘ভোগ’ নামে কর আদায় করত। এছাড়া ফেরীঘাট, বাণিজ্যতঙ্ক প্রভৃতি খাতে কর আদায় হত। মহা অক্ষপটলিক রাষ্ট্রের আয়ব্যয়ের হিসেব রাখতেন। প্রমাতৃ জমি জরিপ বিভাগের কর্তা ছিলেন। মহাসন্ধি বিগ্ৰাহিক কূটনৈতিক দপ্তরের প্রধান ছিলেন।

উপসংহার :- পাল সেনাদলে খস-হূণ-কর্ণাট প্রভৃতি দেশের লোক ছাড়া বাঙালী ও বিহারীরাও নিযুক্ত হত। মহা সেনাপতি ছিলেন সেনাবিভাগের প্রধান। পাল বাহিনী পদাতিক ছাড়া অশ্বারোহী, হস্তীবাহিনী ও নৌবাহিনী দ্বারা গঠিত ছিল। কোট্টপাল দুর্গ রক্ষা করতেন, প্রান্তপাল সীমান্ত রক্ষা করতেন।

(FAQ) পাল যুগের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

গোপাল।

২. গোপালের পর কে সিংহাসনে আরোহণ করেন?

ধর্মপাল।

৩. কোন পাল রাজার সময় ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব শুরু হয়?

ধর্মপাল।

৪. পাল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দেবপাল।

Leave a Reply

Translate »