রামপাল

পাল রাজা রামপাল প্রসঙ্গে দিব্যর মগধ আক্রমণ, ভূমি ও অর্থদানের প্রলোভন, সামন্ত রাজাদের সাহায্য, ভীমের পরাজয়, রাজধানী স্থাপন, পূর্ব বাংলা জয়, চোল রাজার সাথে মিত্রতা, চালুক্য আক্রমণ প্রতিহত ও শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা হিসেবে তার ভূমিকা সম্পর্কে জানবো।

রামপাল

রাজা রামপাল
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
শ্রেষ্ঠ রাজা দেবপাল
রামপাল

ভূমিকা :- দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যুর পর তাঁর দুই ভাই শূরপাল ও রামপাল মগধে আশ্রয় নেন। শূরপাল কিছুকাল মগধে রাজত্ব করেন। তার পরে রামপাল বারেন্দ্রীর পৈত্রিক সিংহাসন দিব্য ও তাঁর বংশধরদের হাত থেকে পুনরুদ্ধারের কাজে হাত দেন।

দিব্যর মগধ আক্রমণ

সম্ভবত দিব্য মগধ থেকে পাল অধিকার লুপ্ত করার জন্যে চেষ্টা করেন। এই সূত্রে রামপালের সঙ্গে দিব্যের তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। সম্ভবত দিব্য মগধ আক্রমণ করেন। এই অংশে রামপাল রাজত্ব করতে থাকেন।

ভূমি ও অর্থদানের প্রলোভন

ইতিমধ্যে দিব্যের মৃত্যু হলে তাঁর ভাই রুদ্দোক বা রুদ্র এবং তাঁর পুত্র ভীম বারেন্দ্রীর সিংহাসনে বসেন। রামপাল বারেন্দ্রীর সামন্ত রাজাদের সাহায্য চাইলে তারা ভীমের প্রতি আনুগত্য দেখান এবং রামপালকে প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত রামপাল তাদের ভূমি ও অর্থদানের প্রলোভন দেখালে তারা রামপালকে সাহায্য করতে রাজী হন।

সামন্ত রাজাদের সাহায্য

রামপাল তাঁর মাতুল রাষ্ট্রকূট মদন দেবেরও প্রভূত সাহায্য পান। রামপালের মিত্র সামন্ত রাজারা ছিল অধিকাংশ দক্ষিণ বিহার ও দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার লোক। প্রকৃত বরেন্দ্রীর বিশেষ কেউ তার পক্ষে ছিল না।

মিত্র সামন্ত রাজাদের নাম

বাংলার যে সকল সামন্ত রামপালকে সাহায্য করে রামচরিতে তাদের তালিকা দেওয়া আছে। এই তালিকা দেখলে বাংলায় তখন সামন্ত শক্তির বিস্তৃত ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। এই রাজাদের মধ্যে ছিল –

  • (১) কোটটবী বা বিষ্ণুপুরের রাজা বীরগুণ,
  • (২) দণ্ডভুক্তি বা দাঁতনের রাজা জয় সিংহ
  • (৩) বাল-বলভী বা মেদিনীপুরের রাজা বিক্রম,
  • (৪) অপারমন্দার বা হুগলীর রাজা লক্ষ্মীশূর,
  • (৫) কূজবটী বা সাঁওতাল পরগণার রাজা শূরপাল,
  • (৬) তৈলকম্পা বা মালভূমের রাজা রুদ্রশিখর,
  • (৭) উচ্ছাল বা বীরভূমির রাজা ভাস্কর,
  • (৮) কজাঙ্গাল বা রাজমহালের রাজা নরসিংহ,
  • (৯) সঙ্কটগ্রাম বা হুগলির একাংশের রাজা চণ্ডাৰ্জুন,
  • (১০) টেককরি বা বর্ধমানের রাজা প্রতাপসিংহ,
  • (১১) নিদ্রাবলীর রাজা বিজয়,
  • (১২) কৌশাম্বী বা রাজশাহীর রাজা দ্বোরপবর্ধন,
  • (১৩) পদুম্বা বা পাবনা বা হুগলীর রাজা সোম প্রমুখ।

ভীমের পরাজয়

রামপালের আক্রমণে ভীম পরান্ত ও বন্দী হন। ভীমকে সপরিবারে নিহত করা হয়। বারেন্দ্রীর অধিকার পুনরায় পাল বংশের হাতে আসে। রামপালের বাহিনী ভীমের সীমান্ত ঘাঁটি অধিকার করলে, ভীম রামপালের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য তাঁর সেনাদল পাঠান। তাঁর সেনাপতি হরি পরাজিত হলে ভীমের পতন ঘটে।

রাজধানী স্থাপন

রামপাল উদার কর নীতি ও জলসেচের ব্যবস্থা করে বরেন্দ্রীতে তাঁর শাসনকে দৃঢ় করেন। তিনি রামাবতী নগরী স্থাপন করে তাঁর রাজধানীতে পরিণত করেন। কবি সন্ধ্যাকর নন্দী এই নগরীর রূপ ও বৈভবের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।

পূর্ববাংলা জয়

রামচরিতে বলা হয়েছে যে, পূর্ব অঞ্চলের বর্মন বংশীয় রাজা রামপালকে বশ্যতা দেন। এই বর্মন রাজা ছিলেন সম্ভবত পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরের হরি বর্মন। রামপাল কামরূপ রাজ্যের রাজা ধর্মপালকে পরাস্ত করে তাকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। পূর্বদিকে এভাবে সীমান্ত দৃঢ় করে তিনি দক্ষিণে দৃষ্টি দেন। রাঢ় দেশের সামন্তরা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করলে, রামপাল রাঢ় দেশ হয়ে, দক্ষিণে উৎকল আক্রমণ করেন।

উড়িষ্যা অভিযানে ব্যর্থতা

উড়িষ্যার চিল্কা হ্রদকে এযুগে বাংলার রাজারা তাদের প্রাকৃতিক সীমারেখা মনে করতেন। কিন্তু কলিঙ্গরাজ অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গকে পরাস্ত করা রামপালের পক্ষে সহজ হয়নি। রামপাল ভেদনীতির দ্বারা অনন্তবর্মার স্থলে সোমবংশীয় কেশরীকে উড়িষ্যার সিংহাসনে বসাবার চেষ্টা করলেও ১১১২ খ্রিস্টাব্দে তার চেষ্টা বিফল হয়। রামপালের মৃত্যুর পর অনন্তবর্মা উড়িষ্যায় তাঁর অধিকার দৃঢ় করেন।

চোল রাজার সাথে মিত্রতা

  • (১) গঙ্গ রাজাদের বেষ্টন করার জন্য রামপাল সুদূর দক্ষিণের চোল রাজা কুলোত্তুঙ্গের সঙ্গে মিত্রতাবদ্ধ হন। গঙ্গ বা চোড়গঙ্গ বংশকে রামচরিতে “নিশাচর” বলা হয়েছে। মহাভারতে “নিশাচর” শব্দটি অসম্মান সূচক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে দেখা যায়।
  • (২) সম্ভবত পরাজিত চোড় গঙ্গদের সম্পর্কে পাল বংশের সভাকবি এই অশ্রদ্ধেয় মন্তব্য করেন। যদিও চোড় গঙ্গদের বিরুদ্ধে গঙ্গদের শত্রু দক্ষিণের চোল শক্তির সঙ্গে রামপাল মিত্রতা করেন, চোল লিপিতে বাংলার রাজাকে চোল সম্রাট কুলোতুঙ্গের করদ রাজ্য বলা হয়েছে।

চালুক্য আক্রমণ প্রতিহত

কর্ণাটকের চালুক্য রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য বাংলার দিকে লুব্ধ দৃষ্টি দেন বলে রামচরিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চালুক্য ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের সামন্ত রাজা আচ বাংলা আক্রমণের চেষ্টা করলে রামপাল তা প্রতিহত করেন।

সেন শক্তির ও মিথিলার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

বাংলার ভেতর উদীয়মান সেন শক্তি ও মিথিলার রাজা রামপালের শিরঃপীড়ার কারণ হন। বাংলায় সেন বংশ ও উত্তর বিহার বা মিথিলার নানাদেবের সঙ্গে রামপালের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে।

গাহড়বাল আক্রমণ প্রতিহত

উত্তরপ্রদেশের কনৌজের গোবিন্দচন্দ্র গাহড়বাল, পাল শক্তিকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেন। গাহড়বাল রাজপুত শক্তি বারাণসী ও কনৌজকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা বিস্তার করেন। গোবিন্দচন্দ্র গাহড়বাল, রামপালকে মগধ থেকে হঠিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। রামপাল এই আক্রমণ প্রতিহত করেন বলে সন্ধ্যাকর নন্দী দাবী করেছেন।

শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা

এইভাবে রামপাল কৈবর্ত রাজাদের হাত থেকে পৈত্রিক সিংহাসন উদ্ধার করে এবং প্রতিবেশী রাজাদের পরাস্ত করে তাঁর যোগ্যতা ও শক্তি দেখান। পাল বংশের শেষ শ্রেষ্ঠ রাজা হিসেবে রামপালকেই গণ্য করা হয়।

ক্ষাত্রশক্তি সীমিত

কিন্তু তাঁর ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি। তিনি পাল বংশের অনিবার্য পতনকে কিছুটা বিলম্বিত করেন মাত্র। ধর্মপাল ও দেবপালের মত ক্ষাত্রশক্তির অধিকারী তিনি ছিলেন না। সমকালীন ভারতবর্ষে আঞ্চলিক শক্তিগুলির পারস্পরিক বিরোধ ও বৈদেশিক আক্রমণ পাল সাম্রাজ্যের পতন দ্রুত ডেকে আনে।

আঞ্চলিক শক্তির বিচ্ছিন্নতা

রামপাল ভারতের আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে সঙ্ঘবদ্ধ করে ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা করেননি। তাছাড়া ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত শক্তির প্রভাবকে রোধ করতে না পারলে কোনো রাজা একক শক্তি দ্বারা বিচ্ছিন্নতাবাদকে রোধ করতে পারতেন না, একথা তিনি বুঝেননি।

উপসংহার :- System অর্থাৎ প্রচলিত ক্ষয়িষ্ণু সামন্তপ্রথাকে পরিবর্তন করে তিনি যদি নতুন কোন প্রথা প্রবর্তনের চেষ্টা করতেন তাহলে তিনি ইতিহাসে অনেক সফল হিসেবে চিত্রিত হতেন। রামপালের এরকম রাজনৈতিক দুরদর্শিতা ও সংগঠন ক্ষমতা ছিল না।

(FAQ) পাল রাজা রামপাল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কৈবর্তদের হাত থেকে পালদের মাতৃভূমি উদ্ধার করে কোন পাল রাজা?

রামপাল।

২. রামাবতী নগরে কে রাজধানী স্থাপন করেন?

রামপাল।

৩. রামপালের সভাকবি কে ছিলেন?

সন্ধ্যাকর নন্দী।

৪. রামচরিত কার লেখা?

সন্ধ্যাকর নন্দী।

৫. রামচরিত গ্ৰন্থ থেকে কোন পাল রাজার কথা জানা যায়?

রামপাল।

Leave a Reply

Translate »