আধুনিক রসায়নের সূচনা

আধুনিক রসায়নের সূচনা প্রসঙ্গে ধাতুবিগলন বিদ্যা, নতুন মৌলের আবিষ্কার, বায়ু সম্পর্কিত রসায়ন চর্চা, বয়েলের রসায়ন চর্চা, নৌ রসায়ন শিল্প, চিকিৎসাবিদ্যায় রসায়ন ও অন্যান্য রসায়ন চর্চা সম্পর্কে জানবো।

আধুনিক রসায়নের সূচনা

ঐতিহাসিক ঘটনাআধুনিক রসায়নের সূচনা
ধাতুবিগলন প্রযুক্তি১৩৪০ খ্রি
সোডিয়াম আবিষ্কারহামফ্রে ডেভি
ভ্যাকুয়াম পাম্পঅটো ভন গেরিক
অক্সিজেন আবিষ্কারপ্রিস্টলি
অণুর ধারণাঅ্যাভোগ্যাড্রো
ক্লোরিন আবিষ্কারশেইল
আধুনিক রসায়নের সূচনা

ভূমিকা :- অপরসায়নচর্চার অবসানের পর থেকে আধুনিক রসায়নের বিভিন্ন শাখার বিকাশ শুরু হয়। এর ফলে ধাতুবিগলন, মৌল আবিষ্কার, বায়ুর উপাদান, রাসায়নিক শিল্প, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব হয়।

ধাতুবিগলন বিদ্যা

  • (১) ইউরোপে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ধাতুবিগলন প্রযুক্তির আবিষ্কার হয়। পঞ্চদশ শতক থেকে রসায়নবিদ্যার সর্বাধিক ব্যাবহারিক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় ধাতুবিগলনবিদ্যায়। ধাতুবিগলনবিদ্যার অগ্রগতির ফলে পারদ-সংকরায়ণ, জারণ, বিজারণ, পাতন প্রভৃতি রাসায়নিক প্রক্রিয়ার উৎপত্তি ঘটে।
  • (২) তামা ও দস্তার আকরিক ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কৌশল আবিষ্কৃত হয় জার্মানিতে। জর্জ অ্যাগ্রিকোলা (১৪১৪- ১৫৫৫ খ্রি.) ধাতুবিগলন বিষয়ে ‘De re metallica’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এতে তিনি ধাতুবিগলনের উপযুক্ত বিভিন্ন ধরনের চুল্লি সম্পর্কে আলোচনা করেন। রাসায়নিক পদ্ধতিতে রুপোর সঙ্গে পারদের সংমিশ্রণ এবং সোনা গলানোর কৌশল আবিষ্কৃত হয়।

নতুন মৌলের আবিষ্কার

  • (১) আধুনিক বিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বিজ্ঞানের পৃথক শাখা হিসেবে যথার্থ আধুনিক রসায়নশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠা। পঞ্চদশ শতকের পর থেকে নতুন নতুন বিভিন্ন পদার্থ আবিষ্কৃত হতে থাকে। এই সময়ই ফসফরাস, বিসমাথ, প্ল্যাটিনাম প্রভৃতি নতুন ধাতুর আবিষ্কার হয়।
  • (২) হামফ্রে ডেভি ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালশিয়াম মৌল আবিষ্কার করেন এবং যাবতীয় মৌলিক পদার্থকে ধাতু ও অধাতু – এই দুইভাগে ভাগ করেন। আধুনিক রসায়নে নতুন পদার্থগুলির ধর্ম, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি জ্ঞানচর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
  • (৩) পরমাণুর গঠন সম্পর্কে জন ডালটন তাঁর আধুনিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আধুনিক পরমাণুবাদের জনক নামে পরিচিত। ক্রমে পরমাণুর ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধান, মূলক (Radical), জৈব যৌগ প্রভৃতির উদ্ভব ঘটে।

বায়ু সম্পর্কিত রসায়ন চর্চা

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) দহন ও শ্বসনে বায়ুর প্রয়োজন

অটো ভন গেরিক (১৬০২-৮৬ খ্রি.) ভ্যাকুয়াম পাম্প আবিষ্কার করার ফলে যে বায়ুশূন্য অবস্থার সৃষ্টি করতে সক্ষম হন, আরও প্রায় এক শতাব্দী পরে তা থেকে একটি আধুনিক রাসায়নিক সূত্রের জন্ম হয়। এ ছাড়াও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে দহন এবং শ্বসন উভয় ক্রিয়ার জন্যই বায়ুর প্রয়োজন অপরিহার্য।

(২) অক্সিজেন আবিষ্কার

মেয়ো ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রমাণ করেন যে, ধাতুকে উত্তপ্ত করলে ধাতুর ওজন বাড়ে। বয়েল, হুক এবং মেয়ো দাবি করেন যে, বায়ুতে এমন কোনো উপাদান আছে যা দহন এবং শ্বসনে অপরিহার্য। মেয়ো এই উপাদানের নাম দেন ‘নাইট্রো এরিয়াল স্পিরিট’। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রিস্টলি অক্সিজেন গ্যাস আবিষ্কার করেন।

(৩) গ্যাস সংগ্রহ পদ্ধতি

জলের ওপর কীভাবে গ্যাস সংগ্রহ করতে হয় এবং কীভাবে গ্যাসের আয়তন মাপা যায় তা রসায়নবিদ স্টিফন হেলস অষ্টাদশ শতকের গোড়াতেই দেখিয়ে দেন। এই পদ্ধতিকে আরও উন্নত করে প্রিস্টলি ও ক্যাভেন্ডিশ পারদের ওপর গ্যাস সংগ্রহের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

(৪) দহনে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ

ল্যাভয়েসিয়ার দেখান যে, দহনের জন্য অক্সিজেন গ্যাসের প্রয়োজন হয়। তিনি আরও দেখান যে, অক্সিজেনের সঙ্গে হাইড্রোজেন গ্যাস যুক্ত হয়ে জল উৎপন্ন হয়।

(৫) ক্লোরিন আবিষ্কার

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে শেইল ক্লোরিন আবিষ্কার করেন এবং ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বের্তোলে দেখান যে ক্লোরিনের বিরঞ্জন ক্ষমতা আছে।

(৬) অণুর ধারণা

জন ডালটন, বার্জেলিয়াস ও গে লুসাকের চিন্তাকে মিলিয়ে অ্যাভোগ্যাড্রো অণুর ধারণা দেন এবং বলেন যে, একই চাপে ও তাপমাত্রায় সম আয়তনের সব গ্যাসেই সমান সংখ্যক অণু থাকে।

বয়েলের রসায়নচর্চা

  • (১) সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশ রসায়নবিদ রবার্ট বয়েল (১৬২৭-১৬৯১ খ্রি.) রসায়নশাস্ত্রে বিভিন্ন মৌলিক গবেষণার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে ‘The Sceptical Chymist’ পত্রিকায় বস্তুর মৌল কণা সম্পর্কিত নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেন। প্রাচীনকালে অ্যারিস্টটল মাটি, বায়ু, অগ্নি ও জল – মূলত চারটি উপাদানের দ্বারা সকল প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যার যে তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন বয়েল তা ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করেন।
  • (২) বয়েল বলেন যে, প্রকৃতির ব্যাখ্যা করা সম্ভব মৌল কণার গতি ও সংগঠনের দ্বারা। তিনি প্রমাণ করেন যে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট ভরের গ্যাসের আয়তন তার উপর প্রযুক্ত চাপের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়।

নৌ রসায়ন শিল্প

এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) শিল্প ও বাণিজ্য

ষোড়শ শতকে আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ইউরোপে শিল্পোৎপাদন ও বাণিজ্যের অগ্রগতি ঘটে।

(২) রাসায়নিক শিল্প

শিল্পোৎপাদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কয়েকটি রাসায়নিক পদার্থের চাহিদা এই সময় যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। এগুলি হল সোরা, ফটকিরি, আয়রন সালফেট, সালফিউরিক অ্যাসিড, সোডা প্রভৃতি। এইসব দ্রব্যের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রসায়ন শিল্পের উদ্ভব ঘটে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এইসব পদার্থের উৎপাদন শুরু হয়। জার্মান বিজ্ঞানী পার্কিন ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কৃত্রিম রঞ্জক পদার্থ ম্যাজেন্টা আবিষ্কার করলে জার্মানির শিল্পে অগ্রগতি ঘটে।

(৩) অগ্রগতি

রাসায়নিক শিল্পের কাজে যে সব সমস্যা ও অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় তা থেকে আধুনিক রসায়নশাস্ত্রের প্রভূত উন্নতি ঘটে।

চিকিৎসাবিদ্যায় রসায়ন

অপরসায়নের চর্চার সময় থেকেই তা চিকিৎসাবিদ্যার সহায়ক হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে আধুনিক ভেষজবিদ্যাতেও রসায়নশাস্ত্রের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। যেমন –

(১) ঔষধ প্রস্তুত

রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন ভেষজ ঔষধপত্র প্রস্তুত হতে থাকে।

(২) সিফিলিসের চিকিৎসা

কলম্বাসের সঙ্গে যেসব নাবিক আমেরিকা অভিযানে গিয়েছিলেন তারা ইউরোপে সিফিলিস নামে এক ছোঁয়াচে যৌনরোগ নিয়ে এসেছিল। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পারদ ও অ্যান্টিমনি ধাতুর ব্যবহার করে এই রোগের চিকিৎসা শুরু হয়।

(৩) গায়ের রং

খনির কাজে নিযুক্ত মহিলা শ্রমিকরা নিজেদের গায়ের রঙের জৌলুস বাড়ানোর জন্য আর্সেনিকের ব্যবহার শুরু করে।

(৪) অক্সিজেনের দহন শক্তি

ল্যাভয়েসিয়ার প্রমাণ করেন যে, জীবিত দেহ আগুনের মতোই আচরণ করে, তা খাদ্যবস্তুকে দহন করে এবং দহন-জাত শক্তিকে তাপরূপে ত্যাগ করে। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় এই সময় রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার শুরু হয়। রাসায়নিক কৌশল ব্যবহারের ফলে চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রভূত অগ্রগতি সম্ভব হয় ।

অন্যান্য রাসায়নিক চর্চা

চিকিৎসাক্ষেত্র ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সময় রাসায়নিক পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়। যেমন –

  • (১) রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যৌগিক পদার্থের অণু বিভাজনের কৌশল আবিষ্কৃত হয়। জোশেফ ব্ল্যাক ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসের মৌল পৃথক করার রাসায়নিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
  • (২) ফরাসি বিজ্ঞানী ল্যাভয়েসিয়ার মৌলিক পদার্থের তালিকা তৈরি করেন এবং ভরের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেন।
  • (৩) এ ছাড়া ফ্রান্সিস বেকন রসায়নশাস্ত্রে বিভিন্ন গবেষণা করে এই শাস্ত্রের উন্নতি ঘটান।

উপসংহার :- আধুনিক রসায়ন বিদ্যার অগ্রগতি ব্যবহারিক বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করেছিল। বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে রসায়নবিদ্যার উন্নতি এবং বিজ্ঞান দর্শনের ক্ষেত্রে সূর্য কেন্দ্রিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধারণা আধুনিক বিজ্ঞানের উৎপত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।

(FAQ) আধুনিক রসায়নের সূচনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আধুনিক পরমানুবাদের জনক কে ছিলেন?

জন ডালটন।

২. কে কখন অক্সিজেন গ্যাস আবিষ্কার করেন?

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রিস্টলি।

৩. ক্লোরিন আবিষ্কার করেন কে?

১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে শেইল।

৪. অণুর ধারণা দেন কে?

অ্যাভোগ্যাড্রো।

৫. কে, কখন কৃত্রিম রঞ্জক পদার্থ ম্যাজেন্টা আবিষ্কার করেন?

জার্মান বিজ্ঞানী পার্কিন ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment